ভূয়া ট্রটস্কীবাদী মিলিট্যান্ট গোষ্টীর বিলোপবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে সতর্ক হোন – একে বিচ্ছিন্ন করুন
জানুয়ারি ২০২৫

আমাদের পত্রিকার পাঠকেরা মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর সুবিধাবাদী কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক অবহিত রয়েছেন এ বিষয়ে আমাদের পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে। ঐ গোষ্ঠীর ছাত্র-যুব সংগঠনের নীতি-কর্মসূচী নিয়ে আমরা একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকাও এর আগে প্রকাশ করেছি। সুতরাং ট্রটস্কীবাদের মুখোশধারী ঐ গোষ্ঠীর সুবিধাবাদী কার্যকলাপ সম্পর্কে আশা করি পাঠকেরা অবহিত আছেন।
সম্প্রতিকালে বিভিন্ন উপলক্ষে ঐ গোষ্ঠীর সুবিধাবাদী কার্যকলাপ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। যেমন, বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে কলকাতায় বাংলাদেশের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকার তলে তাদের আমরা মিছিল করতে দেখেছি, দেখেছি জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের সময় ভারতের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকার তলাতেও তারা মিছিলে অংশগ্রহণ করেছে। এই মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী এতটাই নির্লজ্জ হয়ে পড়েছে যে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর পতাকা নিয়ে মিছিল করতে তারা আর কোন লাজ-লজ্জা বা সংকোচবোধ করে না। স্ট্যালিনবাদী মাওবাদীদের মতই তারা সুবিধাবাদের পাঁকে আকন্ঠ নিমজ্জিত হয়েছে। আর এসবের ধারাবাহিকতায় তারা এখন আঁকড়ে ধরেছে বিলোপবাদী রাজনীতিকে। স্ট্যালিনবাদী-মাওবাদীদের সাথে গা ঘষাঘষি করতে গিয়ে এই সুবিধাবাদী বেইমানেরা এখন বিলোপবাদকে আশ্রয় করেছে এবং তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠনেরও স্বপ্ন দেখছে তাদের নির্লজ্জতা দেখলে অবাক হতে হয়। স্ট্যালিনবাদীদের সাথে ঐক্যবদ্ধ পার্টি তারা করতে চায় করুক, কিন্তু ট্রটস্কীর নাম করে এসব তারা করছে কেন? আর ট্রটস্কীর নাম করে এসব কার্যকলাপ যারা চালাচ্ছে তাদের মুখোশ খোলবার দায়িত্ব তো আমাদের নিতে হবে। আর সেই কারণেই এই প্রবন্ধের অবতারণা।
মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর বিলোপবাদ
সম্প্রতিকালে মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর যুব সংগঠনের পত্রিকা নয়া দিশা ফ্যাসিবাদ নিয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে ২৭ নং পাতায় আমাদের করণীয় বলে তারা বলেছে— “এই মুহূর্তে ভারতবর্ষে কোনও বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির অস্তিত্ব নেই। রয়েছে কিছু চতুর্থ আন্তর্জাতিকতাবাদী টেন্ডেন্সি ও কিছু র্যাডিক্যাল স্তালিনবাদী সংগঠন। বিভিন্ন বাম সংগঠনের সাথে বিপ্লবী টেন্ডেন্সিগুলির পারস্পরিক সমালোচনা বজায় রেখে যৌথ কর্মসূচির মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলাই আজ কমিউনিস্টদের প্রথম ও প্রধান কাজ।”
কি সীমাহীন নির্বুদ্ধিতা ও সুবিধাবাদ! আর মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর যুব সংগঠনের ঔদ্ধত্য দেখেও অবাক হতে হয়। একটা যুব সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কর্তব্য হাতে নিয়েছে। কোথা থেকে এই সীমাহীন ঔদ্ধত্য তারা পেল? নিজেদেরকে কি ভাবছে তারা ?
কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে কি করে? বিভিন্ন স্তালিনবাদী, মাওবাদী বাম সংগঠনের সাথে যৌথ কর্মসূচীর মাধ্যমে? এইসব মাথামোটাদের সুবিধাবাদ আর অজ্ঞতা দেখলে অবাক হতে হয়। প্রবাদে বলে 'পণ্ডিতেরা যেখানে পা বাড়াতে ভয় পায়, মুর্খেরা সেখানে স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যায়'। নিজেদের কাজের মাধ্যমে মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী এই প্রবাদের সত্যতা প্রমাণ করছে ১৯২১ সাল নাগাদ যখন ইউরোপে শ্রমিক বিপ্লবের আশু সম্ভাবনা কমে আসছিল এবং পুঁজিবাদী প্রতিক্রিয়া জোরদার হচ্ছিল, আবির্ভাব ঘটেছিল। ফ্যাসীবাদের, তখন তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী আক্রমণ তথা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য শ্রমিক শ্রেণীর যুক্তফ্রন্টের আহ্বান রাখে। শ্রমিক শ্রেণীর সমস্ত পার্টি ও সংগঠনগুলিকে নিয়ে এই যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলবার কথা বলা হয়। বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সুবিধাবাদী-সংস্কারবাদী শ্রমিক পার্টিগুলির সাথে যৌথ আন্দোলনের কথা বলা হয়। কিন্তু পরিষ্কারভাবে এটা বলা হয় যে এটা কোন রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত বা নির্বাচনী ফ্রন্ট নয়। কেবল মাত্র কিছু ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই ফ্রন্ট গড়ে তোলা যাবে এবং কমিউনিস্ট পার্টির স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, সুবিধাবাদী-সংস্কারবাদীদের সমালোচনা এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করা হবে না, তাতে যদি ফ্রন্ট ন হয় না হবে। এবং কমিউনিস্ট পার্টির শক্তি বিচার করেই এই ধরনের ফ্রন্ট গড়ে তোলার প্রশ্ন আসবে।
বোঝাই যায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। যেহেতু ইউরোপে তখনও শ্রমিক শ্রেণীর বড় অংশ এইসব সুবিধাবাদীদের নেতৃত্বের অধীনে ছিল তাই তাদের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবে নিয়ে আসার জন্য এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ব্যাপক শ্রমিক জনতাকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবাধীনে নিয়ে আসাই এই যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল। কারণ তাদের বাদ দিয়ে তো আর বিপ্লব সম্ভব নয়। আর কমিউনিস্ট পার্টি হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর আগ্রণী অংশের পার্টি। এটা শ্রমিক শ্রেণীর সবচেয়ে সচেতন অগ্রণী অংশকে নিয়ে গঠিত হয়। লেনিনবাদী পার্টির চিন্তা তাই বলে। সোস্যাল ডেমোক্রাসি বা স্ট্যালিনবাদ গণপার্টির ধারণা তুলে ধরে যা আসলে নেতৃত্বের ধামাধরাদের একটা পার্টিতে পরিণত হয়। লেনিনবাদ এই ধরণের পার্টির ধারণাকে বর্জন করে অগ্রণী অংশের পার্টির কথা বলে। খেয়াল রাখা দরকার স্বাভাবিক সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি সংখ্যালঘুই থাকে। কেবল মাত্র বিপ্লবী পরিস্থিতিতেই তা সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক জনতার সমর্থন অর্জন করতে থাকে। কিন্তু তখনও সেই পার্টি গণপার্টি হয় না, তা অগ্রণী অংশের পার্টিই থাকে। একটা লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলতে গেলে প্রথমেই যেটা দরকার তা হল তত্ত্বগতভাবে কর্মসূচী নির্ধারণ করা যা সমস্ত ধরনের সুবিধাবাদের থেকে হবে সম্পূর্ণ আলাদা এবং শুধু তাই নয়, এই কর্মসূচীর ভিত্তিতে বিভিন্ন সুবিধাবাদী বাম ধারার সাথে মতাদর্শগত লড়াইয়ে নামতে হবে এবং তাদের প্রতিটি ভুল ও সুবিধাবাদী কার্যকলাপকে শ্রমিক শ্রেণীর সামনে উন্মোচিত করতে হবে। কেননা এই তথাকথিত বাম ধারাগুলি হচ্ছে আসলে শ্রমিক আন্দোলনে বুর্জোয়াদের দালাল। শ্রমিক শ্রেণীর মধ্য থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা না গেলে কখনোই একটা সত্যিকারের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলে তার নেতৃত্বে সামাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করা যাবে না। মনে রাখতে হবে কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি, আর সেই শ্রমিক শ্রেণীকে বিপ্লবী রাজনীতিতে শিক্ষিত করতে গেলে সমস্ত ধরনের বাম সুবিধাবাদ (যা আসলে বুর্জোয়া চিন্তার প্রতিফলন) এর মুখোশ তাদের সামনে খুলে দিয়ে তাদেরকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। যেটা ছাড়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অসম্ভব। যে জন্য এইসব সুবিধাবাদী বামদের প্রতিটি ভুলকে ক্ষমাহীনভাবে সমালোচনা চালিয়ে যেতে হবে, এ ব্যাপারে কোনরকম ছাড় দেওয়া চলবে না। (যা মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী স্তালিনবাদীদের সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সময় তাদেরকে দিয়ে থাকে)।
শুধু তাই নয়, লেনিনবাদী পার্টি গড়তে গেলে মনে রাখা দরকার সেই পার্টির কেন্দ্রে থাকে পেশাদার বিপ্লবীরা। পেশাদার বিপ্লবী ছাড়া কোন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠতে পারে না, সে ব্যাপারে মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর চিন্তাভাবনা কি? তা তারা এড়িয়ে গেছেন কেন?
