header

🄯 Made by devolskii

logo

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু – একটি ট্রটস্কিবাদী মূল্যায়ন

আগস্ট ২০১৮


নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু – একটি ট্রটস্কিবাদী মূল্যায়ন
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে ভারতীয় বুর্জোয়াদের সচেতন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি জাতীয়তাবাদকে উর্দ্ধে তুলে ধরেছেন এবং শ্রেণী সংগ্রাম বা শ্রেণী সংঘর্ষকে পরিহার করতে চেয়েছেন।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বাঙ্গালী জনসাধারণের মধ্যে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্যসাধারণ বিপ্লবী চরিত্র হিসেবেই তাকে সকলে জানে। একদিকে গান্ধী সম্পর্কে এক নেতিবাচক ধারণা, আর অন্যদিকে তাকে এক বিপ্লবী নায়ক হিসেবে ভাবতেই বাঙালী পছন্দ করে। তবে শুধুমাত্র বাঙ্গালী নয়, ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তেই নেতাজীর এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা আছে। বলাই বাহুল্য, এর মধ্যে যতটা আবেগ মিশে আছে, যুক্তি বা বিজ্ঞানসম্মত ধারণার বিশেষ স্থান সেখানে নেই। যেমন, গান্ধী ও নেতাজীকে পরস্পরবিরোধী দুই ধারার প্রতিনিধি হিসেবে সকলে দেখতে ও ভাবতে অভ্যস্ত হলেও নেতাজী কিন্তু গান্ধী সম্পর্কে কোনদিন কোন অশ্রদ্ধাসূচক মন্তব্য করেননি। বরঞ্চ উল্টোটা, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গান্ধীকে তিনি বিপ্লবী হিসেবেই মনে করতেন। পরবর্তীকালে গান্ধীবাদ তার বিপ্লবী সত্তা খুইয়ে ফেলেছিল বলে তার মনে হয়েছিল এবং তার ফলে তা জাতীয় স্বাধীনতার লক্ষ্যের দিকে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে তার কোন আশা আর ছিল না। অথচ তখনও কংগ্রেসকে ভারতীয় জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কথা তিনি বলেন নি। বরঞ্চ তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ফরওয়ার্ড ব্লককে তিনি কংগ্রেসেরই একটি শাখা বলে মনে করতেন। সুতরাং নেতাজী সম্পর্কে কোনরকম মূল্যায়ণ করতে গেলে কংগ্রেস ও গান্ধীকে বাদ দিয়ে তা করা সম্ভব নয়। তাই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেসের ও গান্ধীর ভূমিকা নিয়ে একটা সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেস ও গান্ধীর ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই কংগ্রেসের শ্রেণী চরিত্র নিয়ে একটা পরিষ্কার ধারণা তৈরি করে নেওয়া দরকার। কেননা তাছাড়া কংগ্রেসের বা গান্ধীর ভূমিকার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

উপনিবেশের এই পুঁজিপতিরা যতটা না ক্ষিপ্ত ছিল বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতি তার থেকেও বেশি ভয় পেত দেশের শ্রমিক-কৃষককে। তাদেরকে সশস্ত্র করে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলন করার কথা ভাবলেই আতঙ্কে তাদের গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যেত। কারণ তারা জানত শ্রমিক-কৃষকের হাতের ঐ অস্ত্র তারা যে কোন মুহুর্তে তাদের আরো দুই দেশী শোষক পুঁজিপতি, জমিদারদের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে ধরতে পারে।

কংগ্রেস ছিল ভারতের পুঁজিপতি ও জমিদারদের দল। আর সাম্রাজ্যবাদের যুগে উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশগুলিতে তথা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে পুঁজিপতিরা ছিল ও আছে পুরোপুরি প্রতিক্রিয়াশীল। তাদের মধ্যে কোনরকম প্রগতিশীলতা আশা করাটাই মূর্খামি। সুতরাং কংগ্রেস যে প্রথম থেকেই একটা প্রতিক্রিয়াশীল দল হিসেবে তৈরি হয়েছিল এর মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। উপনিবেশের এই পুঁজিপতিরা যতটা না ক্ষিপ্ত ছিল বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতি তার থেকেও বেশি ভয় পেত দেশের শ্রমিক-কৃষককে। তাদেরকে সশস্ত্র করে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলন করার কথা ভাবলেই আতঙ্কে তাদের গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যেত। কারণ তারা জানত শ্রমিক-কৃষকের হাতের ঐ অস্ত্র তারা যে কোন মুহুর্তে তাদের আরো দুই দেশী শোষক পুঁজিপতি, জমিদারদের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে ধরতে পারে। রুশ বিপ্লব বুর্জোয়াদের এই শিক্ষা খুব ভালো ভাবেই দিয়েছিল। তাই এইসব ভাবনা তারা ভুলেও ভাবত না। আর সেই কারণেই ভারতীয় বুর্জোয়াদের নেতা গান্ধী আমদানি করেছিলেন অহিংসার তত্ত্ব। এবং আন্দোলন বলতে তিনি বুঝতেন অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আর বিদেশী বস্ত্র বয়কট (যা কিনা দেশীয় বস্ত্র-শিল্পের মালিকদের লাভের কথা ভেবে করা হত)। এমনকি ঐসব আন্দেলনের মধ্যে যদি কেউ মুহূর্তের জন্য হিংসাত্মক কোন কাজ করত সঙ্গে সঙ্গে গান্ধী সেই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিতেন। যেমন হয়েছিল চৌরিচৌরার ঘটনার পর।

সুতরাং গান্ধীর কাছ থেকে কেউ যদি কিছু প্রত্যাশা করে থাকেন তবে দোষটা তার নিজের। যেমন কমিউনিস্ট পার্টি স্ট্যালিনের নির্দেশে গান্ধীর মধ্যে প্রগতিশীলতা খুঁজে পেয়েছিল এবং তার লেজুড়বৃত্তি করে স্বাধীনতা পর্যন্ত কাটিয়ে দিয়েছিল। আবার নেতাজী গান্ধীর এক বিনম্র শিষ্য ছিলেন এবং তার মধ্যে 'বৈপ্লবিক সত্ত্বা' আবিষ্কার করেছিলেন। যারা গান্ধী ও নেতাজীর মধ্যে সংঘাত খুঁজতে চান তারা কিন্তু নেতাজীর নিজের বক্তব্যের মধ্যে তা খুঁজে না পেয়ে হতাশই হবেন।

নেতাজীর চোখে কংগ্রেস ও গান্ধী

নেতাজীর রাজনৈতিক মত ও পথ কিন্তু কংগ্রেসের থেকে কোন কালেই খুব আলাদা ছিল না। তিনি কংগ্রেসেরই নেতা ছিলেন। কংগ্রেসের বা গান্ধীর মতামতই তার পাথেয় ছিল। তবে সব ব্যাপারেই যে তিনি গান্ধী বা কংগ্রেসের মতের সাথে একমত ছিলেন তা নয়। যেমন আধুনিক শিল্প নিয়ে গান্ধীর মতামতকে তিনি সমর্থন করতেন না । চাহিদা বা জীবনযাত্রার মানের বৃদ্ধির বিরুদ্ধে গান্ধীর মতের সাথে তিনি একমত ছিলেন না। মধ্যযুগে ফিরে যাবার গান্ধীর তিনি বিরোধিতাই করতেন। আসলে বুর্জোয়াদের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গীকে তিনি প্রতিনিধিত্ব করতেন। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গান্ধীর ভূমিকা বৈপ্লবিক ছিল বলে তিনি মনে করতেন। নেতাজীর একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ ছিল 'Fundamental Question of Indian Revolution'। সেখানে গান্ধী সম্পর্কে তার প্রশংসাসূচক বক্তব্যগুলি আমরা তুলে ধরছি :-

আমরা আগেই বলেছি গান্ধীর অসহযোগে আন্দোলন ছিল শ্রমিক-কৃষককে বৈপ্লবিক আন্দোলন থেকে দূরে রাখার কৌশল, সেই আন্দোলনকে প্রশংসা করে নেতাজী বলছেন- “১৯২০-তে অসহযোগ আন্দোলন ছিল সবচেয়ে উপযোগী” (ঐ, পৃ.-২)। ঐ সময়ে তিনি গান্ধীকে কংগ্রেসের বামপক্ষ বলে অভিহিত করছেন।

অথচ ১৯২০ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস স্বাধীনতার দাবী তোলা তো দূরের কথা, কংগ্রেসের সংবিধানে “ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে ভারতের স্বশাসনের" কথা বলা হয়েছিল। ১৯২০-র নাগপুর অধিবেশন থেকে বলা শুরু হয় 'স্বরাজ'-এর কথা। গান্ধী স্বরাজ-এর ব্যাখ্যা দিলেন এইভাবে— “যদি সম্ভব হয় ব্রিটেন-এর মধ্যে, যদি প্রয়োজন হয় তার বাইরে" (নে.স.র.[1]খণ্ড ২, পৃ. ৪৭-৪৮)। এই গান্ধী কি করে বামপক্ষ হয়ে গেলেন। এবং শুধু তাই নয়, নেতাজী বলছেন— “মহাত্মা কংগ্রেসকে ১৯২১-এ বিপ্লবী সংগঠনে পরিণত করেন।” (নে.স.র, খণ্ড-২, পৃ. ৭৭)

অথচ এই 'বিপ্লবী' নেতা আমেদাবাদ কংগ্রেসে যুক্তপ্রদেশের এক কংগ্রেসী নেতা মৌলানা হসরত মোহানি-র প্রজাতান্ত্রিক ভারতের যুক্তরাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবীকে বিরোধিতা করেন এবং তার প্রভাব বিস্তার করে ঐ প্রস্তাব খারিজ করে দেন। প্রকৃতই বামপন্থী ও বিপ্লবী বটে! তা এই বামপন্থী ও বিপ্লবী সংগঠন কংগ্রেস ১৯২৭-এ মাদ্রাজে স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করে। কিন্তু আবার ১৯২৮-এই কলকাতা কংগ্রেসে ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস-এর প্রস্তাব গৃহীত হয়। নেতাজীর নিজের মত অনুযায়ী “মাদ্রাজ তো বটেই এমন কি নাগপুর (ডিসেম্বর, ১৯২০) প্রস্তাব থেকেও তা পিছিয়ে আসা। নাগপুর-এ স্বরাজ-এর প্রস্তাব গৃহীত হয়। তার অর্থ যদিও পরিষ্কার ছিল না, কিন্তু তাতে স্বাধীনতার ব্যাখ্যা করা যেত।” (F.Q.I.R., পৃ. ৫)[2]

“কংগ্রেসের বামপন্থীরা গান্ধী আরউইন চুক্তি অনুমোদন করে না। এই বিবৃতি দেওয়া হবে ঠিক হয়। কিন্তু পরিস্থিতি বিচার করে তারা বিভাজন সৃষ্টি থেকে সরে আসে, বিবৃতি দেয় না। এতে -সমর্থকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। করাচি কংগ্রেসে নেতাজী সাবজেক্ট কমিটির কাছে তা বলেন।”

আবার দেখা গেল ডিসেম্বর, ১৯২৯-এ লাহোর কংগ্রেসে স্বাধীনতার প্রস্তাব নিতে কংগ্রেসী নেতারা বাধ্য হলেন। কেননা গোটা দেশ তখন তেতে ছিল। কিন্তু এরপরেও বলা হয়েছিল স্বাধীনতা মানে পূর্ণ স্বরাজ। এর যা খুশি অর্থ যে কেউ করতে পারে। গান্ধী ১৯৩০-এর প্রথম দিকে তার বিখ্যাত ‘১১ পয়েন্ট' প্রকাশ করেন যা তার মতে স্বাধীনতার মর্মবস্তুকে প্রকাশ করে যা ব্রিটিশ সরকারের সাথে সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করে। এর ফলে লাহোর কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত নাকচ হয়ে যায়। (F.QI.R., পৃ. ৬-৭ )

