প্রসঙ্গ: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান
জানুয়ারি ২০২৫

বাংলাদেশ-এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি উদাহরণ বোধ হয় খুবই প্রাসঙ্গিক হবে। ইউরোপে ফ্রান্স ছিল এমন একটি দেশ যেখান গণঅভ্যুত্থানের ঢেউ আছড়ে পড়ত ঘনঘন। যা দেখে মার্কস-এঙ্গেলস আশা করেছিলেন যে ফ্রান্সেই সংঘটিত হবে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। বাংলাদেশকে বোধ হয় ফ্রান্সের সাথে তুলনা করে বলা যেতে পারে তা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ফ্রান্স। কেন একথা বলছি? ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) আন্দোলন-সংগ্রামে উত্তাল। ১৯৫২, ১৯৬৮-৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪ একের পর এক গণঅভ্যুত্থান সামিল হয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে তৈরি হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র। এরপরও দু-দুটি গণঅভ্যুত্থান আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। সাম্প্রতিক 2024 সালের জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের ফলে দীর্ঘ ১৫ বছারের স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে। তৈরি হয়েছে ইউনুস সরকার। না, সমাজতন্ত্রের লড়াই এখনো বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। হাসিনার স্বৈরাচারী পুঁজিবাদী শাসনের বদলে যে ইউনুস সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে তা পুঁজিবাদী সরকারই, অন্য কিছু নয়। ভারত সরকার ও তার পেটোয়া গদি মিডিয়া তাকে সাম্প্রদায়িক বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেরকম কিছু আমরা এখনো পর্যন্ত দেখতে পাইনি। আসলে বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই ভারত রাষ্ট্র বাংলাদেশকে তার করদ রাজ্য হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত এবং আওয়ামী লীগের মাধ্যমেই সে তার আধিপত্য বাংলাদেশে বজায় রেখেছিল এবং নানারকম অন্যায় সুযোগ-সুবিধা সে এতদিন ভোগ করে আসছিল এবং পদ্মা থেকে শুরু করে বিভিন্ন নদীর জল থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করে তার কৃষি ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। এছাড়া রাজনৈতিক ছড়ি ঘোড়ানো তো ছিলই। হাসিনা সরকার-এর পতনের ফলে ভারত রাষ্ট্র তার সেই আধিপত্যবাদ ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কায় ইউনিস সরকারকে বাগে আনবার জন্য এই ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে আমরা মনে করি, সুতরাং একে গুরুত্ব দেবার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমরা ভাবছি না। তবে ইউনুস সরকার যে একটা পুঁজিবাদী সরকার এবং তার ক্ষমতায় আসীন হবার কারণে যে বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের কোন সুযোগ বা সম্ভাবনা নেই, এ বিষয়ে আমাদের কোন সন্দেহ নেই।
তবে বাংলাদেশের এই গণঅভ্যুত্থান প্রচুর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যা সুস্থ বলেই আমরা মনে করি। বিভিন্ন অপশক্তি ঘোলাজলে মাছ ধরবার চেষ্টা করলেও এই বিতর্ক বাংলাদেশের সমাজ জীবনের পক্ষে স্বাস্থ্যকর হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। তবে সেই বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে গেলে বা বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিকে ভালোভাবে বুঝতে গেলে বা বাংলাদেশের ভবিষ্যত গতিপথ কোন দিকে যেতে পারে তাকে আন্দাজ করতে গেলে আমাদের বাংলাদেশের অতীতকে ভালোভাবে জানার প্রয়োজন আছে, কেননা আজ আমরা বাংলাদেশকে যে ভাবে দেখছি তা অতীতের বিভিন্ন ঘটনাবলীর মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে। আর সেই ইতিহাস সম্পর্কে অনেকেই ভালোভাবে অবহিত নয়, ফলে আজকে যে ঘটনা ঘটছে তা সম্যকভাবে উপলব্ধি তারা করতে পারছেন না। বাংলাদেশের ঘটনাবলীর সম্যক উপলব্ধির জন্য এবং সেখানকার সমাজ অর্থনীতির বদলের লড়াই ই বা কি জায়গায় আছে, বা সেই লড়াই সম্পর্কেই বা আমাদের ধারণা কি তা পরিষ্কার করবার জন্য সাম্প্রতিক অতীত ইতিহাসের রোমন্থন খুবই জরুরী।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ভারতে গদি মিডিয়ার অপপ্রচারের ফলে বাংলাদেশীদের মধ্যে যে চূড়ান্ত ভারত বিরোধিতা বা ভারত-বিদ্বেষ প্রত্যক্ষ করা গেছে তাতে ভারতের অনেক নাগরিকই ক্ষুব্ধ। কিন্তু তাদের জানতে দেওয়া হয়নি বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশে কি ছিল। সেটা যদি তারা জানতেন তবে হয়তো তারা এ কারণে বাংলাদেশীদের উপর খুব ক্ষুব্ধ হতে পারতেন না। যাই হোক, আমরা পাকিস্তান তৈরি হওয়ার সময় থেকেই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে মানুষের সংগ্রাম ও লড়াই এর ইতিহাস সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছি, তার সাথে অবশ। আমাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও আমরা হাজির করবো যা বর্তমান ঘটনাবলীর সাথে একে যুক্ত করতে সাহায্য করবে।
পাকিস্তান পর্ব
