ফ্যাসীবাদকে রুখতে বুর্জোয়াদের সাথে ফ্রন্ট নয়, এগোতে হবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে
জানুয়ারি ২০২৪

পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন সমাপ্ত হল। অনেকেরই আশা ছিল সব রাজ্যগুলিতেই ফ্যাসিবাদী বিজেপি ধরাশায়ী হবে, কিন্তু তা হয়নি। মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়ে ‘বিজেপি জয়ী হয়েছে। যদিও ইভিএম মেশিন জালিয়াতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তবুও এটা বাস্তব ঘটনা যে বিজেপির ফ্যাসিবাদী চিন্তা এখনও ব্যাপক অংশের মানুষকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হচ্ছে। আগামী লোকসভা নির্বাচনে ফলাফল কি হতে যাচ্ছে তা আমরা কেউই জানি না । এমনকি এই তিন রাজ্যে বিজেপির জয় থেকে এটা বলা যায় না যে লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যগুলি থেকে বিজেপি একইরকমভাবে জয়ী হবে। ২০০৩ সালে কিন্তু ফলাফল বিধানসভা ও লোকসভায় ভিন্ন ভিন্ন হয়েছিল। সুতরাং বিজেপির বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটের নির্বাচনী লড়াই-এর জায়গা কিন্তু বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। নির্বাচনী পথে ফ্যাসিবাদকে ‘হারাবার’ আশা এখনও বিলুপ্ত হয়নি। স্ট্যালিনবাদীরা এবং কিছু ভূয়া ট্রটস্কীবাদীও সেই আশাতে আবার কোমর বাঁধছে। বাঁধুক তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদকে রুখতে গেলে আমাদের সত্যিকারে লড়াইয়ের পথে হাঁটতে হবে। বুর্জোয়া পার্টিগুলির কাঁধে ভর দিয়ে যারা ফ্যাসীবাদকে রোখার কথা ভাবেন তারা তো ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক পঙ্গুতে পরিণত হয়েছেন এবং শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে তাদের বিষাক্ত ভাবনাগুলো ছড়িয়ে তাদের হতোদ্যম করার চেষ্টা করছেন।
আমাদের পরিষ্কার বোঝার সময় এসেছে যে ফ্যাসীবাদ গোটা বুর্জোয়া শ্রেণীরই সেবা করে। সুতরাং কোন বুর্জোয়া দলই ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে আন্তরিক হতে পারে না। সুতরাং তাদের কাঁধে ভর দিয়ে যেসব তথাকথিত 'মার্কসবাদীরা’ নিজেদের পঙ্গুত্ব আড়াল করার চেষ্টা করছেন, তাদের শ্রমিক শ্রেণীর মধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে শ্রমিক-শ্রেণীর নেতৃত্বে ফ্যাসীবাদ রোখার লড়াই মুখ থুবড়ে পড়বে। জয়ী হবে ফ্যাসীবাদ ।
ফ্যাসীবাদের আবির্ভাব কি কারণে ঘটে?
১৯২৫ সাল থেকেই তার এস এস ভারতে কাজ করছে। কিন্তু ৯০-এর দশকের পর থেকেই ফ্যাসীবাদের এই রমরমার কারণ কি? কারণ মূলত দুটো-- প্রথমত, পুঁজিবাদের কাঠামোগত সংকট এবং তার ফলে প্রথাগত বুর্জোয়া দলগুলোর রাজনৈতিক সংকট, দ্বিতীয়ত, স্ট্যালিনবাদ তথা প্রথাগত বামপন্থার অবক্ষয়।
ব্যাপারটা কিরকম? আমরা যদি একটু অতীতে ফিরে যাই তবে দেখবো ভারতের পুঁজিবাদী অর্থনীতি ৯০-এর দশক পর্যন্ত মোটামুটি একটা বিকাশের পর্যায়ে ছিল (অবশ্যই ইউরোপীয় অর্থে নয়)। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে তার সংকট শুরু হয় এবং ক্রমশঃ তা বাড়তে থাকে। শুধুমাত্র ভারতই নয় গোটা বিশ্বেই আমরা এই প্রবণতা দেখেছি। পুঁজিবাদ ক্রমশই সমাধানঅযোগ্য সংকটে বেশি বেশি করে পতিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনছে পুঁজিবাদের কাঠামোগত সংকটকে। প্রথাগত বুর্জোয়া দলগুলি জনগণের সমস্যার কোনো সমাধান তো করতে পারছেই না, বরঞ্চ তা আরো তীব্র আকার নিচ্ছে। উপরন্তু বুর্জোয়া দলগুলির নেতারাও জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন দুর্নীতিতে। যা জনগণের চোখে এই সামাজিক কাঠামো সম্পর্কেই অনাস্থা তৈরি করছে। বুর্জোয়া দলগুলির প্রথাগত রাজনীতি জনগণের এই অনাস্থা দূর করতে ক্রমশ অক্ষম হয়ে পড়ছে। ফলে বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কেই তৈরি হচ্ছে বিতৃষ্ণা এবং তা জনগণকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
