header

🄯 Made by devolskii

logo

কমিউনিস্ট পার্টি ও যুব কমিউনিস্ট লীগের আন্তঃসম্পর্ক এবং মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর ভুয়ো ট্রটস্কিবাদ

আগস্ট ২০২২


কমিউনিস্ট পার্টি ও যুব কমিউনিস্ট লীগের আন্তঃসম্পর্ক এবং মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর ভুয়ো ট্রটস্কিবাদ
"... প্রলেতারীয় বিপ্লবকে এগিয়ে নেওয়ার যুক্ত সংগ্রামে চরমতম ঐক্য এবং কঠোরতম কেন্দ্রীকরণ আবশ্যক।"

কমিউনিস্ট যুব লীগ-এর কথা আমরা কম বেশি সকলেই জানি বা শুনেছি। যদিও ভারতে কমিউনিস্ট যুব লীগ-এর অস্তিত্বের কথা বিশেষ শোনা যায় না, কেননা এখানে কমিউনিস্ট পার্টি নামধারী দলগুলো যেহেতু সকলেই প্রায় ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবে’বিশ্বাসী, সুতরাং তাদের যুব সংগঠনগুলো সেই কারণে ‘গণতান্ত্রিক’ যুব সংগঠন হিসেবে নিজেদের দাবি করে। যেহেতু ভারতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা তারা ভাবেই না, সুতরাং কেন ‘কমিউনিস্ট যুব লীগ' গড়া হবে—এরকমটাই তারা সকলে মনে করে। সেই কারণে এখানে ‘কমিউনিস্ট যুব লীগ গড়াও হয়নি বা হয় না এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক কিরকম হবে সেই চর্চাও বিশেষ নেই। “ওসব রাশিয়া বা পশ্চিম ইউরোপের ব্যাপার’--এরকম একটা মনোভাব নিয়ে সকলে চলতে অভ্যস্ত। আর সেই কারণে এখানে এসব বিষয়ে বিশেষ লেখাপত্র আমরা পাই না। তবে ভূয়া ট্রটস্কিবাদী মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর কল্যাণে এ বিষয়ে কিছু বিতর্ক আমাদের সামনে এসেছে। লেনিনবাদী-টুটস্কিবাদী রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এই গোষ্ঠীটি কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট যুব লীগের মধ্যেকার সম্পর্ক প্রসঙ্গে দাবি করেছে যে কমিউনিস্ট যুব লীগ নাকি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে এবং শুধু এটা বলাই নয়, তাদের প্রতিষ্ঠিত যুব কমিউনিস্ট লীগ নাকি এরকম স্বাধীন একটি সংগঠন! এটাই তাদের দাবি। মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর এসব আবোল-তাবোল প্রলাপ বকা অবশ্য নতুন কিছু নয়, তারা এসব করতে অভ্যস্ত। মার্কসীয় তত্ত্ব বা কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস কোন কিছুই তারা জানে না। এদিক-ওদিক উড়ো কিছু খবরকে সম্বল করেই তারা চলে থাকে। কিন্তু তাদের এইসব কথাবার্তা বা কার্যকলাপ ট্রটস্কিবাদের বদনাম করছে। কেননা বাস্তবে তারা যাই হোক, নিজেদেরকে তারা ‘ট্রটস্কিবাদী' বলে দাবি করে। কাজেই কমিউনিস্ট পার্টি ও যুব কমিউনিস্ট লীগের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে তাদের দাবি যে সম্পূর্ণ লেনিনবাদ-ট্রটস্কিবাদ বিরোধী তা প্রমাণ করে এ ব্যাপারে প্রকৃত লেনিনবাদী-ট্রটস্কিবাদী দৃষ্টিভঙ্গী আমরা এখানে তুলে ধরব। ট্রটস্কিবাদের নাম করে ট্রটস্কিবাদবিরোধী রাজনীতির যে প্রচার তাঁকে প্রতিহত করাটা আমাদের কর্তব্য বলেই আমরা মনে করি।

যুব কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

অনেকের ধারণা আছে যে বোধহয় রুশ বিপ্লবের সাথেই যুব কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্ম হয়েছে, ধারণাটা কিন্তু ঠিক নয়। আমরা জানি যে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক তৈরি হবার আগে বিভিন্ন দেশের মার্কসীয় দলগুলি সমাজতন্ত্রী দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতো। যেমন রাশিয়ার মার্কসবাদী পার্টির নাম ছিল- আরএসডি এলপি-- রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি। সেই সময়ে তাদের অনুগামী যুব সংগঠনগুলিও সেভাবেই নিজেদের নামকরণ করত- যেমন, সোশ্যালিস্ট ইয়ুথ লীগ। বিভিন্ন দেশে নামকরণ আলাদা আলাদাই হত। এরকম প্রথম যুব সংগঠন তৈরি হয়েছিল। বেলজিয়ামের ঘেন্ট (Ghent) শহরে। নাম ছিল ইয়ং গার্ডস। সেটা ছিল ১৮৮৬ সাল। এরপর যুব সংগঠন তৈরি হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে (১৯০০), ইতালিতে (১৯০১), নরওয়েতে (১৯০২), অস্ট্রিয়াতে (১৯০৪), হাঙ্গেরিতে (১৯০৫), ডেনমার্কে (১৯০৫), জার্মানিতে (১৯০৬), স্পেনে (১৯০৬) এবং ফিনল্যান্ডে (১৯০৬)।