১৯৩০ সালে যখন আন্দোলন শুরু হল, তখন সরকার দিশাহারা ছিল। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক-উভয়ই-ভারতের অনুকূলে ছিল। কিন্তু মার্চ ১৯৩১-এ দিল্লী চুক্তি (গান্ধী-আরউইন চুক্তি) অনুযায়ী তা বাতিল করা হয়। এই চুক্তিতে যেসব বিষয় দেখা গেছে-

  1. স্বরাজ-এর মত বৃহৎ ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকার প্রতিশ্রুতি দিতে একটা কথাও বলেনি।
  2. ভারতীয় রাজন্যদের সাথে ফেডারেশনের প্রস্তাবে নীরব সম্মতি লক্ষ্য করা গেছে।
  3. দেশবাসীদের বিরুদ্ধে গুলি চালাতে অস্বীকার করেছিল যে গারওয়ালী সেনারা, তাদের মুক্তির ব্যাপারে কোন কথা নেই।
  4. রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে কোন কথা নেই। (F.Q.IR., পৃ. ৯-১০)

নেতাজী এর বিরুদ্ধেই ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের মধ্যে এ ব্যাপারে তিনি কি ভূমিকা রাখলেন? তার লেখনীতেই শুনুন — “কংগ্রেসের বামপন্থীরা গান্ধী আরউইন চুক্তি অনুমোদন করে না। এই বিবৃতি দেওয়া হবে ঠিক হয়। কিন্তু পরিস্থিতি বিচার করে তারা বিভাজন সৃষ্টি থেকে সরে আসে, বিবৃতি দেয় না। এতে -সমর্থকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। করাচি কংগ্রেসে নেতাজী সাবজেক্ট কমিটির কাছে তা বলেন।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ২২৮–২৯)

এইভাবে নেতাজী 'বিভাজন' সৃষ্টির বিরোধী হিসেবে গান্ধীকেই সাহায্য করে গেছেন।

আর শুধু এই ক্ষেত্রেই নয়। আরো একটি ক্ষেত্রে তিনি একই ধরনের কাজ করেছেন। তার ভাষাতেই শুনুন : “করাচি কংগ্রেসের পাশাপাশি অল-ইন্ডিয়া নওজওয়ান ভারত সভা (অল ইন্ডিয়া যুব কংগ্রেস)-এর অধিবেশন করাচিতে বসে। সেই সময় পাঞ্জাব এবং সিন্ধের যুবকদের মধ্যে একটা পরিষ্কার প্রবণতা তৈরি হয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং আলাদা সংগঠন বানানো। আমি তাতে তীব্রভাবে আপত্তি জানাই এবং সরকারি কংগ্রেসের সংগঠনকে বয়কট করার বদলে তাকে দখল করার আবেদন জানাই।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ২৩০)

অর্থাৎ নেতাজী বরাবরই গান্ধীর নীতির সাথে বিরোধিতার ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতা দেখিয়ে এসেছেন। তার সাথে কখনই বিচ্ছেদ টানতে চান নি। এটাই প্রমাণ করে গান্ধীর নীতির সাথে তার পার্থক্য খুব মৌলিক কিছু ছিল না। কেননা গান্ধীজি কিন্তু বরাবর একই রকম ছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের শুভানুধ্যায়ী হিসেবেই তাকে আমরা বরাবর দেখে এসেছি। ১৯১৯ সালে মন্টেগুর উদ্যোগে যখন গভর্ণমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ১৯১৯ পাশ হয়, গান্ধী তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তার সাপ্তাহিক পত্রিকা ইয়ং ইন্ডিয়াতে ৩১ ডিসেম্বর ১৯১৯-এ লেখেন- “ ঘোষণা সহ সংস্কার আইন ভারতকে ন্যায়বিচার দেবার একটা আন্তরিক প্রচেষ্টা, এ বিষয়ে সন্দেহ দূর হওয়া উচিত... সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সংস্কারগুলিকে ছিদ্রান্বেষী সমালোচনা না করা। বরং শান্তভাবে কাজ করে যাওয়া, যাতে তাদেরকে সফল করে তোলা যায়।” (নে.স. র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯)

ভারতীয়দের ন্যায়বিচার দিতে ব্রিটিশরা তো সত্যিই উন্মুখ ছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগে সেই ন্যায় বিচার তো তারা দিয়েইছে। এহেন গান্ধী ১৯২১ সালে বিপ্লবী ছিলেন বলে নেতাজী দাবি করেছেন। শুধু তো এটাই নয়, ১৯৩১-এ গান্ধী-আরউইন চুক্তিতে যে ফেডারেশন-এর প্রস্তাব গান্ধী প্রায় মেনে নিয়েছিলেন তা ছিল এক বিপজ্জনক ঘটনা। যা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করত দেশীয় রাজন্যদের সাথে ব্রিটিশদের জোটকে আরও সুদৃঢ় করত এবং উভয়ে মিলে স্বাধীনতা আন্দোলকে ধ্বংস করত।

“১৯৩৯-এর ৬ সেপ্টেম্বর গান্ধী লর্ড লিনলিথগোর সাথে সাক্ষাৎকারে প্রতিশ্রুতি দেন ভারত ব্রিটেনের এই বিপদের দিনে সাহায্য করবে।” “৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৩৯, ওয়ার্ধাতে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং-এ কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকারকে তার যুদ্ধের লক্ষ্য ঘোষণা করতে বলে। বলে যদি ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেওয়া হয় তবে তারা ব্রিটেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টার সহযোগী হবে।”

আমরা দেখেছি স্বাধীনতার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আগেই গান্ধী সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু সেই তিনিই লাহোর কংগ্রেসে স্বাধীনতার প্রস্তাব সমর্থন করেন। কেন? আসলে সে সময় গোটা ভারত ফুঁসছিল। সুতরাং হাওয়া গরম বুঝে গান্ধী এতে রাজি হয়ে যান। কিন্তু গান্ধীর এই চালাকিকে নেতাজী কিভাবে ব্যাখ্যা করলেন? তার মতে- “লাহোর কংগ্রেসে স্বাধীনতার প্রস্তাব নিয়ে এসে গান্ধী তার প্রগতিশীল চরিত্র বজায় রাখলেন। গান্ধী-আরউইন চুক্তিতে তার সাময়িক পশ্চাদপসরণ হয়, কিন্তু সেও তার হারানো ভূমি খুঁজে পায় জানুয়ারী ১৯৩২-এ শুরু হওয়া সত্যাগ্রহ ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে"। (FQIR., পৃ. ৩৬-৩৮ ) অর্থাৎ মুখে কিছু প্রগতিশীল কথা বলা এবং কিছু আন্দোলন করলেই সে প্রগতিশীল। এই ছিল নেতাজীর বিচারধারা। ১৯৩২-এ শুরু হওয়া সেই আন্দোলন অবশ্য ১৯৩৩-এই গান্ধী প্রত্যাহার করে নেন। এর পর আসে পার্লামেন্টারী রাজনীতির যুগ। গান্ধী এবং তার চ্যালারা সোৎসাহে বিভিন্ন প্রদেশে মন্ত্রীসভা তৈরি করে ব্রিটিশদের দালালি করতে শুরু করে।

এহেন কংগ্রেসের সভাপতি হতে নেতাজী কিন্তু বিন্দুমাত্র আপত্তি করেন নি। ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮-এ হরিপুরা কংগ্রেসে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তার পরের বছরও তিনি আবার সভাপতি হন। এ বার অবশ্য তার সাথে গান্ধীবাদীদের সংঘাত বাধে এবং তাদের অসহযোগিতার কারণে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু বাঙালী জনতা যা ভাবতে অভ্যস্ত যে নেতাজীর সাথে গান্ধীর বোধ হয় 'সশস্ত্র সংগ্রাম' নিয়ে মতপার্থক্য হয়েছিল, ঘটনা কিন্তু তা নয়। বা খুব মৌলিক চরিত্রের কোন মতপার্থক্য নিয়ে সেই সংঘাত বাধেনি। নেতাজীর বয়ানেই দেখা যাক তাদের মধ্যে সংঘাত কি কারণে ঘটল :-

“আমার বিরুদ্ধে গান্ধী ও গান্ধীবাদীদের অভিযোগগুলি :-

  1. ফেডারেশনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আমি আপোষহীন ছিলাম।
  2. বামদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব ।
  3. ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটি গঠনে আমার পৃষ্ঠপোষকতা, যাতে গান্ধীবাদীদের মনে হয়েছে, তা বৃহৎ শিল্পের প্রসার ঘটাবে, গ্রামীণ শিল্পগুলির বিনাশ ঘটাবে। যার বিকাশ গান্ধীবাদীদের কর্মসূচী।
  4. স্বাধীনতার জন্য জাতীয় সংগ্রাম পূর্বাহ্নেই শুরু করার পক্ষে বলেছি।”

এখন স্ট্যালিনবাদী বামপন্থীরা নেতাজীর 'বামদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব' কথাটি দেখে হয়তো উৎফুল্ল হয়ে উঠবেন। এবং এটাই বিরোধের মূল কারণ বলে ভাবতে শুরু করবেন। কিন্তু ঘটনা আদৌ তা নয়। কেননা বামদেরও গান্ধীর প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবই ছিল। স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত গান্ধীকেই তারা জাতির নেতা বলে ভাবতেন। গান্ধী এতটা বোকা ছিলেন না যে এইসব 'বামদের' সাথে বন্ধুত্বের কারণে তিনি খুব ভীত হয়ে পড়েছিলেন। আসলে বুর্জোয়াদের মধ্যেকার পলিসি সংক্রান্ত যে পারস্পরিক বিরোধ থাকে তাই এই বিরোধের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রথমতঃ তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী। এবং যেহেতু মার্কসবাদীরা জাতীয়তাবাদকে বিরোধিতা করে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদকে উর্দ্ধে তুলে ধরে এবং আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী সমাজ গঠনের লক্ষ্যকে কর্তব্য হিসেবে তুলে ধরে তাই তিনি মার্কসবাদকে বিরোধিতা করেছেন।

এরপর ১৯৩৯ সালে শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আর বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার সাথে সাথেই গান্ধী তার চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যুদ্ধে ব্রিটিশদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। “১৯৩৯-এর ৬ সেপ্টেম্বর গান্ধী লর্ড লিনলিথগোর সাথে সাক্ষাৎকারে প্রতিশ্রুতি দেন ভারত ব্রিটেনের এই বিপদের দিনে সাহায্য করবে।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৭৯) “৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৩৯, ওয়ার্ধাতে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং-এ কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকারকে তার যুদ্ধের লক্ষ্য ঘোষণা করতে বলে। বলে যদি ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেওয়া হয় তবে তারা ব্রিটেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টার সহযোগী হবে।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৮১) অহিংসার পূজারী গান্ধী ব্রিটেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় নির্বিবাদে সহযোগী হয়ে গেলেন। এখন তার অহিংসার কথা মনে পড়ল না। তার এই ভন্ডামি নিয়ে কিন্তু নেতাজী একটি কথাও বলেন নি।

