সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন — একটি ট্রটস্কীপন্থী মূল্যায়ন
ডিসেম্বর ২০২২

— ভাস্কর গাঙ্গুলী
২০২০ সালে শুরু হওয়া কৃষক আন্দোলন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক জগতকে আলোড়িত করেছিল। দিল্লীর উপকণ্ঠে হাজার হাজার কৃষকের অবস্থান বিক্ষোভকে কেউই উপেক্ষা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের চালু করা তিনটি নতুন কৃষি আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়। সেগুলি বাতিলের দাবিতেই চলছিল এই সুবিশাল কৃষক আন্দোলন। আমরা জানি ভারত সরকার ২০২০ সালের জুন মাসে তিনটি কৃষি অধ্যাদেশ বাস্তবায়িত করে যা কৃষি উৎপাদন, তার বিক্রয়, সংগ্রহ, কৃষি বিপণন ও চুক্তি চাষ সংস্কারের ক্ষেত্রে কাজ করে।
লোকসভায় একটি বিল ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এবং অন্য দুটি ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পাস হয়। পরে রাজ্যসভাও ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দুটি এবং ২২ সেপ্টেম্বর তৃতীয় বিলটি পাস করে। ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বিলে স্বাক্ষর করে ভারতের রাষ্ট্রপতিও তার সম্মতি প্রদান করেন, এভাবে বিলগুলি কার্যত আইনে পরিণত হয়।
এই আইনগুলি হচ্ছে —
১) কৃষকদের উৎপাদন বাণিজ্য ও বাণিজ্য (প্রচার ও সুবিধাদি) আইন ২০২০।
২) কৃষকদের (ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষা) মূল্য আশ্বাস ও কৃষি পরিষেবা আইন, ২০২০ সম্পর্কিত চুক্তি।
৩) প্রয়োজনীয় পণ্য (সংশোধনী) আইন ২০২০
নতুন আইনগুলি যে কারণে কৃষকদের উদ্বিগ্ন করেছিল তা হল — নতুন আইনে কৃষিবাজারের (এদেশে যা ‘মাপ্তি) ওপর রাজ্যের একচেটিয়া অধিকার আর থাকতো না। বেসরকারি দেশী ও বহুজাতিক সংস্থাও তাদের পছন্দমত ‘মাণ্ডি' তৈরি করতে পারতো। চুক্তিভিত্তিক চাষের কথা বলা হয়েছিল যা আসলে বৃহৎ দেশী ও বহুজাতিক সংস্থাগুলির হাতে কৃষকদের জমি তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা। সবচেয়ে বড় কথা, কোন দামে চাষী তার পণ্য বেচবেন, তা বাজারই ঠিক করে দেবে। যদিও ন্যূনতম সহায়ক মূল্য তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়নি, কিন্তু প্রবণতাটা সেদিকেই ইঙ্গিত করছিল। কৃষক বিক্ষোভের বড় কারণগুলির মধ্যে এটা ছিল অন্যতম।
এমএসপি বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বাতিল করা না হলেও নতুন আইনে তার স্বীকৃতিও দেওয়া হয়নি। এটা ছাড়া নতুন আইনের বলে বেসরকারি দেশী ও বহুজাতিক সংস্থাগুলি কম দামে ফসল বিক্রিতে কৃষককে বাধ্য করতে পারত।
সংস্কার আরো একটি বিষয় নিশ্চিত করেছিল। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের আওতা থেকে বাদ দিয়েছিল চাল, ডাল, তৈলবীজ, পেঁয়াজ ও আলুকে। এই পাঁচ পণ্যের উৎপাদন ও মজুতের উপর কেন্দ্র বা রাজ্য কোনো সরকারেরই আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকতো না। আলু ও পেঁয়াজের মতো পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ও অন্য পণ্যের দাম ১০০ শতাংশ বাড়লে একমাত্র তবেই রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারতো। নচেৎ বাজারই সর্বেসর্বা। এভাবে দেশজোড়া দুর্ভিক্ষের রাস্তাকে খুলে দেওয়া হয়েছিল।
কৃষকরা তাই এই তিন আইন বাতিলের পাশাপাশি ন্যূনতম সমর্থন মূল্য (এমএসপি)-র আইনী স্বীকৃতি, বিদ্যুৎ (সংশোধন) বিলে কৃষি বিরোধী বিধান প্রত্যাহার এবং খড় পোড়ানোর জন্য কৃষকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিধান বাতিলের দাবি নিয়েও তাদের আন্দোলন জোরদার করে তুলেছিল।
দীর্ঘ এক বছরের উপর ধরে চলা এক আন্দোলন আজ এক 'ইতিহাসে' পরিণত হয়েছে। যার সঠিক বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা হওয়া প্রয়োজন। প্রচুর কৃষক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন এবং প্রায় সমস্ত বামপন্থী দল বা ব্যক্তিই এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিল বা একে সমর্থন যুগিয়েছিল। শুধু তাই নয়। এই আন্দোলন উত্তর ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষকদের প্রায় সমস্ত অংশকে এবং কৃষিমজুরদেরকেও সামিল করতে সক্ষম হয়েছিল। একটি সমীক্ষা থেকে আমরা জানতে পারি এই আন্দোলন চালাতে গিয়ে যে সমস্ত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন কৃষিমজুর ও গরীব চাষী। সুতরাং এই আন্দোলন যে কৃষিজীবী মানুষদের সর্বাত্মক এক আন্দোলন ছিল এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আর এই কারণেই আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে এই আন্দোলনের এক নির্মোহ বিশ্লেষণের। তবে আবেগে ভেসে না গিয়ে এই আন্দোলনের শ্রেণী বিশ্লেষণ আজ জরুরী হয়ে পড়েছে। কেন এই আন্দোলন, কারা এই আন্দোলনে সামিল হল ? কেনই বা হল, তার শ্রেণীগত ব্যাখ্যা হওয়াটা জরুরী। বিভিন্ন তথাকথিত বামপন্থী দলগুলি যেরকম উদ্বাহু হয়ে এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিল তা কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল বা অন্য বিকল্প কিছু ছিল কিনা তার বিশ্লেষণ করাটা আজ দরকার হয়ে পড়েছে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী এক কার্যক্রম সাময়িকভাবে হলেও যে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে তা নিঃসন্দেহে ভালো বিষয়। কিন্তু বামপন্থীরা কি সঠিক রাস্তায় ছিলেন নাকি তারা তাদের চিরাচরিত কায়দায় কুলাকদের অর্থাৎ গ্রামীণ বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি করেছিলেন তা আমাদের বোঝা দরকার। কেননা ভারত জোড়া শ্রেণীসংগ্রাম গড়ে তুলে তাকে সঠিক রাস্তা দেখাতে গেলে এইসব প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া দরকার। শ্রমিকশ্রেণীর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বিপ্লবী ধারার আন্দোলন গড়ে তুলতে এটা আজ খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে।
হঠাৎ এই তিন কৃষি আইন কেন ?