ইউরোপের প্রায় সব দেশেই পর পর এরকম যুব সমাজতন্ত্রী সংগঠন তৈরি হওয়া দেখে কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে সমাজতন্ত্রী দলগুলো হয়তো এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহী ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই তা ছিল না। সব দেশগুলোতেই সমাজতন্ত্রী দলগুলি স্বতন্ত্রভাবে যুব সমাজতন্ত্রী সংগঠন তৈরি হওয়াটাকে মোটেই ভালো চোখে দেখেনি। তারা কম-বেশি সকলেই একে বিরোধিতা করেছিল। যেমন জার্মানি, রাশিয়া ইত্যাদি। রুশ মেনশেভিক নেতা লারিন তো প্রকাশ্যেই তার বিরোধিতাকে ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯০০ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সম্মেলনের সময় আন্তর্জাতিক যুব সংগঠন গড়ার প্রথম উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ১৯০৭ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের স্টুটগার্ট কংগ্রেসের পর আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার আরেকটি প্রচেষ্টা হয়। সেটা সফলও হয়। প্রথম আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯০৭-এর ২৪ থেকে ২৬ অগাস্ট। সেখানে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলির সমাজতন্ত্রী যুব লীগগুলির ৬০,০০০ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে ২০ জন প্রতিনিধি ছিলেন। ঐ সম্মেলনে সমাজতন্ত্রী যুব সংগঠনগুলির আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়বার সিদ্ধান্ত হয়, যা যুব সমাজতন্ত্রী আন্তর্জাতিক হিসেবে পরিচিত হয়। ঐ সম্মেলন যুব আন্তর্জাতিকের একটি ব্যুরোকে নির্বাচিত করে যার চেয়ারম্যান হন কার্ল লিবনে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে সমাজতন্ত্রী দলগুলি এই স্বতন্ত্র যুব সমাজতন্ত্রী সংগঠন গঠনকে খুব একটা ভালো চোখে দেখেনি। ১৯০৮ সালে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ন্যুরেমবার্গ কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয় যাতে যুব লীগগুলির স্বাধীন অস্তিত্বকে নিন্দা করা হয়।

সমাজতন্ত্রী যুব সংগঠনগুলির দ্বিতীয় বিশ্ব সম্মেলন হয় ১৯১০-এর সেপ্টেম্বরে কোপেনহেগেনে। এই সম্মেলনে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে সমাজতন্ত্রী যুব সংগঠনগুলির আন্তর্জাতিক লীগ দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে যোগ দেয়। সমাজতন্ত্রী যুব সংগঠনগুলি গোটা ইউরোপ জুড়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। তাদের সদস্য সংখ্যাও বাড়তে থাকে ভালো পরিমাণে। সমাজতন্ত্রী নেতারা যদিও স্বাধীন সমাজতন্ত্রী যুব সংগঠনের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু সেগুলির গঠনকে আটকাতে না পেরে তারা এগুলোকে নিবীর্য করবার চেষ্টা শুরু করেন। যুব লীগগুলো যাতে রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ না করে তার জন্য তারা সতত সচেষ্ট ছিলেন। তাদের প্রচেষ্টা ছিল যুব লীগগুলিকে সাংস্কৃতিক কাজকর্মের মধ্যে বেঁধে রাখবার। এর জন্য তাদের উপর আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ তারা কায়েম করেন। যার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আবার যুব লীগের কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে লেনিন সেই সময়ে বলেছিলেন, “..... আমরা নিশ্চিতভাবে যুব লীগগুলির সাংগঠনিক স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াব, তা শুধুমাত্র এই কারণে নয় যে সুবিধাবাদীরা এই ধরনের স্বাধীনতাকে ভয় পায়, বরঞ্চ বিষয়টার চরিত্রগত কারণেই আমরা তা করব। কারণ যদি না তাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে তবে যুবরা তাদের মধ্য থেকে ভালো সমাজতন্ত্রীদের প্রশিক্ষিত করতে অথবা সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিজেদের প্রস্তুত করতে সমর্থ হবে না।”

এটা ভেবে নেবার কোন কারণ নেই যে যুব লীগের উপর সমাজতন্ত্রী নেতাদের কোন প্রভাবই ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সমাজতন্ত্রী নেতাদের বেইমানির ফলে যেমন সমাজতন্ত্রী পার্টিগুলিতে ভাঙন ঘটে এবং তার ফলশ্রুতিতে রুশ বিপ্লবের পর ১৯১৯ সালে তৈরি হয় তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক, একইভাবে যুব সমাজতন্ত্রী আন্তর্জাতিকেও ভাঙন ঘটে এবং দেশে দেশে তৈরি হয় কমিউনিস্ট যুব লীগগুলি, যারা সকলে সম্মিলিত হয়ে পরবর্তীকালে তৈরি করে আন্তর্জাতিক যুব কমিউনিস্ট লীগ। দেশে দেশে যুব সমাজতন্ত্রী লীগগুলি ভেঙেই যুব কমিউনিস্ট লীগ তৈরি হয়। সমাজতন্ত্রী নেতাদের বেইমানি এবং যুব লীগগুলির উপর তাদের আমলাতান্ত্রিক আচরণ ও নিয়ন্ত্রণের কারণে যুব লীগগুলির কর্মীরা ব্যাপকভাবেই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের উপর বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। রুশ বিপ্লবের পরে দলে দলে তারা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ত্যাগ করে কমিউনিস্ট যুব লীগ তৈরি করতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও আন্তর্জাতিক যুব কমিউনিস্ট লীগ তৈরি হয়। আমরা সে প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনায় যাচ্ছি না। শুধু তথ্য হিসেবে দু-একটা ঘটনা তুলে ধরছি। প্রথম সারা রাশিয়া শ্রমিক এবং কৃষক যুব লীগের সম্মেলন ২৯ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর ১৯১৮-তে মস্কোতে অনুষ্ঠিত হয়। এটাই ছিল রাশিয়ার ইয়ং কমিউনিস্ট লীগের (আরওয়াইসিএল) প্রথম সম্মেলন। অন্যদিকে ঐ বছরেই ইউরোপের সরকারি সমাজতন্ত্রী যুব সংগঠনগুলি- জার্মান, নেদারল্যান্ডস এবং ফরাসি বাদে--- পুনর্গঠিত IVSJO (International Union of Socialist Youth Organisations ) তে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯১৯-এর মার্চে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গঠনের সাথে সাথেই IVSJO-তে বিরাট প্রভাব পড়ে এবং ২০ নভেম্বর ১৯১৯-এ যুদ্ধের পর তার প্রথম সম্মেলনে তার নাম পরিবর্তিত করে রাখে “ইয়ং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল” বা “YCI” বা যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক।”

YCL কি স্বাধীন হবে নাকি পার্টি নিয়ন্ত্রিত হবে?

যুব কমিউনিস্ট লীগ-এর গঠনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরার পর এবার আমরা আমাদের মূল আলোচনায় ঢুকবো। YCL কি স্বাধীন হবে নাকি তা কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে?