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পরে তৈরি হয় পাকিস্তান। পাকিস্তান এমন একটা অদ্ভূত রাষ্ট্র ছিল, যার দুটো অংশ ছিল। একটা অংশের থেকে আরেকটা অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব ছিল ১২৫০ কিলোমিটার। আবার পশ্চিম অনেক বেশি। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে আর পূর্ব পাকিস্তানে ৫৬ শতাংশ। পূর্ব পাকিস্তানে বহু জাতি বা উপজাতি থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল বাঙ্গালী। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল বা আছে বহু জাতির মানুষ। যেমন বালুচ, পাঠান, সিন্ধী, পাঞ্জাবী এবং বিভিন্ন উপজাতির মানুষ। অর্থাৎ জাতি হিসেবে পাকিস্তানে বাঙ্গালীরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। অথচ মাত্র ৩-৪ শতাংশ লোকের মাতৃভাষা উর্দুকে ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হল। যার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হল ভাষা আন্দোলন, যা ১৯৫২ সালে গণআন্দোলনে রূপ নিল। এর ফলে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করতে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হল।
এসব ঘটনা অনেকেই বা প্রায় সকলই জানেন কিন্তু যা নিয়ে আলোচনা হয় না, বা চাপা পড়ে থাকে তাহলে এসবের নেপথ্য কারণ। অর্থাৎ পাকিস্তান রাষ্ট্র বা সরকার কেন এ ধরনের স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছিল। আর শুধুমাত্র তো বাঙ্গালী নয়, বালুচ, পাঠান, সিন্ধীদের উপর শুরু থেকেই অত্যাচার চালাচ্ছিল পাকিস্তান সরকার, যা এখনও চলছে। শুধু এ বিষয়টা বুঝতে গেলে পাকিস্তানের সামাজিক অর্থনীতি ও রাজনীতি আমাদের বোঝা দরকার।
আজকের পৃথিবীব্যাপী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যুগে যে কোন দেশে (শ্রমিকরাষ্ট্র ছাড়া) রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করে পুঁজিপতিরা (অথবা কিছু দেশে সামন্ত শক্তিগুলি)। কিন্তু পাকিস্তান ছিল এমন একটা দেশ যেখানে স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি হবার পর দেখা গেল সেখানে কোন জাতীয় বুর্জোয়া শ্ৰেণী নেই- না পশ্চিম না পূর্বে। ভারতের বিভাজনের পর গুজরাট ও বোম্বে থেকে মেমন, বোরা এবং খোজা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় করাচিতে এসে বসবাস করতে শুরু করে। পরবর্তীকালে এরাই শিল্পে বিনিয়োগ করে শিল্পপতি এবং পুঁজিপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বুর্জোয়া শ্রেণীর অনুপস্থিতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ত ভূস্বামী শ্রেণী, আমলাতন্ত্র এবং সামরিক বাহিনী শাসকের ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তানে যে প্রথম থেকেই গণতন্ত্রের অভাব আমরা দেখি তার মূল কারণ হচ্ছে সামাজিক সম্পদ লুটের মধ্য দিয়ে নতুন বুর্জোয়া শ্রেণী তৈরির প্রক্রিয়া সেখানে চলেছিল। একই জিনিস আমরা দেখেছি বার্মা বা বর্তমান মায়ানমারে। ভারতবর্ষে যে আমরা তুলনামূলক ভাবে কিছুটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে পেয়েছি তার কারণ হচ্ছে এখানে একটা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী বুর্জোয়া শ্রেণী ছিল, যারা তাদের পক্ষে সুবিধাজনক পার্লামেন্টারী ব্যবস্থা চালিয়ে গিয়েছে, যদিও উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের তুলনায় ভারতের গণতন্ত্র অনেকটাই খর্বিত। পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) ক্ষেত্রে সমস্যাটা ছিল আরো বেশি। সেখানেও কোন বুর্জোয়া শ্রেণী ছিল না, কিন্তু ছিল একটা পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী যারা নিজেদেরকে বুর্জোয়া শ্রেণীতে রূপান্তরিত করতে চায়, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান তাদেরকে শোষণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে সম্পদ পাচার করতে শুরু করে পশ্চিমে। যেমন পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পায়নের জন্য দরকার যন্ত্রপাতি বা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করা, কিন্তু তার জন্য পুঁজি কোথা থেকে আসবে? পূর্ব পাকিস্তান ছিল পাট উৎপাদনের মূল কেন্দ্র যেখান থেকে পাট রপ্তানি হত, আর সেটাই ছিল পাকিস্তানে বিদেশী মুদ্রা আমদানির ৭০ শতাংশ, সেটা কাজে লাগত পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়নের জন্য। এইভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করে পাকিস্তানের বুর্জোয়া শ্রেণী সমৃদ্ধ হতে থাকে। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের বাজারও তাদের উৎপাদিত দ্রব্যে তারা ভরিয়ে দেয় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী পেটি বুর্জোয়াদের বুর্জোয়া শ্রেণীতে রূপান্তরিত হবার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। এর পাশাপাশি শুরু হয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে জোর করে চাপিয়ে দিয়ে বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বাকে দাবিয়ে দেবার চেষ্টা হয়। অথচ তারাই ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি।