হঠাৎ ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার এই তিন কৃষি আইন কেন নিয়ে এল? আসলে এর প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছিল ২০০৮ সাল থেকে চলা অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকট বাজারের সংকোচনকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগ আর প্রায় হচ্ছিলই না। কিন্তু শিল্পপতি - পুঁজিপতিরা তারা তাদের পুঁজিকে অলস ফেলে রাখতে পারে না। সুতরাং তারা তাদের পুঁজি বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্রের সন্ধান চালাচ্ছিল। কৃষিক্ষেত্রকেই শেষ পর্যন্ত তারা তাদের অলস পুঁজির নতুন বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিল। কিন্তু মুশকিল হল দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ বুর্জোয়া বা কুলাক বা ধনী পুঁজিবাদী চাষীরা কৃষিক্ষেত্রে করে খাচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদিত ফসলের বিপণন বা ব্যবসা সবই তাদের দখলে। সুতরাং তারা ছেড়ে কথা বলবে কেন? আজ বৃহৎ পুঁজিপতিরা সেই ব্যবসা দখল করে নিলে তারা কোথায় যাবে? তাদের তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া বা বৃহৎ পুঁজিপতি কিংবা বহুজাতিক সংস্থাগুলির ক্ষুদ্র শরিক বা কর্মচারী হয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না। সুতরাং তারা এই তিন আইনের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে উঠলেন। তবে শুধু তারাই নয়, মাঝারি চাষী বা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরাও বিপদের গন্ধ পেলেন। কেননা কৃষি বিপণন পুরোপুরি বাজারের হাতে চলে গেলে বা চুক্তি চাষে আগামী দিনে তাদেরও সর্বস্বান্ত হওয়া ছাড়া গতি থাকবে না। আর কৃষিমজুরদের এসব ব্যাপারে ক্ষতি না হলেও মজুতদারির ফলে কৃষিপণ্যের যে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে তা তাদেরও অনাহারের দিকে ঠেলে দেবে এটা তাদের থেকে আর বেশি ভালো কে বুঝবে ?
কাজেই কুলাক বা ধনী পুঁজিবাদী চাষী বা গ্রামীণ বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে সময় লাগেনি। কেননা গ্রামীণ সমাজে এমনিতেই কুলাকরা তাদের আর্থিক বা সামাজিক প্রতিপত্তির জোরে কৃষকদের অন্যান্য স্তর বা কৃষিমজুরদের উপর তাদের প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। এছাড়াও বামপন্থী দলগুলি এই আন্দোলনের পিছনে দাঁড়িয়ে যাবার ফলে তা এক সর্বাত্মক চেহারা নিয়েছে, যেখানে কৃষকদের মধ্যেকার সমস্ত শ্রেণীবিভাজন মুছে গিয়েছিল।
কিন্তু এটা কি আমাদের কাছে কাম্য?
কেন্দ্রীয় সরকার আপাতভাবে এই আন্দোলনে পিছু হটবার ফলে সমস্ত ধরনের বামপন্থীদের মধ্যেই এক খুশির হাওয়া। এক যুদ্ধজয়ের তৃপ্তি। ফ্যাসীবাদীদের এই পরাজয় নিঃসন্দেহে খুশির খবর বটে কিন্তু এই আন্দোলন কতগুলি বিষয়কে সামনে হাজির করেছে যার মীমাংসা করাটা জরুরী।
প্রথমত : ভারতবর্ষের কৃষি অর্থনীতি সম্পর্কে আমাদের একটা সাধারণ ধারণা গড়ে তোলা দরকার।
দ্বিতীয়ত : ভারতের কৃষিক্ষেত্রে শ্রেণী বিভাজন কিভাবে ঘটেছে এবং কৃষকদের মধ্যে তা কিভাবে আছে তা আমাদের বোঝা দরকার।
তৃতীয়ত : ভারতবর্ষের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে এই শ্রেণীবিভাজন কিভাবে তাকে সাহায্য করবে?
এই বিষয়গুলো আমাদের পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কেননা বিপ্লব তো বটেই এমনকি যে কৃষক আন্দোলন হয়ে গেল ভবিষ্যতে এরকম ধরনের আন্দোলনে আমাদের অবস্থান কি হবে সে ব্যাপারে আমাদের ধারণা পরিষ্কার করে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটা বিষয় আমরা নজর করেছি, তাহল— স্ট্যালিনবাদী, মাওবাদী থেকে ভূয়া ট্রটস্কীবাদীরা সকলেই এই আন্দোলনের পেছনে সামিল হয়ে গিয়েছিল। কাউকেই বিশেষ এই আন্দোলনের নেতৃত্বকে সমালোচনা করতে দেখা যায়নি বা আন্দোলনে কৃষিমজুরদের দাবী তুলে ধরতে দেখা যায়নি। অবশ্য তাদের কাছ থেকে এই আচরণ প্রত্যাশিত। কেননা সেই দাবী তুলে ধরলে তা আন্দোলনের ‘ঐক্যে’ চিড় ধরাবে এটা বোধহয় সকলেরই উপলব্ধিতে ছিল। তাই এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবী হিসেবে সামনে ছিল ফসলের সহায়ক মূল্য বা এমএসপি-র আইনী স্বীকৃতির দাবী, অথচ কৃষিমজুরদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবী সেখানে ওঠেইনি। কেন সেটা উঠল না? আসলে এইসব তথাকথিত বামপন্থীরা চিরকালই কুলাক বা পুঁজিবাদী চাষীদের লেজুড়বৃত্তি করে এসেছে। সুতরাং কুলাকদের দাবীকে সমস্ত কৃষক, এমনকি কৃষিমজুরদেরও দাবী হিসেবে তারা চালিয়ে দিতে চেয়েছে। তারা বলছে প্রচুর গরীব চাষীও তাদের উৎপাদিত ফসল নাকি বিক্রি করে, সুতরাং এই আইনে তাদেরও ক্ষতি হত। কিন্তু সেটা তারা করে। কাকে, কি দামে এবং মাণ্ডিগুলিতে যে ফসল বিক্রি হয়, সেখানে তারা কি পৌঁছতে পারে? আর যে ফসল বাজারে বিক্রি হয় সেখানে তাদের অংশই বা কতটুকু!