আমাদের প্রথমেই যেটা বোঝা দরকার তা হল যুব সমাজতন্ত্রী লীগগুলি সমাজতন্ত্রী নেতাদের দ্বারা আমলাতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হবার কারণে তাদের মধ্যে ‘স্বাধীন’ সংগঠনের একটা আকাঙ্খা গড়ে উঠেছিল। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যুব কমিউনিস্ট লীগের মধ্যেও এই ‘স্বাধীনতা’-র ধারাটি শক্তিশালী ছিল। বিশেষতঃ ঐ সময়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে অতি-বাম ধারার একটা প্রভাব ছিল, তারাও এই প্রবণতাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিল। এটা তাই খুব অস্বাভাবিক কোন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু একটা বিষয় আমাদের মাথায় রাখা দরকার, তা হল কমিউনিস্ট পার্টি ও যুব লীগ-এর মধ্যে ফারাকটা কি? কমিউনিস্ট পার্টি সমস্ত বয়সী কমিউনিস্টদের নিয়ে তৈরি হয় আর যুব লীগ তৈরি হয় কেবলমাত্র যুব-ছাত্রদের নিয়ে। পার্টির সাথে লীগ সদস্যদের ফারাক এখানেই যে লীগ সদস্যরা কমিউনিস্ট আন্দোলনে অনভিজ্ঞ এবং তত্ত্বগতভাবে দুর্বল। সুতরাং তারা যদি পার্টির দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত না হয় তাহলে তাদের বিরাট বিরাট ভুল করাটা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায় যা কিনা কমিউনিস্ট আন্দোলনকেই দুর্বল করে। তাই কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্বার্থেই পার্টির পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। যদিও যুব লীগের সাংগঠনিক স্বাধীনতা বজায় রেখেই তা করতে হবে এবং এই নিয়ন্ত্রণ সমাজতন্ত্রী নেতাদের মতো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ হলে চলবে না। তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতৃত্ব কিন্তু এরকমটাই মনে করতেন। তৃতীয় আন্তর্জাতিকের এই প্রসঙ্গে কিছু সিদ্ধান্ত তুলে ধরে আমরা তা দেখাবার চেষ্টা করছি।

কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে নিয়মাবলী গ্রহণ করা হয় যেখানে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে YCI-র অন্তর্ভুক্তির একটি বিশেষ ধারা ছিল। ধারাটি বলছে, “ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কমিউনিস্ট ইয়ুথ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের এক পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য এবং তার কার্যনির্বাহী সমিতি ( Executive Committee)-র অধীনস্থ। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কমিউনিস্ট ইয়ুথ কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল-এর কার্যনির্বাহী সমিতিতে নির্দ্ধারক ভোটের অধিকারসহ একজন প্রতিনিধিকে যোগ দিতে পাঠাবে।” (দি ইয়ং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ইটস্ অরিজিনস- ভিক্টর প্রিভালভ, পৃ:-১৪০)।

“... কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী সমিতি জোর দিয়ে বলেছিল যে কিছু পশ্চিম ইউরোপীয় দেশে নতুন প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলি এবং যুব সংগঠনগুলির সম্পর্কে একটা বিরাট পার্থক্য আছে এবং দলিলে এটা নির্দিষ্টভাবে বলেছিল যে এর মূল কারণ হচ্ছে যে দেশগুলিতে নতুন শ্রমিক সংগঠনগুলি গড়ে উঠেছে, সেখানে এখনো পর্যন্ত কোন কমিউনিস্ট পার্টি নেই এবং তারা সেখানে বহু বছর পর সংস্কারবাদী এবং আপোষকামী চিন্তাধারা দ্বারা দূষিত সমাজতন্ত্রী দলগুলির ছেঁদো অভিভাবকত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে যুব সংগঠনগুলির জন্য সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক স্বাধীনতা দাবি করে যুবরা ঠিকই করেছে। যাই হোক, ঘটনা এটাও যে কিছু দেশে যেখানে ইতিমধ্যেই কমিউনিস্ট পার্টি আছে, যুব সংগঠনগুলি সেখানেও সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করছে এবং তার ফলে ‘সোশ্যাল প্যাট্রিয়টিক পার্টিগুলির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সাথে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির সাথে সম্পর্ককে গুলিয়ে ফেলছে।' তারা শ্রমিক শ্রেণীর সাধারণ উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং শ্রমিক শ্রেণীর শত্রুদেরকে তাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত হতে সমর্থ করছে। (সূত্র-ঐ, পৃ:-১৪০-৪১)

কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী সমিতি আরো একবার কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এবং YCI-র মধ্যেকার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিষ্কার এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছিল--- “কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের একটা অংশ হয়ে, যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবগুলিকে এবং তার কার্যনির্বাহী সমিতির রাজনৈতিক নির্দেশিকাগুলিকে অবশ্যই মান্য করবে এবং আন্তর্জাতিক যুব আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিতে, সংগঠিত ও বিকশিত এবং এককাট্টা করতে স্বাধীনভাবে তার কাজ চালিয়ে যাবে।” (সূত্র, ঐ, পৃ:-১৪২)।

এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তৃতীয় কংগ্রেসের গৃহীত সিদ্ধান্ত--“দি কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড দি কমিউনিস্ট ইয়ুথ মুভমেন্ট' নামক গৃহীত প্রস্তাবটি, যা গৃহীত হয়েছিল ১২ জুলাই, ১৯২১-এ।

এই প্রস্তাবের ৫ নং পয়েন্টে বলা হয়েছিল-“যুব কমিউনিস্ট সংগঠনগুলি এবং কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেকার সম্পর্ক বিপ্লবী যুব সমাজতন্ত্রী সংগঠনগুলি এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিগুলির মধ্যেকার সম্পর্কের থেকে মৌলিকভাবে পৃথক। প্রলেতারীয় বিপ্লবকে এগিয়ে নেওয়ার যুক্ত সংগ্রামে চরমতম ঐক্য এবং কঠোরতম কেন্দ্রীকরণ আবশ্যক। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অবশ্যই থাকবে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের হাতে এবং জাতীয় ক্ষেত্রে তা থাকবে সংশ্লিষ্ট জাতীয় শাখার হাতে।

যুব কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির কর্তব্য হচ্ছে এই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অনুসরণ করা (তার কর্মসূচি, কৌশলগুলি এবং রাজনৈতিক নির্দেশিকাগুলি) এবং সাধারণ বিপ্লবী ফ্রন্টে একীভূত হয়ে যাওয়া।

… যে সমস্ত রাজনৈতিক কৌশলগত প্রশ্নগুলি কমিউনিস্ট যুব সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে আলোচিত হয়, যা তারপর একটা অবস্থান গ্রহণ করে এবং নিজ দেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলি অনুযায়ী তার মধ্যে কাজ করে, কোন অবস্থাতেই তাদের বিরুদ্ধে কাজ করে না।