সুতরাং ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী এই পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী তাদের বিক্ষোভ শুরু করে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে তারা কিন্তু পাকিস্তান থেকে বিচ্ছেদের কথা কখনো ভাবেনি। বাঙ্গালী পেটি বুর্জোয়াদের সংগঠন আওয়ামী লীগ কখনোই পাকিস্তান থেকে বিচ্ছেদের শ্লোগান দেয়নি। অনেকের ধারণা আছে যে মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগ শুরু করেছিল, কিন্তু ইতিহাসে এরকম কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। আসলে একটা বুর্জোয়া শ্রেণী হিসেবে গড়ে উঠতে গেলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাহায্য তাদের দরকার বলে এই বাঙ্গালী পেটি বুর্জোয়ারা ভেবেছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা বামপন্থীদের প্রভাব পশ্চিম পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানে (সেখানেই বেশি) বাড়ছিল। এদের দমিয়ে রাখতে গেলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাহায্য তাদের অবশ্য প্রয়োজন। সুতরাং আওয়ামী লীগ কখনোই পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার দাবী তোলেনি। আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমান যে ছয় দফা দাবীর ভিত্তিতে আন্দোলন চালাচ্ছিলেন তাতে পাকিস্তানকে একটা ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে মাত্র দুটি বিষয়- দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি-ছাড়া সমস্ত কিছুই অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির হাতে থাকবে। আলাদা মুদ্রা, আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা তো বটেই, বৈদেশিক বাণিজ্যেরও পূর্ণ ক্ষমতা অঙ্গরাষ্ট্রের থাকবে এইসব দাবী নিয়ে আন্দোলন চলছিল। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার কথা তাতে নেই এমনকি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পরেও তাদেরকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার কারণে যে অসহযোগ আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে চলছিল সেখানেও কিন্তু স্বাধীনতার দাবী ওঠেনি। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের সাথে মুজিবর রহমান এবং আওয়ামী লীগের যে আলোচনা চলছিল তাতে শেষদিনে (অর্থাৎ ২৫ মার্চ-যে দিন পূর্ব পাকিস্তানে সেনার তান্ডব শুরু হয়) আওয়ামী লীগ বিবৃতি দিয়েছিল যে তাদের দলকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে ইয়াহিয়া খান রাজি হয়েছেন এবং তারা আশা করে যে রাষ্ট্রপতি এই বিষয়ে একটি ঘোষণা দেবেন (তথ্য সূত্র :- অ্যাস্থনি মাসকারেনহাস-দ্য রেপ অপ বাংলাদেশ)। সুতরাং এটা প্রমাণিত যে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা চায়নি।
তবে এর কিছুদিন আগে NAP নেতা মওলানা ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলবার ডাক দিয়েছিলেন এবং সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় হচ্ছে যে ১৯৭০ সাল থেকেই মাওপন্থী নেতা সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তারা মনে করতেন যে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের উপনিবেশ এবং সেই সঙ্গে কারণে ৭০ সাল থেকেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিলেন। অবশ্য শুধু তারাই নয়, ২৫ মার্চ, ১৯৭১ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে বামপন্থী বিভিন্ন সংগঠন পাকিস্তানী সেনার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে। আওয়ামী লীগ নেতারা পাকিস্তানী বাহিনীর আগ্রাসন শুরু হবার সাথে সাথেই ভারতে পালিয়ে যান এবং ভারত সরকারের মদতে 'স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তৈরি করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী তৈরি করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের মুক্তিযুদ্ধ চালায়। এটাও এখন সকলেই জানেন যে প্রচুর ভারতীয় সেনা মুক্তিযোদ্ধা সেজে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের মুক্তিবাহিনীর সাথে মিশেছিল। আর মুজিবুর রহমান তো বাস্তবতা পাকিস্তান সরকারের কাছে আত্ম সমর্পণ করেছিলেন এবং তখন পাকিস্তানে বন্দী করে রাখা হয়। আমরা জানি যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যে বাঙ্গালী সেনারা ছিলেন (অফিসার ও সাধারণ সেনা) তাদের একটা বিরাট অংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। তাদেরই অন্যতম ছিলেন জিয়াউর রহমান। চট্টগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ঘোষণা করেন। পরে ভারত সরকার তার উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে এবং তাকে ভারত নিয়ন্ত্রিত মুক্তি বাহিনীর অংশ হতে বাধ্য করে। যেহেতু ভারত সরকারের উদ্দেশ্য বা কার্যবিধি সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার কোন ধারনা ছিল না, তাই তারা এই চাপের কাছে নতিস্বীকার করেন। অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাদের ভুমিকাকে কোন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। মুক্তিযুদ্ধ ক্রমশই গোটা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাতে পাকিস্তান এবং ভারত দুয়েই প্রমাদ গোণে। পাকিস্তানের ভয়টা তো পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হবার, ভারত সরকারের ভয় ছিল মুক্তিযুদ্ধ বামপন্থীদের হাতে চলে যাওয়ার। আওয়ামী লীগ এবং ভারত সরকার উভয়েই বুঝেছিল যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে আওয়ামী লীগ জনগণের চোখে হেয় হায়ে যাবে, কেননা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালাবার মত ধৈর্য, রাজনৈতিক যোগ্যতা বা ইচ্ছা কোনটাই আওয়ামী লীগের নেই ফলে ক্রমশঃই বামপন্থীরা পুরো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে এবং এখানেই উভয়ে প্রমাদ গোণে। তাই তড়িঘড়ি পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে ভারত সরকার বাংলাদেশে সেনাবাহিনী ঢুকিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে শেষ করে দেয় এবং তাদের অনুগত আওয়ামী লীগের হাতে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা তুলে দেয়। তবে এ প্রসঙ্গে যেটা শোনা যায় তা হল ৭দফা শর্ত ভিত্তিক চুক্তি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারত সরকারের হয়েছিল যা আসলে বাংলাদেশের পরাধীনতার নামান্তর। এ চুক্তি অবশ্য কখনও প্রকাশ্যে আসেনি। এ চুক্তিতে বলা হয়েছিল। বাংলাদেশের নিজস্ব সেনাবাহিনী রাখা চলবে না, ভারতের সেনাবাহিনী সেখানে থাকবে। বাংলাদেশের কেবল শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আধাসামরিক বাহিনী থাকবে যা পরে রক্ষীবাহিনী নামে। তৈরি হয়েছিল, যা আবার ভারতীয় সেনাবাহিনীদের দ্বারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। এইভাবে বাংলাদেকে ভারতের প্রায় একটি রাজ্যে পরিণত করা হয়েছিল। যদিও আমরা পরে দেখেছি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটা সেনাবাহিনী তৈরি হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যখন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারতের সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে তখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান ওসমানি সেখানে ছিলেন না বা তাদেরকে সেখানে কোন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ সেই ১৬ ডিসেম্বরকেই বিজয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন
স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন যে প্রথম থেকেই বিতর্কিত ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আওয়ামী লীগের উপর ভারতের কর্তৃত্ব ভালই ছিল। পাকিস্তান পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম যে পশ্চিম পাকিস্তানের মত পূর্ব পাকিস্তানেও কোন বুর্জোয়া শ্রেণী ছিল না। নবোদিত বাংলাদেশে এর আগে কোন বুর্জোয়া শ্রেণী তৈরি হতে পারেনি। এবার সেই বুর্জোয়া শ্রেণী তৈরি হবার প্রক্রিয়া শুরু হল। মুজিব সরকার যে ভারতীয় আধিপত্য মেনে নিয়েছিল তার একটা কারণ সম্ভবত্য এই যে ভারতের রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং বিদেশী পুঁজির সাহায্য ছাড়া নতুন একটা বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে তোলাটা হয়ত তারা অসম্ভব বলে ভাবত। ঠিক যে কারণে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধাঁচের শোষণ সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ কখনো পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়নি। যাই হোক, স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হবার পর থেকে ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে মুজিব নিহত হবার সময় পর্যন্ত যে পর্যায় তাতে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আমরা প্রত্যক্ষ করি। নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিভিন্ন আদর্শ সামনে রেখে আওয়ামী লীগ প্রথমতঃ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, ধর্মভিত্তিক দল গঠনে সরকারের পথ চলা শুরু হয় কিন্তু গোটা বাংলাদেশ জুড়ে চালু হয় এক চরম অরাজক অবস্থা, নতুন বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে তুলতে শুরু হয় সমাজিক সম্পদের লুট, দখল। ফলে বাংলাদেশে মেহনতী ও গরীব মানুষের জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ সংকট। জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য, দুর্ভিক্ষ জনজীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে, পাশাপাশি চলতে থাকে আওয়ামী লীগের মাফিয়া বাহিনীর লুটতরাজ ও তাণ্ডব। এসবের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টিসহ বিভিন্ন বামপন্থী দলের নেতৃত্বে পাল্টা আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়, যা শাসকদের আতঙ্কিত করে তোলে। তারা বাংলাদেশে সমস্ত রকম গণতন্ত্র হরণ করে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করে। তৈরি হয় বাকশাল, যা আওয়ামী লীগ ও তার লেজুড় বা দালালদের নিয়ে তৈরি একটি দল। বাকি সমস্ত দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সে সময় বাংলাদেশে আরো একটি অদ্ভূত ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের সামরিক বাজেটের বেশিটা সে সময় সেনাবাহিনীর জন্য খরচ হত না, হত রক্ষী বাহিনীর পেছনে, যা কিনা ভারতের সামরিক বাহিনীর অফিসারদের দ্বারা ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোকেদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল এবং ভারত সরকার দ্বারাই তারা নিয়ন্ত্রিত হত এমনটা ভাবা যেতে পারে। এই রক্ষীবাহিনীর সেসময় এমন দাপট ছিল যে সামরিক বাহিনী ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়তে থাকে, এরই ফলে খুব সম্ভবতঃ সামরিক বাহিনী মুজিবের বিরুদ্ধে ক্যু সংঘটিত করে এবং ক্ষমতা দখল করে। আরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে সেই সময় থেকেই ধর্মের প্রাধান্য রাজনীতিতে বাড়তে থাকে। এর সম্ভবতঃ দুটো কারণ থাকতে পারে মুজিবের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা তখন সাধারণ মানুষের কাছে হেয় হয়ে যায় তার জনবিরোধী কার্যকলাপের দরুণ, যেভাবে ভারতেও কংগ্রেসের জনবিরোধী কার্যকলাপের ফলে হিন্দুত্ববাদের উত্থান হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ, ভারতের আধিপত্যবাদকে বাংলাদেশের মানুষ বিরোধিতা করতে চাইতেন বলে এবং ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ বলে সেখানে জিয়াউর রহমানের শাসনকালে ইসলাম ধর্মকে তাদের রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপের ভিত্তি বলে ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের মানুষকে ঠান্ডা করবার জন্য। এই সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনেরও সাংবিধানিক অনুমতি দেওয়া হয়, যা মুজিবের শাসনকালে নিষিদ্ধ ছিল। জিয়াউর-এর পরবর্তীকালে এরশাদ-এর নেতৃত্বাধীন সামরিক শাসনের সময় আবার ইসলাম ধর্মকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম বলে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ যেহেতু বাংলাদেশের শাসকেরা বুর্জোয়া শ্রেণীর গঠনের জন্য সামাজিক সম্পদের লুটপাট অব্যাহত রেখেছিল সুতরাং মেহনতী মানুষের ক্ষোভকে প্রশমিত করবার জন্য গণতন্ত্রের টোপকে তারা যথেষ্ট বলে মনে করেনি এবং সেই কারণে ধর্মের আফিম খাইয়ে মানুষকে ঠাণ্ডা রাখবার কৌশল তারা নেয়।
তবে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফল তারা লাভ করে এবং বাংলাদেশে একটি বুর্জোয়া শ্রেণী তৈরি হয়। বস্তা, ঔষধ, ইলেকট্রনিক্স, জাহাজ নির্মাণ, মোটরগাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্প ক্ষেত্রে এই বুর্জোয়া শ্রেণী তাদের কর্মক্ষেত্র গড়ে তোলে। বর্তমানে এই বুর্জোয়া শ্রেণী যথেষ্ট ক্ষমতাশালী এবং সাম্রাজ্যবাদী ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের অধীনে থেকে যতটা সম্ভব নিজেদের ও বাংলাদেশের অর্থনীতির শ্রীবৃদ্ধি করা যায় তা তারা করেছে। সেই কারণেই হয়তো ভারতীয় আধিপত্যবাদের কবল থেকে তারা মুক্তি চাইছে, সেটা হতে পারে। এটাও হতে পারে যে চীনসহ বিভিন্ন আধিপত্যবাদী শক্তির সাথে, এমনকি মর্কিন সাম্রাজ্যবাদ বা অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে একটা ভারসাম্য যে বজায় রাখতে চাইছে। ভারতের যে মদত সে আগে চেয়েছিল তা হয়তো তার এখন অতটা প্রয়োজন নেই। অবশ্য ভবিষ্যতে এ বিষয়টা আরো পরিষ্কার হবে। [ বাংলাদেশের আমদানির অংশীদারদের দিকে তাকালে এই সন্দেহ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ মোট যে আমদানি করে তার সবচেয়ে বেশি সে করে চীন থেকে ২১.৫% আর ভারত থেকে করে ১২.২%। আবার তার রপ্তানি বেশি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও ইউরোপীয় দেশগুলিতে] তবে বাংলাদেশের বুর্জোয়া শ্রেণী যতই আজ স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক না কেন এবং তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি যতটাই আজ উন্নত হয়ে থাকুক না কেন বাংলাদেশের শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষের উপর চরম শোষণ কিন্তু অব্যাহত। বাংলাদেশ একটা উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈশিষ্ঠ্যসমুহের মধ্যে রয়েছে মধ্যম হারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি পরিব্যাপ্ত দারিদ্র্য, আয় বন্টন অসমতা, শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য বেকারত্ব, জ্বালানী, খাদ্যদ্রব্য এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্যে আমদানি নির্ভরতা, জাতীয় সঞ্চয়ের নিম্নহার ইত্যাদি।
বাংলাদেশের উন্নতির কথা যারা বলেন তারা দাবী করেন যে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের মধ্যে ৩৫ তম এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ২৯তম, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে গড়ে ৬.৩ শতাংশ হার ধরে রেখে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং বর্তমানে বিশ্বের ৭ম দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতি দ্বিতীয়।
কিন্তু বাস্তবতঃ বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত একটা পিছিয়ে পড়া পুঁজিবাদী দেশ ছাড়া কিছু নয়। ২০১৮ সালের তথ্যানুসার ‘সেবা', 'শিল্প' ও 'কৃষি' খাতে বাংলাদেশের (জিডিপি যথাক্রমে ৫২.১১, ৩৩.৬৬ এবং ১৪.২৩%)।
বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬% আছে কৃষিক্ষেত্রে, সেবাক্ষেত্রে আছে ৩৯.৬% এবং শিল্পক্ষেত্রে আছে মাত্র 20.৪%। সুতরাং বাংলাদেশ একটা পিছিয়ে পড়া পুঁজিবাদী দেশ ছাড়া কিছু নয়।
সেখানে শ্রমশক্তির ৬৮.৯% হাচ্ছে পুরুষ এবং নারী হচ্ছে ৩১.১%।
বাংলাদেশের মানুষের ১৮.৭% দারিদ্রসীমার নীচে অবস্থান করছে (২০২২ সালে)। ২০২০-র তথ্য অনুযায়ী ২৮.৩% র বায় দিনে ৩.২০ ডলার এর কম। একদিকে এরকম দারিদ্র আর অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি (মে, ২০২৩) ৯.৯৪%।
সাধারণ মানুষের যখন এই ভয়ংকর দারিদ্র্য, মুদ্রাস্ফীতি তখন জনজীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে।