ভারতীয় কৃষি অর্থনীতি নিয়ে কিছু আলোচনা মনে হয় এসব প্রশ্নে অবস্থান ঠিক করতে আমাদের সাহায্য করবে। সাহায্য করবে ভবিষ্যতে গ্রামাঞ্চলে শ্রেণীসংগ্রাম গড়ে তুলতে।
ভারতের কৃষি অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান
ভারতে কি সামন্ততন্ত্র ছিল? এই বিতর্ক দীর্ঘদিনের। খোদ কার্ল মার্কস-ই ভারতে সামন্ততন্ত্রের ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। তিনি ভারতের উৎপাদন ব্যবস্থাকে এশীয় ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা ( Asiatic mode of Production) বলে চিহ্নিত করেছিলেন। যা স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তিতে চলত। যেখানে জমির মালিকানা থাকত গ্রামীণ সমাজের হাতে। ব্যক্তি মালিকানা জমিতে ছিল না। মজার বিষয় হচ্ছে ভারতের তথাকথিত মার্কসবাদীরা ভারতে সামন্তবাদের কথা বলে এবং তা নিয়ে রীতিমতো তারা সোরগোল ফেলে দিয়েছে। যদিও আমাদের আলোচনা ভারতের অতীত ইতিহাস নিয়ে নয়। কিন্তু ভারতে কৃষির বিকাশ বুঝতে আমরা খুব সংক্ষেপে এ বিষয়ে কিছু আলোচনা সেরে নিচ্ছি। যে সমস্ত মার্কসবাদীরা ভারতের কৃষিতে সামন্তবাদ ছিল বলে দাবী করেন তাদের অন্যতম একজন ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র এব্যাপারে কি বলেছেন শোনা যাক— তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে ইউরোপীয় 'ম্যানর' ব্যবস্থা ভারতে ছিল না।
“একটা জমিদার শ্রেণী মুঘল আমলে ভারতে গড়ে উঠেছিল বটে কিন্তু তাদের ক্ষমতা বা অধিকার ছিল সীমিত। সবচেয়ে বড় কথা কৃষকদের জমিতে হস্তক্ষেপের অধিকারই তাদের ছিল না। তিনি বলছেন—“এখানে একটা কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার। জমিদার কিন্তু তার গ্রামের কৃষকদের জমির মালিক নয়। জমিদারের অর্থ জমির উপর সম্পত্তির অধিকার নয়। এটা উদ্বৃত্ত সম্পদের উপর একটা অধিকার এবং জমিতে অন্যান্য অধিকারের সঙ্গে এই অধিকারও পাশাপাশি বজায় ছিল। কিন্তু জমিদারের গ্রামে নিছক জমির উপর ভোগ দখল বা অন্যান্য ব্যক্তিগত অধিকারের স্বত্ব কৃষকেরই থাকত। জমিদারের নিজস্ব কিছু জমি ছিল – যেখানে সে কৃষক হিসেবে নিজে চাষ করত বা চাষের জন্য ভাগচাষী লাগাত । কিন্তু যে জমিতে কৃষক নিজে সেচ ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করছে সেই জমিতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার সাধারণত জমিদারের থাকত না।
দ্বিতীয়ত : জমিদারির কেনাবেচায় জমিদারের রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার এবং নিজের মিলকিয়াৎ-এ ২-এর জন্য রাজস্বের থেকে নিজের হিস্যা বিক্রি হতো। কখনো সেই গ্রামের বিভিন্ন ধরনের কৃষকদের জমির উপর বিভিন্ন ধরনের দখলি ভোগস্বত্ব বিন্দুমাত্র ব্যাহত হতো না। অর্থাৎ দেহাত-ই-তালুক'-এর জমি থেকে কৃষকের পরিশ্রমলব্ধ উদ্বৃত্তশ্রমের উপর জমিদারের অধিকার বিক্রয় হতো মাত্র, কৃষিযোগ্য জমি নয়।” (মুঘল যুগে কৃষি অর্থনীতি ও কৃষক বিদ্রোহ-গৌতম ভদ্র, পূ: ৩০-৩১ )
তিনি আরো বলছেন— 'তৃতীয়ত জমিদারেরা নিশ্চিতভাবে একটি শোষক শ্রেণী। কিন্তু এই শ্রেণী জায়গিরদারদের থেকে আলাদা। উদ্বৃত্ত সম্পদের একাংশ মাত্র এরা ভোগ করত, সিংহভাগ রাষ্ট্রই পেত।” (ঐ, পৃ:৩৫ )
“জমির উপর কৃষকের ভোগ দখল ও অধিকার-স্বত্বকে মুঘলরা মেনে নিয়েছিল। এই স্বত্ত্বতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার জমিদার বা সদৎ-ই- মায়েশদের ছিল না (ঐ, পৃঃ ৪৮)
“নতুন অনাবাদী জমিকে কৃষির আওতায় আনলে বা জমিতে সেচের বন্দোবস্ত করলে ধার্য রাজস্বের হার কমানো হত। আবার, বীজধান বা গোরু কেনার জন্য রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের কাছ থেকে ধার পাওয়া কৃষকদের অন্যতম অধিকার ছিল। এছাড়া দুর্ভিক্ষের সময়ও কৃষকদের দেয় রাজস্ব থেকে ছাড় দেওয়া হত।” (ঐ, পূ:-৪৮)
ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্র ছিল বলে দাবী করেন যিনি ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র তিনি এইসব বলছেন। অর্থাৎ ইউরোপীয় সামন্তবাদের সাথে কোনরকম মিল না থাকা সত্ত্বেও তারা ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্র ছিল বলে দাবী করছেন। কৃষকদের জমির উপর জমিদার শ্রেণীর কোন অধিকার নেই, কৃষকরা রাজস্ব দেয় রাষ্ট্রকে, রাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা চাষের জন্য সাহায্য পায়— জমিদারের সেখানে কোন ভূমিকা নেই। তা সত্ত্বেও সেটা নাকি সামন্ততন্ত্র। এইসব আজগুবি দাবী করে স্ট্যালিনবাদীরা, মাওবাদীরা এবং শুধু অতীত ইতিহাস নয়, বর্তমান সমাজ সম্পর্কেও তাদের দাবী কতটা আজগুবি, তা আলোচনা এগোলে আরো পরিষ্কার হবে।
বৃটিশ ভারতের কৃষি অর্থনীতি
বৃটিশরা যখন ভারতে আসে এবং ক্ষমতা দখল করে তারপর তারা ভারতের কৃষি অর্থনীতিতে বদল আনে। এখানে তাদের দেশের সেই সময়কার ধাঁচ অনুযায়ী তারা ভারতের একটা বড় অংশে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে। যদিও বৃটিশ ভারতের অর্ধেক— এরও কম অংশে তা চালু ছিল। বাংলা, বিহার, ওড়িশা, মাদ্রাজের কিছু অংশে চালু হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সাময়িক বন্দোবস্ত ছিল উত্তরপ্রদেশের বড় অংশে, বম্বে, বাংলা, সেন্ট্রাল প্রভিন্স এবং পাঞ্জাবের কিছু অংশে। কিন্তু বৃটিশ ভারতের ৫১ শতাংশ জুড়ে ছিল রায়তওয়ারী ব্যবস্থা। রায়ত বা প্রজারা ছিল জমির মালিক, তারা সরাসরি রাষ্ট্রকে কর দিত। সেই ব্যবস্থা ছিল বম্বে, সিন্ধ, বেরার, আসাম এবং অন্যান্য অঞ্চলে। এছাড়া ছিল মহলওয়াড়ী ব্যবস্থা। অ্যাগ্রা ও আউধ-এ ১৮৩৩-এ তা চালু হয়।
পরবর্তীকালে পাঞ্জাব এবং সেন্ট্রাল প্রভিন্স-এ তা বিস্তৃত হয়। এটা আসলে ভারতের চিরাচরিত স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ ব্যবস্থাই, কিছুটা সংস্কার সহ। সুতরাং বৃটিশ ভারতেও ভারতের অধিকাংশ জায়গাতে সামন্ততন্ত্র ছিল না।