যদি কমিউনিস্ট পার্টির সাথে কমিউনিস্ট যুব সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থাকে তবে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী সমিতির কাছে তার আবেদন করবার অধিকার আছে।

রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব কোনভাবেই সাংগঠনিক স্বাধীনতার অভাবকে বোঝায় না যা কিনা রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য খুবই জরুরি।

… যে সমস্ত দেশে ঐতিহাসিক অগ্রগতি যুবদের পার্টির উপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে, সেই নির্ভরশীলতাকে বজায় রাখতে হবে, দুটো সংগঠনের মধ্যে পার্থক্যগুলি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী সমিতি এবং যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী সমিতির দ্বারা মীমাংসিত হবে।

৬ নং পয়েন্টে বলা হয়েছে-

“যুব কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির সবচেয়ে আশু এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যগুলির একটি হচ্ছে রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা, যা কিনা, যুব সংগঠনগুলি যে সময়ে চূড়ান্ত স্বাধীনতা ভোগ করত সেই সময় থেকে চলে আসছে এবং এখনো কিছু সদস্য যার সমর্থক।

এই প্রসঙ্গে ৮ নং পয়েন্টে বলা হয়েছে —

‘কমিউনিস্ট যুব আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের একটি শাখা, এর কংগ্রেস এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তসমূহের দ্বারা তা আবদ্ধ। যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এই সমস্ত সিদ্ধান্তগুলির কাঠামোর মধ্যে তার কাজ চালায় এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের রাজনৈতিক লাইন তার সমস্ত শাখাগুলির কাছে সে পাঠায়। একটি পারস্পরিক বা অন্যোন্যক প্রতিনিধিত্বের সু-বিকশিত ব্যবস্থা এবং ঘনিষ্ঠ ও ধারাবাহিক সহযোগিতা কমিউনিস্ট যুব আন্তর্জাতিকের সমস্ত ধরনের কার্যকলাপে তাকে লাভবান করবে (নেতৃত্ব, বিক্ষোভ, সংগঠন এবং কমিউনিস্ট যুব সংগঠনগুলিকে সাহায্য ও শক্তিশালী করার কাজে)। (সূত্র-উইকিপিডিয়া, Transcribed Andy Blwnden- থিসিস রেজোলিউশান অ্যান্ড ম্যানিফেস্টোস অব দি ফার্স্ট ফোর কংগ্রেসেস অব দি থার্ড ইন্টারন্যাশনাল। অনুবাদ- অ্যালিক্স হল্ট এবং বারবারা হল্যান্ড, Ink Link 1980)

কমিউনিস্ট পার্টি এবং কমিউনিস্ট যুব লীগের মধ্যেকার সম্পর্কের ব্যাপারে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের বক্তব্য আমরা এতক্ষণ দেখলাম। এবার রুশ কমিউনিস্ট পার্টি ১৯১৯ সালে তার অষ্টম কংগ্রেসের পর এ ব্যাপারে কি নির্দেশিকা ঘোষণা করেছিল তা আমরা দেখবো।

ঐ কংগ্রেসের পর, যুব কমিউনিস্ট লীগের (YCI) ২৬ থেকে ২৮ এপ্রিল, ১৯১৯-এ সংগঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনারি মিটিং-এ যুব কমিউনিস্ট লীগ এবং কমিউনিস্ট লীগের মধ্যেকার সম্পর্কের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পার্টি কংগ্রেসে এবং যুব লীগের প্লেনারি মিটিং-এ যে সব প্রস্তাবগুলি গৃহীত হয়েছিল তাই ছিল নির্দেশিকাগুলির ভিত্তি যা কিনা অগাস্ট ১৯১৯-এ জানানো হয়েছিল, যা আবারো পার্টি এবং যুব লীগের সম্পর্ককে আরো বিশদে ব্যাখ্যা করেছিল।

পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এবং যুব লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যৌথ নির্দেশিকাগুলি আংশিকভাবে যা বলেছে-

১) কমিউনিস্ট যুব লীগ কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচি এবং কৌশলগুলিকে গ্রহণ করে, এটি একটি স্বশাসিত সংগঠন, যার নিজস্ব নিয়মাবলী আছে এবং পার্টির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কমিটিগুলির তত্ত্বাবধানে তা কাজ করে। ...

৪) যেখানে কোন YCL সংগঠন নেই, স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনগুলি এবং সেলগুলি (শহর, জেলা, গ্রাম, কারখানা ইত্যাদি) সেখানে যুব লীগের নিয়মাবলী এবং তার কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশাবলী অনুযায়ী যুব লীগের সংগঠনগুলি তৈরি করবে। ...

৬) যুব কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি প্রত্যক্ষভাবে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনস্থ থাকবে; যুব কমিউনিস্ট লীগের স্থানীয় সংগঠনগুলি কমিউনিস্ট পার্টির স্থানীয় কমিটিগুলির তত্ত্বাবধানে কাজ করে।

৭) ... স্থানীয় পার্টি সংগঠনগুলির যুব লীগের সংগঠন ভেঙে দেবার কোন অধিকার নেই। পার্টির এবং যুব লীগের স্থানীয় সংগঠনগুলির মধ্যে সমস্ত ভুল বোঝাবুঝিগুলিকে পার্টি এবং যুব লীগের উচ্চতর কমিটিগুলির কাছে বিবেচনার জন্য পেশ করতে হবে। (সূত্র: দি ইয়ং কমিউনিস্ট লীগ অব দি ইউএসএসআর--অবকাশ শর্মা-নবযুগ পাবলিশার্স, দিল্লি, পৃ:-২৯-৩১)

শুধুমাত্র রুশ কমিউনিস্ট যুব লীগই যে কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে থেকে কাজ করতে প্রস্তুত ছিল ব্যাপারটা এরকম নয়। বিপ্লবের দেশ রাশিয়ার ব্যাপার আলাদা- এরকম ভাবার কোন কারণ নেই। কেননা আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট যুব লীগও এ ব্যাপারে সন্মতিজ্ঞাপক প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। অবশ্য তা নিয়ে টানাপোড়েন যে ছিল না তা নয়। কারণ কমিউনিস্ট পার্টিগুলির অতি-বাম অংশ ‘স্বাধীন' সংগঠনের ধুয়ো তুলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য তা স্থায়ী হয়নি। এখন আমরা সেই ইতিহাস পর্যালোচনা করব।