আর এই ভয়াবহ দারিদ্রের সাথেই যুক্ত হয়েছিল হাসিনা সরকারের স্বৈরাচার। নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা, বিরোধী দলগুলির কর্মীদের উপর নির্যাতন, তাদেরকে জেলবন্দি করা, গুমখুন করা ইত্যাদি বাংলাদেশে দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। দেশজুড়ে চূড়ান্ত স্বৈরাচার কায়েম করা এবং শেষ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন দমন করতে গণহত্যার আশ্রয় নেওয়া, জনসাধারণের সমস্ত ধৈর্যের বাঁধকে ভেঙ্গে দিয়েছিল। প্রায় ১,৫০০ থেকে ২০০০ লোককে গুলি করে হত্যা করা, কয়েক হাজার লোককে আহত করা এবং শেষমেশ ছাত্র তথা জনগণের আন্দোলনকে দমন করতে সেনাবাহিনী নামানো সকলের ধৈর্যের বাঁধকে ভেঙ্গেছিল। এমনকি সেনাবাহিনীর মাঝারি ও নিচুস্তরের অফিসাররা জনতার উপর গুলি চালাতে অস্বীকার করেন, ফলে হাসিনার পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।
বাংলাদেশে বামপন্থীদের ভূমিকা
একথা বলাই বাহুল্য যে বামপন্থীদের ব্যর্থতাই আজ হাসিনার স্বৈরাচারী পুঁজিবাদী শাসনের বদলে ইউনুসের পুঁজিবাদী শাসনকে অনিবার্য' করে তুলেছে। প্রায় দু হাজার শহীদের রক্ত আবারো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এরকমটা হবার কথা ছিল না। ভারত বিভাজিত হয়ে পাকিস্তান তৈরি হবার পর পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আত্মপ্রকাশ করে, যারা আগাগোড়া স্ট্যালিনবাদী একটা দল ছিল। ফলতঃ প্রথম থেকেই তারা ভাসানীর NAP এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রবেশ করে কাজ চালাতে থাকে। আমরা জানি যে ১৯৬২ সালে চীন-রাশিয়া সংঘাত শুরু হয়। এরপর কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে যায় এবং রুশপন্থী ও চীনপন্থী সংগঠনে স্ট্যালিনবাদী পার্টি ভেঙ্গে যায়, আর এর অভিঘাতে NAP ও ভেঙ্গে যায় এবং রুশপন্থী ও চীনপন্থী NAP স্ট্যালিনবাদী ও মাওবাদীরা বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৬৮-৬৯ এর পাকিস্তান জোড়া গণঅভ্যুত্থানে কমিউনিস্টরা ভূমিকা রাখলেও তাদের এই বুর্জোয়া পার্টির মধ্যে অনুপ্রবেশের নীতি তাদের সাফল্যের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখে। বাংলাদেশের রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি তো পুরোপুরি আওয়ামী লীগের দোসরে পরিণত হয়। অন্যদিকে চীন পাকিস্তান। রাষ্ট্রের সমর্থক হওয়াতে এবং ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানের উপর বর্বারোচিত তান্ডবের পরেও তার এই সমর্থন অব্যাহত থাকাতে মাওপন্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে একটি মাওবাদী গোষ্ঠী ছাড়া বাকিরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি তো ১৯৭০ সাল থেকেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল। কারণ তারা মনে করত যে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ। রুশপন্থী CP আওয়ামী লীগের মধ্যে থেকে এবং মাওবাদীরা স্বাধীনভাবে মুক্তিযুদ্ধ চালাতে থাকে। আমরা জানি যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও চীন পাকিস্তানের পক্ষে দাড়ায় এবং রশী আধিপত্যবাদ ও ভারত সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকার ভান করে। যে রাশিয়া স্ট্যালিনের সময়ে এবং তার পরে সেখানকার সংখ্যালঘু জ্যাতিসত্ত্বাগুলির স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল এবং অন্যান্য দেশে আগ্রাসন চালাচ্ছিল এবং যে ভারত রাষ্ট্র কাশ্মীরী, নাগা, মিজো, মণিপুরী জাতিসত্ত্বার লড়াইকে নির্মমভাবে দমন করছিল তারা হঠাৎ পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী ও অন্যান্য জাতিত্ত্বার মুক্তিযুদ্ধের প্রতি হঠাৎ খুব দরদী হয়ে পরেছিল এরকমটা ভাবা ঠিক নয়। আসলে রাশিয়া চাইছিল মার্কিন মিত্র পাকিস্তানকে দুর্বল করতে এবং ভারতও তার শত্রু পাকিস্তানকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানে একটি বিপ্লবী বাম সরকারের প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করতে চাইছিল। আর সেই কারণেই যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব পাকিস্তানের আক্রমণের পর ভারতে পালিয়ে এসেছিল তাদেরকে তুরুপের তাস করেই তারা এ কাজে এগোয়, আর বামপন্থীরা এই মুক্তিযুদ্ধকে পুরো কব্জা করে নেবার আগেই তারা তাই যুদ্ধে সামিল হয়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সরকার প্রতিষ্ঠা করে দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের এই চক্রান্তের দোসর হয়ে পড়ে রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি। রাশিয়ার নির্দেশে তারা এই কাজ করে। অন্যদিকে মাওবাদীরা স্বাধীনভাবে লড়াই চালালেও এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও (বিশেষজ্ঞ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ৭২-৭৪ পর্যায়ে) তাদের সন্ত্রাসবাদী কর্মপদ্ধতি নিয়ে তারা খুব বেশি এগোতে পারেনি। পরবর্তীকালে তো তাদের স্ট্যালিনবাদী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় CPB-র মত তারাও কখনো জিয়া উর রহমান, কখনো এরসাদ ইত্যাদি বিভিন্ন বুর্জোয়া নেতার মধ্যে প্রগতিশীলতা খুঁজতে গিয়ে আস্তে আস্তে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সম্প্রতিকালের গণঅভ্যুত্থানে বামপন্থী দলগুলি যোগ দিলেও তাদের অতীতের হারিয়েছে যে তার ফলে তারা এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে আসতেই বুর্জোয়াদের দালালি করবার কার্যক্রমে তারা এতটাই বিশ্বাসযোগ্যতা পারেনি। একটা প্রান্তিক শক্তি হিসেবেই তারা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কি?