আবার যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এলাকা চালু হয়েছিল সেখানেও | ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। খাজনা নেওয়া হত টাকায়, মুদ্রা চালু করা হয়েছিল। দেশের অর্থনীতিতে তা ছিল প্রথম মুদ্রা ব্যবস্থা। মুদ্রায় খাজনার ব্যবস্থা, মুদ্রার পত্তন এবং বাণিজ্যিক | কার্যকলাপগুলি সাধারণভাবে একটি বিদেশী শক্তি তাদের নিজস্ব স্বার্থে দেশের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল। মুদ্রায় খাজনার ব্যবস্থাটা দক্ষভাবে চালাতে সামন্তীয় সম্পত্তির অধিকার মুক্ত বিক্রয় এবং ক্রয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই পদক্ষেপগুলি বন্ধ সামন্ত অর্থনীতিকে বাণিজ্য এবং বিনিময়ের জন্য সাধারণভাবে খুলে দিতে বাধ্য করেছিল। জমিদারি সম্পত্তিগুলি পরিবর্তিত হয়ে যায় ভূসম্পত্তিতে বিনিয়োগে। জমিদারি অর্থনীতির মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে জন্মসূত্রের যে সামন্তীয় বাধা তা বিলুপ্ত হয়ে গেল। জমিদার যদি খাজনা প্রদানে অক্ষম হয় তবে যে তার সম্পত্তির জন্য নিলামে সর্বোচ্চ দর হাঁকবে তার কাছে জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু সামন্তীয় সুবিধাগুলি, খাজনা আদায়ের অধিকার কেবলমাত্র রইলই না তা বরং আরো নিশ্চিত হল। যতদূর পর্যন্ত জমিদারি অর্থনীতি বিজড়িত আছে, বাণিজ্যিকীকরণের পথে সামন্তীয় বাধাগুলি বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু সামন্তীয় সুবিধাগুলি নয়।
প্রসঙ্গত এটা উল্লেখ করা দরকার যে মুঘলদের রাজস্বনীতিও মুদ্রা অর্থনীতিকে উৎসাহিত করেছে। আকবর-এর সময় থেকে জমির খাজনা মূলত টাকাতে নির্ধারিত হত। সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে যেমন পাঞ্জাব, দিল্লি, আগ্রা, আউধ, এলাহাবাদ এবং গুজরাটে মূলত তা টাকায় দাবী করা হত, যদিও শস্যভাগের আশ্রয়ও নেওয়া হত ।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে যেভাবে বাণিজ্যিকীকরণের রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীকালে সেখান থেকেই কৃষিতে পুঁজিবাদের বিকাশের শুরু হয়েছিল। অনেকের ধারণা আছে যে সবুজ বিপ্লবের পর থেকেই ভারতে কৃষিতে পুঁজিবাদী বিকাশ শুরু হয়, বিষয়টা একেবারেই তা নয়। ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকেই কার্যত তা শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং তার মূল ক্ষেত্র ছিল সেই অঞ্চলগুলি যেখানে আমরা সবুজ বিপ্লবের পর কৃষিতে পুঁজিবাদী বিকাশের ব্যাপক বিস্তার দেখি।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অঞ্চলে বাণিজ্যিকীকরণ ঘটলেও যেহেতু সেখান থেকে ব্রিটিশদের রাজস্ব খুব বেশি আসত না, তাই তারা মূলত রায়তওয়ারী এবং সাময়িক বন্দোবস্তের অঞ্চলগুলিতে কৃষির উন্নতির জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছিল । পশ্চিম (পাঞ্জাব) এবং দক্ষিণ (অন্ধ্র এবং তামিলনাড়ু)-র কৃষকরা বেশি সুবিধা পেয়েছিল। সেচের সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছিল (১৯৪০-৪১ পর্যন্ত) পাঞ্জাব, মাদ্রাজ ও উত্তরপ্রদেশ। এই আধিপত্য চলেছিল ১৯৭০-৭১ পর্যন্ত। এর ফলে কৃষি থেকে একটা স্থায়ী আয় তা দিত এবং মৌসুমী বায়ুর খেয়ালী আচরণ সত্ত্বেও তা কৃষিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করত। দেশভাগের আগে ভারতে মোট সেচসেবিত জমি ছিল ৭০ মিলিয়ন একর বা ৭ কোটি একর।
কৃষিতে পুঁজিবাদী বিকাশকে গতি দিয়েছিল ১৮৮২-তে তৈরি হওয়া প্রথম কৃষি ব্যাঙ্ক। ৩-৬ শতাংশ সুদে টাকা ধার দেওয়া হত। ১৯১১ সালে সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক তৈরি হয়। গুজরাটী ব্যবসায়ীরা তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। গ্রামীণ সমবায়গুলির কার্যকরী পুঁজির অর্ধেক এই ব্যাঙ্ক থেকে থেকে যেত। মোট ধারের মধ্যে সমবায়ের অংশ অন্যান্য রাজ্যের মধ্যে বোম্বেতে ছিল সবচেয়ে বেশি। পাঞ্জাব পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে। সেখানে গড় ভূ-সম্পত্তি ছিল অনেক বড়। ১৯৩০ সালে মোট কর্ষিত জমির এক ষষ্ঠাংশ ছিল ক্যানাল কলোনীতে। ১৯৩০-এ গুরুদাসপুরে কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কারখানা ছিল। জলন্ধরে ১৯৫১-তে ৮৭টি কারখানা বিভিন্ন ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি | করত যা কখনো কখনো অন্যান্য রাজ্যে রপ্তানি হত। কৃষিমজুররা ১৯৩১ সালে কৃষি জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ ছিল। এটা দেখিয়ে দেয় স্বাধীনতার আগেই ভারতে কৃষি ক্ষেত্রে কিভাবে শ্রেণী বিভাজন বিকাশ লাভ করেছিল। আর পাঞ্জাবও বৃটিশ আমল থেকেই কৃষিতে উন্নত একটি অঞ্চল ছিল এবং সেখানে কৃষিতে পুঁজিবাদী বিকাশ ঘটেছিল।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কৃষিতে পুঁজিবাদের বিকাশ
স্বাধীনতার পূর্বেই ভারতে কৃষিতে পুঁজিবাদের বিকাশ শুরু হয়ে গিয়েছিল। এর একটা ছোট উদাহরণ দিয়ে আমরা স্বাধীনতা পরবর্তীতে কৃষিতে পুঁজিবাদের বিকাশের আলোচনাতে ঢুকবো।
১৯৪০ সালে ফ্লাউডস (Flouds) কমিশনের কাছে বাংলার | কৃষক সমিতি যে স্মারকলিপি দিয়েছিল সেখানে তারা বলে— “ভাগচাষ-এর বৃদ্ধির পিছনে অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে একটি হচ্ছে এক নতুন ধরনের জমিদার-মহাজনবৃত্তির সহিত জমিদারদের বৃদ্ধি। সে তার টাকা কামিয়েছে কৃষকদের শোষণ করে এবং তার স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে তার আয় জমিতে লগ্নি করা, একই সময়ে সে পাট, গম বা চালের ছোট ব্যবসায়ী, প্রায়ই গ্রামীণ শস্যব্যবসায়ী অথবা সে পরিবহণ ব্যবসায়ে আগ্রহী হতে পারে। যে কোন ক্ষেত্রেই, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পসংস্থায় বিনিয়োগের চেয়ে জমিতে পুঁজি বিনিয়োগ তার কাছে অনেক আকর্ষণীয়। সে নিজে জমিতে চাষ করতে চায় না বা অনুপস্থিত জমিদারও হবে না। এই নতুন ধরনের জমিদার ইতিমধ্যেই শস্যের বা পাটের ব্যবসায়ী। সুতরাং প্রজার কাছ থেকে রাজস্ব হিসেবে টাকার বদলে শস্য নিলে সেটা তাকে অর্থ জোগাবে এবং তারপর তার ব্যবসার জন্য কাঁচা মাল সে খোলা বাজার থেকে কিনবে। অন্য ভাবে বললে সে তার ব্যবসাকে উল্লম্বভাবে যুক্তিসংগত করেছে। ... যে ভাবে বর্গাদার (ভাগচাষী)-দের দ্বারা চাষের এলাকা বাড়ছে তা পরিবর্তনের দিক থেকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যা বাংলার কৃষিকে ছেয়ে ফেলছে।”
