ইজরায়েল-পালেস্টাইন যুদ্ধ – সমাধান কোন পথে
জানুয়ারি ২০২৪

গত ৭ই অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের অভূতপূর্ব আক্রমণের পর থেকে যে যুদ্ধ প্যালেস্তাইন জুড়ে ইজরায়েল চালাচ্ছে তা বর্বরতা ও নারকীয়তার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে। যদিও মাঝখানে যুদ্ধ বিরতি হয়েছে এবং বন্দী বিনিময়ও চলেছে তবে ইতিমধ্যেই ২০ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টিনীয় ইজরায়েলের বোমা হামলায় মারা গেছে, যার মধ্যে হচ্ছে অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, অর্ধেকের বেশি মসজিদ-গির্জা কোন কিছুই ইজরায়েলের বোমা হামলা থেকে রেহাই পায়নি। যুদ্ধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কোন আইন কানুনের কোন পরোয়া না করে ইজরায়েল গাজাতে নারকীয়তার যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা বোধহয় হিটলারকেও লজ্জা দেবে। আবার ইজরায়েলের এই বর্বরতা ও পাশবিকতাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিম ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি। যদিও বিশ্বজুড়ে এমনকি খোদ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের উত্তাল ও অভূতপূর্ব প্রতিবাদের ফলে এখন কেউ কেউ কিছুটা বেসুরো গাইছে, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে ইজরায়েলের এই বর্বরতা ও নৃশংসতা এদের মদত ছাড়া সম্ভব হত না। তাই ইজরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যে ঘৃণা আছড়ে পড়ছে তা এদেরও প্রাপ্য।
তবে ইজরায়েলের ফানুস ইতিমধ্যেই অনেকটা ফেটে গেছে। হামাসকে ধ্বংস করে দেবার যে বাগাড়ম্বর তারা করেছিল এবং গাজাতে স্থল অভিযান যা তারা চালাচ্ছে তা ইতিমধ্যেই তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। এর মধ্যেই তাদের একশোর উপর ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়েছে এবং প্রচুর সেনা নিহত হয়েছে, যা তারা চেপে যাবার চেষ্টা করেছে। কেননা খোদ ইজরায়েলেই সরকার বিরোধী বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। হাজার হাজার মানুষ ইজরায়েলের রাজধানীতে পথে নেমে সরকারের পদত্যাগ দাবী করেছে। আর শুধু তো এই নয়, লেবাননের হিজবুল যোদ্ধারাও (তাদের সংখ্যা ১ লক্ষেরও বেশি) ইজরায়েলের বিরুদ্ধে টানা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে । যুদ্ধ সেখানেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। যারা সেখান থেকে ইজরায়েলে মিসাইল ছুড়েছে এবং ইজরায়েলের একটি জাহাজও আটক করে রেখেছে। লোহিত সাগরে ইজরায়েলী জাহাজে তারা আক্রমণ চালাচ্ছে। এমনকি যুদ্ধে ইজরায়েলকে মদত দানের জন্য ইরাক ও সিরিয়াতে মার্কিন ঘাটির উপর সেখানকার স্থানীয় যোদ্ধারা টানা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যা আমেরিকাকেও চিন্তিত করেছে। এই যুদ্ধ যদি আরো কিছুদিন চলে তবে সম্ভাবনা আছে তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে। ইরান ইতিমধ্যেই সেই হুশিয়ারি দিয়ে রেখেছে এবং আমেরিকার দালাল আরব রাষ্ট্রগুলোও এখন বাধ্য হয়ে বেসুরো গাইছে যা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইজরায়েলের অশুভ জোটকে অনেকটাই কোণঠাসা করেছে।