বাংলাদেশের মানুষ একের পর এক অভ্যুত্থানে সামিল হলেও তাদের মুক্তি অধরাই রয়ে গেছে। হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার বিদায় নিয়েছে, এটা ভালো কথা, কিন্তু ইউনুস বা বি এন পি অথবা অন্য কোন পুঁজিবাদী সরকারই তাদের অবস্থার পরিবর্তন আনতে পারবে না। অবস্থার কিছুটা রকমফের হতে পারে মাত্র, কিন্তু তাতে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষের ভাগ্য বদলাবে না। বাংলাদেশের মেহনতী মানুষের ভাগ্য বদলাতে গেলে দরকার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। আর তা প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে দরকার সঠিক নেতৃত্বের অর্থাৎ একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির। স্ট্যালিনবাদী বা মাওবাদী যে দলগুলো বাংলাদেশে আছে তারা পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গেছে। অবশ্য শুধু বাংলাদেশেই নয়, গোটা বিশ্বেই স্ট্যালিনবাদী মাওবাদীদের এই দশা, তাই আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে একটি নতুন কমিউনিস্ট পার্টির যা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও ট্রটস্কীর চিন্তাধারার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে এবং তা চতুর্থ আন্তর্জাতিকের কর্মসূচীর ভিত্তিতেই তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের সমাজ আজ নতুন সমাজের জন্ম দেবার গর্ভযন্ত্রণায় কাতর। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশী পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করে সেখানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই আজ সময়ের দাবী।
পরিশেষে আরো কিছু কথা
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান প্রসঙ্গ ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি এবং গদি মিডিয়া যে ভূমিকা নিয়েছে তা এককথায় ন্যক্কারজনক। বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের উচ্ছেদ তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। কারণটা খুবই পরিষ্কার, আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমেই বিভিন্ন ধরনের সুবিধা ভারত এতদিন ভোগ করে আসছিল। যেমন ভারতীয় শিল্পপতি আদানি সেখানে বিদ্যুৎ বিক্রি করে কয়েকগুণ বেশি দামে, হাসিনা সরকারই এই অন্যায় চুক্তির কারবারি ছিলেন। দ্বিতীয়তঃ আমরা জানি ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির সাথে তার যোগাযোগ ভারত বজায় রাখে শিলিগুড়ি করিডরের মাধ্যমে যা চিকেন লেক নামে পরিচিত। চীনের সাথে কখনো যুদ্ধ বাধলে যদি চীন এই অঞ্চল দখল করে নেয় তবে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির সাথে মূল ভারতীয় ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সেজন্য বাংলাদেশের চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারত যোগাযোগের রাস্তা বার করবার জন্য হাসিনা সরকারের সাথে চুক্তি করেছিল যা এখন বানচাল হয়ে যাবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারত সরকার এইসব সুবিধা বাংলাদেশের কাছ থেকে নেবে অথচ ভারতের বিভিন্ন নদীর উপর বাঁধ দেবার ফলে বাংলাদেশে সেই নদীগুলি যে শুকিয়ে যাচ্ছে এবং তাতে যে বাংলাদেশের চাষের ক্ষতি হচ্ছে তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করে না। ভারতের এসব কার্যকলাপ একেবারেই বন্ধুর মত নয় অথচ বাংলাদেশকে সে এতেদিন বন্ধু বলে দাবী করত ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশীদের মনে ভারত সম্পর্কে বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে, যা স্বাভাবিক। আর বাংলাদেশী মানুষদের ঘুষ পটিয়া বলার কথা তো নাহয় বাদই দিলাম। বাংলাদেশীদের মন থেকে বিদ্বেষ দূর করতে গেলে তাকে সত্যিকারের বন্ধুর মত আচরণ করতে হবে, যা এখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। বরং বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের গদি মিডিয়া যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা এই সম্পর্ককে আরো বিষিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় যে মিথ্যা প্রচারটি চালানো হচ্ছে তা হল এই যে সেখানে এখন নাকি জামাত ই ইসলামী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং সেখানে হিন্দুদের বাড়ি ঘর ভেঙ্গে দেওয়া হচ্ছে বা জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি মন্দিরও ভেঙ্গে দেওয়া হচ্ছে বা পুড়িয়ে দেওযা হচ্ছে। অথচ অভ্যুত্থানের ঠিক পরে পরে আমরা দেখেছি ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা তো বটেই এমনকি জামাতের কর্মীরা পর্যন্ত হিন্দুদের বাড়ি-ঘরদোর, মন্দির বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পাহারা দিয়েছেন। ফলে তাদের উপর হামলা হয়েছে এমনটা ঘটাবে কি করে? দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোট নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক ভারতীয় গদি মিডিয়ার এইসব অপ্রচারকে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং এই অপপ্রচার সেখানকার হিন্দুদেরই ক্ষতি করবে বলে দাবী করেছেন। তিনি বলেছেন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর সবচেয়ে বেশি অত্যাচার হয়েছে হাসিনার আমলে আর এখন কিছু হিন্দুর উপর যে হামলা হয়েছে তা হয়েছে তারা আওয়ামী লীগের কর্মী বলে, হিন্দু বলে নয়। আর শুধু তিনি নন, বাংলাদেশের আরো কিছু হিন্দু এবং সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান এইসব প্রচারকে ভুয়ো বলে অভিহিত করছেন। 'Rumour Scanner' বলে ভুয়ো গুজব চিহ্নিত করার একটি প্রতিষ্ঠান দাবী করছে যে ভারতের ৪৯টি সংবাদ সংস্থা ১৩টি গুজব দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে যাচ্ছে।
