পরীক্ষা কেলেঙ্কারি, রাষ্ট্র সন্ত্রাস ও বুর্জোয়াদের বেইমানি: শ্রমজীবী ও ছাত্র জনতার প্রতি ট্রটস্কিপন্থীদের বিপ্লবী আহ্বান
জুলাই ২০২৬

প্রলেতারীয় বিপ্লবের পতাকাতলে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের ডাক!
আজকের ভারতকে যারা পরিচালনা করছে, সেই বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগী রাজ্য সরকারগুলো সমগ্র দেশটাকে এক চরম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের কাছে দেশের সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া, অন্যদিকে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক কলঙ্কিত বাজারে পরিণত করা—এই হলো এদের মূল সাফল্য। একের পর এক – প্রায় ৭২টিরও বেশি নিয়োগ ও প্রবেশিকা পরীক্ষায় নজিরবিহীন প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতি আজ কোটি কোটি ছাত্র, যুবসমাজ এবং তাদের নিঃস্ব পরিবারগুলোকে এক অন্ধকার অনিশ্চয়তা ও আত্মহত্যার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বছরের পর বছর ঘাম ঝরানো পরিশ্রম আর দিনমজুর পিতা-মাতার শেষ সম্বলকে এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা দালালদের টেবিলে বিক্রি করে দিচ্ছে। এই চরম জনবিরোধী ও কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র বিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, ন্যায়সঙ্গত এবং ঐতিহাসিক!
এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ যখন রাজপথে আছড়ে পড়ছে, তখন কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকশ্রেণী তাদের প্রকৃত হিংস্র চেহারা প্রকাশ করছে। হাজার হাজার নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর যেভাবে নির্বিচার লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাসের গ্রেনেড হামলা, এমনকি পেলেট গান চালিয়ে তাদের রক্তাক্ত করে অস্ত্রোপচার কক্ষে পাঠানো হয়েছে—আমরা ট্রটস্কিপন্থীরা এই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সন্ত্রাসকে তীব্রতম ভাষায় ধিক্কার জানাই। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, রক্তক্ষয়ী এই প্রতিক্রিয়া কেবল ছাত্রদের ওপর নয়, এই রাষ্ট্রযন্ত্র বারবার নামিয়ে এনেছে দেশের প্রতিটি লড়াকু জনতার ওপর। কিন্তু আজ মূল প্রশ্ন কেবল ক্ষোভ প্রকাশের নয়, প্রশ্ন হলো: এই রক্তের বিনিময়ে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? যে নেতৃত্ব আজ এই আন্দোলনের ব্যাটন হাতে তুলে নিয়েছে, তারা কি ছাত্র-যুব সমাজকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছে, নাকি শাসকশ্রেণীরই পাতা ফাঁদে এনে বলি দিচ্ছে?
ইতিহাস আমাদের অত্যন্ত নির্মম শিক্ষা দিয়েছে। কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি কোটি কোটি কৃষকের ঐতিহাসিক আন্দোলন কীভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। কারণ সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল কায়েমী স্বার্থবাদী কুলাক বা ধনী-কৃষক শ্রেণী, যারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল শিকড়ে আঘাত না করে কেবল কয়েকটি আইনের রদবদলেই সন্তুষ্ট থেকেছিল। ঠিক একইভাবে, সারা দেশজুড়ে নয়ডা শ্রমিক আন্দোলনের মতো একের পর এক আন্দোলন, সঠিক বিপ্লবী বলশেভিক লেনিনবাদী নেতৃত্বের অভাবে পুঁজিবাদ উচ্ছেদের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। আজ ছাত্রদের এই আন্দোলনেও সিজেপি ও সোনাম ওয়াংচুকের মতো নেতৃত্ব আসলে শাসকশ্রেণীরই অন্য এক অংশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। এদের সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় বুর্জোয়া ব্যবস্থার বাইরে স্বাধীন কোনো অস্তিত্ব নেই। এরা কোনোদিন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি। গতকাল যে ওয়াংচুক কাশ্মীরের দেড় কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার বুটের তলায় পিষে মারার ৩৭০ ধারা বাতিলের মোদির সিদ্ধান্তকে রাজকীয় সেলাম জানিয়েছিলেন, আজ তিনি 'পরিবেশপ্রেমী' ও 'শিক্ষাপ্রেমী' সেজে মঞ্চে বসেছেন!
আজ সিজেপি ও ওয়াংচুকরা দাবি করছে কেবল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বা নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগ। কিন্তু আমরা ট্রটস্কিপন্থীরা কঠোর সত্য উচ্চারণ করে বলতে চাই—কেবল সরকার বা মন্ত্রী বদল করে, কিংবা NTA (National Testing Agency)-র মতো দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থাকে স্রেফ কাগজে-কলমে ‘সংস্কার’ করে বা বাতিল করে এই সংকটের সমাধান অসম্ভব! সরকার পরিবর্তন করা হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সেই পুরনো ভেল্কিবাজি, যেখানে শোষক শ্রেণীর কেবল বুটের রঙটাই বদলায়, কিন্তু ঘাড়ে নামা বুটের ওজন বিন্দুমাত্র কমে না।
একই সাথে আমাদের চিনে নিতে হবে কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী বুর্জোয়া দলগুলোর দেউলিয়া ভূমিকা। এই পুঞ্জীভূত জনক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্য তারা আজ অত্যন্ত তৎপর। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, কংগ্রেসী জমানাতেও গণআন্দোলন দমনে বা দুর্নীতির শিকড় গভীরে পোঁতার ক্ষেত্রে আজকের ফ্যাসিবাদী মোদী সরকারের থেকে তাদের রূপ খুব একটা আলাদা ছিল না। তাই এই সমস্ত বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ওপর বিন্দুমাত্র ভরসা রাখা যাবে না!
