যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-মৃত্যু এবং ছাত্র রাজনীতি: আমাদের অভিমত
জানুয়ারি ২০২৪

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং-এ ছাত্র-মৃত্যুর ঘটনা যদিও ইতিমধ্যেই কিছুটা পুরোনো হয়ে গেছে এবং প্রচার মাধ্যমগুলিতে তা নিয়ে আর বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই তবুও আমরা এ বিষয়ে যে আলোচনা করছি তার কারণ হচ্ছে এ ঘটনা আমাদের সামনে কিছু রাজনৈতিক শিক্ষাকে তুলে ধরেছে যা অনুধাবন করাটা জরুরী। এ ঘটনা যেমন সুবিধাবাদী রাজনীতির নির্মম পরিণতিকে দেখিয়েছে তেমনি আবার সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘোলা জলে মাছ ধরবার যে অভিযান চালিয়েছেন তাকে পরিষ্কারভাবে উন্মোচন করাটা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে আমরা মনে করছি। কেননা রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বিপ্লবী রাজনীতির বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা, যাকে পরাস্ত করাটা জরুরী, জরুরী ছাত্র তথা জনসমাজ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা।
র্যাগিং ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি
র্যাগিং বিষয়টা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তা চলে আসছে। পুঁজিবাদী সমাজ দাঁড়িয়ে আছে একটা শোষণমূলক ও দমনমূলক ব্যবস্থার উপর, যা সমাজের সর্বস্তরে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। এই ব্যবস্থা সমাজের সর্বস্তরেই মানসিক বিকৃতির জন্ম দেয়। ছাত্র সমাজও তার বাইরে নয়। এইসব বিকার ও বিকৃতি ছাত্রসমাজে র্যাগিং বলে পরিচিত। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও তা দীর্ঘদিন ধরেই আছে, থাকবেও যতদিন পর্যন্ত এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা থাকবে। অবশ্য সত্যিকারের বিপ্লবী কমিউনিস্ট মতাদর্শে যদি ছাত্র সমাজ উদ্বুদ্ধ হয় তবে এই বিকৃতি অনেকটাই পিছু হটতে বাধ্য হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। দুর্ভাগ্যবশতঃ ছাত্রসমাজ তো নয়ই, এমনকি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও এই বিপ্লবী কমিউনিস্ট মতাদর্শকে ছাত্ররা এখনও পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। তাই র্যাগিং চলছে এবং একটি সম্ভাবনাময় তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে গেছে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, যে পুঁজিবাদী সমাজ এই র্যাগিং নামক মানসিক বিকৃতির জন্ম দেয়, তার ধারকবাহক বুর্জোয়া ও ফ্যাসিবাদী পার্টিগুলি র্যাগিং বিরোধিতার নামাবলী গায়ে জড়িয়ে আসর মাত করতে ময়দানে নেমে পড়েছিল। আর এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গত করেছিল বুর্জোয়া প্রচার মাধ্যমগুলি -- পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলগুলি। যেহেতু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নগুলি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পলিসিগুলির বিরোধী এবং জনসমাজে 'বামপন্থী' বলে পরিচিত এবং তাদেরই কেউ কেউ এই ঘটনার সাথে জড়িত তাই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা বামপন্থা তথা মার্কসবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালায় যা বাস্তবত মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কুৎসা ছাড়া আর কিছু নয়। নিজেদের কদর্য চরিত্রকে আড়াল করতে তারা যেভাবে প্রচারে নেমেছিল তা জনমানসে বিভীষিকা তৈরি করে দিয়েছিল। আর শুধু তো জনমানসে বিভীষিকা তৈরিই নয়, এই সুযোগে একটি নকশালপন্থী ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ানদের দিয়ে অত্যাচারও চালিয়েছে ফ্যাসীবাদী বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তবে এসব করে তারা খুব লাভ কিছু করে উঠতে পেরেছে বলে মনে হয় না। অন্তত এখনো পর্যন্ত তো সেরকম কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