যদিও মন্তব্যগুলি বাংলার সাথে সম্পর্কিত, বর্তমানে এটা দেখানো হবে যে কমবেশি সমস্ত ভারতেই তা প্রযোজ্য। (Emerging capitalism in Indian Agriculture; by Ambica Ghosh, p.253 -54)
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমরা দেখবো ভাগচাষ বা বর্গাদারি প্রথা আরো বেড়েছিল (যদিও বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে) ভারতে প্রজাসত্ব চাষ (tenant farming) ১৯৫০-৫১তে ১২ শতাংশ থেকে ১৯৯১-৯২-তে ৮.২৮ শতাংশে নেমে গেছে। (সূত্র- redpolemique.wordpress.com) অনেকে একে সামন্তবাদী ব্যবস্থা বলে অভিহিত করেন বা আধা-সামন্তবাদ বলেন। যারা এসব বলেন তারা বিভিন্ন দেশে কৃষিতে পুঁজিবাদী বিকাশের ইতিহাস সম্পর্কে বা তার সাথে শিল্প পুঁজিবাদের বিকাশের সম্পর্ক সম্বন্ধে অবহিত নন। তাই আমরা সেইসব উদাহরণ দেব।
সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন নিয়ে বলতে গিয়ে এসব আমরা বলছি একটাই কারণে যে কৃষক আন্দোলনের চরিত্র বুঝতে গেলে কৃষি ব্যবস্থার চরিত্র পরিষ্কার না হলে এই আন্দোলনের চরিত্রও পরিষ্কার হবে না।
‘ফ্রান্স যখন তাদের প্রতিবেশী জাতিগুলির তুলনায় সবচেয়ে সম্পূর্ণরূপে সামন্ততন্ত্র থেকে মুক্ত হয় তখন জার্মানির তুলনায় আরো বেশি দীর্ঘ সময় ধরে সে পশ্চাৎপদ কৃষি-ব্যবস্থাকে বজায় রেখেছিল। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদরা এর জন্য অনেকগুলি কারণের মধ্যে একটি কারণকে এই বলে চিহ্নিত করেছেন যে ফ্রান্সে শিল্প জার্মানীর তুলনায় অনেক ধীরগতিতে বিকাশলাভ করেছিল। শিল্পের এই ধীর বিকাশের সাথে সামন্তবাদী কৃষির অনুপস্থিতির ফলে ক্ষুদ্র ভূমিহীন কৃষিমজুরের সাথে পরিযায়ী শিল্প শ্রমিকদের দীর্ঘকালীন অস্তিত্ব বজায় ছিল।
সামন্তবাদ উচ্ছেদের পরেও সামন্তবাদের সাথে সম্পর্কিত কিছু বিষয়ের এই ধরনের নাছোড়বান্দা উপস্থিতির সন্মুখীন হয়েছিল ফরাসী কৃষকরা। 'ভোগদখলের কিছু ধরণ বিপ্লব কিছুটা পরিমাণে সংস্কার করেছিল কিন্তু কোনভাবেই রূপান্তরিত করেনি।
প্রথমত: মেটাইয়েজ (Metayage), জমিদার এবং চাষীর মধ্যে শস্যের ভাগবাটোয়ারার অংশের শর্তাবলী, জমিদারের অংশ সাধারণত হত অর্ধেক। কিন্তু কখনো কখনো তা এক তৃতীয়াংশ বা এমনকি দুই-তৃতীয়াংশও হতে পারত, যেখানে কার্যকরী পুঁজির একটা অতিরিক্ত বড় অংশ সে দিয়েছে।
“ভাগচাষ প্রথার সাধারণ নীতিতে বিপ্লব হাত দেয়নি। যদি মেতাইয়ের তার সামন্ত প্রভুর কাছে দেনাগ্রস্ত থাকে, যদি সে জমিদারি মিলে শস্য চূর্ণ করতে বা জমিদারি আঙ্গুর পেষক যন্ত্রে আঙ্গুর পিযতে বাধ্য থাকে, যা সে সাধারণত ছিল, সেই বাধ্যবাধকতা অবলুপ্ত হয়েছিল। কিন্তু প্রজাসত্ব (Tenancy) কে স্বাধীন চুক্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল।
ভাগচাষ এবং শস্য মজুরি ব্যবস্থার অদ্ভূত বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে ভারতে জীবন ধারণোপযোগী শস্যের আভ্যন্তরীণ বাজার বড় এবং বর্ধিষ্ণু। গ্রামীণ শ্রমিকদের নিজস্ব ক্ষুদ্র জমি খণ্ডের মালিকানাভিত্তিক পশ্চাৎপদ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অর্থনীতিতে শস্য মজুরি ব্যবস্থা মানানসই। বর্ধিষ্ণু আভ্যন্তরীণ বাজার ধনী চাষীদের শস্য উৎপাদনের জন্য মানানসই। উত্তরণশীল ব্যবস্থা এইভাবে একটা ভয়ানক পিছিয়ে পড়া অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অর্থনীতিকে বাজার অর্থনীতির সাথে যুক্ত করে। কৃষক ব্যবসায়ী অথবা জমিদার ব্যবসায়ী মজুরদের সাথে পশ্চাৎপদ অ-আর্থিক সম্পর্কগুলি বজায় রাখে যদিও সে আবার বহিঃস্থ বাজারগুলির সাথে আধুনিক সম্পর্ক রক্ষা করে।' (Emerging Capitalism in Indian Agriculture by Ambica Ghosh, p.277-78)
আরো আমরা দেখি—
“এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে অনেক দেশে ভাগচাষ এসেছে পুঁজিবাদী অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যখন কিনা তার কৃষিকে সেই অগ্রগতি একই মাত্রায় পরিবর্তিত করতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে ৩৯ শতাংশ প্রজা ছিল ভাগ-চাষী, ভারতে পুঁজিবাদী শিল্পের দিক থেকে সবচেয়ে উন্নত রাজ্যগুলিতে যেমন বাংলা, পাঞ্জাব, মাদ্রাজ এবং বম্বেতে আপেক্ষিকভাবে দেশের কম উন্নত রাজ্যগুলির তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক ভাগচাষী দেখা যায়। গ্রামীণ অর্থনীতির এই বিভাজন যা ভাগ চাষের ছড়িয়ে পড়াকে এগিয়ে দেয় অদ্ভুতভাবে তা চরিত্রের দিক থেকে পুঁজিবাদী'। (সূত্র- ঐ, পৃ-২৫৮)
স্বাধীনতার পর ভারত সরকার জমিদারি উচ্ছেদ করবার সংকল্প নিয়ে কাজ শুরু করে। তার ঘোষিত উদ্দেশ্য যদিও ছিল সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল সংস্কারের পথে সামন্ত জমিদারদের পুঁজিবাদী জমিদারে রূপান্তরিত করা। (যদিও ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলেই ছিল রায়তওয়ারী ব্যবস্থা ও মহলওয়ারী ব্যবস্থা)। তার জন্য তারা জমিদারদের কাছ থেকে জমি নেবার সময় তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়। বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলি যে পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করেছিল তার জন্য ১৯৬৩ সালে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল ৫১৩ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। (Land Reform and Change in Rural Society - S. N. Pathak, P.64 )। এই বিপুল পরিমাণ টাকা জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দেবার কারণ ছিল আসলে তাদের পুঁজিবাদী উপায়ে চাষ করবার জন্য পুঁজির যোগান দেওয়া। আর প্রকৃত ভূমিহীনরা খুব কমই এইসব জমি সরকারের কাছ থেকে লাভ করেছিল। অর্থাৎ সামাজিক ন্যায় ছিল একটা ভাঁওতা। আসল উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদী পথে কৃষিব্যবস্থার রূপান্তর।