হামাসের সঙ্গে যুদ্ধে ইজরায়েল যে খুব একটা পেরে উঠছে না। তা বুঝেই আমেরিকা এখন সমঝোতায় আসবার জন্য ইজরায়েলকে চাপ দেবার অভিনয় চালাচ্ছে। ভাবখানা এমন যেন ইজরায়েল রাজী। নয়, তারাই চাপ দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করাচ্ছে। আসলে ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। পরাজয়ের আশাঙ্কায় ইজরায়েল-আমেরিকা জোট এখন যুদ্ধবিরতি এবং যুদ্ধ বন্ধ করবার কথা বলছে। ভবিষ্যতে কি ঘটবে তা ভবিষ্যত ঘটনাবলীতে পরিষ্কার হবে। কিন্তু এই যুদ্ধ তো প্রথম যুদ্ধ নয়। এর পিছনের ঘটনাবলীর দিকে তাকালে আমরা বুঝব যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি (এবং তাদের এককালের দোসর স্ট্যালিন নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত রাশিয়া) কিভাবে প্যালেস্টিনীয়দের জীবনকে নরকে পরিণত করেছে তাদের তেল দখলের স্বার্থকে চরিতার্থ করতে। হ্যাঁ, তেল, তেলই হচ্ছে সেই বস্তু যার দখলদারির জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে আরব ভূমিতে তাদের নোংরা খেলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানকার মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
আরবভূমিতে সাম্রাজ্যবাদের পদচারণা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনেক আগে থেকেই আরব ভূমিতে সাম্রাজ্যবাদীরা দখলদারি শুরু করেছে। মিশরে ১৮৮২ সালেই ব্রিটিশরা তাদের দখলদারি কায়েম করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা আরব ভূমিতে এক নোংরা খেলা শুরু করে। যেহেতু অটোমান সাম্রাজ্যের বিরোধী শক্তি ছিল ব্রিটিশরা, এবং অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ছিল। আরবরাও কেননা তারা অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে অত্যাচারিত হত, সেই সুযোগকে ব্রিটিশরা কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু করে। তাদের ভয় ছিল যে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রধান খলিফাকে যেহেতু মুসলিমরা তাদের ধর্মগুরু বলে মানে সে কারণে সমস্ত মুসলিমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। তাই আরবদের দলে টানবার জন্য তারা আরবদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে অটোমান সাম্রাজ্য যুদ্ধে পরাস্ত হলে তারা আরবদের স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরিতে মদত দেবে। এসব কথা তারা প্রকাশ্যে বলে, আর গোপনে ফ্রান্স, রাশিয়া ও ইটালির সাথে চুক্তির (Sykes-Picot চুক্তি যা ১৯১৬ সালে সম্পাদিত হয়েছিল) মাধ্যমে আরব ভূমিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ভাগাভাগি করে রাখে। ব্রিটেন পাবে প্যালেস্টাইন, ইরাক, জর্ডন ইত্যাদি এবং ফ্রান্স পাবে সিরিয়া ও লেবানন ইত্যাদি। এবং ঘটনা হচ্ছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরে সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতিষ্ঠান লীগ অব নেশনস্ এভাবেই আরবভূমিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। যা কিনা ম্যান্ডেট নামে অভিহিত করা হয়। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিক সরকার এই চুক্তি ফাঁস করে দেয় এবং আরব ও কুর্দদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। কেননা কুর্দদেরও ব্রিটেন স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
একই সাথে তারা আর এক খেলা শুরু করে, পূর্ব ইউরোপের ইহুদিদের সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে জায়নবাদীদের ব্রিটেন মদত দিতে শুরু করে এবং ১৯১৭ সালে বালফোর ঘোষণার মাধ্যমে প্যালেস্টাইনে তাদের জাতীয় বাসভূমির প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই উদ্দেশ্যে ধারাবাহিকভাবে প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের বসতি স্থাপনও শুরু হয়। যদিও তা গতি পায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, কেননা হিটলারের ইহুদি গণহত্যার পর ইহুদিরা ইজরায়েলের ব্যাপারে আকৃষ্ট