তবে বিভিন্ন ‘বামপন্থী' সংগঠনগুলির বোঝা উচিত যে তাদের সুবিধাবাদী কার্যকলাপ এভাবেই বুর্জোয়া ও ফ্যাসিবাদী দলগুলিকে জনসমাজে হিরো সাজবার সুযোগ করে দেয়। বাড়িয়ে দেয় এসব পচে গলে যাওয়া দুর্গন্ধী লাশ-এর মত দলগুলির গ্রহণযোগ্যতাকে। তবে এইসব দলগুলিকে নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনায় যেতে চাই না। আমাদের আলোচনা আমরা সীমাবদ্ধ রাখব যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বিভিন্ন বামপন্থী' ছাত্র সংগঠন ও তাদের জন্মদাতা দলগুলোর কার্যকলাপে। কেননা যাদবপুরের ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব তারাই দেয়। আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাদেরই কারো কারো কার্যকলাপের ফলে, আবার তাদেরই একটা অংশ অভিযুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার। অভিযুক্তদের ‘সুবিধাবাদ', ‘অরাজনীতি', 'নির্দলীয়তা'-কে তারা সোচ্চারে আক্রমণ করছে। এবং যাদবপুরের ছাত্রসমাজকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হবার ডাক দিচ্ছে।
অভিযুক্তদের রাজনীতি ও কার্যকলাপ
যাদবপুর-এর ছাত্রমৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে নাম জড়িয়েছে কালেক্টিভ এবং ডিএসএফ, ফ্যাস (FAS) ও WTI-(We The Independent)-এর। এসএফআই এবং তাদের সহযোগীরা অভিযোগ করছে যে আসলে এসব সংগঠনগুলিকে কালেক্টিভই নিয়ন্ত্রণ করে এবং অভিযুক্তরা সকলেই কালেক্টিভের সঙ্গে যুক্ত। এই অভিযোগ কতটা সত্য আমরা জানি না, তবে যদি ধরেও নিই তাদের অভিযোগ সত্য তাহলেও এই সংগঠনগুলোর ব্যাপারে কিছুটা স্বতন্ত্র আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা FAS বা WTI খুব পুরোনো না হলেও ডিএসএফ সংগঠনটি ১৯৭৫ সালে জরুরী অবস্থা জারি হওয়ার সময় থেকে আছে এবং একটা সময় (১৯৭৭ সালের আগে পর্যন্ত) SFI-ও এই সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাজেই ডিএসএফ আর কালেক্টিভকে এক করে দেখাটা ঠিক নয়। কেননা কালেক্টিভ, ছাত্র আন্দোলন প্রস্তুতি কমিটি' এদের জন্ম অনেক পরে। SFI-র বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে আমরা পরে আসছি, তার আগে 'কালেক্টিভ' করেছিল যে সেটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। ছাত্র সমাজকে বিপ্লবী সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার ।
‘কালেক্টিভ’সংগঠনটি পূর্বে 'ছাত্র আন্দোলন প্রস্তুতি কমিটি' নামে পরিচিত ছিল বলে শোনা যাচ্ছে। এই কমিটিটি তৈরি হয়েছিল গণতান্ত্রিক ছাত্র কেন্দ্র (DSC) থেকে বেরিয়ে আসা কিছু কর্মীকে নিয়ে। এরা দীর্ঘদিন ধরেই দাবী করে আসছে যে তারা নাকি মার্কসবাদ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। সেই গবেষণার ফলাফল কি তা তত্ত্বাকারে আমরা এখনো পাইনি বা কোনদিন পাব বলে মনেও হয় না। কিন্তু এদের কার্যকলাপ দেখে তার ফলাফল কিছুটা আঁচ করা যায়। তারা মার্কসীয় তত্ত্ব সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ কিছু সুবিধাবাদীর একটা জোট, যারা অরাজনীতির নাম করে যেনতেন প্রকারেণ ছাত্রদেরকে তাদের সংগঠনে ধরে রাখতে চায়। এ ব্যাপারে যাদবপুরে তারা অনেকটাই সফল, কেননা তাদের আগে ডিএসসি এবং পিডিএসএফ নামে দুটি নকশালপন্থী সংগঠন ঐ একই কায়দায় ওখানে তাদের কার্যক্রম চালিয়েছিল এবং তাদেরই ধারাবাহিকতায় কালেক্টিভ সেই জমির দখল নিয়েছে। (ছাত্রমৃত্যুর ঘটনা পিডিএসএফ সংগঠনের এক কর্মীর নাম জড়িয়েছে এবং সে গ্রেপ্তারও হয়েছে)। সুতরাং অরাজনীতির ধুয়া একা কালেক্টিভই তুলেছিল এরকমটা নয়, এতে ঐসব সংগঠনেরও যথেষ্ট অবদান আছে। আর এব্যাপারে শুধু এদেরকে বলে লাভ নেই, সমস্ত স্ট্যালিনবাদী সংগঠনই গণসংগঠন গড়বার নাম করে এই অরাজনীতির চর্চা চালায়। তবে এব্যাপারে কালেক্টিভ যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছে এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই, আর সকলকে হঠিয়ে তারাই যাদবপুরের ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংগঠন হয়েছে। যেহেতু ‘কালেক্টিভ’ কোন বিপ্লবী মার্কসবাদী রাজনীতির পরোয়া করে না, তাই ছাত্রদের মধ্যে তাদের প্রভাব ধরে রাখতে এবং বাড়াতে তাদের মধ্যেকার সমস্ত পশ্চাদপদ চেতনাকে তারা মদত করে, এমনকি উসকেও দেয়। র্যাগিং এমনই একটা পশ্চাদপদ চেতনা, যা আসলে মানসিক বিকৃতি ছাড়া কিছু নয়। কালেক্টিভ এগুলোকে বিরোধিতা তো করেই না, বরঞ্চ একে মদত করে ছাত্রদের মধ্যে তার প্রভাবকে ধরে রাখার জন্য। এর ফলে র্যাগিংকারীরা যেমন তার দলে থাকে, তেমনি তাদের মাধ্যমে সে বিরোধীদের দমন করে যা স্ট্যালিনবাদী রাজনীতির অন্যতম উপাদান। বিরোধী মতকে বিতর্কের মাধ্যমে পরাস্ত করা নয়, তাকে দাবিয়ে দাও -- স্ট্যালিনবাদ এটাই বলে। কালেক্টিভ একটা স্ট্যালিনবাদী সংগঠন হিসেবে সেটাই করে চলেছে। আর সেটা করতে গিয়েই সে এখন বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে।
সুবিধাবাদী রাজনীতি কালেক্টিভ বরাবরই করে চলেছে, আর স্ট্যালিনবাদী সুবিধাবাদের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে বুর্জোয়া দলগুলির লেজুড়বৃত্তি করা, যা তারা আগেও করেছে, এখনও করছে। এর আগে ‘হোক কলরব' আন্দোলনের সময় তারা পরিষ্কার ঘোষণা করেছিল যে সেটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। ছাত্র সমাজকে বিপ্লবী মার্কসবাদী রাজনীতিতে উদ্বুব্ধ করা তো দূরের কথা, বরঞ্চ তাদেরকে পশ্চাদপদ চিন্তার গাড্ডার মধ্যে ফেলে রাখার জন্য তারা সেদিন ঐ ঘোষণা করেছিল। অথচ তাদের পরিচালিত মিছিলের সামনের সারিতে দেখা গেছিল তৎকালীন বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদারকে এবং সিপিএম নেতৃত্বকে। অর্থাৎ তাদের তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনে ফ্যাসীবাদী ও স্ট্যালিনবাদী নেতৃত্বকে তারা হাজির করল, অথচ বিপ্লবী মার্কসবাদী রাজনীতি প্রচারে তাদের ঘোরতর আপত্তি। সুবিধাবাদ এভাবেই বুর্জোয়া রাজনীতির সেবা করে ।
গত ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনেও কালেক্টিভ সংগঠনকে No Vote to BJP-র প্রচারে দেখা গেছে, যা আসলে তৃণমুলের হয়ে প্রচার ছাড়া কিছুই নয়। বিপ্লবী মার্কসবাদীরা যেভাবে নির্বাচনকে ব্যবহার করে, তার কণামাত্রও এতে ছিল না। এভাবেই কালেক্টিভ তার সুবিধাবাদী রাজনীতির জায়গা থেকে বুর্জোয়াদের সেবা করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে FAS-এর জন্ম হয়েছিল SFI ভেঙে। কিন্তু তারাও একইভাবে সুবিধাবাদের সেবা করে গেছে। আর WTI তো নামেই তার রাজনীতির পরিচয় দিয়ে দিয়েছে। একটা শ্রেণীবিভক্ত পুঁজিবাদী সমাজে কেউই শ্রেণী নিরপেক্ষভাবে স্বাধীন হতে পারে না। যারা প্রকাশ্যে শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে দাঁড়াবে না, তারা কার্যত বুর্জোয়াদের সেবা করতে বাধ্য। সুতরাং WTI যে এসবই করবে তা স্বাভাবিক । আর কালেক্টিভ যদি FAS ও WTI-র দখল নিয়ে নেয় তাতে অবাক হবার কিছু নেই, কেননা, রতনে রতন চেনে- বাংলাতে এই প্রবাদ আমরা সকলেই জানি। তবে ডিএসএফ-এর ইতিহাস এদের