২০ নভেম্বর, ১৯১৯-র ইয়ং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল-এর বার্লিন কংগ্রেসে ‘স্বাধীনতা’ প্রশ্নে তুমুল বিতর্ক হয়। “তৃতীয় আন্তর্জাতিকে YCI-এর অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে উত্তপ্ত বিতর্ক আত্মপ্রকাশ করে। অনেক প্রতিনিধি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে YCI (Young Communist International)-র অন্তর্ভুক্তিকে তার জাতীয় সংগঠনগুলির সর্বোচ্চ সম্পদ, স্বাধীনতার, পক্ষে বিপজ্জনক বলে গণ্য করে এবং বিপ্লবী আন্দোলনের কৌশলগত সমস্যাগুলির সমাধানের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এবং কমিউনিস্ট যুব লীগের সমানাধিকারের পক্ষে ওকালতি করে। স্বাধীনতা হারানোর ভয়ের কারণে এবং শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থতার জন্য কংগ্রেস একটা মিলঝুল সমাধান গ্রহণ করে। ৮ ভোটের বিপরীতে ১৭ ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যে যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্ল্যাটফর্মের প্রতি অনুগত থাকবে।” (সূত্র-দি ইয়ং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ইটস অরিজিনিস-- ভিক্টর প্রিভালভ-পৃ:১২৫-২৬)

যদিও YCI-র প্রথম কংগ্রেসে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, তার পরেও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যুব লীগগুলি কমিউনিস্ট পার্টির গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি মানতে অস্বীকার করে। তারা দাবি করে যে পার্টিগুলি থেকে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন, যদিও তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ জঙ্গি সহমর্মিতা' বজায় রেখে তারা কাজ করছে। YCI-এর কেন্দ্রীয় মুখপত্র ইয়ুথ ইন্টারন্যাশনাল-এ এইসব মতামতের স্বপক্ষে প্রবন্ধ প্রকাশ পেতেও শুরু করে। ফেব্রুয়ারি ১৯২০ সংখ্যায় “যুব সংগঠনগুলির স্বাধীনতা” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে লেখক মতাদর্শগত স্বাধীনতার দাবিকে ন্যায্য, প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন: “রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ন্যায্য, কারণ নিরপেক্ষ ভিত্তিতে মুক্তভাবে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষায় নিযুক্ত হতে স্বাধীনতার প্রয়োজন রয়েছে যা কিনা আন্দোলনের একমাত্র এবং মূল লক্ষ্য।” (সূত্র-ঐ, পৃ:-১২৮-২৯)

কোন কোন YCI নেতা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে বেরিয়ে আসাকে সমর্থন করেছিলেন এবং পার্টি কর্মসূচি ও পার্টির তত্ত্বাবধানে থাকাকে বিরোধিতা করেছিলেন। এর একটা উদাহরণ হচ্ছে এই প্রবন্ধ: “দ্য ইয়ং অ্যান্ড দ্য ওল্ড” যা “ইয়ুথ ইন্টারন্যাশনাল” ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল, এতে বলা হয়েছিল-- “কমিউনিস্ট অথবা অন্য কোন পার্টির বর্তমান কর্মসূচীর সাথে যুবদের বেঁধে দেওয়ার সমস্ত প্রচেষ্টাকে যুব এবং শ্রমিক সংগ্রামের স্বার্থে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মতাদর্শগত স্বাধীনতা ছাড়া সাংগঠনিক স্বাধীনতা কিছুই নয়।” (ঐ, পৃ:-১২৯-৩০)

যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কেন্দ্রীয় মুখপত্র এইসব দৃষ্টিভঙ্গীগুলিকে যথেষ্ট জোরের সাথে প্রত্যাখ্যান করেনি। আরো বেশি, YCI-এর কার্যনির্বাহী সমিতি বাস্তবতঃ YCI-র স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বনকারী বিবৃতিগুলিকে সমর্থন করেছিল এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের মধ্যেকার অতি-বাম ধারার পক্ষে সহানুভূতিসম্পন্ন ছিল। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অস্থায়ী আমস্টারডাম ব্যুরোর-- যারা কিনা তৃতীয় আন্তর্জাতিকের একটা অংশ হিসেবে কাজ করছিল এবং যা কিনা ডাচ সুবিধাবাদীদের হস্তগত ছিল এবং যারা শীঘ্রই কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে ভেঙে বেরিয়ে গিয়েছিল-- সাথে কার্যনির্বাহী সমিতির সদস্যরা সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি করার পক্ষপাতী ছিল।

তবে এসব ব্যাপার বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সুবিধাবাদী অতি-বাম চিন্তাধারা যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে অচিরেই পরাস্ত হয়। যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে কমিউনিস্ট যুব সংগঠনের সম্পর্কের প্রশ্নটি চূড়ান্তভাবে ফয়শালা হয়ে যায় এবং এটা স্বীকৃত হয় যে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি যারা কিনা মতাদর্শগতভাবে এবং সাংগঠনিকভাবে সংগঠিত হয়েছে এবং শ্রমিক শ্রেণীর সত্যিকারের নেতা, তাদের রাজনৈতিক তত্ত্বাবধানের অধীনস্থ থাকবে যুব সংগঠনগুলি। (সূত্র-ঐ, পৃ:-১৫৮-৫৯) এর পর বিভিন্ন দেশে যুব কমিউনিস্ট সংগঠনগুলি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্ব মেনে তাদের কাজকর্ম চালিয়েছে এবং শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামকে শক্তিশালী করেছে। সেই ইতিহাসে আমরা ঢুকছি না। কারণ আমরা পার্টি এবং যুব সংগঠনের মধ্যেকার সম্পর্ক কি হবে সেই নিয়েই মূলতঃ আলোচনা করেছি। যা থেকে এটা নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়েছে যে প.বঙ্গের মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী এ প্রশ্নে যে অবস্থান নিয়েছে তা সম্পূর্ণ সুবিধাবাদী এবং তাদের অন্যান্য সুবিধাবাদী কার্যকলাপের মতো এটা আরেকটা মাত্র। কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং যুব কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এই গোষ্ঠীটি বাঁচার চেষ্টা হিসেবে ট্রটস্কির শেষদিককার কিছু প্রবন্ধকে হাতিয়ার করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখানেও ভাগ্য তাদের সহায় হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। কারণ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম চারটি কংগ্রেসের সিদ্ধান্তগুলির সাথে ট্রটস্কির কোন দ্বিমত ছিল বলে আমরা জানি না। কাজেই পরবর্তীকালে তিনি অন্যরকম বলবেন কেন? বলেনওনি। ১৯৩৮ সালের ১৮ নভেম্বর এ প্রসঙ্গে ট্রটস্কির একটি প্রবন্ধ “টুওয়ার্ডস এ রেভলিউশনারি ইয়ুথ অর্গানাইজেশন”-এ ট্রটস্কি বলছেন—“আমি বিশ্বাস করি এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে অন্ততঃ প্রথম পর্যায়ে স্থানীয় যুব সংগঠনের জন্য নিউ ইয়র্ক কেন্দ্রের তুলনায় (যুব সংগঠনের কেন্দ্রীয় দফতর-লেখক) পার্টির স্থানীয় কমিটিগুলি বেশি কার্যকরী হবে, কারণ স্থানীয় পরিস্থিতি একই এবং বয়স্ক কমরেডরা যুবদের নজরে রাখতে পারে এবং আদেশ-নির্দেশের কোন চেষ্টা না করে তাদের ভালো পরামর্শ দিতে পারে।” (সূত্র-পৃ:১/নেট) অর্থাৎ এখানে ট্রটস্কি যুব সংগঠনকে পার্টির নেতৃত্বদানের কথাই বলছেন।