হতে শুরু করে। ইহুদিদের প্যালেস্টাইনে বসতি গড়বার পেছনে সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য ছিল আরবদের বিরুদ্ধে একটা শক্তি সেখানে গড়ে তোলা যারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে আরব ভূমিতে কাজ করবে এবং আরবদের কোণঠাসা করতে তাদের সাহায্য করবে। আরবভূমিতে তেলের সন্ধান যেহেতু ইতিমধ্যেই পাওয়া গিয়েছিল, তাই সেখানে সাম্রাজ্যবাদী শকুনদের নজর পড়েছিল। আমরা জানি ১৯০৯ সাল থেকেই ইরানে ব্রিটিশরা তেলের কোম্পানি চালাচ্ছে। দি অ্যাংলো-পার্শিয়ান অয়েল কোম্পানি (APOC) তখন থেকেই চলছে। ইরাকেও সেই উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা ঘাঁটি গেঁড়েছিল। গিবসন বলেছিলেন মোশুল ভিলায়েত ছিল বৃহত্তম কার্যকরী তৈলক্ষেত্রে এবং ১৯১৮তে ফ্রান্স ব্রিটেনের হাতে ইরাক সমর্পণে রাজি হয়েছিল এই শর্তে যে তারা তেলের একটা ভাগ পাবে এবং অন্যত্র ব্রিটিশরা তাদের সাহায্য দেবে।
সুতরাং আরবভূমিতে সাম্রাজ্যবাদীদের যে আগমন ঘটেছিল তার মূল উদ্দেশ্যই ছিল তেল দখল এবং ইহুদিদের আরবদের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিয়ে “বিভক্ত কর এবং শাসন কর' এই নীতিই সাম্রাজ্যবাদীরা সেখানে নিয়েছিল।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পরিবর্তিত নীতি
তবে এটাও বাস্তব ঘটনা যে সাম্রাজ্যবাদীদের মর্জি অনুযায়ী দুনিয়া চলেনি, চলবেও না। তাই প্যালেস্টাইনে ইহুদি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে আরবদের প্রতিবাদ চলতে থাকে। ১৯২০, ১৯২১ এবং ১৯২৯-এ আরব-ইহুদি দাঙ্গা বাধে এবং ১৯৩৬-৩৯ সময়ে প্যালেস্টাইনে আরব বিদ্রোহ ঘটে। এসবের ফলশ্রুতিতে তাকে নীতি পরিবর্তন করতে হয়। ১৯৩৯ সালে নেভিল চেম্বারলেন-এর নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ সরকার আরব জায়নবাদীদের লন্ডন সম্মেলন ভেস্তে যাবার পর একটি শ্বেত পত্র (১৯৩৯) প্রকাশ করে যা সরকারের নীতি হিসেবে ঘোষিত হয়। তাতে বলা হয়-- একটা স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের পর (১০ বছরের মধ্যে) তার মধ্যে ইহুদিদের জাতীয় বাসভূমি প্রতিষ্ঠিত হবে। পিল কমিশনের (Peel Commission) প্যালেস্টাইন বিভাজনের ধারণা খারিজ করা হয়। বলা হয় পাঁচ বছরে ৭৫,০০০ জন ইহুদী অভিবাসীকে প্যালেস্টাইনে গ্রহণ করা হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবরা তারপর অভিবাসীদের সংখ্যা ঠিক করে দেবে (সেকশন II)। ম্যান্ডোটর মাত্র ৫ শতাংশ আরবভূমি ইহুদীরা কিনতে পারবে। (সেকশন III)।
ব্রিটিশদের এই হঠাৎ ভোল বদলে বলাই বাহুল্য ইহুদী সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি যেমন হাগানা (Haganan) ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তারা ব্রিটিশদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা বিল্ডিং অথবা স্থাপনাতে হামলা চালাতে থাকে। ট্রটস্কীর একটি প্রবন্ধে তিনি ইহুদীদের সাম্রাজ্যবাদী প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং ব্রিটিশদের এই ভোল বদলের উল্লেখ করেন এবং বলেন প্যালেস্টাইন ইহুদীদের কাছে রক্তাক্ত ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে। একথা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। ইহুদী সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদের ডাক দেন যা আজ প্যালেস্টাইন সমস্যার একমাত্র সমাধান বলে রাজনীতি সচেতন মানুষের কাছে প্রতিভাত হচ্ছে।
ইজরায়েলের জন্ম তবে হল কি করে? সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকার ভূমিকা