থেকে কিছুটা আলাদা। জরুরী অবস্থাকালীন সময়ে কংগ্রেসী স্বৈরাচারী রাজের বিরোধিতা করবার জন্যে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের যৌথ ফ্রন্ট ছিল এটি। বিভিন্ন নকশালপন্থী সংগঠন তাতে ছিল। ডিএসএফ সেইসময় থেকে নকশালপন্থী ছাত্রদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর একটি যৌথ মঞ্চ ছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও তারা একসাথেই ডিএসএফ করত। এবং সেটি নকশালপন্থী রাজনীতির কর্মসূচির ভিত্তিতেই চলত। সেই সময়ে ডিএসএফ নিজেকে রাজনৈতিক সংগঠনই বলত, অরাজনীতির ধুয়া তারা ধরেনি। পরবর্তীকালে ডিএসসি সংগঠন ডিএসএফকে চালাত এবং ডিএসএফকে ডিএসসি-র অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু সেটা রাজনৈতিক সংগঠনই ছিল (যদিও সেটা ছিল স্ট্যালিনবাদী রাজনীতি, কিন্তু অরাজনীতির কথা তারা বলত না)। পরবর্তীকালে নব্বই-এর দশকে ডিএসসি, পিডিএসএফ এইসব সংগঠনগুলি ক্রমশ অরাজনীতির ধুয়া তুলতে থাকে এবং যেহেতু তারাই সেই সময়ে ডিএসএফ-কে নিয়ন্ত্রণ করত সুতরাং ডিএসএফ আস্তে আস্তে অরাজনীতির ধ্বজাধারী হয়ে ওঠে। আর সেই সুযোগে ছাত্র আন্দোলন প্রস্তুতি কমিটি' (কালেক্টিভের পূর্বসুরী) ডিএসএফ-কে দখলে নেয় এবং অরাজনীতির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটায়। আমাদের এই ইতিহাস খেয়াল রাখা দরকার। কেননা কিছু সংগঠন বর্তমান ডামাডোলের সুযোগে ডিএসএফ সম্পর্কে নানারকম মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে যা আদৌ অভিপ্রেত নয়।
সুবিধাবাদকে, অরাজনীতিকে বিরোধিতা করা দরকার। কিন্তু কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে তা করা যায় না। ভুল রাজনীতিকে সঠিকভাবে রাজনৈতিকভাবেই বিরোধিতা করতে হবে।
অভিযোগকারী এসএফআই সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য
যাদবপুরের ছাত্র-মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এসএফআই বিরাটভাবে প্রচার চালিয়েছে। এমনকি সিপিএম-ও তা নিয়ে আসরে নেমে পড়েছে। তৃণমূল ও বিজেপির যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দখলের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তারা সঠিকভাবেই বিরোধিতা করেছিল। তাদের কুৎসা ও মিথ্যাকেও তারা বিরোধিতা করেছে এটা ভালো কথা। কিন্তু কালেক্টিভ, ডিএসএফ ইত্যাদিদের বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা সবসময় সঠিক রাস্তায় হাঁটেনি, বরঞ্চ অনেক ক্ষেত্রেই মিথ্যার রাস্তায় হেঁটেছে। যেমন ডিএসএফ-কে যেভাবে তারা তৃণমূল নেতা তৈরির সংগঠন বলে দাবি করেছে তা ঠিক নয়। আমরা আগেই ডিএসএফ-র পুরোনো ইতিহাস বলেছি। মোহিত রায় বলে যে বর্তমান বিজেপি নেতা ডিএসএফ করত বলে তারা দাবী করছে সেই মোহিত রায় যখন যুক্ত কমিটি করত তখন এসএফআই ও ডিএসএফ-এর মধ্যে ছিল, সুতরাং ডিএসএফ যদি তার জন্য দায়ী হয় তবে এসএফআইও তার দায় এড়াতে পারে না। সম্প্রতিকালে আরেকজন তৃণমুল নেতা ডিএসএফ-এর নেতা হিসেবে ‘হোক কলরব' আন্দোলনে যুক্ত ছিল বলে তারা দাবী করেছে। এটা নিঃসন্দেহে ডিএসএফ তথা কালেক্টিভ-এর সুবিধাবাদী রাজনীতিকে উন্মোচন করে। কিন্তু সেই ‘হোক কলরব' আন্দোলনের সমর্থনে সিপিএম নেতারাও তো নাগরিক মিছিলে হেঁটেছিলেন। তা কি তারা ভুলে গেছেন? তাহলে সেক্ষেত্রে তাদের কোন দায় নেই? আসলে সেই সময় কালেক্টিভের সুবিধাবাদী রাজনীতিকে তারা বিরোধিতা তো করেনইনি বরঞ্চ বিজেপির নেতাদের সাথে একসাথে মিছিলে হেঁটে তার থেকে ফায়দা তোলবার চেষ্টা করেছিলেন। এটা কি নির্লজ্জ সুবিধাবাদ নয়। আর আজ যখন কালেক্টিভ বিপদে পড়েছে তখন সব দোষ তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সাধু সাজলে চলবে?