গান্ধী এবং কংগ্রেস নেতৃত্ব এতটাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল ছিল যে- “নভেম্বর ১৯৪০ পর্যন্ত গান্ধী ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রকাশ্যে বলতে থাকেন যে কোন সত্যাগ্রহ বা আইন অমান্যর প্রশ্নই ওঠে না এবং এই ধরনের আন্দোলন শুরু করলে তা তার দেশের ক্ষতি করবে।” (F.Q.I.R., পৃ. ৪০-৪১ ) ২৭ জুলাই, ১৯৪০ অল-ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি পুনায় জানায়— “যদি স্বাধীনতার প্রস্তাব বিবেচনা করা হয় তবে তারা যুদ্ধে ব্রিটেনকে সহযোগিতা করবে।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৮৫) "এরপর ১৯৪০-এর নভেম্বরে গান্ধীজীর পৃষ্ঠপোষকতায় যদিও ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ শুরু হয়েছিল, কিন্তু গান্ধীজী নিজে ঘোষণা করেছিলেন যে তা স্বাধীনতা অর্জনের জন্য গণসংগ্ৰাম নয়। এবং বৃটিশ অফিসাররা বলেছিল যে এটা বৃটিশ সরকারকে সমস্যায় ফেলেনি।” (F.Q.I.R., 80-85) "১৯৪১-এ লড়াই-এর সময় গান্ধী যে নরম নীতি নিয়েছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল যাতে ব্রিটিশদের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানো যায়। কিন্তু তার আশা ভঙ্গ হয়।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৮৭) গান্ধীর আন্দোলন সম্পর্কে নেতাজীর পর্যবেক্ষণ ছিল এটাই। তা সত্বেও গান্ধী বা কংগ্রেসের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কথা তার মনে হয়নি।

"এরপর ১৬ই জানুয়ারী, ১৯৪২-এ ওয়ার্ধায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সাহায্যের প্রস্তাব পাশ করে।” (নে.স. র, খণ্ড-২, পৃ. ৩৮৮)

এমনকি 'ভারত ছাড়' প্রস্তাব যখন কংগ্রেস গ্রহণ করছে তখন কি বলা হচ্ছে? নেতাজী লিখছেন-

"১৪ই জুলাই, ১৯৪২, ওয়াধাতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি বিখ্যাত 'ভারত' ছাড়' প্রস্তাব গ্রহণ করে। ঘোষণা করা হয়। ‘ভারতে বৃটিশ শাসনের অবিলম্বে অবসান চাই’। ঐ প্রস্তাবে বলা হয় 'যদি ভারত মুক্ত হয় তবে গ্রেট বৃটেন এবং মিত্রশক্তির যুদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকে বাধা দেওয়ার কোনও ইচ্ছা' বা মিত্রশক্তির প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতাকে বিপন্ন করার কোন ইচ্ছা” কংগ্রেসের নেই। এবং যদি প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে মিত্রশক্তি ভারতে সশস্ত্র বাহিনীকে মোতায়েন করতে চায় তবে কংগ্রেস তাতে রাজি আছে।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯১-৯২)

এর পরিপ্রেক্ষিতে নেতাজীর বক্তব্য— “মুক্ত ভারত তার সমস্ত সংস্থান নিয়ে বৃটেনের লড়াই এর পাশে দাড়াবে এই আশ্বাস দেখিয়ে দিচ্ছে যে কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গীতে মুক্ত ভারত কখনও আলাদা শান্তি প্রচেষ্টা নেবে না। সুতরাং স্বাধীনতা সংগ্রামের নির্ধারক লড়াইতে নামার সময় ও সে বৃটিশ সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে না।” (নে.স.র, খণ্ড-২, পৃ. ৩৯১ – ১২) তাহলে নেতাজীর রচনা থেকেই আমরা জানতে পারছি কংগ্রেসের তথাকথিত ভারত ছাড় প্রস্তাব আসলে কি ছিল। ৪২-এ কংগ্রেস নেতৃত্বের গ্রেফতারির ফলে দেশজোড়া স্বতঃস্ফূর্ত গণসংগ্রাম দেখা না দিলে এই প্রস্তাব যে অশ্বডিম্ব প্রসব করত তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু প্রশ্নটা কংগ্রেস বা গান্ধী নিয়ে নয়, নেতাজী এরপরেও গান্ধী বা কংগ্রেসের সাথে তার পরিপূর্ণ বিচ্ছেদের কথা ঘোষণা করলেন না কেন? কেন তার হাতে তৈরি ফরওয়ার্ড ব্লককে তিনি কংগ্রেসেরই একটি শাখা হিসেবে ঘোষণা করলেন? যদিও অনেকেরই ধারণা যে ফরওয়ার্ড ব্লক নাকি কংগ্রেস ভেঙ্গে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তা যে সম্পূর্ণ ভুল ধারণা, তা আমরা নেতাজীর বিভিন্ন বক্তব্য থেকে দেখাবো। এবং তৎসহ স্বাধীন ভারতের অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে তার ধ্যানধারণা ও মতামত এবং মার্কসবাদী আন্দোলন সম্পর্কে তার মূল্যায়ন, মূল্যায়ন ফ্যাসীবাদ সম্পর্কে এবং কেন তিনি ফ্যাসীবাদী জোটের এক শরিক জাপানের সাথে হাত মেলালেন এবং জাপানের সাথে তার সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনায় ঢুকবো।

নেতাজীর দৃষ্টিভঙ্গী ভারতীয় বুর্জোয়াদেরই দৃষ্টিভঙ্গী

নেতাজীর দৃষ্টিভঙ্গী কিন্তু একেবারেই ভারতীয় বুর্জোয়াদের দৃষ্টিভঙ্গী। তিনি জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ছিলেন এবং পরবর্তীকালে কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে তিনি সরে গেলেও বা ওয়ার্কিং কমিটি থেকে তাকে বাদ দেওয়া হলেও এবং তিনি কংগ্রেসকে 'সঠিক' পথে চালনা করবার জন্য ফরওয়ার্ড ব্লক তৈরি করলেও ভারতীয় বুর্জোয়াদের সংগঠন কংগ্রেস সম্পর্কে তিনি কোন বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করেন নি। তার 'সমাজতন্ত্র' সম্পর্কিত বোলচাল বা 'সশস্ত্র সংগ্রাম' নিয়ে তার হাকডাকে অনেক তথাকথিত বামপন্থী তাকে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী বলে ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি আদপেই তা ছিলেন না।

প্রথমতঃ তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী। এবং যেহেতু মার্কসবাদীরা জাতীয়তাবাদকে বিরোধিতা করে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদকে উর্দ্ধে তুলে ধরে এবং আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী সমাজ গঠনের লক্ষ্যকে কর্তব্য হিসেবে তুলে ধরে তাই তিনি মার্কসবাদকে বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিকতাবাদকে বা আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী সমাজ গঠনের লক্ষ্যকে তার বিরোধিতা করার কারণ কি, তার যুক্তিসঙ্গত কোন ব্যাখ্যা তিনি হাজির করতে পারেন নি। শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদের সাথে তো কোন দেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের কোন বিরোধ নেই, বরঞ্চ তা সাম্যবাদের লড়াইকে সাহায্যই করে। সুতরাং কমিউনিস্টরা জাতীয়তাবাদের বিরোধী বলে তার রুষ্ট হওয়ার কোন যুক্তিসংগত কারণ আমরা দেখি না। আসলে কারণটা অন্যত্র। ভারতীয় বুর্জোয়ারা তাদের সংকীর্ণ শ্রেণীগত শোষণের স্বার্থে একদিকে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদকে বিরোধিতা করে, অন্যদিকে সংকীর্ণ জাতীয়তার গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ থেকে তাদের শ্রেণী শোষণ বজায় রাখতে চায়। সেই কারণেই ‘জাতীয়তাবাদ' নিয়ে তারা হইচই বাধায় এবং তাকে গোটা জাতির মত বলে প্রচার করে। নেতাজী যেহেতু ভারতীয় বুর্জোয়ার প্রতিনিধি ছিলেন তাই তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী এবং কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ছিলেন খড়গহস্ত। তার ভাষাতেই শুনুন –

“জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কমিউনিজমের আক্রমণ শুধুমাত্র ভুলই নয়, তা বিদেশী শাসকদের সাহায্য করে।” (নে.স.র, খণ্ড-৫, পৃ. ২৪৫ )

“কোন রূপেই জাতীয়তাবাদের প্রতি আজ কমিউনিজমের সহানুভূতি নেই। কমিউনিজম এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্কের লেনিনের তত্ত্ব চীন বিপ্লবের ব্যর্থতার পর বিদায় নিয়েছে।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫০-৫৩ )

জাতীয়তাবাদ যেমন বুর্জোয়াদের সংকীর্ণ জাতীয় রাষ্ট্রগঠনের স্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করে, তেমনই তারা শ্রেণী সংঘর্ষকে পরিহার করতে চায়। সমাজে শ্রেণীগত অসাম্য থাকবে, শোষণ থাকবে, কিন্তু শ্রেণীগত সংঘর্ষ থাকবে না। তাকে যেন তেন প্রকারেণ পরিহার করতে হবে, এটাই হচ্ছে বুর্জোয়াদের রাজনীতি। ভারতবর্ষে গান্ধী ছিলেন এই শ্রেণীঐক্যের মূল প্রবক্তা।

নেতাজীর ভাষায় শোনা যাক—

“গান্ধী হিন্দু-মুসলিম, উঁচু জাত-নীচু জাত, পুঁজিপতি-শ্রমিক, জমিদার কৃষকের ঐক্য চাইতেন।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩২৯) “আর বলাই বাহুল্য, নেতাজী ছিলেন এব্যাপারে গান্ধীর সুযোগ্য অনুগামী। ভারতীয় বুর্জোয়ারা শ্রেণী-সংগ্রাম, শ্রেণী সংঘর্ষ-কে যমের মত পরিহার করতে চাইত। নেতাজী তাদের মনোভাবকেই সুন্দর ভাবে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন –

“শ্রেণী-সংঘর্ষ ভারতে একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। যদি মুক্ত ভারতের সরকার জনগণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করে তবে শ্রেণী সংঘর্ষের দরকার নেই। রাষ্ট্রকে জনতার ভৃত্য বানিয়ে আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারি।" (F.Q.I.R., পৃ. ৮৬-৮৭)

কংগ্রেসকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন “কংগ্রেস যদি জনগণকে অবহেলা করে তবে শ্রেণী সংগ্রাম আত্মপ্রকাশ করবে। শ্রেণীযুদ্ধ করাটা বিপর্যয়কর হবে। কিছু শ্রমিক নেতা কংগ্রেসকে এবং কংগ্রেসের কর্মসূচীকে ছোট করতে চায়, তা ঠিক নয়।” (নে.স.র, খণ্ড-৫, পৃ. ২৪৬)

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে ভারতীয় বুর্জোয়াদের সচেতন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি জাতীয়তাবাদকে উর্দ্ধে তুলে ধরেছেন এবং শ্রেণী সংগ্রাম বা শ্রেণী সংঘর্ষকে পরিহার করতে চেয়েছেন। তিনি যে ভারতীয় বুর্জোয়াদের যোগ্য প্রতিনিধি ছিলেন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। নেতাজীর সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত বোলচালে অনেকেই একসময়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং এখনো হন। যেন সমাজতন্ত্রের কথা বললেই কেউ সত্যিকারের সমাজতন্ত্রী হয়ে যান। জার্মান ফ্যাসিবাদী নেতা হিটলার সমাজতন্ত্রের বুকনি দিতেন, আবার আমাদের দেশে ইন্দিরা গান্ধী সমাজতন্ত্রের কথা বলে স্ট্যালিনবাদীদের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। অথচ তারা উভয়েই তাদের জাতীয় পুঁজিবাদের সেবা করেছেন। এর পরেও অনেকের ঘোর কাটতে চায় না। সুতরাং সমাজতন্ত্র সম্পর্কে নেতাজীর বোলচালের স্বরূপ পরীক্ষা করা যাক।

নেতাজী খুব পরিষ্কার ভাবেই মনে করতেন যে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে সমাজতন্ত্রের করণীয় কিছু নেই। কেননা তখন একটাই কর্তব্য-ব্রিটিশ খেদানো। ভারতীয় বুর্জোয়া বা জমিদারদের "খেদানোর ব্যাপারে অবশ্য নেতাজী নীরবই ছিলেন। যেহেতু শ্রেণী সংগ্রাম বা শ্রেণী সংঘর্ষকে পরিহার করতে হবে তাই তিনি বলেছিলেন—'আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জনতার স্বার্থের সাথে একাত্ম, সুতরাং কমিউনিস্ট পার্টির মত আলাদা পার্টির দরকার নেই।” (F.Q.I.R., পৃ. ৭৯-৮২) অর্থাৎ ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াই-এ শুধু কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ এবং হিন্দু মহাসভা থাকবে, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজন নেই। কেননা ভারতীয় বুর্জোয়া আর জমিদাররা স্বাধীন ভারতে বহাল তবিয়তে থাকবে।

তার ভাষায় প্রকৃত বামপন্থা কি?