এক বুর্জোয়া মন্ত্রী বা দলকে সরিয়ে অন্য কোনো তথাকথিত 'শিক্ষিত' বুর্জোয়াকে ক্ষমতায় বসালে কি দুর্নীতির এই বিষাক্ত ফেনা বন্ধ হবে? কখনোই নয়! কারণ দুর্নীতির মূল উৎস কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট আমলাতান্ত্রিক এজেন্সি নয়, দুর্নীতির মূল উৎস হলো এই মুনাফাভিত্তিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো। শাসকশ্রেণী আজ ভয় পাচ্ছে যে, মোদী শাসন ভারতের সমাজকে এমন এক চরম মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যার শেষ পরিণতি হবে শ্রমজীবী মানুষের এক বিস্ফোরক গৃহযুদ্ধ। আর তাই, শাসকশ্রেণীরই উদারপন্থী অংশ ওয়াংচুকদের সামনে নামিয়ে দিচ্ছে—যাতে জনগণের বিপ্লবী ক্ষোভকে কেবল 'মন্ত্রী বদল' বা 'সংস্থা সংস্কার'-এর এক আন্দোলনে পরিণত করে মূল পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থাটাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যায়!
পরীক্ষা ব্যবস্থার এই ব্যাপক দুর্নীতি রোধে আমাদের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট। কোনো বুর্জোয়া আমলাদের নিয়ন্ত্রণে নয়—শিক্ষার সাথে যুক্ত সমস্ত স্তরের মানুষ, অর্থাৎ শিক্ষক, ছাত্র, শিক্ষা কর্মী এবং সমাজের বৃহত্তম অংশ শ্রমিক ও কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে একটি সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক সংস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা পরিচালনা করবে পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু এই দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো আইনসভায় আবেদন-নিবেদন করে বা কেবল সরকার বদলের মধ্য দিয়ে অর্জিত হতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন সমগ্র বুর্জোয়া ব্যবস্থা-বিরোধী এক আপসহীন বিপ্লবী লড়াই!
এই ঐতিহাসিক বেইমানির খেলায় সবচেয়ে ঘৃণ্য ভূমিকা পালন করছে তথাকথিত সংস্কারবাদী 'বাম' গোষ্ঠীগুলো। তারা বিপ্লবের রক্তস্নাত লাল পতাকাকে বুর্জোয়াদের ড্রয়িংরুমে বিকিয়ে দিয়ে আজ শ্রেণীসংগ্রাম-বিরোধী বুর্জোয়া ভারতীয় তেরঙ্গা পতাকাকে সানন্দে মাথায় তুলে নিয়েছে! আন্দোলনের নামে প্রলেতারীয় রূপকল্পকে বিসর্জন দিয়ে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতীক তেরঙ্গার নিচে মিছিল করা শ্রেণী-বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এমনকি নিজেদের 'ট্রটস্কিপন্থী' বলে দাবি করা 'নয়া দিশা' বা ‘রেভলিউশনারী কমিউনিস্টস অফ ইন্ডিয়া’-র মতো ভণ্ড রাজনৈতিক দলগুলোও আজ এই বুর্জোয়া তেরঙ্গার ছত্রছায়ায় মিছিল করতে বিন্দুমাত্র লজ্জা বোধ করছে না। আর.জি. কর আন্দোলনের সময় এই সুবিধাবাদী বামেরা অরাজনীতির যে প্রতিক্রিয়াশীল বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল, তার ফলেই ফ্যাসিবাদী বিজেপি এই রাজ্যে তাদের জমি শক্ত করার সুযোগ পেয়েছিল। এরা আন্দোলনের বিপ্লবী চেতনাকে নির্বীর্য করে দিয়ে আসলে ফ্যাসিবাদেরই রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়।
অতএব, লড়াকু ছাত্র ও সর্বহারা জনতা! আমাদের পথ গান্ধীবাদী আন্দোলনজীবীদের আমরণ অনশন বা প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে দয়া ভিক্ষার পথ নয়। আমাদের যুদ্ধ কেবল এক জল্লাদকে সরিয়ে আরেক জল্লাদকে বসানোর যুদ্ধ নয়। এই পচা-গলা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে রক্ষা করার স্বার্থে শাসকশ্রেণীর চক্রান্তের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতেই হবে। শিক্ষাঙ্গন থেকে কারখানায়—প্রতিটি স্থানে ছাত্র ও শ্রমজীবী মানুষের নিজস্ব গণতান্ত্রিক পরিষদ (Soviets) গড়ে তুলুন। ভুয়ো বুর্জোয়া তেরঙ্গার মোহ ত্যাগ করে প্রলেতারীয় বিপ্লবের পতাকাতলে একত্রিত হন। মন্ত্রী বদল নয়, ব্যক্তিবদল নয়—সমগ্র পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্ছেদ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রলেতারীয় শ্রেণী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য!
শাসকশ্রেণীর ফ্যাসিবাদী দমনপীড়ন নিপাত যাক!
আন্দোলনকারী ছাত্র-শ্রমিক জনতার লড়াকু ঐক্য জিন্দাবাদ!
ভুয়ো বুর্জোয়া সংস্কারক, কংগ্রেসী সুবিধাবাদী ও ছদ্ম-বিপ্লবীদের দূরে সরিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে এগিয়ে চলুন!
বিপ্লবী অভিনন্দন,
কমিউনিস্ট লীগ (চতুর্থ আন্তর্জাতিকতাবাদী)