এই উদ্দেশ্যে সরকার ১৯৫০ থেকে সেচ, বাঁধ তৈরি, নতুন নতুন বীজ এবং উন্নত প্রজাতির শস্য আমদানিকে সাহায্য করে। ফোর্ড ফাউন্ডেশন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির তাদের প্যাকেজ প্রোগ্রাম, নির্বাচিত IAVP জেলাসমূহ এবং ‘সবুজ বিপ্লব'-এর আগেই সরকার এসব শুরু করে। শিক্ষার বিস্তার, কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি, জমি উন্নয়ন ব্যাঙ্ক, সুগার কো-অপারেটিভ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুই এই লক্ষ্যে চালিত হয়েছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলির একটি হচ্ছে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ। সরকারি কর্মসূচি এবং অর্থভাণ্ডার কুলাকদের উৎপাদন বাড়ানোতে সাহায্যকারী ভূমিকা নেয়।
ভারতের গ্রামগুলোতে জমি কিভাবে বণ্টিত রয়েছে তা দেখলেই আমরা বুঝবো শ্রেণী বিভাজন কিভাবে ঘটেছে। এক একরের কম জমির মালিক পরিবারগুলির অংশ ২০০৪-০৫ সালে ছিল ৭৬.৬ শতাংশ, ১-২ একর মালিক পরিবারগুলির অংশ হচ্ছে ১২.২ শতাংশ, ২ একরের বেশি জমির মালিক পরিবারগুলির অংশ হচ্ছে ১১.২ শতাংশ। (সূত্র- redpolemique.wordpress.com)
কার্যকরী জমিহীনতা ১৯৬০-৬১ সালে ৪৪.২ শতাংশ থেকে ২০০২-৩ সালে বেড়ে হয়েছে ৬০.১ শতাংশ। ৬০ শতাংশ দরিদ্রতম গ্রামীণ পরিবারগুলি মাত্র ৬ শতাংশ জমির মালিক। ( যে জমিতে চায হয়)। (সূত্র-ঐ)
কার্যকরী জমিহীন এবং প্রান্তিক কৃষকরা ২০০৩-এ সমস্ত গ্রামীণ পরিবারের মধ্যে ৮০ শতাংশ যা ১৯৬১ সালে ছিল ৬৬ শতাংশ। (সূত্র-ঐ)
কৃষিমজুরদের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা কিন্তু একইরকম রয়েছে। ১৯৫১ সালে কৃষিমজুরের সংখ্যা ছিল মোট কৃষিকর্মীর ২৮ শতাংশ। ১৯৭১ সালে ৩৫ শতাংশ, ১৯৮১ সালে ছিল ৩৭ শতাংশ। এটাই বুঝিয়ে দেয় কৃষিক্ষেত্রে পুঁজিবাদের অগ্রগতি এবং শ্রেণী বিভাজনের তীব্রতা। (The Agrarian Question and the Development of Capitalism in India- Usha Patanaik P.11)
কৃষি সেনশাসে দেখাচ্ছে— সম্পদ কেন্দ্রীকরণের হিসাব অনুযায়ী ১৯৭১-৭২-এ সমস্ত পরিবারগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের হাতে সমস্ত সম্পদের ৪৭.২১ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১ শতাংশের হাতে ২২.৯৬ শতাংশ সম্পদ আছে।
সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ মালিক ৩১ শতাংশ জমি চাষ করে। এনএসএস/ADDIS দেখাচ্ছে সর্বোচ্চ ২.২ শতাংশ পরিবার ২৩ শতাংশ জমি চাষ করে। (Capitalist Agriculture and Rural Classes in India - Gail Omvedt, ঐ, পৃ: ৪২)
সাম্প্রতিক হিসেবে দেখা যাচ্ছে বৃহৎ কৃষিফার্মগুলি (১০ একরের বেশি) ১৯৬১ সালে ৬০ শতাংশ থেকে কমে ২০০৩ সালে হয়েছে ৩৫ শতাংশ। এবং মধ্য চাষী (২-৫ একর-১০ একর)-দের শতাংশ ১৯৬১ সালের ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪২ শতাংশ । অর্থাৎ বৃহৎ কৃষিফার্ম কমে গেলেও পুঁজিবাদী মধ্যচাষীর সংখ্যা বেড়েছে। (সূত্র-RedPolemique)
ADDIS সমীক্ষা (৮০-র দশকে) দেখাচ্ছে গ্রামীণ পরিবারগুলির মধ্যে ৩৭.৯ শতাংশ জমিতে কিছু না কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করে। (Gail Omvedt, পৃ-৪৩)
তবে কৃষিতে পুঁজিবাদ-এর আধিপত্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে শস্যের বাণিজ্যিকীকরণ। আমরা আগেই দেখেছি বৃটিশ আমল থেকেই কিভাবে শস্যের বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছিল এবং জমিদারেরা, শস্য ব্যবসায়ীরা তা চালাতো।
একইভাবে ১৯৬০-এর দশকের প্রথমদিকে খাদ্য এবং কৃষি মন্ত্রক হিসাব করেছিল সমস্ত উৎপাদিত শস্যের ৪৫-৪৭ শতাংশ বাজারীকৃত হয়, মনে হয়, উৎপাদকরা নিজেরাই এর তিন-চতুর্থাংশ বাজারীকৃত করে যখন বাকিটা জমিদাররা বা মহাজনরা বাজারে বেচে (ঐ, পৃ. ৩৪-৩৫)।
কিন্তু ইদ্রদীপ সিনহা সাম্প্রতিককালে দাবী করেছেন গত ৩০ বছরে বাস্তবতঃ সমস্ত গ্রামীণ অর্থনীতি টাকা-পণ্যের ঘূর্ণিবাত্যার মধ্যে চলে এসেছে এবং বাণিজ্যিক শস্যের ১০০ শতাংশ এবং খাদ্যশস্যের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বাজারে এসছে এবং পণ্য হিসেবে বিক্রি হয়েছে। এটা সম্ভবত সঠিক এবং তার দাবী অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যবসায়ী এবং পাইকারেরা সার্বজনীন শিল্প-বাণিজ্যিক কাঠামোতে অঙ্গীভূত হয়ে গেছে এবং গোটা সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের সাথে যুক্ত। সুতরাং ভারতের গ্রামীণ জনগণের জীবন সংকটাদীর্ণ বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতির দ্বারা শাসিত হয়। (ঐ, পৃ:-৩৪-৩৫)
ঊষা পট্টনায়ক হাজির করেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা আজকের কৃষক আন্দোলনের মর্ম ও চরিত্র অনুধাবন করতে আমাদের বিরাটভাবে সাহায্য করবে। বলছেন তিনি ?
“সাবধানী অনুমানের ভিত্তিতে বললে ১৯৬০-৬১ সালে গ্রামীণ পরিবারগুলির উপরের স্তরের এক অষ্টমাংশ (জমির পরিমাণ অনুযায়ী) খাদ্যশস্যের মোট বিক্রয়যোগ্য উদ্বৃত্তের দুই-তৃতীয়াংশই দখল রেখেছিল। ... এই এক অষ্টমাংশ আরো দ্রুতগতিতে তাদের উৎপাদন এবং উদ্বৃত্ত অন্যদের তুলনায় যোগ করেছিল (বাড়িয়েছিল)। কম পক্ষে বাজারের সরবরাহকৃত পণ্যের ৭০-৭৫ শতাংশ তাদের দখলে আছে। পণ্যের উদ্বৃত্তের একচেটিয়া দখলকারী এই ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু অংশ নিশ্চয়কৃত এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্যপণ্যের মূল্য থেকে লাভবান হয়।” (The Agrarian Question and the Development of Capitalism in India-- Usha Patnaik P.20-21)
নতুন কৃষি নীতির বিরোধিতায় এবং এমএসপি-র নিশ্চয়তার দাবীতে কুলাকরা কেন জান লড়িয়ে দিয়েছিল তাকি এখন বোধগম্য হচ্ছে ?
ঊষা পট্টনায়েক আরো কি বলছেন ?
“ক্ষেতমজুর এবং গরীব চাষীরা খাদ্যের জন্য এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য বাজারের উপর নির্ভরশীল। ১৯৭৫ পর্যন্ত প্রকৃত আয় কমে যাওয়াতে তারা ভুগেছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষুদ্র পণ্য বিক্রেতা হিসেবে যা লাভ করেছে তার থেকে বেশি ক্ষতি তাদের হয়েছে পণ্যের ক্রেতা হিসেবে। (সূত্র-ঐ, পৃ:-১৫-১৬)
কৃষিপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও এমএসপি নিয়ে যেসব ‘বামপন্থীরা’ সোচ্চার তারা কি শুনতে পাচ্ছেন!