তাহলে মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী কোথা থেকে এটা আবিষ্কার করল যে যুব কমিউনিস্ট লীগ পার্টি থেকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র হবে? যুব কমিউনিস্ট লীগ যেহেতু একটা স্বতন্ত্র সংগঠন সুতরাং তার সাংগঠনিক স্বাধীনতা নিশ্চয়ই থাকবে। কিন্তু এতক্ষণের আলোচনা থেকে এটা খুবই স্পষ্ট যে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্ব মেনে সে চলবে এবং কমিউনিস্ট পার্টির একটি শাখা হিসেবেই সে কাজ করবে। তার কোনরকম বিরোধিতা তো সে করবেই না, বরঞ্চ তার সাথে হাত মিলিয়ে সে শ্রমিক আন্দোলনকে জোরদার করার চেষ্টা করবে। তার রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতার কারণেই তাকে যেমন পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে, অন্য দিকে তার তারুণ্যের উদ্দীপনায় সে পার্টির নেতৃত্বে চলমান শ্রমিক আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করে তুলবে। পার্টির প্রতিযোগী নয়, সে হবে পার্টির সহযোগী। তবেই শক্তিশালী হবে শ্রমিক আন্দোলন তথা কমিউনিস্ট আন্দোলন। কিন্তু তার জন্য মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর লেনিনবাদ-ট্রটস্কিবাদ-বিরোধী চিন্তাকে পরিত্যাগ করতে হবে যুবদের। তাদের বুঝতে হবে এই গোষ্ঠী ট্রটস্কিবাদী আন্দোলনের একটা কলঙ্ক। তাদের কলঙ্কিত কার্যকলাপ ট্রটস্কিবাদের মর্যাদাহানি করছে, সাধারণ শ্রমিক ও মেহনতী জনতার কাছে ট্রটস্কীর রাজনীতি সম্পর্কে ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। সুতরাং এদেরকে পরিত্যাগ না করলে ট্রটস্কিবাদী আন্দোলনের আরো অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই ট্রটস্কিবাদী আন্দোলনের অগ্রগতির স্বার্থে মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর ভুয়া ট্রটস্কিবাদের মুখোশ খুলে তাদের যুবদের মধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করুন।



মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর যুব কমিউনিস্ট লীগের খসড়া কর্মসূচি প্রসঙ্গে কিছু কথা

মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী “যুব কমিউনিস্ট লীগ” (YCL) বানিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও সেটা নিয়ে যথেষ্ট লুকোছাপা আছে। যে YCL তাদের সৃষ্ট বলে তারা গর্ববোধ করে, সেই YCL আবার নিজেদের ‘স্বাধীন' বলে দাবি করে। মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর সাথে তাদের সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে বলে না। এটা একরকমের সুবিধাবাদ তো বটেই, আমরা আগেই বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সহ দেখিয়েছি যে তা আদতে লেনিনবাদ-বিরোধী কাজও বটে। খসড়া কর্মসূচির ৯ নং পাতায় তারা এ ব্যাপারে বলেছে-“আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ওয়াই সি এল বিভিন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লবী সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরে অধ্যয়ন করবে, বিতর্ক চালাবে। ভারতে বর্তমানে কোন কমিউনিস্ট পার্টি নেই। ট্রটস্কিবাদী কয়েকটি গোষ্ঠী আছে। সংগঠন স্বাধীনভাবেই বিচার-বিবেচনার ভিত্তিতে এরকম কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে চলার পথে সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত। তাতে শ্রেণী আন্দোলনে যুক্ত হতে সংগঠনের সুবিধা হবে।(পৃ:-৯) এর অর্থ কি? ট্রটস্কিবাদী কয়েকটি গোষ্ঠী আছে বলে তারা দাবি করেছে। শুধু তো ভারতে নয়, সারা বিশ্বে আছে। এদের ব্যাপারে YCL -এর 'স্বাধীন' চিন্তা-ভাবনা কি? অধ্যয়ন -- বিতর্কের মধ্যে দিয়েই বা কি বেরিয়ে এল? এই অধ্যয়ন আর বিতর্ক কত বছর ধরে চালিয়ে তারপর তারা বিভিন্ন গোষ্ঠী সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসবে বলে ঠিক করেছে? এইসব গোষ্ঠীগুলির অনেকগুলিই যে আর আদৌ ট্রটস্কিবাদী নেই, তা কি তারা বোঝে? শ্রীলঙ্কার গণঅভ্যুত্থানে ঐসব তথাকথিত ট্রটস্কিবাদী গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা কি? তাদের তো ন্যূনতম কোন ভূমিকা আছে বলে মনে হয় না। মুখে ট্রটস্কীবাদী বলে নিজেদের দাবী করবো আর কাজে স্ট্যালিনবাদীদের মতো আচরণ করবো-- তার পরিণতি কি হয় শ্রীলঙ্কার ঘটনা আজ তা দেখাচ্ছে। ‘ট্রটস্কিবাদীদের' ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও গণঅভ্যুত্থানে তাদের কোন ভূমিকাই নেই। সুবিধাবাদের পরিণতি এরকমটাই হয়। ভারতবর্ষেও ঘটনা তাই। তথাকথিত বিভিন্ন ট্রটস্কিবাদী গোষ্ঠীগুলিও আসলে এরকমই। তারা স্ট্যালিনবাদীদেরই রকমফের মাত্র। সুতরাং YCL মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর সাথে গোপনে হাত মেলালেও লাভ কিছু হবে না। এ ধরনের গণঅভ্যুত্থান এদের অপ্রাসঙ্গিক করে দেবে। অবশ্য যদি না তার আগেই তারা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। যাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা করার কোন ক্ষমতাই নেই তারা কি করে কমিউনিস্ট আন্দোলনে পা রাখার দুঃসাহস দেখায় ?