ব্রিটিশদের এই ভোল বদল সত্ত্বেও ইজরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হল কি করে? এ প্রশ্নে আলোচনা করতে গেলে আমাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাস কিছুটা জানতে হবে। সেই সময়ে ব্রিটেনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতা বেশ কমে যায়। সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে সামনের সারিতে এগিয়ে আসে আমেরিকা। অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়াও মধ্যপ্রাচ্যে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রতিষ্ঠিত করতে এগিয়ে আসে। আমরা জানি ১৯৪১ সালে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সোভিয়েত রাশিয়ার মধুচন্দ্রিমার সময় রাশিয়া ও ব্রিটেন যৌথভাবে ইরানের দখল নেয় এবং ইরানের উত্তর অংশ রাশিয়া ও দক্ষিণ অংশ ব্রিটেনের দখলে থাকে। ১৯৪৬ পর্যন্ত এই দখলদারি রাশিয়া ও ব্রিটেন এবং আমেরিকা চালিয়ে যায়। এই সময়ে উত্তর ইরানের তৈল সম্পদে রাশিয়া ৫১ শতাংশ শেয়ার-এর বিশেষ অধিকারও কায়েম করে। ১৯৪৬-এর মার্চে একটি চুক্তির বলে তারা তা করে। পরবর্তীকালে ১৯৪৭-এ নবনির্বাচিত মজলিস তা চালু রাখার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে। এই সময়ে তাদের মদত করে আমেরিকা এবং ইরানকে সোভিয়েত-এর বিরুদ্ধে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই বলে বলীয়ান হয়ে মজলিস ১৯৪৭-এর ২২ অক্টোবর সেই চুক্তি নাকচ করে। এইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে তেল-এর উপর দখলদারি রাখতে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সোভিয়েত রাশিয়ার দ্বন্দ্ব শুরু এবং তা চলতে থাকে।
প্যালেস্টাইনকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব আরো তীব্র রূপ নেয়। সোভিয়েত রাশিয়া চাইছিল মধ্যপ্রাচ্য তথা প্যালেস্টাইন থেকে ব্রিটিশদের হঠিয়ে দিয়ে সেই জায়গায় তার প্রাধান্য বিস্তার করে তেল সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদীদের নয়া সর্দার আমেরিকাও তা চাইছিল। সেই কারণে তারাও ব্রিটিশকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে তাদের আধিপত্য বিস্তারের ছক করেছিল। যদিও সেটা তারা করছিল ব্রিটেনকে সঙ্গে রেখে এবং সোভিয়েত রাশিয়া যাতে কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে পা রাখতে না পারে সেটা মাথায় রেখে। সেই লক্ষ্যে ১৯৪৬-এ রাশিয়াকে বাইরে রেখে 'অ্যাংলো-আমেরিকান কমিটি অব এনকোয়ারি ফর প্যালেস্টাইন গঠিত হয়। বলাই বাহুল্য, রাশিয়া এইসব উদ্যোগকে ভালো চোখে দেখেনি। ১৯৪৬-এর মার্চে গ্রীস এবং তুরস্ককে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান-এর ৪০০ মিলিয়ন ডলার সাহায্যে প্রদান তো রাশিয়ার প্রভাবকে প্রতিহত করার জন্যই। এদিকে ব্রিটেনের ভোল বদলের পরে জায়নবাদী নেতারা রাশিয়ার সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলে এবং কথাবার্তা চালিয়ে যায়। যদিও রাশিয়া তখন একটি ‘একক, স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক প্যালেস্টাইন'-এর পক্ষেই ছিল। সেখানে সমস্ত নাগরিক ‘সমান জাতিগত এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে।' তারা প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের অভিবাসনের বিপক্ষেও ছিল। এবং ইহুদীদের সমস্যার সবচেয়ে ভালো সমাধান হতে পারে ইউরোপের গণতন্ত্রীকরণ এবং ফ্যাসিবাদের মূল উচ্ছেদ-এর মধ্য দিয়ে এরকমটা মনে করত। (দি সোভিয়েত ইউনিয়ন অ্যান্ড দি ক্রিয়েশন অব দি স্টেট অব ইজরায়েল-- প্রফেসর গ্যাব্রিয়েল সোরো ডেটস্কি। পৃ-১৬-১৭) রাশিয়া অবশ্য প্যালেস্টাইনের দ্বিখণ্ডীকরণ-এর মাধ্যমে ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন দুটি রাষ্ট্র গঠনের কথাও পরে ভেবেছিল। (সুত্র:- ঐ, পৃ: ১৮)। কিন্তু এরপর হঠাৎই তারা ইহুদী রাষ্ট্র ইজরায়েল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এবং ইউনাইটেড নেশন্স্-এ এই প্রস্তাব তুলতে সমর্থ হয়। ইউ.