বামপন্থী দলগুলি কিন্তু এই অবস্থায় সবচেয়ে ভালোভাবে বিপ্লবী রাজনীতির প্রসার ঘটাতে পারত। কিন্তু তারা সে রাস্তায় তো গেলই না, বরঞ্চ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ম্যানেজারির (সরকার গঠন করে) দায়িত্ব নিয়ে জনগণের ঘৃণার বস্তুতে পরিণত হল। ফলে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াই-এর কোনো জায়গাই তৈরি হল না। বরঞ্চ জনমানসে এক ভয়ংকর শূন্যতা তৈরি হল। যা রাষ্ট্র সম্পর্কে জনগণের নেতিবাচক ধারণাকে আরো দৃঢ় করল এবং বুর্জোয়াদের পক্ষে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করল।
এই অবস্থায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এল ফ্যাসীবাদ। তারা এক কাল্পনিক শত্রু হিসেবে মুসলিমদের হাজির করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুকে এই রাষ্ট্রের পিছনে নতুন করে জড়ো করতে চাইল। যেহেতু হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই হিন্দুত্বের জিগির তোলা হল। বলা হল হিন্দুত্ব বিপন্ন এবং রাষ্ট্রকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করে তাকে রক্ষা করতে হবে। আর সেই কাজকে পরিপূর্ণ করে তুলতে উগ্র জাতীয়তাবাদের ঝড় তোলা হল। কারণ জাতীয় রাষ্ট্রই পুঁজিবাদী সমাজের বর্তমান রূপকে ধারণ করে। অর্থাৎ ফ্যাসীবাদের গোটা কার্যক্রমটাই হচ্ছে যে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র থেকে জনগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তাকে আবার নতুন করে রাষ্ট্রের সমর্থক করে তোলাই শুধু নয়, তাকে রাষ্ট্রের পক্ষের একজন যোদ্ধা হিসেবেও সে গড়ে তুলতে চাইছে, যার কাজ হবে পুঁজিবাদের মূল শত্রু শ্রমিকশ্রেণীর সংগঠনকে ভেঙে দেওয়া এবং তাকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে বিচ্ছিন্ন এককে পরিণত
করা ।
সুতরাং যেসব স্ট্যালিনবাদীরা ও ভুয়া ট্রটস্কীবাদীরা 'পার্লামেন্টকে রক্ষা কর' শ্লোগান তুলে রাজনৈতিকভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া বুর্জোয়া দলগুলির কাঁধে ভর দিয়ে ফ্যাসীবাদকে রুখতে যাচ্ছেন তারা এক বাতিল হয়ে যাওয়া কার্যক্রমকে আঁকড়ে ধরছেন। পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যদি পুঁজিবাদকে রক্ষা করা যেত তবে ফ্যাসীবাদের উত্থান হত না বা তাকে বুর্জোয়ারা মদত করত না। তা আজ সম্ভব নয় বলেই বুর্জোয়াশ্রেণী ফ্যাসীবাদকে আঁকড়ে ধরেছে। আর ফ্যাসীবাদীরাও পার্লামেন্ট-এর কোন পরোয়া করে না ।
স্ট্যালিনবাদীরা যে ভাবছে তারা 'পার্লামেন্টকে রক্ষা কর' শ্লোগান তুললে ব্যাপক মেহনতী মানুষের সমর্থন পাবে ঘটনাটা তাও নয়। কেননা যে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষকে কিছু দেয়নি, তাকে রক্ষা করতে তারা জীবনপণ লড়াই করবে, এটা আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র। সুতরাং একটা কথা পরিষ্কারভাবে বুঝে নেবার প্রয়োজন রয়েছে যে স্ট্যালিনবাদীরা ও ভুয়া ট্রটস্কীবাদীরা ‘পার্লামেন্টকে রক্ষা কর' বলে যে কার্যক্রম নিয়েছে তা দুদিক থেকেই বাতিল হয়ে গেছে। বুর্জোয়ারা ঐ পথে আর বিচরণ করতে ইচ্ছুক নয়, কারণ তাহলে আবার জনগণের বিরুদ্ধতার মুখে তারা পড়বে, যা তারা চায় না। ফ্যাসীবাদ যেভাবে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের পক্ষে আবার জনগণকে সমাবেশিত করেছে তারা সেটাকেই আঁকড়ে ধরছে এবং ধরবেও। আর অন্যদিকে শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী মানুষও পার্লামেন্টারী ব্যবস্থা নিয়ে উৎসাহী নয়। তাদেরকে ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে সমাবেশিত করতে গেলে লড়তে হবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার শ্লোগান দিয়ে। একমাত্র এই পথেই তাই ফ্যাসীবাদকে রোখা যাবে।
স্ট্যালিনবাদীরা ও ভুয়া ট্রটস্কীবাদীরা 'পার্লামেন্টাকে রক্ষা করত বলে যে শ্লোগান তুলে এগোচ্ছে তা নিরালম্ব হয়ে গগনে ঝুলছে, অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে সুতরাং ফ্যাসীবাদকে সত্যি রুখতে হলে আমাদের এগোতে হবে শ্রমিকশ্রেণীর যুক্তফ্রন্ট তৈরি করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শ্লোগান তুলে। ফ্যাসীবাদকে রোখার এটাই একমাত্র পথ। বাকি সবই ভাঁওতা।