তবে এসএফআই-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে যে বড় অভিযোগ আমরা তুলব তাহল তাদের অতীত কার্যকলাপ। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের সময় পঃবঙ্গের বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসএফআই-এর কি ভূমিকা ছিল তা কি আমরা ভুলে গেছি? বাম সরকার এই দীর্ঘ সময়ে যে জনবিরোধী কাজগুলি চালিয়েছিল তাকে। এসএফআই সমর্থন তো করেইছিল এমনকি কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরোধী বাম ছাত্রসংগঠনগুলির উপরে তারা ব্যাপক হামলা এবং নির্যাতন চালিয়েছিল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য বাম ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের মারধর করা, তাদের ছাত্র-সংসদ নির্বাচনে দাঁড়াতে না দেওয়া, দাঁড়ালে হুমকি দেওয়া, নমিনেশন বিভিন্ন অজুহাতে কর্তৃপক্ষকে দিয়ে বাতিল করানো এসব তো ছিল দৈনন্দিন ব্যাপার। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গা জোয়ারি করে ছাত্রসংসদগুলো দখল করাটাই ছিল এসএফআই-এর সেই সময়কার নীতি। আজ যখন তারা র্যাগিং-এর বিরুদ্ধে কথা বলে তাই তা হাসির খোরাক জোগায় মাত্র। ঐ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েই ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় চারদিক থেকে ঘিরে সিপিএম কর্মীরা ডিএসএফ কর্মীদের উপর যে হামলা চালিয়েছিল নিশ্চয় অনেকের মনে আছে। শুধু তাই নয় পুলিশ ও সিপিএম কর্মীদের যৌথ হামলা চালিয়ে ছাত্র আন্দোলন ভেঙে দেবার ঘটনা তার পরেও ঘটেছে। তা এত সবের পরে এসএফআই যখন আজ কালেক্টিভ বা অন্যদেরকে বিরোধিতা করে নিজেদের 'গণতান্ত্রিক' বলে জাহির করে তখন তাদের মুখোশ খুলে দেওয়াটা প্রত্যেক বিপ্লবী মার্কসবাদী ছাত্রের আবশ্যকর্তব্যর মধ্যে পড়ে।
এআইএসএ ও ‘নয়া দিশা’-র ভূমিকা
এ প্রসঙ্গেই আসে এআইএসএ ও 'নয়াদিশা’-র ভূমিকার কথা। এআইএসএ পরিচিত সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠন হিসেবে এবং ‘নয়াদিশা' ভূয়া ট্রটস্কীবাদী মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর যুব-ছাত্র শাখা। এরা উভয়েই এসএফআই-এর সাথে যৌথ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। কালেক্টিভকে খুনী বলে অভিহিত করে তাদের দাদাগিরিকে রোখবার ডাক দিয়েছিল ‘নয়া দিশা’। ‘উত্তর পাড়া নিপাত যাক’ বলে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক বালখিল্যসুলভ পোস্টারও তারা সাঁটিয়েছিল। কিন্তু কালেক্টিভ কি খুনের রাজনীতি করে ? তাদের খুনী বলা হচ্ছে কোন যুক্তিতে? তাদের কর্মীরা যদি ঐ ছাত্র হত্যার সাথে জড়িতও থাকে, তাবলে কি কালেক্টিভ খুনী হয়ে যায় ? কালেক্টিভ কি সংগঠনগতভাবে ঐ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? তা নিশ্চয়ই তারা নেয়নি। তাহলে কালেক্টিভ খুনী হয় কি করে? তাদের সুবিধাবাদকে উন্মোচন করে তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালানোটা দরকার, কিন্তু মিথ্যা দোষারোপ প্রমাণ করে অভিযোগকারীরা আসলে এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে যা কাম্য নয়।
‘নয়া দিশা’ কতটা সুবিধাবাদী তা তাদের শ্লোগানগুলো থেকে বোঝা যায়। তারা যাদবপুরের বিপ্লবী ঐতিহ্য' ফিরিয়ে আনবার ডাক দিয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কি ট্রটস্কীবাদী ছাত্র আন্দোলনের ঘাঁটি ছিল না কি? কোন কালেই তো তা ছিল বলে আমরা জানি না। বরঞ্চ তা স্ট্যালিনবাদী-মাওবাদীদের ঘাঁটি ছিল বলেই আমরা জানি। তাহলে যাদবপুরে ‘বিপ্লবী” ঐতিহ্য ‘নয়া দিশা’ কোথায় খুঁজে পেল ?