এন-এর জেনারেল অ্যাসেমব্লীতে ব্রিটিশরা ১৯৪৭-এর ২৬ সেপ্টেম্বর প্যালেস্টাইন থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার-এর ঘোষণা করে। ১৬ই অক্টোবর আবার তা পুনরায় বলা হয় । এর আগেই আমেরিকা এবং রাশিয়া এই সমাধানের পক্ষে সমর্থন দেয়। নভেম্বর-এর ২৯, ১৯৪৭ ইউনাইটেড নেশন্ত্-এর জেনারেল অ্যাসেম্বলী ১৮১ নং প্রস্তাবে প্যালেস্টাইন-এর বিভাজন এবং একটি ইহুদী রাষ্ট্র ও একটি আরব রাষ্ট্র গঠনে সায় দেয়। বলাই বাহুল্য আমেরিকা ও রাশিয়া তার পক্ষে দাঁড়ায় ।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্যের তেল দখলের জন্য ইজরায়েল রাষ্ট্রগঠনে সায় দিয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়া তার পুরনো সমস্ত চিন্তা ভাবনাকে বদলে হঠাৎ কেন ইজরায়েল গঠনে আগ্রহী ভূমিকা নিল? আসলে আমেরিকার মত তারও উদ্দেশ্য ছিল ইজরায়েল-এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সাম্রাজ্য তার নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু পরবর্তীকালে ইজরায়েল যে আমেরিকার দালালে পরিণত হবে তা দীর্ঘদিন আগেই মার্কসবাদ পরিত্যাগকারী স্ট্যালিন ভেবে উঠতে পারেননি। আমলাতন্ত্রের মোটা মাথা শ্রেণীস্বার্থের একতাকে কখনোই বুঝে উঠতে পারে না। আর সে কারণেই বার বার বুর্জোয়াদের মধ্যে তারা প্রগতিশীল খুঁজে পেতে থাকে ।
সোভিয়েত রাশিয়া ভেবেছিল ইজরায়েলকে হাতে রেখে তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধ করবে, কিন্তু ইহুদী ধনকুবেরদের সাথে আমেরিকান পুঁজিপতিদের সম্পর্ক যথেষ্ট নিবিড় ছিল শ্রেণীগত স্বার্থেই। সুতরাং সোভিয়েত রাশিয়াকে দিয়ে তাদের কাজ উদ্ধার হয়ে যাবার পর তারা শ্রেণীস্বার্থেই আমেরিকাকে আঁকড়ে ধরল। কারণ উভয়েই তো পুঁজিবাদের ধারক-বাহক। বেচারা স্ট্যালিন ও তার শাকরেদরা। বদনামের ভাগীদার তারা হল, আরবভূমিতে তাদের অনুগামী কমিউনিস্ট পার্টিগুলি দিশাহীন হয়ে পড়ল আর গোটা ঘটনা থেকে ফায়দা লুটল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। আর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হল প্যালেস্টিনীয় জনগণ। তারা তাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হল । তাদের জমি-বাড়ি সবই অভিবাসী ইহুদীরা দখল করে নিল। নিজ ভূমে তারা হল পরবাসী এবং সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই শুরু হল তাদের উদ্বাস্তু জীবন, যা আজো চলছে এবং আরো বেশি বেশি প্যালেস্টিনীয় উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। যে গাজা এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক আজ প্যালেস্টিনীয়দের বাসভূমিতে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে সেখানেও ক্রমশ ইহুদী বসতি একের পর এক স্থাপিত হয়ে যাচ্ছে এবং প্যালেস্টিনীয়রা নতুন করে উদ্বাস্তু হয়েই চলেছে।
আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ
তবে সাম্রাজ্যবাদীদের এই চাপিয়ে দেওয়া ইহুদী রাষ্ট্রকে প্যালেস্টিনীয়রা তো মানেইনি, আরব রাষ্ট্রগুলিও মেনে নেয়নি। তাদের সাথে ইজরায়েলের ধারাবাহিক যুদ্ধ চলতে থাকে। প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ বাধে ১৯৪৮-এ, ইজরায়েল গঠনের সাথে সাথেই। সেই যুদ্ধে মিশর গাজা স্ট্রিপ এবং জর্ডন ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক দখল করে নেয়। যা ১৯৬৭ পর্যন্ত তাদের দখলেই ছিল। ১৯৫৬ সালে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স সুয়েজ ক্যানালের নিয়ন্ত্রণ দখল করবার জন্য মিশরকে আক্রমণ করে। মিশর এই জোটকে যুদ্ধে পরাস্ত করে। ইজরায়েল সিনাই দখল করলেও আন্তর্জাতিক চাপের ফলে হার মানতে বাধ্য হয়। এরপর ১৯৬৪ সালে আরব সরকারগুলির মদতে প্যালেস্টিনীয়রা তাদের সংগ্রামী সংগঠন PLO তৈরি করে যাদের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠন। PLO-র নেতৃত্বে প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলতে থাকে এরপর তৃতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ হয় ১৯৬৭তে। ছয়দিন এই যুদ্ধ চলে। ইজরায়েল জর্ডন, মিশর এবং সিরিয়াকে আক্রমণ করে। গাজা, সিনাই, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক এবং সিরিয়ার গোলান হাইটস ইজরায়েল দখল করে নেয়। চতুর্থ আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ বাধে ১৯৭৩ সালে, যা ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে মিশর ও সিরিয়াকে ইজরায়েল পর্যুদস্ত করলেও সোভিয়েত রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ফলে ইউএনও-র উদ্যোগে যুদ্ধ বিরতি হয় ।
এরপর থেকেই আস্তে আস্তে আরব রাষ্ট্রগুলি ইজরায়েলের সাথে শাস্তির পথে এগোতে থাকে। ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির সুবাদে ইজরায়েল মিশরকে সিনাই উপদ্বীপ ফিরিয়ে দেয় এবং ১৯৭৯ সালে মিশর-ইজরায়েল শান্তি চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে প্রথম মিশর ইজরায়েলকে 'আইনসম্মত বৈধ রাষ্ট্র’ বলে মেনে নেয়। এরপর জর্ডন হচ্ছে দ্বিতীয় আরব রাষ্ট্র যারা ১৯৯৪ সালে একই কাজ করে। এরপর আব্রাহাম চুক্তির বলে এই ২০২০-র শেষার্ধে একের পর এক সমঝোতাচুক্তি হয় ইজরায়েল এবং আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে। যার মধ্যে আছে আরব আমিরশাহি (UAE), বাহরাইন এবং মরক্কো ও সুদান। এইভাবে আরব রাষ্ট্রগুলি তাদের নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থে প্যালেস্টিনীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ইজরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে।
ভাঙ্গন প্যালিস্টিনীয় মুক্তি সংগ্রামে
১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে প্যালেস্টিনীয়দের প্রথম ইন্তিফাদা বা বিদ্রোহ শুরু হয়, এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯৩ সালে অসলো শান্তিচুক্তির মাধ্যমে প্যালেস্টিনীয় কর্তৃপক্ষ গঠন করে গাজা ও পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় সীমিত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। এর সময়সীমা ছিল পাঁচ বছরের জন্য। তারপর সীমান্ত, উদ্বাস্তু এবং জেরুজালেমের মর্যাদা নিয়ে, ইজরায়েলি সৈন্যের উপস্থিতি এবং প্যালেস্টাইনের স্বায়ত্তশাসন স্বীকার করে নেওয়ার পর সৈন্যদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায়। কি করা হবে ও প্যালেস্টিনীয়দের ফিরে আসার অধিকারের ব্যাপারে ভবিষ্যতে আলোচনার কথা বলা হয়। তবে অসলো চুক্তিতে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠন নিয়ে কিছু বলা হয়নি।