"বর্তমান ভারতবর্ষে প্রকৃত বামপন্থা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, সেই হচ্ছে প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী যে সত্যিকারের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে (গান্ধীর মত নয়)। স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রকৃত ৰামপন্থা হচ্ছে সমাজতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে জাতীয় জীবনের পুনর্গঠন করতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের আগে সমাজতন্ত্র হচ্ছে একেবারেই অপরিণত”। (F.QIR., পৃ. ৫৫)

নেতাজীর এইসব কথাবার্তা আপাতদৃষ্টিতে মনোমুগ্ধকর মনে হতে পারে। বিশেষতঃ স্ট্যালিনবাদীদের তো তা খুবই পছন্দ হবে। কিন্তু তিনি যেভাবে বিষয়টাকে হাজির করেছিলেন তা কি সত্যি সত্যিই বাস্তবতাকে তুলে ধরতে বা তাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম ছিল? জাতীয় কংগ্রেস কি স্বাধীনতার জন্য সত্যিকারের লড়াই লড়তে আদৌ প্রস্তুত ছিল? নেতাজী তো নিজেই গান্ধীজীকে এ ব্যাপারে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের তথা গান্ধীর এইরকম ভূমিকার কারণ কি ছিল? আসলে সাম্রাজ্যবাদের যুগে উপনিবেশ বা আধা-উপনিবেশের বুর্জোয়ারা চরিত্রগতভাবে হয় চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল। শ্রমিক-কৃষকের বিপ্লবী আন্দোলনের ভয়ে তারা সাম্রাজ্যবাদের সাথে সমঝোতা করে নেয়। সাম্রাজ্যবাদ হয় তাদের বন্ধু, তাদের প্রভু। কংগ্রেস এবং গান্ধীর ভূমিকা সেটাই প্রমাণ করে। সুতরাং সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জন করতে গেলে কর্তব্য হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের সাথে তাদের পেটোয়া জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীকেও উচ্ছেদ করা। আর তাই উপনিবেশগুলিতে জাতীয় বুর্জোয়া এবং তাদের সাধী জমিদারদের বিরুদ্ধে শ্রেণী সংগ্রামকে তীব্র করেই জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সাথে সমাজতন্ত্রের লড়াইকে সংযুক্ত করে তবেই সত্যিকারের মুক্তি সম্ভব। অর্থাৎ উপনিবেশগুলিতে কর্তব্য ছিল নিরন্তর বিপ্লব। জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম যেখানে সমাজতন্ত্রের লড়াই-এর সাথে সংযুক্ত হবে। তাই শ্রেণী সংগ্রামকে এড়িয়ে যাওয়া নয় বরঞ্চ তাকে তীব্র করেই সত্যিকারের মুক্তি অর্জন সম্ভব ছিল। নেতাজী গান্ধীজীকে সমালোচনা করলেও শ্রেণী সংগ্রাম এড়ানোর ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন ফারাক ছিল না। অর্থাৎ বিপ্লবী বুলি ঝাড়লেও গান্ধীর সাথে এ ব্যাপারে তার ফারাক ছিল না। তিনি আসলে জাতীয় স্বাধীনতা বা সমাজতন্ত্র কোনটাই অর্জন করতে চাননি।

সমাজতন্ত্র সম্পর্কে নেতাজী অনেক কথা বলেছেন যেগুলো প্রমাণ করে যে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার উপলব্ধি খুবই অস্বচ্ছ ছিল, এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সমাজতন্ত্রের বিরোধ হাজির করে সমাজতন্ত্রকে একটা দানবীর রূপ তিনি দিয়েছিলেন। আসলে ফ্যাসীবাদের প্রতি তার একটা আকর্ষণ বরাবরই ছিল। তার সঙ্গে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়ার স্বৈরাচারী আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার জগাখিচুড়ি পাকিয়ে সমাজতন্ত্রের যে ধারণা তিনি হাজির করেছিলেন তা হাস্যকর তো বটেই, বর্জনীয়ও। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে নেতাজীর ধারণাকে বুঝে আগে ফ্যাসীবাদ সম্পর্কে তিনি কি মনে করতেন তা জানা থাকলে আমরা বুঝব তিনি আসলে কি ধরনের সমাজতন্ত্র চেয়েছিলেন এবং কিভাবে তা বুর্জোয়াশ্রেণীকেই সেবা করত। তিনি বলছেন –

“আমরা ফ্যাসীবাদ ও কমিউনিজমের ভালো দিকগুলির সমন্বয় করতে পারি।" (F.Q.IR., পৃ. ৮৫-৮৬)

“আমাদের রাজনৈতিক দর্শন হবে জাতীয় সমাজবাদ এবং কমিউনিজমের সমন্বয়।” (F.Q.I.R., পৃ. ৮৭) কিন্তু ফ্যাসীবাদ ও কমিউনিজমের ভালো দিকগুলি কি কি আছে যা তিনি সমন্বয় করতে চান?

তিনি বলছেন :-

“ফ্যাসীবাদ ও কমিউনিজমের সাধারণ দিক :-

  1. উভয়েই ব্যক্তির উপর রাষ্ট্রের আধিপত্যে বিশ্বাস করে।
  2. উভয়েই পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের বিরোধিতা করে।
  3. উভয়েই পার্টিতান্ত্রিক শাসন বিশ্বাস করে।
  4. উভয়েই পার্টি একনায়কত্বে এবং বিরোধী সংখ্যালঘুকে নির্মম দমনে বিশ্বাস করে।
  5. উভয়েই দেশের পরিকল্পিত শিল্পীয় পুনর্গঠনে বিশ্বাস করে।

নতুন সমন্বয়ের এগুলোই হবে ভিত্তি। এই সমন্বয়কে লেখক বলেছেন 'সাম্যবাদ'—একটি ভারতীয় শব্দ, আক্ষরিকভাবে যার মানে হচ্ছে 'সমন্বয় বা সমতার তত্ত্ব'। এটা ভারতের কর্তব্য এই সমন্বয় তৈরি করা।” (নে.স. র, খণ্ড-২, ৩৫০-৫৩ )

প্রকৃত কমিউনিজমের সাথে এর সম্পর্ক কি? কোন সম্পর্কই নেই। প্রকৃত কমিউনিজম ব্যক্তির উপর রাষ্ট্রের আধিপত্যে বিশ্বাস করে না, তা ব্যক্তির সর্বাঙ্গীন মুক্তির জন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহারের কথা ভাবে। পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রকে কমিউনিজম বিরোধিতা করে বটে, কিন্তু তার থেকেও হাজার গুণে গণতান্ত্রিক সোভিয়েত ব্যবস্থা সে প্রতিষ্ঠা করে। যদিও শেষ পর্যন্ত সমস্ত ধরনের রাষ্ট্র, পার্টি, রাজনীতির সে অবলুপ্তি চায় এবং গোটা বিশ্বজুড়ে মানবজাতির স্বনিয়ন্ত্রণই তার লক্ষ্য।

অর্থাৎ ফ্যাসীবাদ কমিউনিজমের সাধারণ দিক নিয়ে সমন্বয় তৈরি করতে হবে এবং এটাই ভারতের কর্তব্য। তাদের স্বাধীনতার পর এপথেই ভারতকে এগোতে হবে। তিনি পরিষ্কার বলছেন—

“যদি আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো হয় সমাজতান্ত্রিক চরিত্রের তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলবে না, একটা স্বৈরাচারী রাষ্ট্র চাই।" (F.Q.I.R., পৃ. ৭১-৮২)

আর তিনি তো আগেই বলে দিয়েছেন—“স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রকৃত বামপন্থা হচ্ছে সমাজতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে জাতীয় জীবনের পুনর্গঠন করতে হবে।" (F.Q.IR., পৃ. ৫৫)

অর্থাৎ তার প্রস্তাবিত সমাজতন্ত্রে কোন গণতন্ত্র থাকবে না। রাষ্ট্র হবে স্বৈরাচারী। এটাকেই তিনি সমাজতন্ত্র বলে চালাচ্ছেন। এ ব্যাপারে ফ্যাসীবাদ ও কমিউনিজমের সাধারণ দিক বলে তিনি যা যা বলেছেন তা ফ্যাসীবাদের লক্ষণ নিঃসন্দেহে, এমনকি স্ট্যালিনবাদী স্বৈরাচারী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথেও তা মেলে, কিন্তু প্রকৃত কমিউনিজমের সাথে এর সম্পর্ক কি? কোন সম্পর্কই নেই। প্রকৃত কমিউনিজম ব্যক্তির উপর রাষ্ট্রের আধিপত্যে বিশ্বাস করে না, তা ব্যক্তির সর্বাঙ্গীন মুক্তির জন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহারের কথা ভাবে। পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রকে কমিউনিজম বিরোধিতা করে বটে, কিন্তু তার থেকেও হাজার গুণে গণতান্ত্রিক সোভিয়েত ব্যবস্থা সে প্রতিষ্ঠা করে। যদিও শেষ পর্যন্ত সমস্ত ধরনের রাষ্ট্র, পার্টি, রাজনীতির সে অবলুপ্তি চায় এবং গোটা বিশ্বজুড়ে মানবজাতির স্বনিয়ন্ত্রণই তার লক্ষ্য। আর সমাজতান্ত্রিক সমাজে পার্টিতান্ত্রিক শাসনে কমিউনিজম বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বে, সোভিয়েত শাসনে। আর পার্টি একনায়কত্ব এবং বিরোধী সংখ্যালঘুদের নির্মম দমনে কমিউনিজম বিশ্বাস করে না। যদিও বুর্জোয়াদের নির্মম দমনে সে বিশ্বাস করে, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণী ও মেহনতী মানুষের সংখ্যালঘু বিরোধীদের গণতন্ত্রেই কমিউনিজম বিশ্বাস করে। সুতরাং নেতাজী কমিউনিজম সম্পর্কে যা বলেছেন হয় স্ট্যালিনবাদী শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তা বলেছেন, আর নয়তো জেনে বুঝে কমিউনিজম সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার তিনি করেছেন। তবে কমিউনিজম সম্পর্কে তার আদৌ কোন ধারণা ছিল কিনা তা যথেষ্ট সন্দেহের বিষয়।