তিনি আরো বলছেন --
“সবচেয়ে গরীবদের জীবনধারণের মান ১৯৬১-৬২-র তুলনায় ১৯৭৩-৭৪ -এ আরো খারাপ। একই সময়ে অর্থনীতিতে সঞ্চয়ের হার অবিচলিতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে তা দাঁড়িয়েছে জাতীয় আয়ের কম পক্ষে ২০ শতাংশে এবং সপ্তম পরিকল্পনায় তা ২০ শতাংশ হবে বলে নির্ধারিত হয়েছে (ঐ, পৃ:-৩২) কুলাকরা দিনে দিনে সমৃদ্ধ হচ্ছে অথচ “কৃষিতে যত প্রত্যক্ষ কর ছিল তা মোট জাতীয় কৃষি উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম ছিল এবং ১৯৭৪-৭৫ এর কর রাজস্বের মাত্র ৩ শতাংশ দিয়েছিল। (ঐ, প: ১৫)
এই কুলাকরা যারা কৃষিতে বিনিয়োগ করছে তারা কিন্তু কৃষিতে বিশাল পরিমাণ পুঁজির বিনিয়োগ করে চলেছে। ২০১১-১২ সালে কৃষিতে মোট পুঁজির গঠন ছিল ২,৭৪,৪৩২ কোটি টাকা এবং ২০১৪-১৫ সালে ছিল ২,৫৪,৪৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি পুঁজির অবদান ছিল ২০১১-১২-তে ২,৩৮,৭১৭ কোটি টাকা এবং ২০১৪-১৫-তে ২,২০,৪৩৪ কোটি টাকা। (সূত্র: Private and Government: Who Is Investing How Much on Agriculture, Richard Mahapatra, published | Wednesday, 26 June, 2019-Internet)
অর্থাৎ ৩ বছরে ব্যক্তিপুঁজির বিনিয়োগ কিছুটা কমলেও তা বিশাল পরিমাণেই রয়েছে। যেসব তথ্য আমরা উপরে হাজির করেছি তা থেকে এটা পরিষ্কার যে কৃষি পণ্যের বাজার পুরোপুরি কুলাকদের বা শস্যব্যবসায়ীদের দখলে। গরীব বা প্রান্তিক চাষীরা তাদের উদ্বৃত্ত শস্যের একটা বড় অংশ জমির মালিকদের কাছে জমা দিতে বাধ্য হয়। তার পরও নানান কারণে যখন তারা কিছুটা অংশ বাজারে বিক্রি করে সেখানেও লাভের গুড় পিঁপড়ে খায় যখন তারা বাজারে শস্য কিনতে গিয়ে ক্ষতির সন্মুখীন হয়। সুতরাং ফসলের সহায়ক মূল্যের দাবী বা তার মূল্যবৃদ্ধির দাবী বাস্তবতঃ কুলাক বা শস্য ব্যবসায়ীদের দাবী যার সাথে গরীব বা প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থের কোন সম্পর্ক নেই। খেয়াল রাখা দরকার শহরের শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ এবং গ্রামাঞ্চলের কৃষি মজুর বা প্রান্তিক কৃষকদের বাজার থেকে শস্য কিনেই খেতে হয়। সুতরাং ফসলের মূল্যবৃদ্ধি তাদের স্বার্থের পক্ষে হানিকর। তাই ফসলের মূল্যবৃদ্ধির বিপক্ষে সবসময়ে আমাদের দাঁড়ানো উচিত। যার বিপরীতটাই কিন্তু তথাকথিত বামপন্থীরা করে থাকেন।
MSP -র দাবী কতটা যুক্তিসঙ্গত?
MSP-র দাবী নিয়ে কৃষকদের সোচ্চার হওয়া বা আন্দোলনে নামা ভারতবর্ষে নতুন নয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই তা চলে আসছে। মূলত বাণিজ্যিক শস্যের ক্ষেত্রেই আগে তা ঘটতে দেখা যেত। যেমন ১৯৩৪ সালে যুক্তপ্রদেশ (United Province) এবং বিহার সরকার কৃষকদের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে আখের ন্যূনতম মূল্য স্থির করে দেয়। মিল মালিকরা এর বিরোধিতা করে। কারণ এর ফলে চিনির মূল্যবৃদ্ধি হলে তাদের ব্যবসা মার খাবে। ফলে সরকারগুলি | এই চাপের মুখে ন্যূনতম মূল্য কমিয়ে দেয়। (সূত্র-Agrarian Relation in India (1793-1947) by Sunil Sen, P.98-100) আবার পরে ১৯৪০-এর জুনে ভারত সরকার কর্তৃক আহূত সিমলা সম্মেলনে এটা নিয়ে আলোচনা হয়। মালিকদের পক্ষে বি.এম. বিড়লা ন্যূনতম মূল্য যতটা সম্ভব কম রাখার পক্ষে ওকালতি করেন। ... ১৯৪৮-৪৯ সালে আখের যে দাম ঠিক করে বিহার সরকার তা ১৯৪৯-৫০ সালে কমিয়ে দেয় তারা। (সূত্র-ঐ, পৃ-৯৮-১০০)।
এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে তাহলে শস্যের ন্যূনতম মূল্যের বা তার বৃদ্ধির দাবীকে বিরোধিতা করে আমরা কি শিল্পপতিদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি না?
ব্যাপারটা একদমই তা নয়। প্রথমত: এগুলো হচ্ছে বাণিজ্যিক শস্য। স্বাধীনতার পূর্বেও যদিও শস্য ব্যবসায়ীরা এসব শস্যের বাজারে আধিপত্য করত, কিন্তু তাদের সেই আধিপত্য এখনকার মতো এত সর্বগ্রাসী ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও যে কোন পণ্য যা সাধারণ মেহনতী মানুষ ক্রয় করে তার মূল্য বৃদ্ধি তাদের ক্ষতিই করে। সুতরাং তাকে আমাদের সমর্থন করা উচিত নয়। পুঁজিপতিরা এটাকে কেন বিরোধিতা করে তার কারণ পরিষ্কার। কারণ এর ফলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে তাদের পণ্যের বিক্রি কমে যাবে এবং তাদের মুনাফাতে টান পড়বে। মেহনতী মানুষের দুর্দশার কথা ভেবে তারা এটা করে না।
আজকের দিনে যেহেতু খাদ্যশস্য ও বাণিজ্যিক শস্যের বাজার প্রায় পুরোটাই কুলাক ও শস্য ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করে, সুতরাং তাদের মুনাফার স্বার্থে আমরা মেহনতী মানুষের স্বার্থের বিপক্ষে দাঁড়াতে পারি না। তাই এমএসপি বা খাদ্যশস্যের এবং বাণিজ্যিক শস্যেরও মূল্যবৃদ্ধিকে আমরা বিরোধিতা করি।
হ্যাঁ, এরপরেও যেটা বলা যেতে পারে যে খুব সামান্য হলেও গরীব বা প্রান্তিক চাষী তো বাজারে শস্য বিক্রি করে, সেক্ষেত্রে তাদের স্বার্থে রক্ষিত হবে কি করে? এর উত্তর একটাই। সরকারকে সরাসরি গরীব ও প্রান্তিক চাষীকে ভর্তুকি দিতে হবে। এই দাবীতে আমাদের অবশ্যই সোচ্চার হতে হবে। এই দাবী তাদের স্বার্থকেও পূরণ করবে আবার বাজারে ক্রেতা কোটি কোটি মেহনতী মানুষকে এমনকি ঐ চাষীদেরকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।
সদ্য শেষ হওয়া কৃষক আন্দোলনে এমন কোন দাবীকে কিন্তু আমরা কৃষক মোর্চাকে তুলতে দেখিনি। ওঠেনি কৃষিমজুরদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবীও। কারণটা খুবই পরিষ্কার। তা কুলাকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। আমরা জানি পাঞ্জাব-এ কুলাকদের সাথে কৃষি মজুরদের শ্রেণী সংগ্রাম কি তীব্রভাবে চলে। গ্রামাঞ্চলে কুলাকদের বিরুদ্ধে কৃষিমজুরদের শ্রেণী সংগ্রামকেই আমাদের গড়ে তুলতে হবে। কুলাকরা হচ্ছে বুর্জোয়াদের গ্রামীণ অংশ। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে শ্রেণীসংগ্রামকে তীব্র করতে হলে কুলাকদের বিরুদ্ধে কৃষিমজুরদের লড়াইকে তীব্র না করে তা হতে পারে না। আর এখানেই স্ট্যালিনবাদী মাওবাদীদের ব্যার্থতা। গ্রামাঞ্চলে তথাকথিত সামন্তবাদবিরোধী লড়াই এর কথা বলে তারা কুলাকদের বিরুদ্ধে কৃষিমজুরদের সংগ্রামকে এড়িয়ে যায়। তাদের স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ে তোলার কোন প্রচেষ্টা তারা নেয় না। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে সামন্তবাদ বিরোধী লড়াই-এর নামে তারা আসলে কুলাকদের দালালি করে এবং বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি করার তাদের ঐতিহ্যকে তারা বজায় রাখে।