পিএলও এই চুক্তির পরে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের রাস্তা থেকে সরে আসে এবং ইজরায়েল রাষ্ট্রের বৈধতাকে মেনে নেয়। এর ফলে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া হামাস (যারা কিনা মুসলিম ব্রাদারহুডের প্যালেস্টিনীয় শাখা হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং যাদের সম্পর্কে অনেকেই মনে করে যে ইজরায়েলই হামাস গঠনে মদত দিয়েছিল পিএলওকে কোণঠাসা করার জন্য)। পিএলও-র বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং ইজরায়েলকে তারা স্বীকৃতি দেয় না। এর ফলে হামাস ক্রমশই প্যালেস্টিনীয়দের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, (২০০০-২০০৫ সালের দ্বিতীয় ইস্তিফাদা হামাসের জনপ্রিয়তা বাড়ায়) এবং ২০০৬ সালে তারা নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গাজার শাসন কর্তৃত্ব দখল করে। এর আগে থেকেই পিএলও-র সাথে তাদের সংঘাত চলছিল এবং ২০০৭ সালে তারা পিএলওকে গাজা থেকে বহিষ্কার করে। ইজরায়েল হামাস কর্তৃত্বাধীন গাজাকে অবরোধ করে, এমনকি সমুদ্রপথেও তারা গাজাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। এর ফলে গাজার মানুষের জীবনযাত্রা নরকের সমতুল্য রূপ ধারণ করে। আর এর বিরুদ্ধে যেহেতু হামাস প্রতিরোধ সংগ্রাম চালাচ্ছিল তাই হামাসের জনপ্রিয়তা ক্রমশই বাড়তে থাকে।
হামাস প্রসঙ্গে আমাদের মত
হামাস এর আগেও ইজরায়েলের সাথে যুদ্ধ চালিয়েছে। ২০০৮-০৯, ২০১২, ২০১৪ এবং ২০২১ সালে তারা ইজরায়েলের সাথে যুদ্ধ করেছে। ২০২৩-এর যুদ্ধ অবশ্যই মাত্রাগতভাবে আগের থেকে অনেক বড়। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে হামাস-এর এই যুদ্ধ প্যালেস্টাইনবাসীদের জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম, কাজেই একে অবশ্যই সমর্থন করতে হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও হামাসের রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত চিন্তাকে আমরা সমর্থন করি না। তারা মূলত মৌলবাদী একটি দল-- মুসলিম মৌলবাদী ---- যারা স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। আমরা এর বিরোধী, আমরা মনে করি তাদের এই রাজনীতি প্যালেস্টাইনী সমাজকে পিছন দিকে টেনে নিয়ে যাবে যা প্রগতির পরিপন্থী। যদিও এটা বাস্তব ঘটনা, প্যালেস্টাইনের কমিউনিস্ট পার্টি (স্ট্যালিনবাদী)-র শ্রেণী সমঝোতার রাজনীতিই হামাসের উত্থান ঘটাতে সাহায্য করেছে, কিন্তু তাই বলে আমরা তাকে সমর্থন করতে পারি না। মৌলবাদী রাষ্ট্রের দ্বারা যে প্যালেস্টাইন মুক্তি আন্দোলনকে ধ্বংসের খেয়াল রাখা দরকার হামাস নিয়ন্ত্রিত হয় ইরানের আধিপত্যবাদী দিকে নিয়ে যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার সাথে ইরানের দহরম-মহরম মার্কিন ও রুশ সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে রুশ সাম্রাজ্যবাদের কোলে প্যালেস্টাইনের মুক্তি আন্দোলনকে নিক্ষেপ করতে পারে। যা প্যালেস্টাইনের মুক্তি আন্দোলনের বিনাশ ঘটাবে সেক্ষেত্রে রুশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে হামাস পরিবর্তিত হতে পারে, যার সম্ভাবনা খুবই বেশি। সেরকম ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই প্যালেস্টাইনের মুক্তি আন্দোলন প্রসঙ্গে নতুন করে ভাবব, তবে বর্তমানে আমরা অবশ্যই প্যালেস্টাইনের মুক্তি আন্দোলনের পক্ষে আছি এবং প্যালেস্টাইনের জনগণকে হামাস সম্পর্কে সতর্ক করব। একটি সত্যিকারের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যদি প্যালেস্টাইনী জনগণ জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে যুক্ত করতে না পারেন তবে হামাসের মাধ্যমে রুশ সাম্রাজ্যবাদের দালালিতে লিপ্ত হতে পারে প্যালেস্টাইনের মুক্তি সংগ্রাম। যা তাদের স্বাধীনতা অর্জনে বাধা দেবে এবং তাদের সংগ্রামকে কালিমালিপ্ত করবে। তাই হামাস নয়, প্যালেস্টাইনের শ্রমিকশ্রেণীকে গড়ে তুলতে হবে সত্যিকারের একটা কমিউনিস্ট পার্টি। সেটাই হবে একমাত্র মুক্তির পথ।
দ্বি-রাষ্ট্রেই কি সমাধান ?