নেতাজী বরাবরই কমিউনিজমের বিরোধী ছিলেন তা আমরা আগেই দেখিয়েছি। ভারতে (বা এমনকি চীনেও ) কমিউনিস্ট পার্টির কোন দরকার নেই বলে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন। ভারতের ব্যাপারে তার বক্তব্য আমরা আগেই দেখেছি, চীনের প্রসঙ্গে তিনি কি বলেছিলেন তা দেখা যাক —

“বর্তমান চীন দেখা যাচ্ছে কুয়োমিন্টাং এবং কমিউনিস্ট পার্টি এই দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি বুঝি না কেন এটা ঘটবে অথবা কেন, যদি চীনা জনগণের স্বার্থ কুয়োমিন্টাং-এর হৃদয়ে থাকে, তবে বিদেশী প্রভাবে একটা স্বতন্ত্র কমিউনিটি পার্টি গঠনের কোন প্রয়োজন আছে কি?” (F.Q.I.R., পৃ. ৭৯-৮২) ইতিহাসের পরিহাস হচ্ছে, যে চীনের কুয়োমিন্টাংকে তিনি মনে করতেন চীনের জনগণের হৃদয়ের ধারক, তারাই ১৯৪২ সালে যে কাণ্ড ঘটিয়েছিল তাতে নেতাজী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কেননা তাদের সেই কাজ তার তৎকালীন চিন্তার বিরুদ্ধেই গিয়েছিল। তার কথাতেই সেই ঘটনা শোনা যাক-

"তার কিছু পরেই, ফেব্রুয়ারি ১৯৪২-এ ব্রিটিশ সরকারের অনুরোধে মার্শাল চিয়াং কাই শেক ভারত ভ্রমণে আসেন, তার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের সাথে একটা সমঝোতায় আসার জন্য কংগ্রেসের নেতাদের রাজি করান।” (নে.স. র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৮৮) তাহলে কমিউনিজমকে বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালালদের চীনের জনগণের হাদয়ের ধারক বলে অভিহিত করেছিলেন তাতো তার কথাতেই স্পষ্ট। আসলে শ্রেণী স্বার্থ এভাবেই কোন ব্যক্তিকে সাম্রাজ্যবাদের কোলে ঠেলে দেয়।

তিনি যে কমিউনিজমের বিরোধিতা করেছিলেন তার আরও দুটি কারণ তিনি জানিয়েছিলেন। তার বক্তব্য ছিল যে কমিউনিজমের নিরীশ্বরবাদী ব্যাখ্যা এবং ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা ভারতবর্ষের মানুষ গ্রহণ করবে না। কেননা তার মতে ভারতের মানুষের ধর্মবিদ্বেষ নেই। অর্থাৎ তিনি যে ধর্মে এবং ইতিহাসের ভাববাদী ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন এর মাধ্যমে তিনি তা জানিয়ে দিয়েছিলেন। যে কোন বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি এর মাধ্যমে বুঝে নিন তারা নেতাজীকে কি চোখে দেখবেন। আমরা মনে করি আসলে বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে জনগণকে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে তারা ধর্মকে যে ব্যবহার করতে চায় তাতে নেতাজী সহমত ছিলেন। আর ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বুর্জোয়ারা গ্রহণ করে কি করে? তাহলে তো নিজেদের অস্তিত্বকেই তাদের বিলুপ্ত করে দিতে হয়। তার থেকে তাদের কাছে অনেক বেশি কাম্য হচ্ছে মানবসমাজকেই বিলুপ্ত করে দেওয়া। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ যারা বাধিয়েছে তাদের সম্পর্কে আমাদের এই ধারণা কি খুব ভুল কিছু?

কমিউনিজমকে বিরোধিতা করে নেতাজী যে 'সমাজতন্ত্র' চেয়েছিলেন তা অশ্বডিম্ব ছাড়া আর কিছুই প্রসব করত না। যেমন করেছে জওহরলাল নেহরুর তথাকথিত 'সমাজতান্ত্রিক পথ। সমাজতান্ত্রিক বুকনির আড়ালে পুঁজিবাদ বিকাশের কাজই তা করেছিল, অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদের যুগে যতটুকু করা সম্ভব।

সমাজতন্ত্র প্রসঙ্গে নেতাজী অবশ্য অনেক বৈপ্লবিক কথাবার্তা বলেছিলেন। সমাজতন্ত্র মানে যে উৎপাদন এবং বন্টনের সামাজিকীকরণ তা তিনি বলেছিলেন (ফরওয়ার্ড ব্লকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য)। এমনকি তিনি একথাও বলেছিলেন- "মুক্ত ভারত পুঁজিপতি, জমিদার এবং জাতগুলির ভারত হবে না। মুক্ত ভারত হবে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক গণতন্ত্র”। (F.Q.L.R., পৃ. ২৯) কিন্তু মুক্ত ভারত কিভাবে পুঁজিপতি ও জমিদার মুক্ত হবে? তিনি তো আবার শ্রেণী-সংঘর্ষ, শ্রেণী-সংগ্রামের বিরোধী। তাহলে পুঁজিপতি, জমিদার মুক্ত ভারত তৈরি হবে কি কিরে? আর তিনি কি সত্যিই সেটা চেয়েছিলেন? নাহলে তিনি কি করে বলছেন-"শ্রেণী সংঘর্ষ ভারতে একেবারেই প্রয়োজনীয়। যদি মুক্ত ভারতের সরকার জনগণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করে, তবে শ্রেণী সংঘর্ষের দরকার নেই। রাষ্ট্রকে জনগণের ভূতা বানিয়ে আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারি"। (F.QI.R., পৃ. ৮৬-৮৭) কিন্তু মুক্ত ভারতের সরকার কি করে জনগণের হাতিয়ার হবে। তাদেরকে কি করেই বা জনগণের ভৃত্য বানানো যাবে? অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী পুঁজিপতি-জমিদাররা নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে কি আঙ্গুল চুসবে। তাদেরকে উচ্ছেদ না করলে, সে উপনিবেশিক রাষ্ট্র তার আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রসহ সম্পূর্ণভাবে জনবিরোধী এবং জনগণ-বিদ্বেষী, তাদেরকে উচ্ছেদ না করলে কি করে সেই রাষ্ট্র জনগণের ভৃত্য বনে যাবে? এসব আজগুবি চিন্তায় নেতাজী বিশ্বাস রাখতে পারেন, কিন্তু আমরা এসবে বিশ্বাস করি না। ইতিহাসের শিক্ষা আমাদেরকে দেখায় আজ পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ায় বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে শ্রমিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত আর কোন রাষ্ট্র জনগণের ভৃত্য' হয়নি। সুতরাং নেতাজীর ঐসব আজগুবি কথায় ভবী ভুলবে না।

তবে নেতাজী সত্যি সত্যিই পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন বলে আমাদের মনে হয় না। ১৯৩৮ সালের ২রা অক্টোবর দিল্লীতে শিল্পমন্ত্রীদের সম্মেলনে তার সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন- "শিল্পকে সাধারণভাবে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায় ভারি, মাঝারি এবং কুটির শিল্প। বর্তমান সময়ে দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভারি শিল্পের অনেক বেশি গুরুত্ব আছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদন্ডকে তৈরি করে। দুর্ভাগ্যবশতঃ কেন্দ্রে ক্ষমতাদখল না করা পর্যন্ত এবং আমাদের আর্থিক নীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই ক্ষেত্রে আমরা খুব বেশি উন্নতি করতে পারি না। সরকারি সহযোগিতা এবং সাহায্যে ব্যবসায়ী নেতারা মাঝারি শিল্পগুলি শুরু করতে পারে। কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে আমি ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি যে তাদের উন্নতির সাথে বৃহৎ শিল্পের উন্নতির কোন দ্বন্দ্ব থাকার প্রয়োজন নেই।” (নে.স.র, খণ্ড-৯, পৃ. ৫২) তার এই বক্তৃতা থেকেই পরিষ্কার যে মাঝারি শিল্পগুলির মালিকদের সরকারী সাহায্য দেওয়ার কথা তিনি ভাবতেন, অথচ তিনিই আবার বলছেন যে স্বাধীন ভারতে পুঁজিপতি থাকবে না। তার কোন কথাটা সত্যি? আসলে নেতাজী এখানে যা বলেছেন স্বাধীন ভারতে জওহরলাল নেহরণা নেতৃত্বে ঠিক সেটাই হয়েছিল। যেহেতু ভারতীয় পুঁজিপতিরা ছিল অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল তাই সরকারী উদ্যোগে মৌলিক ভারি শিল্পগুলি গড়ে তোলা হয়েছিল এবং অন্যান্য নানারকমভাবে পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলিকে সাহায্য করা হয়েছিল (স্বল্পমূল্যে কাঁচামাল ও পুঁজির যোগান দিয়ে)। সুতরাং এ ব্যাপারে যে নেতাজী ও নেহরুর কোন ফারাক ছিল না তা বলাই বাহুল্য।

নেতাজী আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা শিল্পায়ন প্রসঙ্গে বলেছেন যেখান থেকে তার পুঁজিবাদী মানসিকতা প্রকাশ পেয়ে গেছে। তিনি বলেছিলেন- "বিদেশী শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতা করতে গেলে আমরা শিল্পায়ন করতে বাধ্য।" (নে.স.র, খণ্ড-৯, ৪৭)

আমরা মনে করি আসলে বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে জনগণকে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে তারা ধর্মকে যে ব্যবহার করতে চায় তাতে নেতাজী সহমত ছিলেন। আর ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বুর্জোয়ারা গ্রহণ করে কি করে? তাহলে তো নিজেদের অস্তিত্বকেই তাদের বিলুপ্ত করে দিতে হয়। তার থেকে তাদের কাছে অনেক বেশি কাম্য হচ্ছে মানবসমাজকেই বিলুপ্ত করে দেওয়া। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ যারা বাধিয়েছে তাদের সম্পর্কে আমাদের এই ধারণা কি খুব ভুল কিছু?

আমরা যদি সমাজতন্ত্রের জন্য শিল্পায়ন করি তবে বিদেশী শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতার কথা আসছে কেন? তাদের সাথে প্রতিযোগিতার কি প্রয়োজন আমাদের তখন থাকবে? আসলে সত্যিকারের সমাজতন্ত্রে বিদেশী শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতার কোন প্রয়োজন থাকে না। প্রয়োজনটা আসলে থাকে পুঁজিপতিদের। পুঁজিবাদের ধর্মই হচ্ছে এটা। সে দেশের ভিতরে দেশী পুঁজিপতিদের সাথেও প্রতিযোগিতা করে, আবার বিদেশীদের সাথেও প্রতিযোগিতা করে। কেননা তার উদ্দেশ্য হচ্ছে সকলকে হটিয়ে দিয়ে দেশের এবং গোটা বিশ্বের বাজার দখল করা এবং সর্বোচ্চ মুনাফা করা। আর তা করতে গিয়েই দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীতে সঙ্ঘটিত হয়েছে। কিন্তু সমাজতন্ত্রের তো এসব প্রয়োজন নেই। তার লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের ... জীবনের মনোন্নয়ন করা। সে বিদেশী শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতা করতে যাবে কেন? নেতাজীর এই কথার মাধ্যমে আসলে ভারতীয় পুঁজিপতিদের মনের কথা প্রকাশ হয়ে গেছে। আজকের সাম্রাজ্যবাদের যুগে তাদের সেই কোমরের জোর কখনই হবে না। যদিও তারা সেই দিবাস্বপ্ন দেখেই চলেছে। সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ সহযোগী হিসেবে তারা যে রকম ছিল, সেই জীবনই তাদের বরাবর কাটিয়ে যেতে হবে।

নেতাজী ফ্যাসিবাদী শক্তির সাথে হাত মেলালেন কেন?