ভারতীয় আধিপত্যবাদীরা তাদের এতদিনকার ভোগ করা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বানচাল হয়ে যাবে বলে আতঙ্কিত হয়ে যে এসব নিজের বিশেষ সুবিধাভোগ চলে যাক এটা চায়। কিন্তু সবচেয়ে অপপ্রচার করছে বা করবে তাতে খুব আশ্চর্যের কিছু নেই। কেই বা লজ্জাজনক হাচ্ছে ভারতের বামপন্থী দলগুলিও বুর্জোয়া দলগুলি ও গদি মিডিয়ার এইসব অপপ্রচার বা মিথ্যা প্রচারে গলা মিলিয়েছে CPL, CPIM, CPIML (লিবারেশন) থেকে শুরু করে স্ট্যালিনবাদী ও মাওবাদী সংগঠনগুলি দাবী করেছে যে বাংলাদেশে নাকি হিন্দুদের উপর ব্যাপক অত্যাচার হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এইসব কাল্পনিক অত্যাচারের ঘটনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঞ্চলে তারা মিছিল, মিটিং করেছে। অথচ একই সময় উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে মসজিদের নীচে মন্দির খোঁজবার নামে প্ররোচনা সৃষ্টি করে বিক্ষোভকারী মুসলিমদের ৪ জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তাদের মিছিল করতে দেখা যায়নি স্ট্যালিনবাদীরা যে ভারতের পুঁজিবাদী শাসকদের দালাল তা আমরা সকলেই জানি। এই ঘটনাতেও ভারতের শাসকদের তথা হিন্দুত্ববাদীদের মিথ্যা মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারে তারা যে সামিল হয়েছেন তাতে আমরা খুব একটা আশ্চর্য হই নি, এটাই তাদের স্বভাব। শাসকদের সংকটের সময় তাদের অক্সিজেন জোগানোটাই হচ্ছে স্ট্যালিনবাদীদের কাজ। তবে এ ব্যাপারে ভূয়া টুটঙ্গীবাদী মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীও স্ট্যালিনবাদীদের সাথে এক সাথে সামিল হয়েছে। ইউনুস কোং গ্যাং' নাকি বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, তারা এটা দাবী করেছে। অথচ এর কোন বাস্তবতা নেই। ইউনুস সরকার একটা পুঁজিবাদী সরকার এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সুতরাং তারাও যে ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িকতাকে হাতিয়ার করতে পারে সেটা হবার সম্ভাবনাই বেশি। এমনকি বর্তমানেও তারা সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণা থেকে মুক্ত তাও হয়তো নয়। কিন্তু তারা এই মুহূর্তে হিন্দুদের উপর ব্যাপক অত্যাচার চালাচ্ছে এটা মিথ্যা কথা। এটা একেবারেই ভারতীয় শাসক শ্রেণীর মিথ্যাচার মিথ্যাচারকে হাতিয়ার করছে। আর ভারতীয় শাসক শ্রেণীর এই এবং তারা হাসিনাকে বাংলাদেশে আবার শাসনক্ষমতায় ফেরাতে এই আধিপত্যবাদী আকাঙ্ক্ষাকে স্ট্যালিনবাদীদের মত ভূয়া টুটস্কীবাদী মিলিস্ট্যান্ট গোষ্ঠীও মদত দিচ্ছে, এটা খুবই লজ্জাজনক ব্যাপার। আমরা আগেই বলেছি এরা আদৌ ট্রটস্কীবাদী নয়। এদের এই কাজের মধ্য দিয়ে তারা তা প্রমাণ করছে।
আমাদের মনে রাখা দরকার যে চিন্ময় মহারাজের ঘটনা নিয়ে ভারতের গোদি মিডিয়া এত সোচ্চার সে একজন অপরাধী। প্রচুর নাবালক ও মহিলাদের উপর যৌন নির্যাতনের দায়ে সে অভিযুক্ত এবং ইসকন থেকেও বহিষ্কৃত। এ ব্যাপারে ইসকনের তদন্ত কার্যে কোন সহযোগিতা না করার কারণে তাকে ইসকন বহিস্কার করে। হাসিনার সময়কাল পর্যন্ত বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আওয়ামী লীগের গুণ্ডাদের অত্যাচারের ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ নীরব ছিল, এমনকি যারা সে সব নিয়ে আন্দোলন করত তাদের সে বিরোধী ছিল। ইসকন থেকে বহিস্কৃত হবার পর সে আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে ছিল। এখন আওয়ামী লীগে তাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে তাকে দিয়ে গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের হাতে প্রচারের অস্ত্র তুলে দেবার জন্য সচেষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে অপমান করার দায়ে তার সেই দেশে বিচার চলছে। সেটা সেই দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তা নিয়ে ভারতের মিডিয়াতে এত হইচইয়ের উদ্দেশ্য কি? যে গোদি মিডিয়া চিন্ময় মহারাজকে নিয়ে এত প্রচার চালাচ্ছে তারা জবাব দিক ভারতের জেলে উমর খালিদ সহ বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী বিনা বিচারে বছরের পর বছর আটক হয়ে আছেন। তাদের মুক্তির বিষয়ে গোদি মিডিয়ার মুখে কোন কথা নেই কেন?
শেষের কথা
ভারত রাষ্ট্র হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিক্রিয়ার ঘাঁটি। তার আধিপত্যবাদী কার্যকলাপের ফলে তার সমস্ত প্রতিবেশী দেশই এখন তার বিরোধী। নেপালের মত হিন্দু অধ্যুষিত একটি রাষ্ট্রও তো তার বিরুদ্ধে। তার কি কারণ? এর জবাব দিক ভারত রাষ্ট্র। আমরা কমিউনিস্টরা আন্তর্জাতিকতাবাদী, শ্রমিক শ্রেণীর কোন দেশ নেই সমস্ত ধরনের সাম্রাজ্যবাদ তথা আধিপত্যবাদকে আমরা তীব্রভাবে ঘৃণা করি এবং তার বিরোধিতা করি। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমস্ত দেশগুলির পুঁজিবাদী সরকারগুলিকে উচ্ছেদ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজতান্ত্রিক ফেডারেশন গঠনের আহ্বান আমরা জানাই। এটাই একমাত্র এ অঞ্চলের শ্রমিক-কৃষক মেহনতী মানুষের সমস্ত দুর্দশার অবসান ঘটাতে এবং এখানে প্রকৃত শান্তি ফেরাতে পারে।