কিন্তু একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে এই আন্দোলনে এমএসপি-র আইনী স্বীকৃতির দাবী মূল দাবী থাকলেও অন্যান্য প্রশ্নগুলো তো ছিল। যেমন চুক্তি চাষ এবং মজুতদারি বিরোধী আইনকে তুলে দিয়ে বৃহৎ পুঁজিপতিদের শস্য মজুত করে খাদ্যশস্যের যথেচ্ছ দাম বাড়িয়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে প্রচুর মুনাফা করবার প্রশ্নও। বলাই বাহুল্য চুক্তি চাষ গরীব ও প্রান্তিক চাষীদের জমিগুলোকেও বড় কোম্পানীকে গিলে খেতে সুবিধা করে দেবে। সুতরাং এই চুক্তিচাষের বিরুদ্ধে গরীব ও প্রান্তিক চাষীকেও লড়তে হবে। কিন্তু তা তাদের লড়তে হবে স্বতন্ত্র ভাবে, প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বে, কুলাকদের নেতৃত্বে নয়। কারণ কুলাকরা আদৌ তাদের স্বার্থ নিয়ে ভাবিত নয়। তাদের স্বার্থ মিটে গেলে তারা গরীব চাষীদের ছুঁড়ে ফেলে দিতে দ্বিধা করবে না। খেয়াল রাখা দরকার, তারা যে গরীব ও প্রান্তিক কৃষকদের সরকারি ভর্তুকি প্রদানের দাবী তোলে না, তার কারণ একটাই। কারণ সেক্ষেত্রে গরীব ও প্রান্তিক চাষীরা স্বাবলম্বী হয়ে গেলে তারা কুলাক বা শস্যব্যবসায়ী মহাজনদের কাছে ধার করবে না। আর তা না করলে তাদের শস্য নিয়ে তারা ব্যবসাও করতে পারবে না।
সুতরাং যে নকশালপন্থী গোষ্ঠীটি বলছেন যে যেহেতু গরীব চাষীরা কুলাকদের সাথে আছে সুতরাং তাদের আন্দোলনকে সমর্থন করতে হবে তারা আসলে কুলাকদের দালালে পরিণত হয়েছেন। | আমাদের কর্তব্য কুলাকদের খপ্পর থেকে গরীব ও প্রান্তিক চাষীদের বের করে আনা। ভ্রান্ত যুক্তির আড়ালে তাদের কুলাকদের খপ্পরে ঠেলে দেওয়া আমাদের কাজ নয়। কমিউনিস্ট হিসেবে আমাদের উচিত তাদের ভুলটাকে দেখিয়ে দেওয়া এবং সঠিক পথ বাতলে দেওয়া। জনগণের মধ্যেকার পশ্চাদপদ চেতনা বা বুর্জোয়া চেতনার লেজুড়বৃত্তি করা আমাদের কাজ নয়।
আর মজুতদারি করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হলে তা শ্রমিক শ্রেণী, শহুরে অন্যান্য মেহনতী মানুষেরা, গ্রামীণ কৃষিমজুর, গরীব ও প্রান্তিক চাষী সকলকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তার বিরুদ্ধে লড়তে হলে সে লড়াই লড়তে হবে প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বে। অন্য কেউ এই লড়াই লড়তে পারে না। সুতরাং হয়ে যাওয়া কৃষক আন্দোলনে যারা কুলাকদের খপ্পরে পড়েছিলেন তাদেরকে কুলাকদের খপ্পর থেকে বের করে এনে প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বে কৃষি-মজুর ও গরীব কৃষকদের লড়াই গড়ে তোলা দরকার। খেয়াল রাখা দরকার ভারতে গ্রামাঞ্চলে কৃষিকর্মীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি হচ্ছে কৃষিমজুররা। সুতরাং বিপ্লবপূর্ব রাশিয়া বা চীনের তুলনায় ভারতে গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশের সম্ভাবনা অনেক বেশি। স্ট্যালিনবাদী, মাওবাদীরা সামন্তবাদ-বিরোধী সংগ্রামের নামে এই বিরাট সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে।
একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার ভারত একটি পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদী দেশ। এখানে সামন্ততন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে গেলেও বিপ্লব-পরবর্তী ফ্রান্সের মতই (কিছুকালের জন্য ) এখানেও পুঁজিবাদের সেই বিকাশ হয়নি, যার ফলে এখানে গ্রামাঞ্চলেও হুড়মুড়িয়ে পুঁজিবাদের বিকাশ হবে এবং উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি শহরাঞ্চলের শিল্পে কাজ পাবে। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর বেকার মানুষের ভিড় এবং তার ফলেই নানারকম পশ্চাৎপদ সম্পর্কগুলো টিকে থাকতে পারছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুঁজিবাদ তার কাজ করে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী বিভাজন ক্রমশ বাড়ছে। তৈরি হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য গ্রামাঞ্চলে প্রলেতারিয়েতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাথী গ্রামীণ প্রলেতারিয়েত বা কৃষিমজুর শ্রেণী। এই কৃষিমজুররা এবং গরীব ও প্রান্তিক চাষীদের প্রলেতারিয়েতের অধীনে নিয়ে এসে ভারতে তৈরি করতে হবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মহাকাব্য। ভারতের শহুরে একচেটিয়া পুঁজিপতি এবং গ্রামীণ বুর্জোয়া শ্রেণী অর্থাৎ কুলাকদের মধ্যে উদ্বৃত্ত শ্রমের ফসল লুঠের বখরা নিয়ে দ্বন্দ্ব যত তীব্র হবে ততই তা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রাস্তাকে পরিষ্কার করে দেবে। খেয়াল রাখতে হবে ফ্রান্সের সম্রাট ও অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে এরকম লুটের বখরা নিয়ে দ্বন্দ্বের ফলেই ফরাসী বিপ্লবের দরজা খুলে গিয়েছিল। সুতরাং কুলাকদের লেজুড়বৃত্তি আমরা করব না বটে, কিন্তু একচেটিয়া পুঁজিপতিদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ববৃদ্ধিকে আমাদের বিপ্লবের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য তৈরি থাকতে হবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন প্রলেতারিয়েতের স্বাধীন পার্টি এবং শ্রমিক আন্দোলনের বিস্তার ও কৃষিমজুর এবং গরীব কৃষকদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার। আসুন সেই লক্ষ্যে আমাদের কর্মকাণ্ড আমরা গড়ে তুলি।