বাঙ্গালীদের মধ্যে তো বটেই, গোটা ভারতেই নেতাজী একটা বিতর্কিত চরিত্র। তিনি কংগ্রেসের নেতা ছিলেন, আবার ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে সভাপতি হবার পর গান্ধী গোষ্ঠীর বিরোধিতার পর তাকে সভাপতি পদ থেকে সরে যেতে হয়। এরপর তিনি ফরওয়ার্ড ব্লক তৈরি করেন। অনেকেরই ধারণা যে তিনি বোধ হয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন এবং ফরওয়ার্ড ব্লক একটা স্বতন্ত্র সংগঠন ছিল, ব্যাপারটা আদপেই তা ছিল না। আবার তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলেছেন এবং ১৯৪১ সাল দেশত্যাগ করে শেষ পর্যন্ত জাপানে তৈরি হওয়া আজাদ হিন্দ বাহিনীর দায়িত্ব নেন এবং জাপানের সহযোগী হিসেবে বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালান। বলাই বাহুল্য, জাপানের সহযোগিতায় ভারতের স্বাধীনতাই ছিল তার ঘোষিত উদ্দেশ্য। অনেকে নেতাজীর এসব কার্যকলাপের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পান না বা বিভ্রান্ত হন। অনেকে আবার নেতাজীর মধ্যে তাদের আকাঙ্খিত বিপ্লবী নেতার ছায়া খুঁজে পান এবং তার অনুরাগী ভক্তে পরিণত হন। আমরা অবশ্য নেতাজীর ভক্তও নই বা তার কার্যকলাপ ছন্নছাড়া ছিল বলে মনে করি না, বরঞ্চ তার এইসব কার্যকলাপের মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা বা সঙ্গতি আছে বলেই আমাদের ধারণা। তার এইসব কার্যকলাপের মধ্যে ধারাবাহিকতা বা সঙ্গতিটাই আমরা এবার তুলে ধরার চেষ্টা করব।

আমরা আগেই বলেছি সাম্রাজ্যবাদের যুগে উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশগুলির বা পশ্চাদপদ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির বুর্জোয়ারা চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল। তারা সাম্রাজ্যবাদের থেকেও বেশি ভয় পেত দেশের শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষকে। তারা যেহেতু একটা স্বতন্ত্র দেশীয় বুর্জোয়া শ্ৰেণী, সুতরাং সাম্রাজ্যবাদের থেকে স্বাধীনতা তারা চাইত বটে, কিন্তু কখনোই বিপ্লবাত্মক পথে নয়। কেননা মুষ্টিমেয় কটা পুঁজিপতি আর জমিদার তো আর শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদীদের উচ্ছেদ করতে পারবে না, সুতরাং বিপ্লবের রাস্তায় যেতে গেলে শ্রমিক-কৃষক মেহনতী মানুষজনকে সশস্ত্র করতে হবে, তাদের সঙ্গে নিয়ে বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে। আর বিপদটা সেখানেই। সেই অস্ত্র তারা দেশীয় বুর্জোয়া আর জমিদারদের দিকে ঘুরিয়ে ধরতে পারে। রুশ বিপ্লব সেই শিক্ষাই দেয়। সুতরাং তাদের নিয়ে বিপ্লবের আশা বুর্জোয়াদের ছাড়তে হল। পড়ে রইল আবেদন-নিবেদন আর নির্বিষ কিছু আন্দোলন, যা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় বুর্জোয়াদের সংগঠন কংগ্রেস করে যেত। যা আবার এক সময় নেতাজীর পছন্দ হল না। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলতে শুরু করলেন। (যদিও তিনি শ্রেণী সংঘর্ষ বা শ্রেণী সংগ্রামের বিরোধী ছিলেন।) তা হলে তো সমগ্র ভারতীয় জনতাকে সশস্ত্র করে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের উচ্ছেদ করতে হয়। কিন্তু তার কি বিপদ তা তো আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। বুর্জোয়াদের এক নেতা হিসেবে নেতাজী তো সে ব্যাপারে অবশ্যই সচেতন ছিলেন। সুতরাং বিপ্লব 'সশস্ত্রও' হবে, আবার তাতে জনতার অংশগ্রহণ ও থাকবে না। কিভাবে তা হতে পারে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সেই সুযোগ নেতাজীর সামনে খুলে দিয়েছিল। জাপানে ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে রাসবিহারী বসু যে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন করেছিলেন, তার দায়িত্ব নিয়ে নেতাজী জাপানের সহযোগী হয়ে বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেন। অর্থাৎ বিপ্লব 'সশস্ত্রও' হল, আবার ভারতীয় জনতাকে সশস্ত্র করার দরকারও হল না। এভাবে এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা করেছিলেন নেতাজী। আমরা তার ধারাবাহিকতায় একে তুলে ধরব।

ফরওয়ার্ড ব্লকের বিষয়টা প্রথমেই এক্ষেত্রে পরিষ্কার করে নেওয়ার দরকার আছে। অনেকের ধারণা গান্ধী গোষ্ঠীর সাথে নেতাজীর চূড়ান্ত সংঘাতের পর নেতাজী বোধ হয় বিপ্লব সংঘটনের উদ্দেশ্যে ফরওয়ার্ড ব্লক তৈরি করেছিলেন। এ ধারণা একেবারেই ভুল ১৯৪২ সালেও নেতাজী মনে করতেন ফরওয়ার্ড ব্লক কংগ্রেসেরই একটি শাখা। এবং কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে কোন কিছু করার ভাবনা তার ছিল না।

১৯৩৯-এর মে মাসে নেতাজী ফরওয়ার্ড ব্লক তৈরির সময় তার উদ্দেশ্য ছিল :

  1. সাংবিধানিকতার দিকে কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান সরণকে লড়া,
  2. কংগ্রেসকে আবার বিপ্লবী সংগঠনে পরিণত করা,
  3. তাকে আবার জাতীয় সংগ্রামের পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসা,
  4. আসন্ন যুদ্ধ সংকটের জন্য দেশকে প্রস্তুত করা। (FQI.R., পৃ. ৫৪)

সুতরাং গান্ধীর যে কংগ্রেসকে নেতাজী বিপ্লবী মনে করতেন, যা কিনা বিপ্লবের পথ থেকে সরে গেছিল বলে নেতাজী ১৯৩৯-এ ভাবতে শুরু করলেন, তাকে আবার বিপ্লবী সংগঠনে পরিণত করাটাই ছিল নেতাজীর তথা ফরওয়ার্ড ব্লকের উদ্দেশ্য। আবার ফরওয়ার্ড ব্লকের সাফল্য হিসেবে তিনি দাবী করেছিলেন:-

  1. কংগ্রেসকে জড়তা ও মৃত্যু থেকে বাঁচিয়েছে।
  2. কংগ্রেসকে তা আবার আন্দোলনের পথে নামিয়েছে (যদিও যথেষ্ট নয়)। ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রচার, লড়াই, ১৯৪০-এর মার্চ রামগড়ে আপোষ-বিরোধী সম্মেলনের ফলে গান্ধী ব্যক্তি সত্যাগ্রহ শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন। (F.Q.I.R., পৃ. ৫৯ - ৬০ )

সুতরাং কংগ্রেসকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরঞ্চ তাকে আবার সক্রিয় করে তোলাটাই ছিল নেতাজীর ফরওয়ার্ড ব্লক গঠনের উদ্দেশ্য। কাজেই যখন ১৯৪১ সালে কংগ্রেস কিছুটা আন্দোলন শুরু করল, নেতাজী আনন্দিত হয়ে বলেছিলেন "ফব আনন্দিত ছিল যে তারা গান্ধীকে আন্দোলনে নামাতে পেরেছে। কংগ্রেসের দুই শাখাই (গান্ধী এবং ফব) যুদ্ধ-বিরোধী এবং ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াই লড়ছিল। ভারতের স্বাধীনতার জন্য বিরাট পরিকল্পনার এটাই উপযুক্ত সময় ছিল।” (নে.স.র., খণ্ড-২, পৃ. ৩৮৬) ভারতীয় জনগণের আন্দোলনের চেহারা দেখে হয়ে তিনি বলেছিলেন- “ভারতের জনগণ নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ থেকে সক্রিয় প্রতিরোধের দিকে যাচ্ছে। এরপর শেষ পর্যায় আসবে যখন সক্রিয় প্রতিরোধের একটা সশস্ত্র বিপ্লবে রূপান্তরিত হবে। তখনই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটবে।" (নে.স.র., খণ্ড ২, পৃ. ৩৬০ )

যে কেউই এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে ভাবতে পারেন যে সক্রিয় প্রতিরোধের এই পর্যায়ে তাকে সশস্ত্র বিপ্লবের দিকে পরিচালিত করবার উদ্যোগ না নিয়ে নেতাজী ভারত ত্যাগ করলেন কেন?

এর উত্তরে আবারো আমরা বলব-এটাই আজকের দিনের বুর্জোয়াদের চরিত্র। সশস্ত্র জনগণকে তারা ভয় পায় সবচেয়ে বেশি। ব্রিটিশকে তাড়াতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই না হটে যেতে হয়। তাই ঐ রাস্তাতে পাই মাড়ালেন না তিনি। দেশত্যাগ করে ফ্যাসীবাদী শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে তিনি ভারতের 'স্বাধীনতা' অর্জনের চেষ্টা শুরু করলেন। কিন্তু এটা কি দী ফরওয়ার্ড ব্লক তৈরির সময় সত্যিকারের কোন বিপ্লবীর পথ হতে পারে? দুই দল সাম্রাজ্যবাদী লুঠেরার উপনিবেশ নিয়ে কামড়াকামড়ির মধ্যে এক দলের পক্ষ নিলে তো সেই ব্যবস্থারই পক্ষ নিতে হয়। জার্মানী, ইতালি, জাপান তো লড়ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার উপনিবেশগুলি ছিনিয়ে নিয়ে সেগুলো তাদের দখলে নেবার জন্য। যেহেতু সে সময়ে অধিকাংশ উপনিবেশ ছিল মিত্রশক্তির দখলে, সুতরাং, তাদের কব্জায় সেগুলোকে আনাই তো ছিল ফ্যাসিবাদী অক্ষশক্তির উদ্দেশ্য। ভারতের বা কোন দেশের স্বাধীনতা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা ছিল না। নেতাজী কি তা জানতেন না? আসলে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের বিপ্লবী শক্তিকে এড়িয়ে চলার কারণে কংগ্রেসী নেতারা বরাবরই বিদেশী শক্তির উপর নির্ভর করতে চাইত। নেতাজী নিজেই ১৯৩০ জেনেভাতে কাটিয়েছিলেন লীগ অব নেশনস্ সংগঠন-কে জানা-বোঝার জন্য ও ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে লীগকে ব্যবহার করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে। (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৬৫) যে লীগ অব নেশনস্ ছিল সাম্রাজ্যবাদীদের একটা সংস্থা, এবং যেখানে ছড়ি ঘোরাত ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা, তারা কিভাবে ভারতের স্বাধীনতার কাজে আসতে পারে? এ ধরনের আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখেছিলেন নেতাজী। নেতাজী নিজে আবার কংগ্রেসের কিছু নেতার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ এনেছিলেন। “বাস্তবে কিছু কংগ্রেস নেতার মধ্যে মোহ এতটা ছিল যে তারা আশা করছিল যে রাষ্ট্রসত্ত্ব এবং আমেরিকা ভারতের জাতীয় দাবীগুলির ক্ষেত্রে অবশ্যই হস্তক্ষেপ করবে"। (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯১-৯২)