‘স্ট্যালিনবাদ-মাওবাদের’ মধ্যেই তাহলে এখন ‘নয়া দিশা’ বিপ্লবী ঐতিহ্য খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমরা মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীকে তো শুধু শুধু ভুয়া ট্রটস্কীবাদী বলি না।
'নয়া দিশা' এসএফআই-এর সাথে যৌথ আন্দোলন করছে। অথচ এসএফআই-এর পূর্বতন প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা নিয়ে তাদের কোন সমালোচনা তারা করেনি, বাম সরকার-এর মত একটা বুর্জোয়াদের দালাল সরকারকে যারা সমর্থন করত তাদের মুখোশ খুলে দেওয়ার কোন প্রচেষ্টা ‘নয়া দিশা’ নেয়নি। প.বঙ্গের সমস্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিরোধী বাম ছাত্র সংগঠনগুলির উপর এসএফআই যে হামলা চালাত, তাদের সেই অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী কার্যকলাপ নিয়েও ‘নয়া দিশা'র কেন সমালোচনা নেই। অর্থাৎ যৌথ আন্দোলনের নাম করে 'নয়া দিশা' আসলে এসএফআই -এর লেজুড়বৃত্তি করছে এবং তাদের দালালে পরিণত হয়েছে।
এসএফআই-এর লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে তারা তাদের ডাকা নাগরিক মিছিলেও হাজির হয়েছিল, যা আসলে কংগ্রেসীদের সাথে সিপিএম-এর যৌথ মিছিল। ‘নয়া দিশা’ এতটাই প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছে যে সেখানেও তারা নির্দ্বিধায় চলে গিয়েছিল।
যৌথ আন্দোলনের অন্যতম শর্ত হচ্ছে শরিকদের বিরুদ্ধে সমালোচনার অধিকার বজায় রাখা এবং সমালোচনা চালিয়ে যাওয়া। শুধু তাই নয় শক্তির তুল্যমূল্য বিচার করেই যৌথ আন্দোলনে যাওয়া উচিত। এর কোন শর্তই ‘নয়া দিশা’ পুরণ করেনি। অবশ্য ভূয়া ট্রটস্কীবাদীদের এই আচরণই প্রত্যাশিত।
শেষের কথা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কালেক্টিভ একটি আদ্যোপান্ত সুবিধাবাদী ছাত্র সংগঠন, কিন্তু এর বাইরে যারা আছে সেই এসএফআই, এআইএসএ, আরএসএফ তারাও স্ট্যালিনবাদী এবং মাওবাদী। এদের রাজনীতি এবং কর্মনীতি ও কৌশলও সম্পূর্ণ সুবিধাবাদী। এরা কালেক্টিভরই প্রতিচ্ছবি মাত্র। ভুয়া ট্রটস্কীবাদী 'নয়া দিশা'ও এদের থেকে আলাদা নয়। যাদবপুরের ছাত্র সমাজকে মনে রাখতে হবে ছাত্ররা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজই ছাত্র-যুব তথা শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের সমস্ত দুর্দশার মূলে। তাকে উচ্ছেদ না করলে এই দুর্দশা থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব নয়। কিন্তু তাকে উচ্ছেদ করতে গেলে চাই সত্যিকারের বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনীতি, যা একমাত্র লেনিনবাদ-ট্রটস্কীবাদের পতাকার তলায় দাঁড়িয়ে করা সম্ভব। র্যাগিং তথা সমস্ত সমস্যার সমাধান সত্যি সত্যিই করতে হলে এই রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। ছাত্ররা বিপ্লবের বার্তাবাহক' লেনিনের এই উদাত্ত আহ্বানকে সফল করতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা চতুর্থ আন্তর্জাতিকের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরুন।