YCL-এর কর্মীরা ভাবতে পারে যে কি কারণে আমরা এত কড়া কথা তাদের উদ্দেশ্যে বলছি! YCL-এর সাথে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক নিয়ে আগেই আমরা বিস্তৃতভাবে বলেছি। এব্যাপারে তারা যে সম্পূর্ণ সুবিধাবাদী অবস্থান নিয়েছে তা আমরা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছি। এবারে আমরা যে বিষয়টি নিয়ে বলব তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কর্মসূচী পড়েই এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে। সুতরাং এটারও একটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।

YCL নিজেকে যুব কমিউনিস্ট লীগ বলছে। অথচ তাদের কর্মসূচি থেকে পরিষ্কার যে আসলে তাদের ভাবনা অনুযায়ী এটা ‘ছাত্র কমিউনিস্ট লীগের' বেশি কিছু নয়। তাদের কর্মসূচির ২০ ও ২১ নং পাতায় ছাত্র-যুব আন্দোলনের উত্তরণকালীন দাবিসমূহ বলে যে সব দাবি তারা তুলে ধরেছে, (মোট এগারোটি দাবি) তার মধ্যে মাত্র একটি শ্রমিক যুবদের দাবি। বাকি সবগুলিই ছাত্রদের দাবি। অর্থাৎ তারা নিজেরাই বাস্তবে স্বীকার করে নিচ্ছে যে এটি আসলে 'ছাত্র কমিউনিস্ট লীগ।’

আর যেসব দাবিগুলিকে তারা উত্তরণকালীন দাবি বলছে, এগুলো আদৌ সে সবের পর্যায়ে পড়ে না। উত্তরণকালীন দাবি বলতে ট্রটস্কি কি বলেছিলেন?-- “ন্যূনতম কর্মসূচির সাথে উত্তরণকালীন কর্মসূচির পার্থক্য হচ্ছে যে তা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একটি ভূমিকা” (টুওয়ার্ডস এ রেভলিউশনারি ইয়ুথ অর্গানাইজেশন, নভেম্বর ১৮, ১৯৩৮)। এখানে সে ধরনের দাবি কোনটি! আবোল-তাবোল দাবি তুলে সেটাকে উত্তরণকালীন দাবি বলে চালাবার অর্থ কি? তাদের সুবিধাবাদে উত্তরণকে চেপে রাখা !

তবে আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা এখানে আলোচনা করতে চাইছি তা এগুলো নয়। আসলে মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী মার্কসবাদী তত্ত্ব এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে এতটাই অজ্ঞ যে তারা জানেই না যে আসলে ‘যুব কমিউনিস্ট লীগ’ গড়বার উদ্দেশ্য কি আর তা কাদের নিয়ে গড়া হবে। যুব কমিউনিস্ট লীগ আসলে মূলতঃ যুব শ্রমিকদের একটি সংগঠন। কমিউনিস্ট পার্টিরই একটি যুব প্রতিরূপ সেটা। কমিউনিস্ট পার্টি যেমন শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠন, তা যেমন শ্রমিকশ্রেণীর শারীরিক অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে, যুব কমিউনিস্ট লীগও তাই। সুতরাং যুব কমিউনিস্ট লীগে পেটি বুর্জোয়া ছাত্র-যুবরা থাকতেই পারে, কিন্তু মূলতঃ তা যুব শ্রমিকদের নিয়েই গড়ে উঠবে। অন্ততঃ কমিউনিস্ট নেতারা সেরকমটাই ভাবতেন ।

নাদেজদা ক্রপস্কায়া ১৯১৭-র এপ্রিলে রাশিয়াতে ফিরবার পরে পশ্চিমের বিপ্লবী যুব আন্দোলন সম্পর্কে রুশ যুবদের অবহিত করতে প্রাভদাতে যুব আন্দোলন সম্পর্কে প্রচুর নিবন্ধ লেখেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, যুবরা অবশ্যই অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেবে। যুব সংগঠনের কাজে প্রথম পদক্ষেপের গুরুত্বের উপরে তিনি জোর দেন। বলেন---“রাশিয়াতে যুব সংগঠন তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াতে আছে। এইসব প্রথম পদক্ষেপগুলির বৃহত্তম ফলাফল আছে। সমস্ত আন্দোলনের গতিপথকে তা নির্দ্ধারিত করবে। রাশিয়ার যুব সংগঠন একটা শ্রমিক সংগঠন হবে কিনা, তা তার দেশের শ্রমিক সংগঠনের ও যুব আন্তর্জাতিকের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে এগোবে কিনা অথবা শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন থেকে তা নিজেকে বিযুক্ত করবে কিনা তা এই পদক্ষেপগুলি নির্দ্ধারণ করবে।” (দি ইয়ং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ইটস অরিজিনস- ভিক্টর প্রিভালভ, পৃ:-১৫৯) নাদেজদা ক্রপস্কায়ার প্রস্তাব মেনে নিয়ে বলশেভিকদের দ্বিতীয় পেট্রোগ্রাদ শহর সম্মেলন এই প্রস্তাব গ্রহণ করে: “সম্মেলন মনে করছে: (১) যুব সংগঠনগুলি অবশ্যই শ্রমিকশ্রেণীর গণসংগঠন হবে, যা নীতিগতভাবে হবে সমাজতান্ত্রিক এবং যুব আন্তর্জাতিকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হবে।” (সূত্র:ঐ, :-98)