এমনকি ১৯৪২ সালে যখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জাপান যুদ্ধে সাফল্য পাচ্ছিল তখন এপ্রিল ২৭ থেকে এলাহাবাদে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির যে মিটিং হয় সেখানে গান্ধী যে খসড়া প্রস্তাব পাঠান, তাতে বলা হয় "জাপানের ঝগড়া ভারতের সাথে নয়। সে লড়ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। যদি ভারত মুক্ত হয় তবে সম্ভবতঃ তার প্রথম পদক্ষেপ হবে জাপানের সাথে সমঝোতা করা।” (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৮৯)

তাহলে দেখা যাচ্ছে সে সময় গান্ধীর চিন্তার সাথে নেতাজীর চিন্তার কোন ফারাক ছিল না। ভারতকে মুক্ত করার কোন উদ্দেশ্য যে জাপানের ছিল না তা তারা বুঝতে অপারগ ছিলেন। 'মুক্ত ভারতের সাথে সমঝোতা করার জন্য কি জাপান যুদ্ধে লড়ছিল, নাকি ব্রিটেনের উপনিবেশ ভারতকে বগলদাবা করা ছিল তার উদ্দেশ্য! আসলে দেশের জনগণের উপর ভরসা না করতে পারার ফলে তারা এইসব অবাস্তব চিন্তার শিকার হয়েছিলেন। যা তাদের উদ্দেশ্যকেও সিদ্ধ করত না। নেতাজী সেই সময় গান্ধীর ঐ খসড়া প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন, যা দেখিয়ে দেয় গান্ধীর সাথে তার চিন্তার আসলে কোন ফারাক ছিল না। তিনি ঐ সময়ে বলেন - “গান্ধীর খসড়া প্রস্তাব দেখাচ্ছে যে গান্ধী নেহরুর মত আদর্শগতভাবে গোঁড়া ছিলেন না এবং নেহরুর চেয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী ছিলেন।" (নে.স.র, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯০)

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, কিন্তু জাপান যে ভারতকে স্বাধীনতা দিত না, এ ব্যপারে আমরা এতটা নিশ্চিত হচ্ছি কি করে? জাপানের কার্যকলাপই দেখিয়ে দিচ্ছে যে তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে খেলা করতে নামে নি, নেমেছিল আরও বেশি বেশি উপনিবেশ তাদের কব্জায় আনবার জন্য। সেই সময় চীন ও কোরিয়াকে তাদের দখলে আনবার জন্য তারা চীনা ও কোরীয়দের উপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছিল তা কি নেতাজী জানতেন না? সেই সময়ে জাপানের দখলে থাকা উপনিবেশগুলি ছিল নাইটি, তাইওয়ান, দক্ষিণ সাখালিন, কোয়ানতুং অঞ্চল, কোরিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলি।

আর শুধু তো তাই নয়, জাপান যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ বার্মার (বর্তমানে মায়ানমার) দখল নেয়, তার ঠিক পূর্বে নেতাজীর মত বার্মার এক জাতীয়তাবাদী নেতা আউং সান (বর্তমান মায়ানমারের শাসক সুকি-র পিতা) জাপানী মদতে তৈরি এক সেনাবাহিনী নিয়ে (নেতাজীর মত) ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে নামেন। কিন্তু বার্মাতে জাপানীদের অনুপ্রবেশের পর তার জাপান সম্পর্কে মোহভঙ্গ হয় এবং তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে জাপানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সাথে হাত মেলান। অর্থাৎ পুনর্মুষিকোভব। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে উপনিবেশগুলির বুর্জোয়া বা পেটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী নেতারা এক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আরেক সাম্রাজ্যবাদের সাথে হাত মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত

তাদেরই স্বার্থ সিদ্ধ করছেন। তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ হচ্ছে না। তার এটাই স্বাভাবিক। শ্রমিক কৃষক-মেহনতী মানুষের বিপ্লবের ভয়ে ভীত জাতীয় বুর্জোয়াদের সাম্রাজ্যবাদীদের কোলে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আজকের দিনে অন্য কোন উপায় নেই।

তবে জাপানের সাথে হাত মেলাতে গিয়ে নেতাজী কিন্তু বাস্তবে জাপ সাম্রাজ্যবাদের প্রচারকে পরিণত হয়েছিলেন। একটা নিষ্ঠুর, বর্বর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে তিনি শান্তির দূত হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন, যা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। ১৯৪৪ সালে টোকিওতে ভারতের মৌলিক সমস্যাগুলি নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন- “স্বাধীনতা, ন্যায় এবং পারস্পরিক অধিকারের ভিত্তিতে পূর্ব এশিয়াতে একটা নতুন ব্যবস্থা তৈরি করতে যুক্ত ঘোষণার মাধ্যমে যে পদক্ষেপগুলি নেওয়া হয়েছে তাকে আমি পূর্ণ সমর্থন করি।”... “লীগ অব নেশনস্ ব্যর্থ হয়েছে, কারণ উদ্যোক্তা জাতিগুলি ছিল স্বার্থপর এবং দূরদৃষ্টিহীন। এখন যে জাতিগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, এবং নির্দিষ্টভাবে উদ্যোক্তা জাতিটি যদি স্বার্থপর এবং দূরদৃষ্টিহীন নীতি এড়িয়ে যায় এবং একটি নৈতিক ভিত্তিতে কাজ করে, তবে পরীক্ষাটি সফল না হওয়ার কোন কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না।”

“এই কাজে উদ্যোক্তা-জাতি হয়ে জাপান যে প্রকাণ্ড দায়িত্ব গ্রহণ করেছে আমি আবারো তাতে জোর দিতে চাই।”“আমি আশা, প্রার্থনা এবং বিশ্বাস করি যে ছাত্র এবং যুবকরা যারা জাতির ভবিষ্যৎ প্রতিনিধি, এই নতুন ব্যবস্থা চালু করে জাপান যে নৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছে তাকে বাস্তবায়িত করবে।” (F.Q.I.R., পৃ. ৮৭-৯১)

তাহলে যে নিষ্ঠুর ও বর্বর সাম্রাজ্যবাদী জাপান তার বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর দেশগুলির হাত থেকে উপনিবেশ কেড়ে নিয়ে সেগুলোকে নিজের উপনিবেশ বানাতে চাইছিল এবং চীনা ও কোরীয় জনতার উপর বর্বর অত্যাচার চালানোর কারণ যে ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে সে স্বাধীনতা, ন্যায় এবং পারস্পরিক আধিকারের ভিত্তিতে পূর্ব এশিয়াতে একটা নতুন ব্যবস্থা তৈরি করবে, তা নেতাজী বিশ্বাস করছেন এবং তাকে সমর্থন জানাচ্ছেন। তাদের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খাকে ঘোমটার আড়ালে ঢেকে রাখবার জন্যই ছিল জাপানের নতুন ব্যবস্থার কথা। যেমন ছিল লীগ অব নেশনস্ এবং এখন আছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ব্রিটিশ, মার্কিন, ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খা ও কার্যকলাপকে ঢেকে রাখবার একটা ঘোমটা।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতের স্বাধীনতার স্বার্থে জাপানকে ব্যবহারের কথা বলে শেষ পর্যন্ত তিনি সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছিলেন। আর এটাই তো স্বাভাবিক। সাম্রাজ্যবাদের যুগে উপনিবেশ, আধা-উপনিবেশ এবং পশ্চাদপদ দেশগুলির জাতীয় বুর্জোয়াদের এই পরিণতিই তো অবশ্যম্ভাবী।

ভারত থেকে চলে যাবার ঠিক আগে জেলে বসে নেতাজী যে তিনটি সিদ্ধান্তে আসেন তার অন্যতমটি ছিল এরকম— "ভারত তার স্বাধীনতা অর্জন করবে যদি সে ব্রিটিশ-বিরোধী যুদ্ধে তার ভূমিকা পালন করে এবং যে সব শক্তি ব্রিটেনের বিরুদ্ধে লড়ছে তাদের সাথে সহযোগিতা করে।” (নে.স.র, খণ্ড-২, পৃ. ৩৮-৬)

নেতাজী জাপানের সাথে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতার অর্জনের চেষ্টা করার কথা ভাবলেন অথচ ভারতের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের আন্দোলন তখন ক্রমশই তীব্র হয়ে উঠছে (তারই স্বীকারোক্তি অনুযায়ী) তাকে সংগঠিত করে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের কথা তিনি একবারও ভাবলেন না। এটাই হচ্ছে শ্রেণীগত দৃষ্টিভঙ্গীর সংকীর্ণতা। যে বুর্জোয়া শ্রেণীর তিনি প্রতিনিধি ছিলেন তাদের স্বার্থই তাকে জাপানের সাথে সহযোগিতার দিকে চালিত করেছিল। আর এই শ্রেণীগত সংকীর্ণতা কিভাবে তাকে সত্যিকারের বন্ধু চিনতে ভুল বুঝিয়েছিল তার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে যখন তিনি দাবী করেন যে ব্রিটেনের কেউই ভারতের স্বাধীনতার সমর্থক হতে পারে না। তিনি বলেছিলেন — "ভারত শোষণে ব্রিটেনের সকলের স্বার্থ আছে। যে বৃটিশ পুঁজি ভারতে খাটে তা কেবল উচ্চশ্রেণী নয়, মধ্য শ্রেণী এবং আরো দরিদ্র শ্রেণীগুলি থেকেও আসে। ল্যাঙ্কাশায়ারের ক্ষতি করে ভারতের বস্ত্রশিল্প বিকাশলাভ করুক, বৃটিশ শ্রমিকরা চায় না। যার জন্য লেবার সরকারের আমলেও চরম নির্যাতন চলছে।” (F.Q.I.R., পৃ. ২২ )

“ইংল্যান্ডের কোন রাজনৈতিক দলের থেকে আমরা কিছু আশা করতে পারি না।” (F.Q.I.R., পৃ. ২৪)

যিনি শ্রেণী সংগ্রাম, শ্রেণী-সংঘর্ষ ভারতে চান না, কিভাবে তিনি সবকিছু গুলিয়ে দিতে পারেন, নেতাজীর এই কথাগুলি তার বাস্তব উদাহরণ। লেবার পার্টি ছিল বাস্তবতঃ একটা বুর্জোয়া পার্টি (যদিও তার ভিত্তি ছিল শ্রমিক শ্রেণী)। সুতরাং তাদের আচরণ দিয়ে ব্রিটেনের শ্রমিক শ্রেণীর বিচার করাটা মূর্খামি ছাড়া কিছু নয়। আর সেই সময়ে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের বৃটিশ শাখার কর্মীরা এবং এমনকি মৌখিকভাবে স্ট্যালিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টিও ভারতের স্বাধীনতার কথা বলত। বৃটিশ স্ট্যালিনবাদী নেতা রজনী পাম দত্তের সাথে এক ইন্টরভিউতে (১৯৩৮ সালে) নেতাজী তা স্বীকারও করেছিলেন। “আমি এটা যোগ করব যে কমিউনিজম, যেভাবে মার্কস এবং লেনিনের লেখাতে এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নীতির সরকারী বিবৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে, জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে পূর্ণ সমর্থন দেয় এবং তার বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তা আমি সর্বদাই বুঝেছি এবং সম্পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট।” (নে.স.র., খণ্ড-২, পৃ. ৩৯৮-৯৯) তাহলে বৃটেনের ‘কোন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আমরা কিছু আশা করতে পারি না'- একথা তিনি কেন বলছেন? আসলে বিশ্বজুড়ে যে শ্রমিক শ্রেণী সারা বিশ্বের উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশগুলির মুক্তি যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল, শ্রেণীগত স্বার্থের কারণেই তাদের সংস্পর্শ জাতীয় বুর্জোয়ারা এড়িয়ে চলতে চাইত, কারণ তারা জানত এই শ্রমিক শ্ৰেণী জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন করে থেমে যাবে না, তারা সমাজতন্ত্রের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাবে। সুতরাং স্বাধীনতার লড়াইতে তাদের দূরে সরিয়ে রেখে, বৃটিশ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে বন্ধুত্ব করো। তাতে শোষণের পুরোটা না পেলেও অন্ততঃ কিছু ভাগ তো পাওয়া যাবে। সেটাই জাতীয় বুর্জোয়ার লাভ। এই শ্রেণীগত স্বার্থই বুর্জোয়াদের কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে এবং সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ঠেলে দেয়। নেতাজী তার থেকে আলাদা কিছু ছিলেন না। জাপানের সাথে তার সহযোগিতার মূল কারণ ছিল জাতীয় বুর্জোয়ার এই শ্রেণীগত স্বার্থ ।