তবে আসল জায়গাতেই যারা সুবিধাবাদী তারা যে এসব প্রশ্নে সুবিধাবাদী অবস্থান নেবেন তা বলাই বাহুল্য।
সোশ্যাল ডেমোক্রাসী, স্ট্যালিনবাদী, মাওবাদী এইসব সুবিধাবাদীদের সাথে কি কম্যুনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা যায় ? না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লেনিনের বিখ্যাত প্রবন্ধ 'দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পতন'-এ লেনিন তা পরিষ্কারভাবে বলেছেন। (লেনিনের সময় স্ট্যালিনবাদ ছিল না ঠিকই, কিন্তু ট্রটস্কীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী স্ট্যালিনবাদ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসীরই রকমফের মাত্র। রাশিয়াতে তা প্রতিবিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে এবং বিশ্বের বাকি সব দেশে তার ভূমিকা প্রতিক্রিয়াশীল। চীন, ভিয়েতনাম, যুগোশ্লাভিয়া ইত্যাদি দেশে তারা পুঁজিবাদ-বিরোধী বিপ্লব সংঘটন করলেও সমাজতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে তারা প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাই পালন করেছিল। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে মার্কস বলেছিলেন, কৃষকরা সমাজতান্ত্রিক বিভাবে অংশগ্রহণ করলেও তারা সমাজতন্ত্রের প্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাই পালন করে, তা যেন আমরা ভুলে না যাই। ঐ তিনটি দেশে পুঁজিবাদ-বিরোধী পেটি বুর্জোয়াদের অভ্যুত্থান ও বিপ্লব (স্তালিনবাদীদের নেতৃত্বে) আমরা দেখেছি কিন্তু সমাজতন্ত্রে অগ্রগতির ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা একেবারেই নেতি বাচক, কিউবাতে কাস্ত্রো ও গুয়েভারার '২৬ জুলাই আন্দোলন' ঐ একই ভূমিকা নিয়েছিল। ইতিহাসের এইসব শিক্ষা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।)
ঐ প্রবন্ধে লেনিন বলছেন -
“সুতরাং উপরে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যুক্তিসঙ্গতভাবে তার থেকে যে উত্তর বেরিয়ে আসে তা হল কিভাবে সামাজিক সুবিধাবাদকে মোকাবিলা করা হবে? সামাজিক-সুবিধাবাদ দীর্ঘকালব্যাপী তুলনামুলকভাবে 'শান্তিপূর্ণ” পুঁজিবাদের সময়ে যেরকম শক্তিশালী এবং নির্লজ্জ হয়ে উঠেছে, তার রাজনৈতিক আদর্শ যেরকম নির্দিষ্ট রূপ নিয়েছে, এবং যেরকম ঘনিষ্ঠভাবে বুর্জোয়ারা এবং তাদের সরকারগুলির সাথে যুক্ত হয়েছে, যে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টিগুলির মধ্যে তাদের উপস্থিতি সহ্য করা যাবে না।
ইউরোপে সমাজতন্ত্র একটা সংকীর্ণ এবং জাতীয় সীমার মধ্যে। আবদ্ধ একটা তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ পর্যায়ে উদ্ভূত হয়েছিল। ১৯১৪-১৫য় যুদ্ধের শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে সবিধাবাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের, শ্রমিক পার্টিগুলির থেকে তাদের বহিষ্কারের সময় চলে এসেছে।(লেনিন সংগৃহীত রচনাবলী, খণ্ড-২১ পৃঃ ২৪৯)
লেনিনের বক্তব্য খুবই পরিষ্কার। এইসব সুবিধাবাদীদের পার্টির মধ্যে কোন ঠাঁই নেই। তবে লেনিনবাদ সম্পর্কে অজ্ঞ কোন কোন বামপন্থী উৎসাহবশে এসব ভেবে বসেন এবং বলেও বসেন। তাদের উদ্দেশ্যে ট্রটন্তী কি বলছেন শুনুন-