কমিউনিস্ট যুব লীগের জন্য রুশ কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-এর একাদশ কংগ্রেস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেসব বাস্তব কর্তব্যাবলী গ্রহণ করে তার মধ্যে ছিল; ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিককে এখানে আকৃষ্ট করা; প্রগতিশীল যুব শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করে বয়সের সীমা বৃদ্ধি করা, এবং বাস্তব, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কাজের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সদস্যদের শ্রেণী সচেতনতার উন্নয়ন করা। (সূত্র : ঐ, :- ১৭০) রুশ যুব কমিউনিস্ট লীগ ১৯২০-২১ সালে বলে “লীগকে পেটি বুর্জোয়া উপাদানে ভরে যাওয়া থেকে আটকাতে স্থানীয় সংগঠনগুলি ছাত্র, সোভিয়েত অফিস কর্মচারী এবং অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আরোপ করবে। যেমন, উদাহরণত, তারা রুশ কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক) এবং রুশ যুব কমিউনিস্ট লীগ-এর সদস্যদের থেকে সুপারিশ সংগ্রহ করবে, লীগে প্রবেশ করবার আগে একটা নির্দিষ্ট সময়কালে জুড়ে যুবদের মধ্যে কাজ করবে এবং এরকম আরো কিছু।” (সূত্র, ঐ, পৃ:-১৬৫)

যুব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেস সাংগঠনিক প্রশ্নগুলির মধ্যে যাতে পদক্ষেপ কেন্দ্রীভূত করে তা হল কারখানা স্তরে যুব লীগগুলির পুনর্গঠন, যা হল, কারখানাগুলিতে প্রত্যক্ষভাবে যুব কমিউনিস্ট লীগের শাখাগুলিকে প্রতিষ্ঠা করা। ইউজেন স্কলহার তার রিপোর্টে যুব সংগঠনগুলির আশু পুনর্গঠনের জন্য আবেদন জানান এবং বলেন কেবলমাত্র তবেই তারা গণসংস্থা হয়ে উঠবে। (সূত্র- ঐ, পৃ:-১৫৬)

আমরা যে উদ্ধৃতিগুলি এখানে দিয়েছি তা থেকেই কি পরিষ্কার নয় যে বলশেভিক নেতৃত্ব যুব কমিউনিস্ট লীগের গঠন, তার সদস্যদের শ্রেণী চরিত্র ইত্যাদি নিয়ে কি ভাবতেন। আর মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর ভাবনা ও কার্যকলাপ কি? একটা পেটি বুর্জোয়া ছাত্র-যুব লীগ বানিয়ে তাকে তারা যুব কমিউনিস্ট লীগ বলে দাবি করছে। বলশেভিক চিন্তাভাবনার সাথে তাদের কার্যকলাপের কোন সামঞ্জস্য নেই। তাদের সমস্ত সুবিধাবাদী কার্যকলাপের সাথে এটা একটা নয়া সংযোজন মাত্র। আমরা অবশ্য এতে বিন্দুমাত্র আশ্চর্যান্বিত নই। কেননা তৃণমূলের সাথে যৌথ অনুষ্ঠান করে যারা নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছিল, তারা এর থেকে বেশি আর কি করবে? ঈশ্বর এদের করুণা করুন।

পুনশ্চ:- তাদের খসড়া কর্মসূচির ২ নং পাতায় ট্রটস্কির উদ্ধৃতির নীচেই তারা লিখেছে— “যেভাবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও তার সঙ্গীরা মিলে রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাচ্ছে তাতে পরমাণু বিশ্বযুদ্ধের বিপদ ঘনিয়ে উঠছে।”

মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী কি বলতে চায়? আমেরিকা ও তার সঙ্গীরা যে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু রাশিয়া ও চীন কি ধোয়া তুলসিপাতা নাকি? রাশিয়া নিজেই তো একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ। ক্রিমিয়াতে তার ভূমিকা কি আমরা এর মধ্যেই ভুলে গেছি। আর ইউক্রেনে তার কার্যকলাপ সমস্ত ধরনের মানবিকতাবিরোধী । তাকে আমেরিকা ঘেরাও করছে এই অজুহাতে ইউক্রেন দখল করার কোন অধিকার তার নেই। আর চীনকে মার্কসবাদী অর্থে সাম্রাজ্যবাদী না বলা গেলেও সে যে সম্পূর্ণভাবে আধিপত্যবাদী একটা আগ্রাসী শক্তি, তাতে সন্দেহ নেই। আমেরিকার সাথে তার লড়াই সমাজতন্ত্রের স্বার্থে নয়, বরঞ্চ আমেরিকাকে হঠিয়ে সব জায়গায় নিজের আধিপত্য সে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। গোলমাল এই নিয়ে। এক্ষেত্রে আমাদের উভয়পক্ষকেই বিরোধিতা করতে হবে। রাশিয়া ও চীনকে সহানুভূতি দেখানোর কোন জায়গা নেই। মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী কিন্তু সেটাই করছে বলে তাদের ঐ বক্তব্য থেকে আমাদের অনুমান। এটা একটা অমার্জনীয় অপরাধ।

প্রসঙ্গতঃ চীনে পুঁজিবাদের ব্যাপকতম প্রচলন সত্ত্বেও চীন একটা আমলাতান্ত্রিক শ্রমিক রাষ্ট্র বলেই আমরা মনে করি। সুতরাং তার উপরে মার্কিন হামলা হলে তাকে বিরোধিতা করাটা কমিউনিস্ট হিসেবে আমাদের দায়িত্ব নিশ্চয়ই। কিন্তু তার আধিপত্যবাদের দায় আমরা নেব না। সেই নিয়ে আমেরিকার সাথে তার সংঘাতেও আমরা পক্ষাবলম্বন করব না। বরঞ্চ উভয়কেই আমরা সেক্ষেত্রে বিরোধিতা করব। আমেরিকার বিরুদ্ধে রাশিয়া ও চীনের যে জোট গড়ে উঠেছে তা একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রাশিয়া ও তার সহযোগী চীনের জোট মাত্র। একে বিরোধিতাই করতে হবে, সমর্থন নয়। একে কোন সহানুভূতি দেখানোও নয়। মিলিট্যান্ট কি তাই করতে চাইছে? একটু খোলসা করে আপনাদের বক্তব্যটা জানান তো!

সূচি

  • যুব কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
  • YCL কি স্বাধীন হবে নাকি পার্টি নিয়ন্ত্রিত হবে?
  • মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর যুব কমিউনিস্ট লীগের খসড়া কর্মসূচি প্রসঙ্গে কিছু কথা