রাষ্ট্রসংঘ যখন ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠন করার প্রস্তাব নিয়েছিল, তখনই আর একটি প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। যদিও আজ পর্যন্ত তা হয়নি। এখন অনেকেই এমনকি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কমিউনিস্ট নামধারী দলগুলি এই সমাধানের কথা বলছে। আমরা এই মতামতের চূড়ান্ত বিরোধী।
ইজরায়েল সম্পূর্ণ অবৈধ একটি রাষ্ট্র বলে আমরা মনে করি। প্যালেস্টাইনীদের জমি ও বাড়ি দখল করে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সুতরাং এটা একটা দখলদার রাষ্ট্র। শুধু তাই নয়, সব সময়েই তা প্যালেস্টাইনীদের জমি দখল করে চলেছে। এই দখলদার রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ উচ্ছেদই আমরা কামনা করি। এক্ষেত্রে একমাত্র যুক্তিসংগত সমাধান হচ্ছে একটি প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠন। অনেকে অবশ্য প্রশ্ন তুলবেন তাহলে ইহুদীদের কি হবে? তাহলে কি প্যালেস্টাইন থেকে ইহুদীদের বহিষ্কার করা হবে? না, আমরা তারও পক্ষপাতী নই । আমরা মনে করি পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যে কেউ এসে বসবাস করতে পারে। তাদের কাউকে বহিষ্কার করার কোন অধিকার কোন রাষ্ট্রের নেই। আমরা যেমন ভারতে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশীদের বহিষ্কারের বিপক্ষে, একইভাবে নবগঠিত প্যালেস্টাইন থেকে ইহুদীদেরও বহিষ্কারের বিরুদ্ধে। প্যালেস্টাইনে প্যালেস্টাইনীদের যা যা অধিকার থাকবে, ইহুদীদেরও একই অধিকার থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি। ইজরায়েল গঠনের আগে যেভাবে ইহুদী, মুসলিম এবং খ্রীষ্টানরা শান্তিপূর্ণভাবে সেখানে বসবাস করত, ভবিষ্যৎ নবগঠিত প্যালেস্টাইনে আবার সেইভাবেই সকল নাগরিকরা বসবাস করবে, সেটাই হওয়া উচিত। তবে এসব ব্যাপার আদৌ এই পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার মধ্যে সম্ভব হবে বলে আমাদের মনে হয় না। সেজন্য প্যালেস্টাইনকে তথা গোটা আরব দুনিয়াকে সমাজতন্ত্রের রাস্তা ধরতে হবে। উচ্ছেদ করতে হবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। ১৯৩৭-৪০ সালেই ট্রটস্কী ইহুদীদের সতর্ক করেছিলেন যে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ-এর অধীনে প্যালেস্টাইনে ইহুদী রাষ্ট্রের গঠন রক্তাক্ত ফাঁদে পরিণত হতে পারে। বাস্তবত আজ তাই হয়েছে। ইহুদীরা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র গঠন যদি করতে চান তবে তা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে সমস্ত জাতিগুলির মানুষের সাথে আলোচনার ভিত্তিতেই তা করতে হবে-- ট্রটস্কী এরকমটাই বলেছিলেন। আমরাও তাই মনে করি। বর্বর মৌলবাদী ইজরায়েল রাষ্ট্র ধ্বংস হোক। স্বাধীন প্যালেস্টাইন গঠনই সমস্যার সমাধান। আরব সমাজতান্ত্রিক ফেডারেশনই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান ।