“এখন যদি পুঁজিবাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা সাধারণ প্রতিরক্ষা সম্ভব হয়, তাহলে কি আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারি না, এবং সমস্ত প্রশ্নেই দুটো পার্টির একটা সত্যিকারের জোট (bloc) তৈরি করতে পারি না? তাহলে দুজনের মধ্যেকার বিতর্ক একটা আভ্যন্তরীণ, শান্তিস্থাপক এবং আন্তরিক চরিত্র গ্রহণ করতে পারে। সেদেউইজ-এর মত কোন কোন বাম সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, যা জানা গেছে, এমনকি আরো অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসীর পূর্ণাঙ্গ ঐক্যের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু এই সমস্ত কিছুই বিফল স্বপ্ন, মৌলিক প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রে বিরোধই কমিউনিস্টদের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি থেকে আলাদা করেছে। তাদের মধ্যেকার মতপার্থক্যগুলির মর্মবস্তুকে অনুবাদের সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে; সোশ্যাল ডেমোক্র্য্যাসী নিজেকে পুঁজিবাদের গণতান্ত্রিক চিকিৎসক মনে করে, আমরা সেটার বিপ্লবী কবরখনক।
সামাজিক-দেশপ্রেমবাদ পুঁজিবাদের চিকিৎসকদের কর্মসূচী। আন্তর্জাতিকতাবাদ পুঁজিবাদী সমাজের কবর খনকদের কর্মসূচী। এই বিরোধ অহাসযোগ্য (irreducible)। [The United Front for Defence, Leon Trotsky (February, 1933). Marxist Internet Archive]
‘নয়া দিশার’ উজবুকদের উদ্দেশ্য করেই যেন ট্রটস্কী আরো বলেছেন—
“মৌলিক ঐতিহাসিক কর্তব্য
যুক্তফ্রন্টের মত একটা কৌশলমূলক কর্তব্যের সাথে মৌলিক ঐতিহাসিক কর্তব্য নতুন পার্টি এবং নতুন আন্তর্জাতিক গঠনের কাজকে গুলিয়ে ফেলা চলবে না।
বাস্তব কর্মকাণ্ডের স্বার্থে সবচেয়ে দুর্বলতম মিত্রকেও অবহেলা করো না।
সবচেয়ে “বাম” মিত্রকেও সম্ভাব্য বিপক্ষ হিসেবে উত্তরীণশীল কর্মসূচীতে ট্রটস্কীর সেই বিখ্যাত বক্তব্যকে আজকের সমালোচনামূলকভাবে পর্যবেক্ষণ কর।
যে সমস্ত গোষ্ঠীগুলি বাস্তবতঃ আমাদের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে তাদের সাথে আচরণ সর্বোচ্চ মনোযোগের সাথে কর; ধৈর্য এবং সাবধানতার সাথে তাদের সমালোচনা, সন্দেহ এবং দোদুল্যমানতাকে শোন এবং দেখ, তাদের মার্কসবাদের দিকে অগ্রসর হতে সাহায্য কর; তাদের খেয়ালিপনা, ভীতিপ্রদর্শন বা চরমপত্রতে ভীত হয়ো না (মধ্যপন্থীরা সবসময়েই খেয়ালী এবং স্পর্শকাতর হয় )
নীতির ক্ষেত্রে তাদের কোনরকম ছাড় দেওয়া চলবে না।
এবং আরো একবার: “যা বাস্তব সত্য তা বলতে কোনরকম ভয় পাওয়া চলবে না।”
[মধ্যপন্থা এবং চতুর্থ আন্তর্জাতিক- লিয় টুটস্কী, ফ্রেব্রুয়ারি, ২৩, ১৯৩৪ (Marxist Internet Archive)]
লেনিন - ট্রটস্কীর এসব বক্তব্য নিশ্চয়ই নয়া দিশার পছন্দ হবে না, তবে তাদের বিলোপবাদকে লেনিন-ট্রটস্কীর এসব বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে উন্মোচন করে দিয়েছে। তারা সম্ভবতঃ এ থেকে কোন শিক্ষা নেবে না। কিন্তু বিপ্লবী মার্কসবাদের পতাকাধারীদের এই শিক্ষাকে আকড়ে এগিয়ে যেতে হবে, মনে রাখতে হবে উত্তরণশীল কর্মসূচীতে ট্রটস্কীর সেই বিখ্যাত বক্তব্যকে – আজকের যুগের প্রধান সমস্যা নেতৃত্বের সমস্যা। পৃথিবী ক্রমশঃই একটা বিরাট সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদ ক্রমশঃই নিজেকে নগ্ন করে ফেলছে এবং জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছে। কিন্তু তাকে উচ্ছেদ করতে গেলে চাই একটা সঠিক নেতৃত্ব, একটা সত্যিকারের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে। সমাজ আজ গর্ভযন্ত্রণায় কাতর। বিশ্বজোড়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে আজ যা সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সেই বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়তে আসুন আমরা হাত লাগাই। এটাই আজকের প্রধান কর্তব্য।