স্বাধীন ভারতে হিন্দীকে রাষ্ট্রভাষা করা প্রসঙ্গে

স্বাধীন ভারতের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের চরিত্র কিরকম হবে তা নিয়ে নেতাজীর বক্তব্য আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু শুধু এসবই নয়। জাতীয় ভাষা নিয়েও তার কিছু বক্তব্য আমরা জেনেছি যা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি যদিও ফেডারাল রিপাবলিকের পক্ষে ছিলেন কিন্তু হিন্দীকে জাতীয় ভাষা করার পক্ষে তার সওয়াল বাস্তবত সেই ধারণাকেই নস্যাৎ করে দেয়। ভারত একটা বহুজাতিক রাষ্ট্র। স্বাধীন ভারতে ৭০ বছর ধরে হিন্দীভাষার যে দাপট আমরা দেখছি (যা সংবিধান অনুযায়ী হওয়া উচিত নয়, কেননা এখানে সরকারীভাবে কোনো রাষ্ট্রভাষা নেই)। তার ফলে ভারতে জাতিগুলির মধ্যে অবিশ্বাস ও তিক্ত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও তার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারগুলি এখনও পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এর উৎস কিন্তু লুকিয়ে আছে জাতীয় কংগ্রেসের নীতিতে। কংগ্রেস বরাবরই জাতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দীকে চাপিয়ে দেবার পক্ষে ওকালতি করে গেছে। আর সেই কংগ্রেসের এক নেতা হিসেবে নেতাজীও তাই করেছেন। ১৯২৮ সালে তিনি বলেছিলেন — “আমাদের মধ্যে কিছু লোক আছেন যাদের মধ্যে এই ভুল ধারণা রয়েছে যে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে চূর্ণ করবার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নিয়েই হিন্দীর প্রচার শুরু হয়েছে। এই ভয়ের কোন ভিত্তি নেই।” (নে.স.র, খণ্ড-৫, পৃ. ২৮১-৮২) তিনি আরো বলেন-“কিন্তু হিন্দী বা হিন্দুস্থানীকে আমাদের জাতীয় ভাষার মর্যাদা দিতে হবে। নেহেরু রিপোর্টেও এর সুপারিশ করা হয়েছে।”. “সেই দিন খুব দূরে নেই যখন হিন্দী স্বাধীন ভারতের জাতীয় ভাষা হবে।” (নে.স.র, খণ্ড-৫, পৃ. ২৮৩)

অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে কংগ্রেসের নীতি হিসেবেই হিন্দীকে জাতীয় ভাষা করার পক্ষে নেতাজী ওকালতি করেছিলেন। যা ছিল আসলে ভারতকে একটা এককেন্দ্রিক, স্বৈরচারী রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে একটা পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র গঠনের চিন্তার সাথে এটা একেবারেই খাপ খায় না। তবে আতীয় বুর্জোয়াদের একটা স্বৈরাচারী রাষ্ট্র গঠনের চিন্তার সাথে এটা খুবই খাপ খায়। আর নেতাজী তথাকতিথ ‘সমাজতন্ত্র' গড়বার জন্য স্বাধীন ভারতে স্বৈরাচারী রাষ্ট্র গঠনের জন্য ওকালতি করেছিলেন। এসব চিন্তা শেষ পর্যন্ত সেই দিকেই ভারতকে নিয়ে যায়।

বাংলা তথা ভারতের বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন সম্পর্কে নেতাজীর বেঠিক অবস্থান

শেষত যে বিষয়টি সম্পর্কে নেতাজীর মতামত আমরা তুলে ধরতে চাইছি তা হল বাংলা তথা ভারতের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। নেতাজী নিজে 'সশস্ত্র বিপ্লবের' কথা বলতেন, অথচ, সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের তিনি মোটেই সুনজরে দেখেন নি। এটা ঠিকই যে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা যে ব্যক্তিসন্ত্রাসের রাস্তা নিয়েছিলেন তা থেকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। কেননা প্রবল পরাক্রান্ত বৃটিশ সাম্রাজ্যকে তাদের দু একটা পুলিশ অফিসার বা মন্ত্রীকে খুন করে উচ্ছেদ করা যেত না। এজন্য প্রয়োজন ছিল কোটি কোটি জনতাকে জাগিয়ে তোলা, তাদের সশস্ত্র করা এবং সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যকে উচ্ছেদ করা। যা সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের কর্মসূচীতেই ছিল না। আবার গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস কোটি কোটি জনতাকে আন্দোলনের রাস্তায় নামালেও আবেদন-নিবেদন আর অসহযোগের বাইরে তা কোনদিন যায়নি, যাওয়ার কথাও না, কারণ গান্ধীর অহিংসার তত্ত্ব। এই তত্ত্ব আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপোষের তত্ত্ব। জাতীয় বুর্জোয়াদের বিপ্লব- ভীতি এবং ফলতঃ সাম্রাজ্যবাদের সাথে সমঝোতা করে খুদকুড়ো যা পাওয়া যায় তাই আকড়ে ধরার নীতি থেকেই তাদের রাজনৈতিক নেতা গান্ধী এই অভিনব অহিংসার তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন।

আর এর ফলেই, জাতীয় বুর্জোয়দের এই বিপ্লব-ভীরুতার নীতির বিরুদ্ধেই পেটি বুর্জোয়া যুবকদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি জন্ম নেয়। যারা প্রলেতারিয়েত বা কৃষকদের গণআন্দোলন বা গণ-বিপ্লবের তোয়াক্কা করত না। কিছু পেটি বুর্জোয়া যুবক মিলে যড়যন্ত্র মূলক গোপন বিপ্লবী দল বানিয়ে কিছু বৃটিশ অত্যাচারী পুলিশ অফিসারকে হত্যা করে তারা জনগণকে জাগিয়ে তোলবার চেষ্টা করত। যা স্বাভাবিকভাবেই সফল হবার কোন সম্ভাবনা ছিল না, হয়শুনি। এই দিকভ্রান্ত যুবকদের সঠিক রাস্তা দেখানোটাই ছিল যে কোন বিপ্লবী কমিউনিস্টের কাজ বা বিপ্লবীর কাজ। কিন্তু তারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছিল না, কেবলমাত্র অত্যাচারের বদলা নিতে চাইত- এগুলো কি সঠিক কথা? আর তাদের তথাকথিত 'মূলধারায়' ফিরিয়ে আনার জন্য বৃটিশ শাসকদের পরামর্শ দেওয়াটা কি কোন বিপ্লবীর কাজ হতে পারে? নেতাজী কিন্তু তাই করেছিলেন। তার কথাতেই তা শুনুন- “বাংলার বিপ্লবী আন্দোলন থেকে মুক্তির রাস্তা কি? সরকারের দুটো রাস্তা-প্রথমত: জনগণকে দেখাতে হবে যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিপ্লবী পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত: ব্যক্তি-বিপ্লবীদের শাস্তিপূর্ণ এবং গঠনমূলক পথে দেশের সেবার জন্য একটা সুযোগ দিতে হবে"। (নে.স.র., খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৬-৩৭ )

এরপর চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন—“চট্টগ্রাম জেলায় সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ দেশে বিপ্লব সংঘটনের আকাঙ্খা থেকে হয়নি, হয়েছে সরকারী সন্ত্রাসবাদের কার্যকলাপকে প্রত্যাঘাত করার উদ্দেশ্যে নিয়ে।" (নে.স.র., খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৮ )

“রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবী পদ্ধতির প্রয়োজন নেই।”— এটা যদি তিনি মনেই করতেন, তাহলে আবার ‘সশস্ত্র বিপ্লবের’ কথা বলে তিনি হইচই জুড়ে দিয়েছিলেন কেন? তার পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা কিন্তু দেখিয়ে দিচ্ছে, আসলে সশস্ত্র বিপ্লবের কোন বাসনাই তার ছিল না। আবার অন্যদিকে 'চট্টগ্রাম বিপ্লবীদের বিপ্লব সংঘটনের কোন আকাঙ্খা ছিল না, এটা বলার অর্থ তাদের কার্যকলাপকে হেয় করার চেষ্টা করা। তাদের পদ্ধতির সাথে আমরাও একমত নই। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যকে খাটো করার মানে কি? এ ব্যাপারে অন্যান্য কংগ্রেসী নেতাদের সাথে নেতাজীর কোন ফারাক আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

উপসংহার

নেতাজী সম্পর্কে এতক্ষণ যে আলোচনা আমরা করলাম তা স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনঃপুত হবে না। নেতাজী ভক্তরা তো বটেই, এমনকি অনেক 'বামপন্থী' পর্যন্ত এর সাথে একমত হবেন না। কিন্তু সত্যকে আমাদের মেনে নিতেই হবে। সত্য অনেক সময়ই অপ্রিয়। আগামী দিনে বিপ্লবের স্বপ্ন যারা দেখেন তাদের এইসব অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হতেই হবে। কিন্তু বিপ্লবের সঠিক রাস্তা খুঁজে বার করতে গেলে যে পথ বর্জনীয় তাকে আগে চিহ্নিত করতে হবে। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের মনে যে ক্ষতিকর মোহ এখনও টিকে আছে তা থেকে তাদের মুক্ত করতে হবে। তবেই মার্কসবাদের প্রকৃত শিক্ষায় তারা শিক্ষিত হতে পারবেন, আর বিপ্লবের প্রকৃত পতাকাকে তারা চিনতে পারবেন। বিপ্লবের স্বার্থে এইসব স্বরূপ উদ্ঘাটনের কাজ আমাদের তাই চালিয়ে যেতে হবে।

সূচি

  • ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেস ও গান্ধীর ভূমিকা
  • নেতাজীর চোখে কংগ্রেস ও গান্ধী
  • নেতাজীর দৃষ্টিভঙ্গী ভারতীয় বুর্জোয়াদেরই দৃষ্টিভঙ্গী
  • নেতাজী ফ্যাসিবাদী শক্তির সাথে হাত মেলালেন কেন?
  • স্বাধীন ভারতে হিন্দীকে রাষ্ট্রভাষা করা প্রসঙ্গে
  • বাংলা তথা ভারতের বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন সম্পর্কে নেতাজীর বেঠিক অবস্থান
  • উপসংহার

টীকা

    1 নে. স. র- নেতাজী সংগৃহীত রচনাবলী।
    2 FQ.I.R – Fundamental Question of Indian Revolution. এই সবগুলোই নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত।