header

🄯 Made by devolskii

logo

কমিউনিস্ট লীগের কর্মসূচী ও সংবিধান

মে ১৯৯৯


কমিউনিস্ট  লীগের কর্মসূচী ও সংবিধান
সমাজতন্ত্রের জন্য তার কর্মসূচী হওয়া উচিত মূলতঃ কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম চারটি কংগ্রেস এবং উত্তরণশীল কর্মসূচীর দিশায়।

ট্রটস্কীবাদী আন্দোলনের পতাকাকে উর্দ্ধে তুলে ধরুন

গত ২১শে ও ২২শে ফেব্রুয়ারী শান্তিপুরে বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ (RCL) ও ইনকিলাবী কমিউনিস্ট সংগঠন (পঃ বঃ রাজ্য সংগঠনী কমিটি) এই দুটি সংগঠনের ঐক্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় কমিউনিস্ট লীগ। কমিউনিস্ট লীগের এই প্রতিষ্ঠা কংগ্রেসে গৃহীত হয় তার কর্মসূচী, সংবিধান, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির উপর দলিল। বলাই বাহুল্য, কমিউনিস্ট লীগ ট্রটস্কীবাদী একটি সংগঠন। দীর্ঘ এক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে ট্রটস্কীবাদী আন্দোলনকে নতুন করে সংগঠিত করবার যে প্রচেষ্টা চলছে তারই ধারাবাহিকতায় দুটি ট্রটস্কীবাদী সংগঠনের ঐক্যের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে কমিউনিস্ট লীগ। কমিউনিস্ট লীগ তৈরী হবার সাথে সাথেই শ্রেণীসংগ্রামে সজোরে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদকে উর্দ্ধে তুলে ধরবার চেষ্টা করছে। মার্কসবাদের যে বিপ্লবী মর্মবস্তুকে স্ট্যালিনবাদীরা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে অত্যন্ত ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে তাকে রক্ষা করবার দায়িত্ব আমরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছি। এর ফলে আমাদের উপরে নেমে এসেছে আক্রমণ। ফ্যাসিবাদী আর. এস. এসের গেষ্টাপো বাহিনী এবং পুলিশ কর্তৃক আমাদের এবং আরো দুটি মাওবাদী সংগঠনের যৌথ যুদ্ধ বিরোধী সভা আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু তাতে আমাদের মনোবল তারা ভাঙ্গতে পারেনি। বরঞ্চ বামপন্থী কর্মীদের মধ্যে ট্রটস্কীবাদী রাজনীতি আরো জনপ্রিয় হয়েছে। এটা প্রমাণিত হয়েছে যে ট্রটস্কীবাদীরা কেবল মুখে নয়, কাজেও আন্তর্জাতিকতাবাদী। সোভিয়েত রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের আমলাতান্ত্রিক শ্রমিক রাষ্ট্রগুলির পতনের পর বিশ্ব জুড়ে মার্কসবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে যখন বিরুদ্ধ প্রচারের স্রোত বয়ে চলেছে, তখন মার্কসবাদ- লেলিনবাদের মহলে বিপ্লবী ঐতিহ্যকে বহন করবার দায় আমরা স্বেচ্ছায় আমাদের কাঁধে তুলে নিচ্ছি। কোন দমন-পীড়ন, অত্যাচার আমাদের অগ্রগতিকে রোধ করতে পারবে না। যতদিন পৃথিবীতে শোষন-অত্যাচার থাকবে ততদিন এ লড়াই জারি থাকবে। এক শোষণমুক্ত সাম্যবাদী দুনিয়া না গড়া এ লড়াই বন্ধ হবে না । আর সে লড়াইকে যোগ্য নেতৃত্ব দেবার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রবাহিনী চতুর্থ আন্তর্জাতিককে পৃথিবীব্যাপী পুনর্গঠিত করতে আমাদের ভূমিকা আমার যথাসাধ্য পালন - করবার চেষ্টা করবো। ভারতীয় বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিপ্লবে আমাদের ভূমিকা রাখবার চেষ্টাও আমরা করবো। বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থই কমিউনিস্ট লীগের স্বার্থ, এছাড়া তার আর কোন স্বার্থ নেই।

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও তার দিশা

১। ভূমিকা :

উন্নত অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির সাহায্যে বুর্জোয়ারা গ্লোবালাইজেশন ঘটিয়েছে। বিশ্বব্যাঙ্ক, আই.এম.এফ. বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদির মারফৎ এবং ন্যাটো জোট ও সামরিক শক্তির জোরে আমেরিকার শাসকদের নেতৃত্বে অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশের শাসকরা গোটা দুনিয়ায় প্রভুত্ব করে চলেছে। এ ব্যাপারে তারা রাষ্ট্রসংঘকেও কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও পুঁজিবাদের অনিবার্য নিয়মে এই সাম্রাজ্যবাদীরাও আজ দ্বন্দ্বে দীর্ণ, বহুবিধ সংকটের মুখোমুখি। এদের পতনও অনিবার্য নিয়মেই ঘটবে, কারণ পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ কখনই ইতিহাসের শেষ অধ্যায় হতে পারে না।

আমরা কমিউনিস্টরা আন্তর্জাতিকতাবাদী। আমাদের কর্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিকশ্রেণীকে পুঁজিবাদ উচ্ছেদের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে সংগঠিত করা এবং তাতে সামিল হওয়া। যত দ্রুত সম্ভব সাম্রাজ্যবাদকে দুনিয়ার বুক থেকে নির্মূল করা। এই কাজ ভালভাবে করতে হলে জানতে হবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে। আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে জাতীয় ক্ষেত্রে বিপ্লবকে দেখাটাই কমিউনিস্টদের কর্তব্য। তাই আন্তর্জাতিক অবস্থা ও প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র ও স্বল্পপরিসরে তার ব্যাখ্যা আমরা এখানে হাজির করছি।

২। (ক) বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত চিত্র :

(i) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য এক বিনিয়োগের পর্ব শুরু হয় যার নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই সময়ে উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন (যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিকীকরণ, উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে) এবং ভোগ্য ও উৎপাদিত পণ্যের বর্ধিত চাহিদা বিশ্ব ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির সংকট সাময়িকভাবে নিরসন করার কাজে সহায়তা করে।

(ii) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদ মূলতঃ নতুন কায়দায়শোষণ শুরু করে। সরাসরি উপনিবেশ দখল করার মধ্যে দিয়ে না গিয়ে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অনুন্নত অর্ধোন্নত দেশগুলিতে পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েম করা হয়, অর্থাৎ শোষণের প্রধান ধরণ হয়ে ওঠে নয়া ঔপনিবেশিক শোষণ। এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের নিজ নিজ দেশের অর্থনীতিকে আরও সুসংহত ও চাঙ্গা করতে সমর্থ হয়। এর ফলে প্রায় সমগ্র বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদের তথা সাম্রাজ্যবাদের সাময়িক এক বিকাশলক্ষ্য করা যায়।

(iii) কিন্তু বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের এই আপাত অগ্রগতি '৬০-এর দশকের শেষলগ্নে এসে থমকে দাঁড়ায় এবং '৭০এর দশকে এসেই প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে। তখন থেকেই ক্রমাগত কিছু সময় অন্তর অন্তর একটার পর একটা মন্দা দেখা দিতে থাকে। '৮০-র দশকে বিরাজ করে মোটামুটি একটা স্থিতাবস্থা যার মধ্যে কখনও উর্ধ্বগতি আবার কখনও অধোগতি লক্ষ্য করা যায়। এরপর পুঁজিবাদ আর কোন মসৃণ পথ খুঁজে পায় নি, কেবল চড়াই-উৎরাই এর মধ্যে দিয়ে গেছে এবং এই শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে পুনরায় তা চরম এক সংকটে পতিত হয়েছে। যে সংকটকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্বকালীন সংকটের সঙ্গে তুলনা করা চলে।

(iv) উৎপাদিকা শক্তির পূর্ণাঙ্গ ও সুষ্ঠু ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। '৮০- র দশকে স্থিতাবস্থার ওঠানামা এক অস্থির অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। '৭০-র দশকের মন্দা এবং '৮০-র দশকের প্রথম দিকে পরিকাঠামোগত সংকট পুঁজি বিনিয়োগ এবং রপ্তানির গতি দ্রুততর করেছিল। প্রথমে বিনিয়োগ শুরু হয় মূলতঃ শিল্পোন্নত দেশে। পরে তা প্রধানতঃ হয় অনুন্নত ও অর্ধোন্নত দেশসমূহে ফলে সেই সমস্ত দেশে ঋণের বোঝা এত বেড়ে যায় যে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ধ্বস নামা অনিবার্য হয়ে ওঠে। এর নমুনা আমরা মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ করেছি।

২। (খ) সাম্রাজ্যবাদ এবং উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের স্থবিরতা :

(i) পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে সাম্রাজ্যবাদের সংকট তার পতন এবং ধ্বংসের ইঙ্গিতবাহী, পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্বের অর্থ এইনয় যে যে বর্তমান বিশ্বে কোনরূপভাবে মানবিক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ বা তার উপযোগী কোন সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে তার ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা আছে। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব এবং অনুপস্থিতির সুযোগে তা আজও টিকে রয়েছে।

(ii) সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবিক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ সম্ভব নয়, কারণ তা চালু হয় পুঁজি এবং মুনাফার উদ্দেশ্যে এবং ওই ব্যবস্থা রক্ষার স্বার্থে মারণাস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম উৎপাদনের কাজে। শেষ বিচারে ওই উন্নতির ফলাফল মানবিক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়ায় এবং নির্দিষ্টভাবে তা শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে আরও বেশি শোষণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। শোষণ- উন্নততর প্রযুক্ত-কর্মী সংকোচন ও শ্রমিক ছাঁটাই – আরও শোষণ, এই পথেই তা অগ্রসর হতে থাকে তার চূড়ান্ত ধ্বংসের আগে পর্যন্ত।

(iii) আজকের যুগে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বস্তুগত সম্পদের মানবিক ব্যবহারের বৃদ্ধি সম্পর্কে তার অক্ষমতা প্রমাণ করেছে। মার্কসবাদী বিশ্লেষণ অনুযায়ী সাম্রাজ্যবাদের শাসনে মানবিক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ অসম্ভব। সংশোধনবাদীরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের এই মূল দিককে অস্বীকার করে । তারা মনে করে যে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের এখনও প্রগতিশীল ভূমিকা আছে, তারাও বুর্জোয়াদের সাথে মিলে সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে মানবিক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের জয়গান করে।

(iv) অবশ্য সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজিবাদের বিকাশ সম্ভব নয় বলতে, কখনও তার সুষম ও নিরবিচ্ছিন্ন, সার্বজনীন স্থবিরতাকে বোঝানো হয় না । চিরস্থায়ী সংকট এর পর্যায়েও কোথাও কোন স্থানে তার আংশিক ও সাময়িক বিকাশ সম্ভব (অবশ্য তা শেষ বিচারে মানবজাতির অগ্রগতির পরিপন্থী)। ক্রমহ্রাসমান লাভের গড় হারকে পুঁজিবাদ কখনই ক্রমবর্ধমান করতে পারে না। কেবল স্বল্পময়ের জন্য তার কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব।

(v) এই অবস্থাটাও সম্ভব হচ্ছে বিরাট মানবিক মূল্যের বিনিময়ে, বিমূর্ত শ্রমের ধ্বংসের বিনিময়ে, আর সবশেষে সোস্যাল ডেমোক্র্যাসী ও স্তালিনবাদের ধারাবাহিক বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। কিন্তু এসব সত্ত্বেও পুঁজিবাদ তার সংকটও পতনকে আটকাতে পারবে না। বড়জোর তা বিলম্বিত করতে পারে।

২। গ) সংকটের বহুমাত্রিক দিক :

(i) সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একাধিপত্য এবং এক মেরুকরণের প্রয়াস কার্যতঃ ব্যর্থ হতে বসেছে। পুঁজিবাদের সংকট আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বকেই তীব্রতর করেছে, এর ফলে একাধিক বাণিজ্য ব্লক- এর উদ্ভব হয়েছে। ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানের পর বাণিজ্য যুদ্ধের এক নবপর্যায় শুরু হয়েছে। একদিকে আমেরিকা, জার্মানী-ফ্রান্স এবং জাপান-এর নেতৃত্বাধীন বাণিজ্য ব্লক সমূহের দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে সংকটের বোঝা দুর্বল পুঁজিবাদী ও আধাপুঁজিবাদী দেশগুলির উপর চাপানোর প্রবণতা - এই হল সার্বিক চিত্র। ডাংকেল প্রস্তাব-এর প্রয়োগ, গ্যাট চুক্তি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গঠন ইত্যাদির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ তার সংকট-এর বোঝা আরও বেশী মাত্রায় অনুন্নত ও অর্ধোন্নত দেশগুলির ঘাড়ে চাপাতে সচেষ্ট আছে।

(ii) বিশ্ব অর্থনীতির এই সাধারণ প্রবণতার পাশাপাশি সংকট এর চরিত্র বহুমাত্রিক এবং বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে তা বিভিন্ন মাত্রায় বিরাজমান। সংকটের প্রভাব কেবল এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতেই পড়েনি বরং জাপান, বৃটেন, এমনকি খোদ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব ভয়ংকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডলার-এর যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল তা আর থাকছে না। ইউরোপে নতুন মুদ্রা ইউরো’ চালু হয়েছে। আমেরিকা পূর্বে জাপান এবং ইউরোপে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, বিশেষত জার্মানী-ফ্রান্স দ্বারা ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। ন্যাটোর সম্প্রসারণ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে দ্বন্দ্বও স্পষ্ট।

৩। আমলাতন্ত্র শাসিত (বর্তমান ও প্রাক্তন ) শ্রমিক রাষ্ট্রসমূহ সম্পর্কে

(i) বিংশ শতাব্দীর একটি অন্যতম বিশেষত্ব হয়ে উঠেছে আমলাতন্ত্র শাসিত রাষ্ট্রের উদ্ভব এবং তার পতন অথবা আত্মসমর্পণ। এদেরও আবার বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। একটি ধরণের উদ্ভব হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি হওয়া শ্রমিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন-র আমলাতান্ত্রিক বিকৃতি এবং অধঃপতনের ফলে, যার সূত্রপাত হয়েছিল '২০ এর দশকে। দ্বিতীয় ধরণটি ছিল দ্বিতীয় 'বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ মদতপুষ্ট পূর্বইউরোপের বেশ কিছু দেশ (পূর্ব জার্মানী, হাঙ্গেরী, পোল্যাণ্ড, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, মঙ্গোলিয়া। শুরু থেকেই এই দেশগুলি গড়ে উঠেছিল অ-পুঁজিবাদী আমলাতান্ত্রিক শ্রমিক রাষ্ট্র হিসেবে। পূর্ব জার্মানী বাদে বাকী দেশগুলি ছিল অর্থনৈতিকভাবেও পশ্চাৎপদ। এসব দেশে প্রায় আভ্যন্তরীণ বিপ্লব ছাড়াই পুঁজিবাদের উচ্ছেদ হয়। তৃতীয় ধরণটি হচ্ছে চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম (উত্তর এবং দক্ষিণ), কাম্পুচিয়া, কিউবা, যুগোশ্লাভিয়া এবং আলবেনিয়া, যেখানে স্তালিনবাদী বা অস্তালিনবাদী শক্তির সাহায্যে শ্রমিকশ্রেণী পুঁজিবাদের ও সামন্ত অবশেষের উচ্ছেদে সম্ভব হয়। এসব দেশ ছিল অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, এখানে শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন ছিল অনুপস্থিত, মূলতঃ কৃষক ও মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ ঘটেছিল এইসব বিপ্লবে । কিন্তু তা কখনই সমাজতন্ত্র কায়েম করতে পারে নি বরং প্রথম থেকেই এগুলি হয়ে ওঠে আমলাতান্ত্রিকভাবে বিকৃত। এইসব ধরণগুলিকেই এককথায় ‘প্রলেতারিয়ান বোনাপার্টিস্ট' ধাঁচের রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ।

(ii) প্রথম থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে দ্বিতীয় ধরণের রাষ্ট্রগুলি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল এবং এসব দেশে রাশিয়ার কর্তৃত্ব ছিল প্রবল। রাশিয়ার আমলাতন্ত্রের পতনের সাথে সাথে এসব দেশেরও আমলাতন্ত্রের পতন হয়। তৃতীয় ধরণের আমলাতন্ত্র শাসিত রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যুগোশ্লাভিয়া এবং আলবেনিয়ার আমলাতন্ত্রের পতন ঘটেছে। এসব দেশেই পুঁজিবাদ কমবেশি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

৩। (ক) সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইউরোপের পতন :

(i) সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই দেশগুলিতে আমলাতন্ত্ৰ শাসিত শ্রমিক রাষ্ট্রের পতন এই দেশগুলির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে ট্রটস্কিবাদী মূল্যায়নের সঠিকতা প্রমাণ করে। পুঁজিবাদের পুনঃপ্রবর্তন প্রমাণ করে এসব দেশে এযাবৎকাল পুঁজিবাদ ছিল না, আবার এটাও প্রমাণ করে যে এগুলি সমাজতন্ত্রের কোন রূপও ছিল না, কারণ এগুলি বহিঃআক্রমণে ভেঙ্গে পড়েনি, মূলতঃ নিজেদের আভ্যন্তরীন সংকটে ও দ্বন্দ্বে ভেঙ্গে পড়েছে। এর মধ্যে একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন-এরইযাত্রা শুরু হয়েছিল সমাজতন্ত্র অভিমুখে, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক বিকৃতি তার গতিমুখ ঘুরিয়ে দেয় এবং তা পুঁজিবাদের অভিমুখে চলতে শুরু করে, তার অধঃপতন ঘটে। অন্যদেশগুলি ছিল প্রথম থেকেই বিকৃত, সমাজতন্ত্রের সাথে বলা যেতে পারে সম্পর্কহীন। এগুলির চরিত্রই অস্থায়ী এবং এরা টেকেও নি।

(ii) এই ঘটনা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র' গড়ার স্তালিনীয় তত্ত্বের অসারতা ও ভ্রান্তি। প্রকৃতপক্ষে সোভিয়েত রাশিয়ায় আমলাতান্ত্রিক প্রতিবিপ্লবের সময়ে আমলাতন্ত্রের তাত্ত্বিক সূত্রায়ন হিসেবে এই মার্কসবাদ- লেনিনবাদ বিরোধী তত্ত্বের উদ্ভাবন করা হয় যা কালক্রমে এক চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

(iii) সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের পতন এই রাষ্ট্রগুলির তৎকালীন অবস্থার চরিত্রায়ণের প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই রাষ্ট্রগুলি ছিল উৎক্রমণশীল রাষ্ট্র। কিন্তু বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু কাল বাদ দিলে এই উৎক্রমণশীলতা ছিল শ্রমিকরাষ্ট্র থেকে পুঁজিবাদের দিকে উৎক্রমণশীলতা। ওই রাষ্ট্রসমূহে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল চূড়ান্ত ও নির্ধারক। স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্র কিন্তু শ্রমিকশ্রেণী থেকেই উদ্ভুত। সমস্ত ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত করে সে বিকশিত ও শ্রেণী থেকে বিচ্ছিন্ন এবং নিজ শ্রেণীর উপর নিপীড়নকারী পরগাছা' হিসাবে বেড়ে উঠেছিল। ক্রমশঃ তা স্বতন্ত্রভাবে সংগঠিত হতে থাকে এবং একই সাথে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ এবং বিভাজিত হতে থাকে। অবশেষে তার একটা অংশ অনিবার্য নিয়মে পুঁজিবাদী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। অপর অংশ যারা আমলাতান্ত্রিক শাসন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিল তাদের ব্যর্থতার ও তাদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাদপন্থীরা পুঁজিবাদ পুনঃপ্রবর্তন করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে যায়।

(iv) পুরনো অর্থনৈতিক স্তম্ভগুলির (বিশেষতঃ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প পরিবর্তন পুরোপুরি বা অধিকমাত্রায় না হলেও রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তিত হতে পারে। এটা যেমন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র থেকে প্রলেতারীয় রাষ্ট্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে সত্য তেমনিই আবার প্রলেতারীয় রাষ্ট্র থেকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও সত্য। কারণ এসব ক্ষেত্রে পুরনো উৎপাদন সম্পর্কগুলির অস্তিত্বক্রমহ্রাসমান এবং অবক্ষয়ী। নতুন সম্পর্কগুলি ক্রমবর্ধমান এবং প্রধান ভূমিকায় থাকে এবং প্রলেতারীয় আধিপত্য হল নির্ধারক বিষয়। তাই একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সার্বিক নিয়মসমূহ পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রসমূহ এবং পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশে পুরোপুরি মাত্রায় চালু না হলেও তারা মর্মবস্তুগতভাবে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে।

(v) ওই রাষ্ট্রগুলির অর্থনৈতিক সংকটের ফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তার থেকে পরিত্রাণের পথ ছিল দুটি (১) একটি রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রকে হটিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীগত আধিপত্য কায়েম করা অথবা (২) একটি ধারাবাহিক প্রতিবিপ্লব মারফৎ আমলাতন্ত্রের একটি অংশের দ্বারা পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

(vi) কিন্তু রাজনৈতিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে দরকার একটি সুদক্ষ এবং সুসজ্জিত শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্ব। এই সচেতন নেতৃত্ব গড়ে ওঠা ছিল বেশ কঠিন, আমলাতন্ত্রের তীক্ষ্ণ প্রহরা ও কঠোর শাসনের আড়ালে তাকে পুষ্ট করে তোলা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এবং ট্রটস্কিবাদী ধারার অনুপস্থিতি ওই দেশগুলিতে রাজনৈতিক বিপ্লবের যে সম্ভাবনা ছিল তা ব্যর্থ করে দেয়। শ্রমিকশ্রেণী বহুকাল যাবৎ স্তালিনবাদীদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয় এবং তাদেরকেই খাঁটি মার্কসবাদী হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু অবশেষে তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গে। ফলে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। কিন্তু তার ফসল তোলে পুঁজিবাদী পথের অনুগামীরাই।

(vii) রাশিয়ার গর্বাচভ-এর ‘গ্লাসনস্ত’ আর ‘পেরেস্ত্রৈকা’ আর ইয়েলৎসিন এর পথের লড়াই মূলগত বিচারে অভিন্ন। তাদের দ্বন্দ্ব ছিল কিভাবে, পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব তাই নিয়ে।

(viii) সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন অনিবার্য ছিল না। যদিও তার অভ্যন্তরে জাতিরাষ্ট্রগুলির বিচ্ছিন্ন হওয়ার দাবীর যৌক্তিকতা অস্বীকার করা চলে না। আমলাতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা প্রজাতন্ত্রগুলির সমানাধিকারের দাবী কখনই স্বীকৃত হয় নি। কিন্তু ঘটনা হল, পুঁজিবাদী পথের প্রবক্তারাও কখনই এই দাবীকে স্বীকৃতি দেয় না। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনকে ত্বরান্বিত করেছে ইয়েলৎসিনের উগ্র জাতিদন্তী মনোভাব।

(ix) আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের সাথে সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের সর্বত্র বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলির আত্মপ্রকাশ হয়েছে। এদের মধ্যে নরমপন্থী জাতীয়তাবাদী থেকে শুরু করে মৌলবাদী এবং ফ্যাসীবাদী সমস্ত' ধরণের উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি রয়েছে। তারা গড়ে উঠেছিল ওইসব শ্রমিক রাষ্ট্রের পতনের অল্প কিছুকাল পূর্বে। ফলে ওই দেশসমূহের শ্রমিকশ্রেণীর সামনে তাদের শ্রেণীচরিত্র তখনও পরিস্ফুট হয়নি। এদের আবির্ভাব ঘটেছিল পুঁজিবাদের শক্তি হিসাবে। এদের চরিত্র ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল, তারা কেবল আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে।

(x) সাম্প্রতিক কালের বিভিন্ন নির্বাচনে ওই দেশগুলিতে এই সব শক্তিগুলি বিরাটভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে। পুরনো স্তালিনপন্থী ও তার সহযোগিরা অনেক স্থানে জয়লাভ করেছে। কিন্তু তারা পুঁজিবাদ দূর করতে সচেষ্ট নয়, তারা বরং পুঁজিবাদী সমাজের পাহারাদারী করতেই বেশি ভালবাসে, যাতে তারা তাদের ভোগবিলাস এবং লুঠতরাজ অবাধে চালিতে যেতে পারে।

(xi) ওই সব দেশগুলিতে জাতিদাম্ভিকতা ও জাতিগত নিপীড়নের বেশ কিছু নিদর্শন আছে। যেমন বসনিয়া, যেখানে জাতিগত লড়াই ও গণহত্যা হল সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ ও উগ্রজাতিদাম্ভিকদের কার্যকলাপের যুগপৎ ফল! কৃত্রিমভাবে বসনিয়া বিভাজনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে না। তার অর্থ এই নয় যে আমরা পুরনো ব্যবস্থার সমর্থক। পুরনো সার্ব প্রজাতন্ত্রে আমলাতান্ত্রিক যুগোশ্লাভিয়া এবং বর্তমান বহুধাবিভক্ত রাষ্ট্রের বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকরাষ্ট্রই এই জাতি বৈরিতার অবসানের গ্যারান্টি সৃষ্টি করতে পারে। অন্যান্য দেশগুলির ক্ষেত্রেও একথা সমানভাবে প্রযোজ্য ।

(xii) সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের ভূতপূর্ব আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির ভবিষ্যৎ কি? যতক্ষণ না একটি শক্তিশালী ট্রটস্কীবাদী সংগঠন সেখানে গড়ে তুলে আবার একটা বিপ্লব ঘটানো যাচ্ছে, ততদিন সেখানকার জনগনকে বেকারী, দারিদ্র ও দুর্দশার মধ্যে দিয়েই যেতে হবে। এর থেকে পরিত্রাণের কোন সহজ রাস্তা নেই।

৩ (খ) ভিয়েতনাম, চীন, কিউবা প্রভৃতি দেশগুলি সম্পর্কে

(i) ভিয়েতনাম, চীন, কিউবা প্রভৃতি দেশে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু তার নেতৃত্বে ছিল স্তালিনবাদী বা মাওবাদীরা কিংবা পেটি বুর্জোয়া বিপ্লববাদীরা, ভিয়েতনামে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে লড়াই পুঁজিবাদ-বিরোধী রূপ ধারণ করে এবং রাশিয়া, চীন এবং দুনিয়ার শ্রমিকের সহায়তায় সাফল্য লাভ করে। চীনেও সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র বিরোধী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে এক বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং কায়েম হয় শ্রমিক রাষ্ট্র। কিউবাতেও অনুরুপ ঘটনা ঘটে। কিন্তু এসব দেশে সোভিয়েত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সঠিক দিশা সম্পন্ন নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হয়, স্তালিনবাদী, মাওবাদী প্রভৃতি দল রাষ্ট্রের দখল নেয় এবং প্রথম থেকেই আমলাতান্ত্রিক শাসন চালাতে থাকে। এগুলি প্রথম থেকেই বিকৃত শ্রমিক রাষ্ট্ররূপে গড়ে ওঠে।

(ii) এই পর্যায় কাটলে আমরা আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব সশস্ত্র সংঘর্ষের রূপ নিতে দেখেছি, যেমন চীন-রাশিয়া বা চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধ । কাম্পুচিয়াতে চীনা এবং ভিয়েতনামী শাসকদের অনুগামীদের মধ্যে সংঘাত প্রথম থেকেই ভয়ংকর এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের রূপ নিয়েছে, যা আজও সম্পূর্ণ পরিসমাপ্ত হয়নি। কাম্পুচিয়ায় স্তালিনবাদী ও মাওবাদীদের যে বীভৎস রূপ দেখা গেছে তাতে বহু মানুষের প্রাণ গেছে।

(iii) কিউবাতে স্তালিনবাদীদের ব্যতিরেকেই পেটিবুর্জোয়া নেতৃত্বে বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল, কিন্তু এখানেও সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নেতৃত্বের অভাবে এর ফলকে আত্মসাৎ করে কাস্ত্রোবাদীরা, এরাও ছিল স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্রেরই রকমফের। এখানেও যে শ্রমিকরাষ্ট্র গড়ে ওঠে, তাও প্রথম থেকেই ছিল আমলাতান্ত্রিক বিকৃতির শিকার। তবে এই সব উপরোক্ত দেশসমূহের গুণগত অবস্থান এক হলেও তাদের মাত্রাগত তারতম্য ও আমলাতন্ত্রের চরিত্রের মধ্যে বেশ কিছু প্রভেদ আছে। কিন্তু এই সবগুলিই হল প্রলেতারীয় বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র।

(iv) হাজারো বিকৃতি সত্ত্বেও চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা প্রভৃতি রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকা এখনও সম্পূর্ণ ত্যাগ করেনি। যদিও তারা সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছে, বাজার অর্থনীতিকে বিভিন্নভাবে ও বিভিন্নমাত্রায় অনুপ্রবেশ করতে দিতে বাধ্য হচ্ছে এবং ব্যক্তি পুঁজিকে উৎসাহিত করছে। সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপোষরফা করে তারা দেশেরঅর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা করতে চাইছে, কিন্তু এতে শেষরক্ষা হবে না। ওই দেশগুলিতে নতুন ধরনের সংকট দেখা দিচ্ছে। চীনে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে তিয়েন-আন-মেন এ যে গণ অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল তা ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ, যদিও পুঁজিবাদী পথগামীরা তার নেতৃত্ব দিয়েছিল। সে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। কিন্তু যেভাবে সেখানে ধনতন্ত্রের অগ্রগতি হচ্ছে, তাতে রাজনৈতিক উপরিকাঠামোয় পুঁজিবাদীদের আগমন হওয়া অদূর ভবিষ্যতে অসম্ভব নয়, যদি না একটি রাজনৈতিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে শ্রমিকশ্রেণী সেখানে আমলাতন্ত্রকে দূর করে দেয়। অবশ্য ট্রটস্কিপন্থী পার্টির অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক 'বিপ্লবের সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ ।

(v) উপরোক্ত দেশগুলির অবস্থা অনেকটা একই রকম। তবু এসব রাষ্ট্রের কর্ণধারদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকাকে তুচ্ছ করে দেখলে চলবে না এবং তাকে মদত করাটা অবশ্যকর্তব্য। যেমন কিউবায় মার্কিনী অবরোধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা ও অবরুদ্ধ কিউবান জনগণকে সাহায্য দেওয়াটা আবশ্যিক। কিন্তু এসব দেশের শাসকদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীকে রাজনৈতিক বিপ্লবে অনুপ্রেরণা যোগানোটাও প্রত্যেক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবীর কর্তব্য।

৪। সাম্রাজ্যবাদ ও তৃতীয় বিশ্ব

(i) বহু প্রকারভেদ সত্ত্বেও তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলতে দু-একটা ব্যতিক্রম বাদে আমরা তাদেরকেই চিহ্নিত করি যারা একটা ঔপনিবেশিক বা আধা ঔপনিবেশিক শাসনে আবদ্ধ ছিল, বর্তমানে সেগুলি রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করলেও অর্থনৈতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের ছত্রছায়ায় রয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদী সংকটের প্রভাব এই সব দেশের উপর বেশ ভালভাবে পড়ছে।

(ii) অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক এবং দেশীয় সম্পদের ভিত্তিতে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিশর প্রভৃতি দেশ কম বেশি এক জায়গায় আছে। এসব দেশে কিছু পরিমাণে শিল্পায়ন হয়েছে। দেশীয় বুর্জোয়াদের একটা মোটামুটি শক্তিশালী শিল্প ভিত্তি আছে। এদের কেউ কেউ আবার অন্যান্য দেশে পুঁজি লগ্নিও করে থাকে। ভারতে -এবং ব্রাজিলে শিল্প ও কৃষি শ্রমিকের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। এ দেশগুলির শাসকেরা সাম্রাজ্যবাদের সাথে দ্বন্দ্ব এবং ঐক্য দুইই বজায় রেখে চলতে চায়।কারণ অর্থনৈতিকভাবে তারা অনেকটাই, বলা যায় অধিকাংশ পরিমাণেই সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু তারা তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্যই আপেক্ষিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়। এজন্য তারা সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে এবং সাম্রাজ্যবাদী ও শ্রমিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র গোষ্ঠীর মধ্যে ঘটে চলা দ্বন্দ্বকে কাজে লাগাতে চায়। এইসব দেশগুলিই আজ সংকটে জর্জরিত।

(iii) ইন্দোনেশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ সংকট চাপিয়ে দেওয়ার ফলে অবস্থা চরমে পৌঁছেছে, অর্থনীতিতে ধ্বস নেমেছে। সেখানে সুহাতোর একনায়কতন্ত্রী শাসনের পতন হয়েছে, দেশের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ, গণবিক্ষোভ বিশাল আকার নিয়েছে।

(iv) তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে চার ড্রাগন হিসাবে চিহ্নিত হত দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ার তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুর। এদের অবস্থাও করুণ। এই দেশগুলিতে পুঁজিবাদের সাফল্য নিয়ে বুর্জোয়ারা ঢাক পিটিয়ে প্রচার করতো, তাতে অনেক বামপন্থীরাও বিভ্রান্ত হ'ত, মনে করত আজকের যুগেও পুঁজিবাদের প্রগতিশীলতা রয়েছে। এই দেশগুলির শিল্পোন্নত হওয়ার পিছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিশেষ স্বার্থ। বিশেষ করে এশিয়ায় রুশ ও চীন বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় বিপ্লবের প্রসার রোধে, এইসব অঞ্চলে নিজেদের ভিতকে সবল করতে সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি এদের রক্ষণাবেক্ষণ করে এসেছে। হয়েছে ব্যাপক সামরিকীকরণ। আর অর্থনীতির রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় মূল্য দিতে হয়েছে শ্রমিকশ্রেণীকে, যাদেরকে মানবিক উৎপাদিকাশক্তি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু মারাত্মক সংকট গল্পের ফানুসটা ফাটিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় সংকটে কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, ব্যাপক ছাঁটাই, বেকারী, মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী জনতা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন। হংকংকে চুক্তি অনুযায়ী চীনের হাতে সমর্পণ করতে হয়েছে। ড্রাগন দেশগুলিতে অর্থনৈতিক সংকট ঘোরতর রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেওয়ায় পুঁজিবাদের প্রগতিশীলতার আষাঢ়ে গল্প বলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার' সাম্রাজ্যবাদী অপচেষ্টা বানচাল হয়ে গেছে।

(v) তৃতীয় বিশ্বের আর একটি ধরণ হচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলি, যারা মূলতঃ খনিজ তেলের উপর নির্ভরশীল এবং মোটামুটিভাবে ওপেকভুক্ত। এদের ভিতরকার জোটবদ্ধতার অনেকাংশে ক্ষয় ঘটেছে। ইরাক- ইরান যুদ্ধ এবং সর্বশেষ উপসাগরীয় যুদ্ধে তা স্পষ্ট দেখা গেছে। এই দেশগুলির মধ্যেও ফারাক আছে, ইরাক, ইরান-এর সাথে কুয়েত, কাতার, বাহরিন, ইয়েমেন ইত্যাদি শক্তির পার্থক্য বিদ্যমান। এইসব দেশের বুর্জোয়ারা তাদের সঞ্চিত পুঁজি দেশের অভ্যন্তরে বিশেষ একটা বিনিয়োগ করে না। এই দেশগুলি কমবেশী স্বৈরতান্ত্রিক এবং অনেকক্ষেত্রে ন্যূনতম শ্রমিক আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবীও এখানে মানা হয় না। এই দেশগুলিরও সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরতা রয়েছে, আবার তেল নিয়ে স্বার্থের সংঘাতও হয়েছে। ইরাকের উপর মার্কিনী ঘন ঘন আক্রমণ এবং রাষ্ট্রসংঘ মারফৎ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারী করা এই সংঘাতের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সোমালিয়াতে মার্কিনী আগ্রাসনের লক্ষ্য হল তেল প্রধান অঞ্চলে সর্বময় কর্তৃত্ব কায়েম করা।

(vi) এছাড়াও তৃতীয় বিশ্বের অন্তর্গত রয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশসমূহ। এদের অর্থনীতিতে ধনতন্ত্রের বিকাশ খুব কমই হয়েছে। এদের শাসকরা প্রধানতঃ সাম্রাজ্যবাদের অনুগত বা তাদের দালাল। সমাজে এই শাসকদের গণভিত্তি কম থাকার কারণে এরা মূলতঃ দমন পীড়নের উপর নির্ভর করে শাসন চালায়।

(vii) আলজিরিয়া, অ্যাঙ্গোলা প্রভৃতি কিছু রাষ্ট্র আছে, যেখানে বামপন্থী পেটি বুর্জোয়ারা ক্ষমতা কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। এসব দেশে শক্তিশালী শ্রমিকশ্রেণী ও কমিউনিষ্ট পার্টির অনুপস্থিতিতে এগুলি হয়ে ওঠে পেটিবুর্জোয়া বোনাপার্টিস্ট ধরণের রাষ্ট্র, যাদের শাসকবর্গ কমবেশি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, তবে স্বতন্ত্র অর্থনীতির অস্তিত্ব না থাকনীয় এরা শেষমেষ সাম্রাজ্যবাদের উপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যেমন দেখা গেছে সাম্প্রতিককালে নিকারাগুয়ায়

(viii) তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই বুর্জোয়ারা বিভিন্ন পরিমাণে কৃষিতে প্রাক ধনবাদী ভূস্বামী শ্রেণী এবংন গ্রামীণ বুর্জোয়াদের সাথে জোঁট বেঁধে শাসন চালায়। স্বাভাবিক ভাবেই এসব দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কাজ বহুল পরিমাণে অসমাপ্ত থেকে গেছে। সাম্রাজ্যবাদের যুগে যেহেতু স্বয়ংসম্পূর্ণ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসম্ভব, তাই এসব দেশে শ্রমিক শ্রেণীর কাজ হল নিরন্তর বিপ্লব-এর প্রক্রিয়ায় শ্রমিক রাষ্ট্র গড়ার দিকে অগ্রসর হওয়া।

(ix) তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হল ইজরায়েল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথমটি জাতি-ধর্ম-ভিত্তিক কৃত্রিমভাবে তৈরী এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী হল সাম্রাজ্যবাদ। দ্বিতীয়টিতে বর্ণবৈষম্যবাদী বিদেশী শ্বেতশাসকরা নিজেরাই ওই দেশের নাগরিক হয়েছে। অর্থনৈতিক মানদন্ডে এরা পশ্চিম ইউরোরের যে কোন ছোট পুঁজিবাদী দেশের সমকক্ষ। দুটি দেশেই শ্রমিকের সংখ্যা একটি সামাজিক শ্রেণী হিসেবে শ্রেণী স্বাতন্ত্র্য ও শ্রেণী উদ্যোগের পক্ষে অনুকূল। এই দু দেশেই বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থার মদতদাতা ছিল সাম্রাজ্যবাদ। ঠাণ্ডা যুদ্ধের পর্যায়ে এদের ব্যবহার করা হত আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার প্রাধান্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে শেষ হয়ে যায়। তাই সাম্রাজ্যবাদের পরামর্শে এই দুই দেশের শাসকরা প্যালেস্টিনীয়দের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং বর্ণবৈষম্যবাদ এর প্রশ্নে একটা সমঝোতায় এসেছে।

(x) প্যালেস্টাইনীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইজরায়েল— পি.এল.ও চুক্তি প্যালেস্টাইনী জনগণের প্রতি এক বিশ্বাসঘাতকতা। যে সীমিত স্বায়ত্বশাসন চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে তা ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রসংঘ নিদের্শিত প্রস্তাবগুচ্ছের থেকেও অনেক কম। প্যালেস্টাইনী জনগণের মুক্তি আন্দোলন সমর্থন করার সাথে সাথে আমরা ইজরায়েলের অধিবাসীদের ওখান থেকে তাড়ানোর বিরোধী । বাস্তবে এই দ্বন্দ্ব পুঁজিবাদের সীমানার মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। ইজরায়েল প্যালেস্টাইনী শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম এবং তার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।

(xi) দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবাদী সরকারের সাথে আফ্রিকান ন্যাশানাল কংগ্রেস ও সাউথ আফ্রিকান কমিউনিস্ট পার্টির যে চুক্তি হয়েছে তা এককথায় দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের সঙ্গে তঞ্চকতা। পুরনো শ্বেতশাসকদের স্থানে ম্যাণ্ডেলা সরকারের গঠন হচ্ছে বর্ণবৈষম্যবাদের প্রতীকী অবসানমাত্র। উৎপাদনের উপকরণের উপরে শ্বেতকায় বুর্জোয়াদের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ কখনোই কালো মানুষদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদ না করে ওখানে বর্ণবৈষম্যবাদ দূর করা অসম্ভব।

(xii) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে সদ্য স্বাধীন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অনেকে তাদের আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র রক্ষার চেষ্টা চালিয়েছিল যার ফলশ্রুতিতে গড়ে ওঠে জোট নিরপেক্ষ (ন্যাম)। তা সত্ত্বেও তৃতীয় বিশ্বের ভিতর বাস্তব ঐক্য গড়ে তোলা যায়নি। কারণ বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর সাথে এইসব দেশের গাটছাড়া বাঁধা আছে। তাও ঠাণ্ডাযুদ্ধ অবসানের পূর্ববর্তী পর্যায়ে এই আন্দোলন যতটা গুরুত্ব পেত, আজ আর তা পায় না। তাই তো দেখা যায় সোমালিয়া বা ইরাকের উপর মার্কিনী হানাদারীর মত প্রশ্নেও তৃতীয় বিশ্ব দ্বিধাবিভক্ত।

(xiii) কমিউনিস্টদের কখনই এইসব দেশের শাসকদের সাথে কোনভাবেই আঁতাত করা বা তাদের সমর্থন করার প্রশ্ন আসে না। আমরা ইরাকের ওপর মার্কিনী আক্রমণের নিন্দা করি ও তার সক্রিয় বিরোধিতা করি এবং তাদের অত্যাচার-এর বিরুদ্ধে সেখানকার শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী জনগণের লড়াই- এর এবং ইরাকের নিপীড়িত জাতিসত্ত্বাগুলির মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন করি। ইরাকী শ্রমিকশ্রেণীর দায়িত্ব ইরাককে মার্কিন ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং পুঁজিবাদী একনায়কতন্ত্রী শাসন থেকে মুক্ত করা, সেখানে নিরন্তর বিপ্লবের পথে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা।

(xiv) রাষ্ট্রসংঘ তার জন্ম লগ্ন থেকেই আন্তার্জাতিক পুঁজিবাদের পুলিশম্যান হিসেবে নিয়োজিত থেকেছে, আমরা তার বিরোধিতা করি। নিরাপত্তা পরিষদে কিছু দেশের দায়ী সদস্য পদ লাভ সেখানে বৈষম্যের প্রতীক। আমরা শুধুমাত্র রাষ্ট্রসংঘে স্থায়ী সদস্যপদ বিলোপ বা সেই পদে ভারতবর্ষের অর্ন্তভূক্তির প্রচেষ্টার বিরোধিতাই করি না, আমরা রাষ্ট্রসংঘ বিলোপের পক্ষে। কারণ তা আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের রক্ষাকবচ।

(xv) তৃতীয় বিশ্বের অপেক্ষাকৃত অগ্রসর দেশগুলি তাদের পার্শ্ববর্তী দুর্বল দেশগুলির উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহৎ শক্তি হিসেবে তার আধিপত্যবাদী আকাঙ্খা চরিতার্থ করতে চায়। বাংলাদেশ সৃষ্টির সময়ে কিংবা শ্রীলংকার তামিল সমস্যার ক্ষেত্রে ভারতের এই ভূমিকা প্রত্যক্ষ করা যায়, যেমন গেছিল সিকিমকে গ্রাস করার সময়। ভারত আবার নেপালের ব্যাপারে, পাকিস্তান আফগানিস্থানের ব্যাপারে খোলাখুলি হস্তক্ষেপ করে থাকে।

(xvi) ভারতের সাথে পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্ক এই উপমহাদেশে স্থায়ী জটিলতার সৃষ্টি করেছে। উভয় দেশ একে অপরকে মূল শত্রু হিসেবে দেখিয়ে নিজেদের আভ্যন্তরীণ সমস্যা ধামাচাপা দিতে চায়। ভারতের সংশোধনবাদীরা ভারতের এই আধিপত্যবাদী প্রবণতার সমর্থক এবং সম্প্রসারণবাদী কার্যকলাপের প্রচ্ছন্ন মদতকারী। ভারত ও পাকিস্তানের পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ উপমহাদেশে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে।

(xvii) ভারতীয় উপমহাদেশে নেপালে রাজতন্ত্রের সাথে রফায় এসে সেখানে সংশোধনবাদীরা পার্লামেন্টের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। কিন্তু তারা একটিও বিপ্লবী প্রগতিশীল পদক্ষেপ নিতে পারে নি, ভূমি সংস্কার বা বুর্জোয় ভূস্বামীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও তারা আপাতভাবে বুর্জোয়া ভূস্বামীদের বিরোধী, কিন্তু হঠাৎ করে তাদের সাথে গাঁটছাড়া বাঁধতে সংশোধনবাদী ওস্তাদ। স্তালিনবাদীরা এইভাবে বারবার বিপ্লবী সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে, তারা বুর্জোয়াদের মধ্যে প্রগতিশীলতা খুঁজে বেড়িয়েছে আর শ্রমিকশ্রেণীকে করেছে বিভ্রান্ত।

(xviii) তৃতীয় বিশ্বের শাসকরা বর্তমানে বিভিন্ন বাণিজ্য জোট-এ আবদ্ধ হতে চাইছে। এই বাণিজ্য ব্লকে ঢুকে পড়ার প্রবণতা একদিকে সাম্রাজ্যবাদী জোটে ঢুকে পড়ার আকাঙ্খা প্রতিফলিত করছে, অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থান কিছুটা দৃঢ় করার একটা চেষ্টাও বটে। এরা সকলেই চায় অন্য দেশগুলির উপর দাদাগিরি ফলাতে, নিজেদের আখের গুছোতে। কিন্তু এরা নিজ দেশের শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী জনগণকে ভয় পায়, তাই সাম্রাজ্যবাদের পায়ে মুহুর্মুহু আত্মসমর্পণ করে। এটাই এদের চরিত্র।

৫। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন

(i) পুঁজিবাদী আমলে নিপীড়িত জাতি ও জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম এক বিশেষ ঘটনা যা সারা পৃথিবীতেই তীব্র আকারে বিরাজ করছে। পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদ এর কোন সমাধান দিতে পারে না। এ প্রসঙ্গে স্তালিনবাদ, মাওবাদ বা স্যোশাল ডেমোক্র্যাসীর ভূমিকা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। সমকালীন বিশ্বে তামিল, কুর্দ, কাশ্মীরি, আইরিশ, বাস্ক প্রভৃতি জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

(ii) মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এইসব জাতিগুলির সমানাধিকারের পক্ষে সওয়াল করি। জাতিগত সমস্যা ও সমানাধিকার-এর স্বীকৃতি হল শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণী ঐক্যের প্রাথমিক ধাপ। নিপিড়িত জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (বিচ্ছিন্নতার অধিকার সহ) কে আমরা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি। এই সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির উপর দাঁড়িয়ে আমরা প্রতিটি জাতি সংগ্রামের অন্তনির্হিত কারণ বিশ্লেষণ করি এবং সেই অনুযায়ী অবস্থান গ্রহণ করি। জাতিসমূহের সংগ্রামের পিছনে কোন বহুমাত্রিক কারণ নয়, বরং প্রায়শই তার সাথে জড়িত থাকে নানা ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপাদান। সেই বিচারে জাতি সংগ্রাম নিছক জাতিগত দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা হচ্ছে তার বাহ্যিক প্রকাশ মাত্র। শেষ বিচারে জাতি সমস্যা জাতিরাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়িয়ে বা কমিয়ে সমাধান করা যাবে না। এর চূড়ান্ত সমাধান একমাত্র বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের মাধ্যমেই সম্ভব।

(iii) শ্রীলংকার তামিলদের ন্যায়সংগত দাবীকে আমরা পূর্ণ সমর্থন করি। আমরা তাদের উপর রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের অধিকারী। কিন্তু আমরা মনে করি সিংহলী উগ্রজাতিয়তাবাদের প্রতিক্রিয়ায় উগ্র তামিল জাতীয়তাবাদ ও সমান ক্ষতিকারক, তা শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণী ঐক্যের পরিপন্থী। তাদের সংগ্রামের সব পদ্ধতি, বিশেষতঃ সন্ত্রাসবাদী পদ্ধতি আমরা সাধারণভাবে সমর্থন করি না। আমরা শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্যের ভিত্তিতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংসের সাধারণ দিশার ভিত্তিতে তামিলদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করি।

(iv) কুর্দরা, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, ও নিকটবর্তী অঞ্চলে কুর্দিস্থান গড়ার আন্দোলন চালাচ্ছে। এইসব দেশের শাসকরা তাদের উপর নির্মম দমনপীড়ন চালায়। তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবীকে 'আমরা' সমর্থন করি।

(v) তীব্বতীদের স্বাধীনতার দাবীও আমরা সমর্থন করি। এক্ষেত্রে চীনের মাওবাদীরা তীব্বীদের স্বতন্ত্র হওয়ার ও স্বাধীনতাকে দাবীকে পদদলিত করেছে। একই রকমভাবে আমরা বৃটেনে আইরিশ জাতির র মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। আমরা স্পেনে বাস্ক জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবী স্বীকার করি। এইরকমআরও বহু জাতিসত্তার লড়াই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হচ্ছে। এগুলিকে সাধারণভাবে সমর্থনের সাথে সাথে আমরা মনে করি এই লড়াইগুলি সফল হতে পারে শ্রেণীসংগ্রামকে তীব্রতর করে সমাজতন্ত্র কায়েমের মধ্য দিয়েই।

(vi) ভারতীয় উপমহাদেশে জাতীয় স্বাধীনতার দাবীতে বহুকাল যাবৎ তীব্র আন্দোলন চালাচ্ছেন কাশ্মীরীরা। এখানে ভারত ও পাকিস্তান ভাগাভাগি করে শোষণ নিপীড়ণ চালায়। তারা উভয়ই স্বাধীন কাশ্মীরের দাবীকে অস্বীকার করে। ভারতের শাসকরা এখানে গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়েও পিছিয়ে এসেছিল এবং তারপর থেকে মিলিটারী দিয়ে সেখানকার জনসাধারণের উপর এক ভয়াবহ সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে। কাশ্মীরিদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে অনেক ধাপ্পাবাজ, সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট মৌলবাদী শক্তিও ঢুকে পড়ে তাকে বিপথগামী করতে সচেষ্ট আছে। কিন্তু তাতে সেখানকার জনগণের স্বাধীনতার দাবী নস্যাৎ করা যায় না। কাশ্মীরের স্বাধীনতা বলতে আমরা ভারত ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের স্বাধীনতার কথা বলি। ভারতের স্তালিনবাদীরা নিলজ্জভাবে কাশ্মীরী প্রশ্নে ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীকেই সঠিক বলে বিবেচনা করে এবং সেখানে দমনপীড়ন চালানোর ঘটনাকে পরোক্ষে মদত করে।

৬। বিশ্ব রাজনীতির গতি প্রকৃতি

(i) বিংশ শতকের শেষ দশকে বিশ্ব রাজনীতির একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে ক্রমবর্ধমান দক্ষিণপন্থীকরণ। এর দুটি দিক আছে। একটি হচ্ছে রাষ্ট্র ও দলসমূহের দক্ষিণমুখী গতি এবং অন্যটি হচ্ছে মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাবাদের মাধ্যমে ফ্যাসীবাদী বা ওই ধাঁচের গণ আন্দোলন।

(ii) বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট, পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে আমলাতন্ত্রের পতন, চীন ও অন্যান্য অ-পুঁজিবাদী দেশের পুঁজিবাদের কাছে ক্রমশঃ আত্মসমর্পণ ইত্যাদি ঘটনা পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার বুর্জোয়া দলগুলিকে ক্রমশঃ দক্ষিণ দিকে সরতে বাধ্য করছে। পূর্বে জনগণকে ধোঁকা দিতে যেসব জনকল্যাণকর প্রকল্প রূপায়ণের প্রচেষ্টা চালু ছিল তা ক্রমেই অবলুপ্তির পথে। আর ‘কনসেশন' দেওয়া যাচ্ছে না। পুজিবাদের তাত্ত্বিকেরা যে দাবী করত যে পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রের মানবিক দিককে আত্মীকরণ করে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করেছে, তার অসারতা আজ প্রকট হয়ে পড়েছে। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের চাপে বুর্জোয়ারা সমাজতন্ত্রের বিপদ এড়াতে যেসব টোটকা হাজির করেছিল শ্রমিক রাষ্ট্রগুলির বৃহৎ তাংশের অনুপস্থিতিতে তার আর প্রয়োজন থাকছে না। ঘুষ দেবার সামর্থও হারিয়ে ফেলছে পুঁজিবাদ।

(iii) রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই প্রভাব দেখা যায় বিভিন্ন বুর্জোয়া দলের মধ্যেকার শ্লোগানে। অর্থনৈতিক পলিসির মধ্যে পার্থক্য মুছে যাচ্ছে, বিশেষতঃ মধ্যপন্থী বুর্জোয়া দল এবং স্যোশাল ডেমোক্র্যাসীর মধ্যে। জনগণ ও শ্রমিক শ্রেণীর চোখে পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এই সুযোগে বামপন্থীরাও কোথাও কোথাও নির্বাচনে কোয়ালিশনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসছে, এবং যথারীতি তাদের বামপন্থা বিসর্জন দিয়ে দক্ষিণপন্থীদের দাসত্ব করছে। ফলে তারাও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।

(iv) ইউরোপ এবং আমেরিকায় এর পাশাপাশি একাধিক ফ্যাসীবাদী সংগঠন গড়ে উঠছে। এরা বর্ণবৈষম্যবাদ, উগ্র ধর্মান্ধতাকে সম্বল করে বেড়ে উঠছে এবং এক দক্ষিণপন্থী গণ আন্দোলন সংগঠিত করতে সচেষ্ট হয়েছে। এই সব শক্তির বিকাশ বুর্জোয়াদের সংকট এবং শ্রমিকশ্রেণীর অপ্রস্তুত অবস্থাকেই নির্দেশ করে ।

(v) সাম্প্রতিক কালে আর একটি ঘটনা হচ্ছে সংগঠিত ধর্মীয় মৌলবাদী আন্দোলন। এশিয়া; আফ্রিকাতে এই আন্দোলন বেশী তীব্র। মুসলিম, হিন্দু, খ্রীষ্টান সব মৌলবাদী সংগঠন সক্রিয় হয়ে উঠছে। ভারতে হিন্দু মৌলবাদীরা, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম মৌলবাদীরা খুবই সংগঠিত। মুসলিম মৌলবাদীরা আলজিরিয়া, লিবিয়া, মিশর, প্যালেস্টাইনে, তুরস্ক, ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ প্রভৃতি স্থানে খুবই সক্রিয়। একদিকে এরা বর্বর, মধ্যযুগীয়, নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিকভাবে পশ্চাৎপদতার পূজারী, অন্যদিকে মুসলিম মৌলবাদ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের চাপে পিষ্ট, ফলে তার সাথে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরোধও রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইটুকুকে আমরা সমর্থন করি, যদিও তাদের মৌলবাদের আমরা বিরোধিতা করি।

(vi) আফগানিস্তানে মৌলবাদী তালিবানরা সেখানকার উপর থেকে চাপানো তাঁবেদার সরকারকে হটিয়ে দেয়। আফগান জনগণের একটা বড় অংশ তাদের সমর্থন করেছিল। তাদের কার্যকলাপে মৌলবাদী এবং নিঃসন্দেহে প্রগতির পরিপন্থী, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান, সেক্ষেত্রে আমরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের ভূমিকা সমর্থন করি।

৭। শ্রমিক আন্দোলন ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন

(i) আজকের দিনে শ্রমিক আন্দোলন প্রায় একটা দিশাহীন অবস্থায় পৌঁছেছে। উপযুক্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নেতৃত্বের অভাবে, সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী আক্রমণের সামনে এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসী ও স্তালিনবাদী নেতৃত্বের বেইমানীর ফলে শ্রমিকশ্রেণী তার অর্জিত অধিকার অনেকাংশে হারাতে বসেছে। আজকের আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল অধিকারের পরিধি ব্যাপকতর করার সংগ্রাম নয় বরং অর্জিত অধিকার রক্ষা করার সংগ্রাম। কিন্তু সেগুলি টিকিয়ে রাখতে গেলে যে ধরণের ঐক্য ও মানসিকতা থাকা দরকার তার অভাব খুবই প্রকট।

(ii) এই অবস্থাটা বিরাজ করছে তার কারণ শ্রমিক সংগঠনগুলির আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব পুঁজিবাদের সংকটকে নিজেদের সংকট বলে চিহ্নিত করে বুর্জোয়া পলিসিই মেনে নিয়েছে। অবশ্য এর বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও বিদ্রোহও হয়েছে। স্বাধীন, স্বতন্ত্র শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিক আন্দোলন ও বিক্ষিপ্তভাবে হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে নীচুতলার চাপে দালাল নেতৃত্বকেও সংগ্রামের আহ্বান রাখতে হয়েছে, অবশ্য দালাল নেতৃত্ব সুযোগ মত আন্দোলনকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে বা বিপথগামী করতেও সচেষ্ট হয়েছে।

(iii) রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের পতনের পর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন অনেকটাই হেয় হয়েছে, জনগণ বুর্জোয়াদের ও শোধনবাদীদের প্রচারে বিভ্রান্ত হয়েছে এবং স্তালিনবাদকে মার্কসবাদের সমর্থক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে সমাজতন্ত্রের পরাজয় বলে মনে করেছে। অন্যদিকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসীও বুর্জোয়াদের সেবাদাসে পরিণত হওয়ায় শ্রমিক আন্দোলনে কোন দাগই কাটতে সমর্থ হয় নি। আর আমরা ট্রটস্কিবাদীরা বহুধাবিভক্ত হওয়ায় শ্রমিক আন্দোলনে কখনই কার্যকরী শক্তি হয়ে উঠতে পারিনি।

(iv) একটি শক্তিশালী বিপ্লবী শ্রেণী আন্দোলন তথা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন নির্ভর করে শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের উপর। সেই কাজের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন শ্রমিক আন্দোলন ও সংগঠনে বিপ্লবী কেন্দ্র গড়ে তোলা। একমাত্র তার ভিত্তিতেই রক্ষণাত্মক শ্রমিক আন্দোলনকে আক্রমণাত্মক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ স্পষ্ট সামাজিক দিশার ভিত্তিতে আন্দোলনের নেতৃত্বের সংকট অতিক্রম করাই হল এই মুহূর্তে প্রধান কর্তব্য। এখন থেকে এই কাজ শুরু করা না গেলে বিপ্লবের সময়কালে অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে আন্দোলনকে সঠিক দিশায় পরিচালিত করা যাবে না। তাই নেতৃত্বদাবী ট্রটস্কিবাদী পার্টির এবং শ্রমিক আন্দোলনে তার নেতৃত্বদায়ী উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরী।

৮। অন্যান্য পুঁজিবাদ বিরোধী সামাজিক আন্দোলন

(i) সারা দুনিয়াতেই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলন ছাড়াও আরও বহু আন্দোলন সংগঠিত হয়, বিশেষ করে কৃষক আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, যুব আন্দোলন, নানা ধরনের কর্মচারী সংগঠনের আন্দোলন বা বামপন্থী পেটি বুর্জোয়া মনোভাবাপন্ন শক্তির আন্দোলন। এসব আন্দোলনে আমাদের অংশ নিতে হবে এবং তাকে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়াটাই হল আসল কাজ ।

(ii) এছাড়াও রয়েছে নারীমুক্তির আন্দোলন, পরিবেশ দূষণ বিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। শোষণকারী বুর্জোয়া সমাজে নারীর পূর্ণাঙ্গ মুক্তি সম্ভব নয় ৷ বুর্জোয়া নারীবাদী আন্দোলন নারীমুক্তির এক বিকৃত ও কদর্য ব্যাখ্যা করে এবং তা নারীমুক্তি আন্দোলনকে বিপথগামী করে। আমরা নারীমুক্তি আন্দোলনকে দিশা দিতে চাই, তাই বলতে চাই যে একমাত্র সমাজতন্ত্রেই প্রকৃতপক্ষে নারী পুরুষের সমমর্যাদা পেতে পারে এবং তার উপর শোষণ বন্ধ হতে পারে, নচেৎ তা কখনই সম্ভব হবে না।-

(iii) পরিবেশ নিয়েও অনুরূপ কথা বলা চলে। বুর্জোয়ারা দৈনন্দিন নানাভাবে পরিবেশকে কলুষিত করছে। এ ব্যাপারে গণসচেতনতা বাড়ায় এখন বুর্জোয়ারাই কোথাও সরাসরি কোথাও বা বিভিন্ন এন.জি.ও মারফৎ এর বিরুদ্ধে লোকদেখানো আন্দোলন করে। পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে তাকে সমাজতন্ত্রের লড়াই-এর সাথে যুক্ত করতে হবে। এছাড়াও বিজ্ঞানকে মারণাস্ত্র তৈরীর কাজ থেকে বিরক্ত করে সর্বমুখী করে তোলার কাজে ব্যবহার করা, সংস্কৃতিকে দূষণ মুক্ত করা ও সুস্থ সংস্কৃতি চালু করা ইত্যাদি যে সমস্ত আন্দোলন বিভিন্ন দেশে সংগঠিত হচ্ছে তাদেরকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অঙ্গীভূত করতে হবে।

৯। আন্তর্জাতিকতাবাদ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন :

(i) পুঁজিবাদের অবসান ও সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় নির্ভর করে বিশ্ববিপ্লবের উপর। সেই হিসেবে সাম্যবাদী আন্দোলন হচ্ছে এক আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন হচ্ছে ওই আন্দোলনের সাংগঠনিক আধার, কেন না কোন জাতীয় পার্টি বুর্জোয়াদের ভাবাদর্শগত আক্রমণের মুখে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে

(ii) আন্তর্জাতিক সংগঠন কেবল জাতীয় সংগঠনগুলির মিলন কেন্দ্র নয়। তা হল বিশ্বজোড়া এক অভিন্ন সংগঠন, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার ভিত্তিতে, বিভিন্ন দেশে যার দেশীয় শাখা বর্তমান। সেইদিক দিয়ে আমরা কোন জাতীয় দল নয়, আমরা আন্তর্জাতিক ট্রটস্কিবাদী সংগঠনের একটা কাঠামো তৈরীর লক্ষ্যে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে চাই, যে সংগঠন ছাড়া আমাদের সমস্ত প্রয়াসই ব্যর্থ হতে বাধ্য। সেই হিসেবে আমাদের সংগঠনের চরিত্র উৎক্রমণশীল। যা ভবিষ্যতে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনে নিজেকে বিলীন করবে।

(iii) আজকের বর্তমান বাস্তবতায় ট্রটস্কিবাদী হিসেবে যারা নিজেদের দাবী করে তাদের সবাইকে একজোট করে একটি ঐক্যবদ্ধ একক আন্তর্জাতিক গড়ে তোলার স্বপ্ন একটি অলীক কল্পনা বিলাস। ওই সব সংগঠনের অনেকগুলিই আর বিপ্লবী অবস্থানে নেই।

(iv) বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে চতুর্থ আন্তর্জাতিকে ভাঙ্গন এবং পরবর্তীকালে বহু উপবিভাজনের কারণ হল সমকালীন ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ ও অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে ভিন্নতা। সেই হিসেবে শুধু মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, ট্রটস্কীর বক্তব্যের স্বীকৃতি, চতুর্থ আন্তর্জাতিককে স্বীকার করা বা উৎক্রমণশীল কর্মসূচীকে মেনে নেওয়াই ঐক্যের ভিত্তি হতে পারে না, ওইগুলির সাথে সাথে সমকালীন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান ঘটনাসমূহের বিশ্লেষণেও ঐক্যমত হওয়াটা দরকার। এই পদ্ধতিতেই ঐক্য সম্ভব। আমরা কোন একটি গোষ্ঠীকেই চতুর্থ আন্তর্জাতিকের একমাত্র উত্তরসূরী হিসেবে স্বীকার করি না। আমরা মনে করি পুরনো ট্রটস্কীবাদী শক্তির বিপ্লবী অংশ এবং নতুন উদীয়মান শ্রেণীসচেতন অগ্ৰণী বাহিনীর সমন্বয়ে গড়ে উঠবে আগামী দিনের চতুর্থ আন্তর্জাতিক।

১০। উপসংহার

আমরা সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনরূপ সংশয় পোষণ করি না। আমরা দুনিয়ার শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী জনগণের সাথে একযোগে লড়াই চালিয়ে চালিয়ে চতুর্থ আন্তজাতিককে পুনর্গঠন করতে, ভারত সহ বিভিন্ন দেশে নিরন্তর বিপ্লবের পথে সমাজতানতিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে এবং দুনিয়া জোড়া সাম্যবাদী ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যেতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

জাতীয় পরিস্থিতি

শুরুর কথা

প্রায় দশ মাস হয়ে গেল ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় আসীন রয়েছে ফ্যাসীবাদ ও বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। গত দশক থেকেই ভারতবর্ষের রাজনাতি এবং অর্থনৈতিক নীতি সমূহে যে পরিবর্তন লক্ষিত হয়েছে তারই ফলশ্রুতি হিসেবে যে ফ্যাসীবাদদের এই ক্ষমতা যখন দখল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদের এই উত্থানকে হৃদয়ঙ্গম করতে গেলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন, তাতে বুর্জোয়াদের ভূমিকা, কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ ইত্যাদি সম্পর্কে একটা ধারণা জানা প্রয়োজন।

ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, বড়ো আকারে, ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের মধ্য দিয়ে, তার আগে পরে অনেক স্থানীয় বিদ্রোহও বৃটিশ শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। এই সময়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার দেশে পুঁজিবাদ বিকাশের স্বার্থে ভারতবর্ষ থেকে কাঁচামাল আহরণের জন্য দেশজুড়ে রেলপথের জাল ছড়িয়ে দেয়। তারই আনুষঙ্গিক হিসেবে গড়ে ওঠে বিভিন্ন ধরণের শিল্প। গড়ে ওঠে ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী। বুর্জোয়া শ্রেণীর পার্টি হিসেবেই গড়ে ওঠে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। সাম্রাজ্যবাদের অধীনে জন্মপ্রান্ত ভারতীয় বুর্জোয়ারা ছিল খুবই দুর্বল এবং তাদের দালাল। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক লড়াই- গড়ে তোলার মত সামর্থ্য বা ইচ্ছা কোনোটাই তাদের “ ছিল না। তারা সবচেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত ছিল নবোদিত শ্রমিক শ্রেণীকে নিয়ে। তাই সাম্রাজ্যবাদের সাথে দরকষাকষি আর সমঝোতাই ছিল তাদের রাজনীতি। আর, এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে তাদের যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিল খঞ্জ গান্ধী। তার অহিংসার রাজনীতি ছিল আসলে শ্রমিক শ্রেণী এবং কৃষক সম্প্রদায়কে বৈপ্লবিক রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার একটা ওজর মাত্র। সাম্রাজ্যবাদের সাথে তার দরকষাকষির একটা ঘোমটা হিসেবেও তা ব্যবহৃত হত। ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্তব্য ছিল প্রথম থেকেই ভারতীয় দালাল বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি কংগ্রেসকে শ্রমিক কৃষকের মধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে শ্রমিক' নেতৃত্বে কৃষকদের সংগঠিত করে নিরন্তর বিপ্লব (Permanent Revolution - জাতীয় গণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মেলবন্ধন) এর পথে এগিয়ে চলা। কিন্তু স্ট্যালিনবাদী তৃতীয় আন্তর্জাতিকের প্রতিবিপ্লবী লাইন অনুসরণ করতে গিয়ে CPI খঞ্জ গান্ধীর দালালে পরিণত হয় এবং গান্ধী ও জিন্নাকে ভারতীয় জাতির নেতায় পরিণত করে। এর ফলে যা ঘটার তাই ঘটল। ভারতীয় বিপ্লব সফল হল না, ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের ঐক্যকে চিরতরে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালরা কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, আর.এস.এস ধর্মীয় ভিত্তিতে ভারতকে বিভাজিত করল। সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের এই প্রতিবিপ্লবী কাজকে সর্ব শক্তি দিয়ে রোখা তো দূরের কথা স্ট্যালিনবাদী CPI তাদের বরঞ্চ মদত করল। বিভিন্ন স্ট্যালিনবাদী কুযুক্তির আড়ালে তাদের তারা সমর্থন জানাল। সেই বিষাক্ত কাজের ফল এখন ফলছে, উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি-র মত ফ্যাসিবাদী দলগুলি এখন ভারতীয় জনমানসে তার ভিত্তিভূমি তৈরী করছে।

সাম্রাজ্যবাদের জঠরে জন্ম নিয়েছিল যে ভারতীয় পুঁজিবাদ তা প্রথম থেকেই ছিল প্রতিক্রিয়াশীল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা তাকে হাতে ধরে ক্ষমতায় বসিয়ে যাবার পূর্ব পর্যন্ত সে সাম্রাজ্যবাদের দালালি করে গিয়েছিল এবং সামন্তপ্রভুদের সাথে গড়ে তুলেছিল এক সমঝোতা। ক্ষমতায় আসবার পরেও তার এই চরিত্র ছিল অব্যাহত। প্রত্যক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদ ক্ষমতায় না থাকলেও ভারতীয় বুর্জোয়াদের মাধ্যমে ও তাদের সহযোগিতায় সে ভারতীয় শ্রমিক- কৃষক-মেহনতী মানুষকে শোষণ করে যাচ্ছিল। অন্যদিকে সামন্তপ্রভুদের সাথে তার গাটছাড়াকে অক্ষুণ্ণ রেখেছিল ভারতীয় বুর্জোয়ারা। পঞ্চাশের দশকে নেহেরু যখন জমিদারি প্রথার অবলুপ্তি' ঘোষণা করেন, তিনি কিন্তু তার জন্য তাদের সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন এমনকি ভারতে সামন্তবাদের পাণ্ডা রাজন্যদের ১৯৭০ পর্যন্ত ভাতা দেওয়া হত। সুতরাং সামন্তদের হৃদয়ের বেদনা যে বুর্জোয়ারাও হৃদয় দিয়ে অনুভব করত তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে সামন্তদের সাথে যতই গাটছাড়া থাক না কেন, বুর্জোয়ারা কিন্তু এই সামন্তপ্রভুদের ধীরে ধীরে কুলাকে পরিণত করার যে কর্মসূচী নিয়েছিল তাতে তারা অনেকটাই সফল। দেশজুড়ে একটা বিশাল কুলাক শ্ৰেণী তারা ইতিমধ্যেই তৈরী করেছে এবং ভারতের গ্রামাঞ্চলগুলিতে শ্রেণী বিভাজনও যথেষ্টই ঘটে গেছে।

কিন্তু বিপ্লবী পথে সমস্যার সার্বিক ও মৌলিক পরিবর্তনের অভাবে যে আধখ্যাচড়া পুঁজিবাদের বিকাশ ভারতে ঘটেছে তাতে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষের দুর্দশা বেড়েছে বই কমে নি। রাশিয়ায় যদি পুঁজিবাদের বিকাশ সংস্কারের পথে হয় তবে তা কি সার্বিক বিপর্যয়ের মধ্যে মেহনতী মানুষকে ফেলতে পারে, এই মন্তব্য করে লেনিন সেই বিপর্যয়ের যে ছবি এঁকেছিলেন তা এখন আমরা প্রত্যক্ষ করছি ভারতবর্ষে। আশির দশকে থেকে এবং মূলত নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিবিপ্লবী ভাঙ্গনের পরে সাম্রাজ্যবাদী নির্দেশ এবং দমন যেরকম ক্রমবর্ধমান তাতে এই সমস্যা আরও বড়ছে। গ্যাট চুক্তিতে সই করার পর ভারতকে আরো বেশি বেশি করে সাম্রাজ্যবাদী অধীনতা মেনে নিতে হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদের সংকট ভারতেও পাচার করা হচ্ছে। আর এই বহুমুখী আক্রমণে মেহনতী মানুষের অবস্থা আজ দুর্বিষহ। তাদের দিনযাপন করাটাই আজ ক্রমশঃ বেশি বেশি করে দুঃসহ হয়ে উঠছে। ভারতে ফ্যাসিবাদের উদ্ভব এবং তার ক্রমবিকাশকে এইসব পরিপ্রেক্ষিত থেকে বুঝতে হবে।

ফ্যাসিবাদের উদ্ভব ও তার বিকাশ

ভারতে ফ্যাসিবাদের উদ্ভব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসনের সময়েই। ১৯২৫ সালে তৈরী হয় RSS। RSS তার জন্মলগ্ন থেকেই মুসলিমদের তার মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নিশ্চিহ্নকরণের অভিযানে নামে। কিন্তু ব্রিটিশদের দালাল হিসেবে কাজ করবার ফলে এবং জনগণের মধ্যে সেই হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবার ফলে তারা কোনদিনই সেরকম কিছু সুবিধা করে উঠতে পারে নি। যদিও শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষকে সাম্প্রদায়িক লাইনে বিভক্ত করা এবং সাম্রাজ্যবাদকে আড়াল করার তাদের কাজে তারা যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিল। ১৯৪৬ সাল দেশজোড়া দাঙ্গার সুযোগে তারা তাদের সংগঠনকে বিস্তৃত করতে পারলেও তা ছিল নেহাৎই অনুল্লেখনীয়। এমনকি আশির দশকের মধ্য পর্যন্তও তারা ছিল নেহাতই প্রান্তিক শক্তি। কিন্তু তার পর থেকেই তারা রমরমিয়ে বাড়তে শুরু করল। বাবরি মসজিদ ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা যে সাফল্য লাভ করল, যেভাবে তারা সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ল তা বিস্ময়জনক হলেও অবোধ্য নয়।

১৯৪৭ সালের পর দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর কংগ্রেসের জনগণের মধ্যে তার সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে তার প্রতারণামূলক ভূমিকা সত্ত্বেও CPI-এর বেইমানী ও অপদার্থতার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা দৃঢ়মূল হয়েছিল যে কংগ্রেসই জাতির নেতা। এই ধারণা ভাঙ্গতে সময় লেগেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর। মানুষের তা উপলব্ধি করতে এত দীর্ঘ সময় লাগল কেন এবং কেনই বা তারা ফ্যাসিবাদের দিকে আকৃষ্ট হল, আকৃষ্ট হল না মার্কসবাদী আন্দোলনের প্রতি?

১৯৪৭-র আগে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগকেই জাতির নেতা হিসাবে CPI মেনে নিয়েছিল। তাদের বেইমানীকে প্রকাশ্যে শ্রমিক-কৃষকের মধ্যে উন্মোচিত করে তাদেরকে স্বতন্ত্রভাবে সংগঠিত করার যে দায়িত্ব ছিল CPI-র, তা তারা পালন করে নি। এমনকি ৪৭-র পরেও কংগ্রেসের মধ্যে ‘প্রগতিশীল’ খুঁজতেই তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে কংগ্রেস সম্পর্কে মেহনতী মানুষের মধ্যে মোহ তৈরীতেই তা সাহায্য করেছিল। যদিও কংগ্রেসী সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে একই সাথে গণ আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছিল তারা (যদিও তা ছিল একটা সীমার মধ্যে এবং কখনোই তা একটা নির্দিষ্ট গম্ভীর বাইরে যায় নি) ফলতঃ একটা পর্যায়ে মেহনতী মানুষের মধ্যে বামপন্থী আন্দোলনকে ঘিরে একটা উন্মাদনাও তৈরী হয়েছিল। প্রচুর পেটি বুর্জোয়া লোকজনও তখন ভিড়ে গিয়েছিল বামপন্থী আন্দোলনে। মূলতঃ ষাটের দশক থেকেই এর পরিবর্তন লক্ষিত হয়। কংগ্রেসের ভিত্তি তখন থেকেই ক্ষইতে শুরু করে এবং বামপন্থীরা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সত্তরের দশকের পর থেকে কিন্তু অবস্থা বদলে যায়। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট গ্রাস করে দেশকে। ষাটের দশক পর্যন্ত যে অর্থনৈতিক প্রগতি ঘটেছিল তা সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। এই সময় দরকার ছিল বিপ্লবমুখী কমিউনিস্ট আন্দোলনের যারা শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে মেহনতী মানুষকে তো বটেই এমনকি শহরাঞ্চলেরও পেটি বুর্জোয়াদের সামিল করতে পারে। পেটি বুর্জোয়ারা এমনই এক চরিত্র যারা বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর পিছনেও সমবেত হয় আবার সেই বিপ্লবের সম্ভাবনার অভাবে ফ্যাসিবাদী দঙ্গ লের কাতারে নিজেদের সামিল করে। কিন্তু স্ট্যালিনবাদীদের পক্ষে সেই নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল না। স্ট্যালিনবাদীদের একটা অংশ মাওবাদী নকশালরা বিপ্লবের নামে যে ছেলেখেলা করে তা সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। ফলতঃ হতাশা আরো গেড়ে বসে। স্ট্যালিনবাদীরা যখনই বিপ্লবী কর্তব্যের সম্মুখীন হয়ে তাকে পশ্চাদেশ দেখাল এবং পার্লামেন্টারী খেলায় মত্ত হয়ে উঠল তখন থেকেই শুরু হল ফ্যাসিবাদের জয়যাত্রা। শ্রমিকশ্রেণীকে বিপ্লবী আন্দোলন থেকে সরিয়ে রাখার ফল অচিরেই। শ্রমিক শ্রেণীর কাছ থেকে বিপ্লবী নেতৃত্ব না পাওয়ার ফলে হতাশ পেটি বুর্জোয়ারা সামিল হল ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে ৷ ফ্যাসিবাদ যে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল স্ট্যালিনবাদীদের বেইমানীর ফলে তারা তা পেয়ে গেল খুব সহজেই। তাদেরকে আরো যা সাহায্য করল তা হল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিবিপ্লবী ভাঙ্গন এবং তার ফলে বিশ্বজোড়া প্রতিক্রিয়ার শক্তিগুলির শক্তিবৃদ্ধি । এইরকম অনুকূল এক পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদ তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্যাসিবাদের উত্থানের এই বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে মোকাবিলা করবার জন্য যে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল তাতেও স্ট্যালিনবাদীরা পুরোপুরি ব্যর্থ। অবশ্য বুর্জোয়াদের মধ্যে ‘প্রগতিশীল’ খুঁজে বেড়ালে এরকমটাই হতে বাধ্য। বুর্জোয়াদের নিয়ে ফ্যাসিবাদের মোকাবিলা করার স্ট্যালিনবাদী গাঁজাখুরি তত্ত্বের প্রয়োগ করতে গিয়ে স্ট্যালিনবাদীরা ভারতে যে নাকানিচুবানি খেয়েছে তা হাসির খোরাক জোগায় মাত্র। তাদের তথাকথিত ফ্যাসিবাদবিরোধী বীরেরা তেলেগু দেশম অগপ, ফারুক আবদুল্লা, অকালি দল এবং জনতা দলের একটা অংশ সকলেই এখন বিজেপি- র সঙ্গী। স্ট্যালিনবাদীদের এইসব বীরেরা রণক্ষেত্র ছাড়বার পরে এখন তারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিরাট মিত্র খুঁজে পেয়েছে কংগ্রেস। অথচ কংগ্রেস নির্দ্বিধায় বিজেপির সাথে হাত মিলিয়ে বিমা বিল রাজ্যসভায় পাশ করিয়ে দিয়েছে। শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদীরা এবং বুর্জোয়ারা সবসময়েই যে একজোট থাকবে তা এইসব নির্বোধদের কে বোঝাবে। নির্বোধ স্ট্যালিনবাদীরা এইভাবে ফ্যাসিবাদকে বিনাযুদ্ধে ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করেছে মাত্র ।

ফ্যাসিবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে তাদের কার্যকলাপ চালালেও মূলতঃ ১৯৮৫ সালের পর থেকেই তারা সাফল্যের মুখ দেখাতে শুরু করে। তীব্র কমিউনিষ্ট ও মুসলিম বিদ্বেষই হচ্ছে তাদের আন্দোলনের চালিকাশক্তি। নির্বোধ ও হতাশ এবং শ্রমিকশ্রেণীর স্তরে তাদের নেমে যাওয়ার আতঙ্কে আতঙ্কিত পেটি বুর্জোয়াদেরকেই ফ্যাসিবাদীরা তাদের কামানের খোরাকে পরিণত করে এবং বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে দিয়ে তারা এই সব নির্বোধদের তাদের দলে টানতে শুরু করে। তবে এ ব্যাপারে তারা যে দক্ষতা দেখিয়েছে তা সত্যিই মারাত্মক। যদিও বুর্জোয়া সংবাদপত্রগুলো বা গণমাধ্যমগুলো তাদেরকে এ ব্যাপারে পুরোপুরি মদত জুগিয়েছে, কিন্তু যে দক্ষতার সাথে দেশজুড়ে তারা গুজব ছড়িয়েছে এবং প্রচার চালিয়েছে তাতে এটাই প্রমাণ হয় যে একটি সুশৃংখলিত কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া ফ্যাসিবাদীদের মোকাবিলা করা কার্যতঃ অসম্ভব। এইমুহূর্তে দেশজুড়ে যে খ্রীষ্টান বিরোধী দাঙ্গা তারা চালাচ্ছে তার পেছনেও কাজ করছে এই গুজব “খ্রীষ্টান মিশনারীরা ব্যাপকহারে ধর্মান্তরকরণ করছে।” সম্পূর্ণ মিথ্যা এইসব গুজব রটিয়ে দিয়ে যেভাবে জনসমাজকে তারা আলোড়িত করে তাতে এটা প্রমাণিত যে তারা তাদের গুরু গোয়েবেলস-এরা যোগ্য উত্তরসুরি। গোয়েবেলস বলেছিলেন একটা মিথ্যা কথা একশোবার বললে তা সত্যে পরিণত হয়। ভারতীয় ফ্যাসিবাদীরা দক্ষতার সাথে তাদের গুরুর বাণীকে প্রয়োগ করেছে।

বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় আসীন হবার আগে আমরা ভারতবর্ষে সেই একই অবস্থা দেখেছি যা দেখা গেছে ফ্যাসিবাদের ক্ষমতা দখলের আগে জার্মানীতে। একের পর এক 'হাঁং' পালাটেন্ট আমরা দেখেছি। এমনকি দেখা গেছে স্ট্যালিনবাদীদের মদতে ও অংশগ্রহণের তৈরী হওয়া যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এইসব সরকারের জনবিরোধী কার্যকলাপই বিজেপি-র পালে হাওয়া জুড়ে দিয়েছে। স্ট্যালিনবাদীরা তাদের তথাকথিত যে ফ্যাসিবিরোধী ফ্রন্ট গড়েছিল যুক্তফ্রন্ট সরকার তার পরিণাম, অথচ সেই যুক্তফণ্ট কংগ্রেসী উদার অর্থনীতিকেই অনুকরণ করেছিল এবং তারাও ছিল কংগ্রেসের মত সমান জনবিরোধী। স্ট্যালিনবাদী CPM নিজেরাই তা স্বীকার করেও নিয়েছে। তাদের ষোড়শ কংগ্রেসের খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবের ২.১৩ পয়েন্টে তারা বলেছে

কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ সত্ত্বেও এই সরকার উৎসাহের সঙ্গে সেই সব নীতিই অনুসরণ করে যেগুলি উদারনীতিকরণ ও বেসরকারীকরণকে সাহায্য করবে।' এছাড়াও ২.২১ পয়েন্টে তারা বলেছে 'এই ন্যূনতম যৌথ কর্মসূচী ছিল আপসের দলিল। এই দলিলে অর্থনৈতিক নীতির দিশা নির্দেশ সম্পর্কে যুক্ত ফ্রন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ শরিক দলগুলির মতের প্রতিফলন ঘটে। এই মত ছিল আগেকার কংগ্রেস আমলের অর্থনীতিক নীতিগুলিকেই চালিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ,সব কিছু জেনে বুঝেই সম্পূর্ণ সচেতনভাবে স্ট্যালিনবাদীরা একটা প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া সরকারকে মদত যুগিয়ে গেছে। তারপর বিজেপি-পালে যদি হাওয়া লাগে তবে স্তালিনবাদীদের বেইমানীকেই কি আমরা তার জন্য দায়ী করতে পারি না?

ফ্যাসিবাদীদের ক্ষমতা দখল

অনুকূল আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এবং স্ট্যালিনবাদীদের বেইমানীর ফলে সৃষ্ট শূন্যতা ও হতাশাকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদীরা কেন্দ্রীয় সরকারী ক্ষমতা দখল করেছে। বুর্জোয়ারা তাদেরকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছে নির্দিষ্ট কতগুলি উদ্দেশ্য নিয়ে। ভারতীয় জনগণের দ্বারা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত কংগ্রেসকে দিয়ে আর সেই কাজ চালানো সম্ভব ছিল না। আর যুক্তফ্রন্ট সরকারকে দিয়েও তা হচ্ছিল না। কারণটা কিন্তু এটা নয় যে যুক্তফ্রন্টীরা শ্রমিক-কৃষক দরদী। স্ট্যালিনবাদীদের স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করছে যে তারা কংগ্রেস কর্তৃক চালু হওয়া উদারনৈতিক অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে চালু রেখেছিল, এমনকি তাতে বেশ দক্ষতাও দেখিয়েছিল। তাহলে বুর্জোয়ারা তাদের প্রতি বিমুখ হল কেন? আসলে যে গতিতে সংস্কার চাইছে বুর্জোয়ারা সেই প্রত্যাশিত গতিতে সংস্কার করতে যুক্তফ্রন্ট সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট সরকার টিকে থাকবার জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিল স্ট্যালিনবাদী CPI, CPM-এর উপর। অথচ CPI, CPM তাদের ভিত্তি শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী মানুষের মধ্য থেকে ক্রমবর্দ্ধিত চাপের ফলে যুক্তফ্রণ্টের সংস্কারের গতিকে বাধা দিচ্ছিল। তাকে আটকাতে না পারলেও সংস্কারের গতি এর ফলে বুর্জোয়াদের প্রত্যাশিত মাত্রায় হতে পারে নি। বুর্জোয়ারা তো প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে গেল যখন স্ট্যালিনবাদীরা বীমা বেসরকারীকরণের বিলকে আটকে দিল। ফলে যা ঘটার তাই ঘটল। পতন ঘটল যুক্তফ্রন্ট সরকারের

বিজেপি-র ক্ষমতায় আরোহন যদি কোন কিছু প্রমাণ করে থাকে তা হল এই যে বুর্জোয়ারা আজ দ্রুত গতিতে সংস্কার চাইছে। এবং তার জন্য এমনকি বুর্জোয়াদের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা সত্ত্বেও স্ট্যালিনবাদীদেরও তারা সহ্য করতে রাজী নয়। কেননা মাঝে মাঝে বিরোধিতা করে তারা সংস্কারের গতিকে বাধা দিচ্ছিল। বুর্জোয়াদের এই মানসিকতার ফলেই স্ট্যালিনবাদীদের সাধের তৃতীয় বিকল্প আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এমনকি CPM তার সম্মেলনে বহু কোঁদলের পর কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিলেও কংগ্রেস খুব পরিষ্কারভাবেই জানিয়ে দিয়েছে যে তারা CPI, CPM-এর সমর্থনে সরকার গড়তে রাজী নয়। অর্থাৎ সংস্কারের প্রক্রিয়ার কোনরকম বাধা দান তারা সহ্য করতে প্রস্তুত নয়। মাথামোটা স্ট্যালিনবাদীরা এসব না বুঝলেও বিজেপি-র ক্ষমতায় আরোহণকে আমাদের এই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই বুঝতে হবে।

বিজেপি নেতৃত্বধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আরোহণ করেই কংগ্রেসী এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারের উদার অর্থনীতিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। একসময় তারা ‘স্বদেশী' নিয়ে প্রচুর বোলচাল ঝেড়েছিল, কিন্তু সরকারী ক্ষমতায় আসীন হবার পর তাদের প্রকৃত রূপ সকলের সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে। ক্ষমতায় আসবার পর তারা যে নতুন আমদানি নীতি ঘোষণা করেছে তাতে ৩৪০টি দ্রব্যকে ওপেন জেনারেল লাইসেন্স তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে কৃষিপণ্যকেও রাখা হয়েছে এবং আমদানির পরিমাণগত নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি সরকার তার প্রথম বাজেটে কয়লা, লিগনাইট ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের লাইসেন্স ব্যবস্থা তুলে দিয়েছে, ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বেসরকারীকরণের কথা ঘোষণা করা হয়েছে এবং বীমা শিল্পকে বেসরকারীকরণের জন্য আনীত বিল কংগ্রেসের সহযোগিতায় রাজ্যসভায় পাস করিয়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন নয় এমন সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ইউনিটগুলির ৭৪ শতাংশ ইকুইটি শেয়ার বেসরকারী মালিকদের কাছে বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়ে তা ছাড়াও বিজেপি সরকার বিদুৎ প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে কাউন্টার গ্যারান্টির ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে কেন্দ্রীয় সরকার ৬৪টি কয়লাখনি বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, ফলে ৭২ হাজার শ্রমিক কর্মচ্যুত হবে এবং তাদের পরিবারগুলি অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হবে। তবে বিজেপির এই দশ মাসের শাসনে সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা যা ঘটেছে তাহল মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা। গত শরৎকাল থেকেই মূল্যবৃদ্ধি হতে হতে তা এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছয় যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভেও চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এরই ফলশ্রুতিতে তিনটি রাজ্যে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, দিল্লীতে বিজেপি শোচনীয়ভাবে নির্বাচনে পরাস্ত হয়। দ্রব্যমূল্য এখন পূর্বের তুলনায় কিছুটা কম হলেও তা এখনো যথেষ্ট বেশি।

তবে এই সময়ের মধ্যে বিজেপি সরকারের যে কাজ নিয়ে জাতীয় তো বটেই এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সবচেয়ে বেশি জল ঘোলা হয়েছে তা হল পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ। চীন এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিগির তুলে তীব্র কমিউনিষ্ট এবং মুসলিম বিরোধী মানসিকতা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য নিয়েই যে তারা এই কাজ করেছিল এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে এর ফলে অন্য জটিলতাও তৈরী হয়েছে। যেমন জাপসাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘদিন যাবৎ ভারতীয় উপমহাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে মৈত্রী গড়ে তুলে একটা জাপপন্থী ব্লক গড়ে তুলবার জন্য তারা অনেকদিনই সচেষ্ট, বিজেপি সরকারের এই কাজের ফলে তাদের সেই উদ্দেশ্য প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সুতরাং তারা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। তাদের সাথে হাত মেলায় ভারতীয় বুর্জোয়াদেরও কিছু অংশ, যারা উপমহাদেশে তাদের বাজার বিস্তারের স্বপ্ন দেখছিল। উভয়ে যৌথভাবে ‘শান্তির' স্বপক্ষে সোচ্চার হয়। আর তাদের সাথে গলা মেলায় তাদের সেই ‘পুরাতন ভৃত্য' স্ট্যালিনবাদীরা। অথচ তারা একবারের জন্যও জবাব দিল না, বিজেপি সরকারের ১৯৯৮ সালের বোমা বিস্ফোরণ যদি অন্যায় হয়ে থাকে তবে ১৯৭৪ সালের কংগ্রেস সরকারের পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় তাকে তারা সমর্থন করেছিল কেন? আর কেনই বা স্ট্যালিনবাদীরা ১৯৯৮ সালের বোমা বিস্ফোরণের সাথে সাথেই বিবৃতি দিয়ে বিস্ফোরণের সাথে যুক্ত বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানিয়ে ছিল। এদের এইসব নোংরা কার্যকলাপই কার্যতঃ বিজেপি-কে শক্তিশালী হতে সাহায্য করছে।

বিজেপি-র কার্যকলাপকে আমরা এই কারণে বিরোধিতা করি না যে তারা রাষ্ট্রকে পারমাণবিক বোমায় সজ্জিত করছে। বিজেপি একটা ফ্যাসিবাদী দল এবং ভারতীয় বুর্জোয়াদের এবং সাম্রাজ্যবাদের চীখে তারা ভারতীয় রাষ্ট্রকে অস্ত্রসজ্জিত করছে বলে আমরা তার বিরোধী। সাম্রাজ্যবাদীরা সজ্জিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ‘শান্তির বাণী' শুনিয়ে কোন লাভ হয় বলে আমরা মনে করি না। আর সেই কারণে শ্রমিক রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়া ও চীন যখন পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত ছিল আমরা তাকে সমর্থন করতাম। কিন্তু ভারত সরকারের অস্ত্রসজ্জার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। তারা মোটেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে চায় না, তাদের মূল উদ্দেশ্য দক্ষিণ এশিয়া তথা দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করা। আর পাকিস্তান এবং চীনের বিরুদ্ধে তাদের বিষোদগারের বিরুদ্ধে দেি উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম এবং শ্রমিক তথা বামপন্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা। ভারত সরকার যদি শ্রমিক রাষ্ট্র চীনকে আক্রমণ করে তবে আমরা নিঃশর্তভাবে চীনের পক্ষে দাঁড়াব এবং পাকিস্তান আক্রমণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বুর্জোয়া রাষ্ট্রের পক্ষে না দাঁড়ালেও ভারত সরকারের আধিপত্যবাদী উচ্চাকাঙ্খাকে সম্পূর্ণভাবে জনগণের সামনে উন্মোচিত করে দেব এবং ভারত সরকারের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে বিরোধিতা করব। মার্কসীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ আমাদের যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই শিক্ষাই দিয়েছে।

এছাড়াও জনগণের ঘাড় ভেঙ্গে, তাদের উপর হাজারোটা ট্যাক্‌স চাপিয়ে বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে আরো শক্তিশালী করারও আমরা বিরোধী। আমাদের দাবী হবে, কোন অজুহাতেই জনগণের উপর করের বোঝা চাপিয়ে অস্ত্রসজ্জা করা চলবে না। কর যদি বসাতে হয় তবে ধনীদের উপর কর বসাও। যে ধনী চাষীরা (কুলাক) করের আওতার বাইরে রয়েছে, তাদের উপর কর চাপাও এবং বেশি বেশি কর চাপাও ধনীদের উপর, পুঁজিপতিদের উপর। আর সেই সংগৃহীত পয়সা ব্যায় কর জনকল্যাণখ্যাত। বুর্জোয়াদের স্বার্থে যে কোন যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে আমরা বিরোধিতা করবো এবং তার জন্য জনগণকে কামানের খোরাক বানানো চলবে না বা তার জন্য এক পয়সা করও জনগণের কাছ থেকে নেওয়া চলবে না। এটাই হওয়া উচিত যে কোন কমিউনিস্টের দৃষ্টিভঙ্গী এবং এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই পারমাণবিক বিষ্ফোরণের বিষয়টাকে দেখা উচিত।

বিজেপি ক্ষমতায় আসবার পর আরেকটি ঘটনা ভারতীয় জনজীবনকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করেছে, তা হল খ্রীষ্টানদের উপর আক্রমণ। বিজেপি ক্ষমতায় বসবার সাথে সাথেই বিহারে খ্রীষ্টানদের উপর যে আক্রমণ শুরু হয়েছিল তা মধ্যপ্রদেশ-এর পর এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে গুজরাটে। মধ্যপ্রদেশে সন্ন্যাসীনীদের উপর গনধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করার পর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল সহ আর.এস.এস এখন গুজরাটে পুরোপুরি সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। চার্চ পুড়িয়ে দেওয়া, বাইবেল পুড়িয়ে দেওয়া, খ্রীষ্টান পুরোহিতদের উপর হামলা, জোর করে ভয় দেখিয়ে খ্রীষ্টানদের হিন্দু ধর্মে ধমান্তরিত করা ইত্যাদি কার্যকলাপ তারা অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে। গুজরাটে কোন সরকার আছে বলেই মনে হয় না। আর কেন্দ্রেীয় সরকারের প্রধান বাজপেয়ী সরকার তো তার সাথীদের সার্টিফিকেটই দিয়ে এসেছেন গুজরাটে পরিদর্শনে গিয়ে।

বাসা বিজেপি এবং তার সহযোগী দলগুলি যখন গুজরাটে এই সন্ত্রাস চালাচ্ছে, অন্যদিকে তাদের আর এক সহযোগী দল শিবসেনা মহারাষ্ট্রে পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী রাজ কায়েম করে ফেলেছে। যা কিছুকে তারা তাদের হিন্দুধর্মের বিরোধী বলে মনে করছে সে হুসেনের ছবি বা কোন চলচ্চিত্রেই হোক তার উপরই তারা হামলা চালাচ্ছে। বর্তমানে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ভারত সফর নিয়ে তারা দেশজুড়ে যেভাবে হাঙ্গামা বাঁধিয়েছে এবং যেভাবে কেন্দ্রীয় সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকে তাদের এই হামলাকে মদত করেছে তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে গোটা ভারত জুড়ে আগামী দিনে যে ফ্যাসিবাদী রাজ কায়েম করতে চায়, বিজেপি, শিবসেনা, তারই মহড়া চলছে এখন গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে।

শ্রমিকশ্রেণীকে সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাড়াতে হবে খ্রীষ্টানদের বিরুদ্ধে বিজেপি-র এবং ক্রীড়া-শিল্প-সংস্কৃতিতে শিবসেনার এই সব ফ্যাসিবাদী হামলা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। ফ্যাসিবাদীদের কোন ছাড় নয়। যে আক্রমণ আজ খ্রীষ্টানদের উপর নামছে আগামীদিনে তা নামবে শ্রমিক শ্রেণীর উপর। বর্তমানের ঘটনা তার মহড়া মাত্র। ফ্যাসিবাদের মূল উদ্দেশ্য শ্রমিক আন্দোলনকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দেওয়া। কিন্তু শুধুমাত্র পুলিশী সন্ত্রাসের মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা তাই বলে। তাই সমাজের মধ্য থেকেই একটা স্তরকে মূলতঃ পেটি বুর্জোয়াদের-ফ্যাসিবাদীরা সঙ্ঘবদ্ধ করে। আর এই কাজ করবার জন্য একটা কল্পিত শত্রুকে খাড়া করা হয়। যেভাবে ভাতরবর্ষে খাড়া করা হয়েছে মুসলিম ও খ্রীষ্টানদের। তার তারপর একটা প্রতিবিপ্লবী আন্দোলন তৈরী করে জড়ো করা হয় হতাশ পেটি বুর্জোয়াদের। এর জন্য প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদী মতাদর্শও তারা হাজির করে। যেভাবে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে তারা প্রতিবিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ‘সেভাবেই “খ্রীষ্টানরা হিন্দুদের ব্যাপকভাবে ধর্মান্তরিত করছে” এই সব গুজব ছড়িয়ে দিয়ে তারা খ্রীষ্টানদের বিরুদ্ধে আর একটা প্রতিবিপ্লবী আন্দোলন সৃষ্টির চেষ্ঠা করছে। বিজেপি-র এই উদ্দেশ্যকে সফল হতে দেওয়া যায় না। তাদের এই ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপকে রুখতে গড়ে তুলতে হবে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন, গড়ে তুলতে হবে ফ্যাসিবিরোধী প্রতিরোধ বাহিনী। বুর্জোয়াদের উপর ভরসা নয়। তারা ফ্যাসিবাদকেই মদত করবে তাদের শ্রেণীস্বার্থে। শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রেণী। ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদকেই সেবা করে, তাদেরই সন্ত্রাসবাদী শাসন তা। ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চাই লাল সন্ত্রাস। ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের লাল সন্ত্রাসে আজ ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসকে মোকাবিলা করতে হবে। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের রোখার স্বপ্ন দেখছে যে সব স্ট্যালিনবাদীরা তাদের ছুড়ে ফেলেই গড়ে তুলতে হবে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক প্রতিরোধ, এছাড়া অন্য কোন পথ নেই ।

-

ফ্যাসিবাদ বিরোধী বুর্জোয়া বীরেরা : বুর্জোয়া বিকল্প সমূহ

ফ্যাসিবিরোধী বিভিন্ন বিকল্পের কথা এখন বুর্জোয়া সংবাদপত্রে মিডিয়াগুলোতে আলোচিত হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, ফ্যাসিবাদ বিরোধী সবচেয়ে বড় বীর হিসেবে বুর্জোয়ারা এখন কংগ্রেসকেই তুলে ধরছে। কারণটা কি? না, কংগ্রেসের দেশজোড়া সংগঠন আছে এবং সেই বিজেপিকে নির্বাচনে পরাজিত করবার ক্ষমতা রাখে। বুর্জোয়ারাই যে কেবলমাত্র এই তত্ত্বে বিশ্বাসী তা নয়, তাদের দ্বারা মগজ ধোলাই প্রাপ্ত, অধঃপতিত স্ট্যালিনবাদীরাও এখন এই সব কথা বলে বেড়াচ্ছে এবং কংগ্রেসকে নির্বাচনী সমর্থনের কথা ও তাদের সাথে জোট বাঁধবার কথাও তারা সগর্বে বলছে। বুর্জোয়ারা যদি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বীর হিসেবে কংগ্রেসকে তুলে ধরতে চায় তাতে অবাক হবার কিছু নেই, কেননা, তাদের শ্রেণীস্বার্থই তাতে রক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু মাথামোটা স্ট্যালিনবাদীরা এইসব কথা বলে মৃতপ্রায় কংগ্রেসকে আবার পুনরুজ্জীবিত হতে সাহায্য করছে মাত্র। কংগ্রেসকে ফ্যাসিবিরোধী শক্তি হিসাবে তুলে ধরে তারা ফ্যাসিবাদের শ্রেণী চরিত্রকে আড়াল করতেই সাহায্য করছে। ফ্যাসিবাদ একটা প্রতিবিপ্লবী পেটি বুর্জোয়া আন্দোলন হলেও তা পুঁজিবাদকে সেবা করে, সুতরাং কংগ্রেস কখনও তাকে সার্বিক বিরোধিতা করতে পারে না, প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা। ১৯৮৪ সালে হরিদ্বারে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। বাবরি মসজিদের তালা খুলে দিয়ে ফ্যাসিবাদের পালে হাওয়া লাগিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। কংগ্রেস কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিল না – স্বাধীনতার আগেও। ব্যক্তি নয়, কংগ্রেসের মতামত বা আচরণ দিয়ে বলতে হবে। যেমন, কাশ্মীরে আর.এস.এসের মদতে নির্বাচনে লড়েছিল কংগ্রেস। বাবরি মসজিদ যখন ফ্যাসিবাদীরা ভেঙ্গে দিয়েছিল তখন ঠুঠো জগন্নাথ হয়ে বসে থেকে দেশজুড়ে মুসলিম নিধন যজ্ঞ হতে সাহায্য করেছিল কংগ্রেস। শুধু তাই নয়, ১৯৮৪ সালে দেশজুড়ে সংখ্যালঘু শিখ সম্প্রদায়ের উপর গণহত্যা, লুঠ পাট, নির্যাতন চালিয়ে কংগ্রেস প্রমাণ করে দিয়েছে সংখ্যালঘু নিধনে সেও কম যায় না। এইরকম একটা বুর্জোয়া দল কি করে ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করতে পারে? কংগ্রেস কি রাজ্যসভায় বিমা বিল পাশ করতে বিজেপি -কে সাহায্য করে নি? তাহলে সে কি করে ফ্যাসিবিরোধী হল? ফ্যাসিবাদ মানে কেবল সাম্প্রদায়িকতা নয়, শ্রমিক শ্রেণী তথা মেহনতী মানুষের জীবন জীবিকার উপর আক্রমণকেও তা সূচিত করে, আসলে ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদেরই সন্ত্রাসবাদী শাসন মাত্র। সুতরাং মেহনতী মানুষের জীবন জীবিকার উপর আক্রমণকে সমর্থন করে কংগ্রেস কি করে ফ্যাসিবিরোধী হয় তা আমাদের জানা নেই। শুধু দু একটা ‘ধর্ম নিরপেক্ষতার’ বুলি আওড়ালেই (শিখদের রক্তে কংগ্রেসের হাত রঞ্জিত) ফ্যাসিবিরোধী হওয়া যায়? মাথামোটা স্ট্যালিনবাদীরা এসব বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু এসব প্রতারণায় আমাদের ভুললে চলবে না।

এর আগে স্ট্যালিনবাদীরা তৃতীয় বিকল্প নামে একটি বুর্জোয়া বিকল্প হাজির করে ফ্যাসিবাদকে রোখবার শুভ ইচ্ছার কথা ঘোষণা করেছিল। কি হয়েছে তার পরিণতি? স্ট্যালিনবাদীদের ফ্যাসিবিরোধী বীরেরা তেলেগু দেশম, অগপ, ন্যাশনাল কনফারেন্স, অকালি দল এখন বিজেপির জোট সঙ্গী। আর এটাই তো স্বাভাবিক। বুর্জোয়া দলগুলো তাদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার্থে ফ্যাসিবাদের সাথে হাত মেলাবে এতে তো অস্বাভাবিকত্ব কিছু নেই। কিন্তু নির্বোধ স্ট্যালিনবাদীরা তা বুঝতে না চেয়ে নিজেদের চিন্তার দৈন্যতাই প্রকাশ করছে মাত্র। স্ট্যালিনবাদীরা বুর্জোয়াদের বাদ দিয়ে রাজনীতির কথা ভাবতেই পারে না, নিজেদের পায়ে দাড়ানোর মত মানসিক দৃঢ়তাই তাদের নেই। আসলে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যেকার যে সুবিধাভোগী অংশের প্রতিনিধিত্ব তারা করে বর্তমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতেই তারা আগ্রহী, সেই কারণে বুর্জোয়া রাজনীতির চৌহদ্দির মধ্যেই তাদের ঘোরাফেরা। রাজনীতি বলতে তারা বোঝে পার্লামেন্টারী রাজনীতি, আর বুর্জোয়াদের কোন না কোন অংশের লেজুড়বৃত্তি করে কোনরকমে নিজেদের অস্তিত্ব তারা টিকিয়ে রাখতে চায়।

কিন্তু বুর্জোয়া অর্থনীতির সংকট যে জায়গায় পৌঁছেছে তাতে স্ট্যালিনবাদীদের নিয়ে কেন্দ্রে কোন সরকার তৈরী হতে পারে না এটা বোঝা দরকার। এর কারণ এটা নয় যে স্ট্যালিনবাদীরা বিপ্লবীতে পরিণত হয়েছে। আসলে স্ট্যালিনবাদীরা তাদের শ্রমিক ভিত্তির চাপে পড়ে উদার অর্থনীতির কিছু কিছু সংস্কারকে বিরোধিতা করছে। কিন্তু বুর্জোয়ারা এরকম কোন বিরোধিতা আজ সহ্য করতে রাজি নয়। সুতরাং বুর্জোয়া দলগুলোর সাথে স্ট্যালিনবাদীদের জোট গঠনই সার। তাদেরকে বাদ দিয়েই তৈরী হবে কেন্দ্রীয় সরকার। স্ট্যালিনবাদী অথর্ব, বৃদ্ধ নেতাদের প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য জিভ দিয়ে যতই লালা ঝড়ুক, সেই লালা আবার মুখে টেনে নেওয়া ছাড়া তাদের গত্যন্তর নেই।

গত এক দশকে উদার অর্থনীতির ফলাফল : জনগণের অবস্থা

এক দশক আগে কংগ্রেসী সরকারের নেতৃত্বে জোরদার গতিতে যে উদার অর্থনীতির পথে হাঁটা শুরু হয়েছিল, এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারের হাত ধরে যার দায়িত্ব এখন বর্তেছে বিজেপি সরকারের উপর, সেই সংস্কারের ফল হয়েছে ভয়াবহ। বিদেশী পুঁজির জন্য দেশের দরজা হাট করে খুলে দেবার ফলে বিদেশী পুঁজি ভারতে যথেষ্ট প্রবেশ করছে, কিন্তু সরকারের বহু বিজ্ঞাপিত উৎপাদনশীল বিনিয়োগ তা নয়। এই পুঁজি মূলতঃ বিনিয়োগ হয়েছে ফাটকা বাজারে । গত সাত বছরে এই ধরণের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫০০ কোটি ডলার। এই ধরণের পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ইকুইটি শেয়ার কিনে ভারতীয় কোম্পানীগুলো নিয়ে নিচ্ছে।

ভারতীয় অর্থনীতির প্রধান প্রধান উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে বিকাশের হার ক্রমশঃই কমছে। মোট জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির হার ১৯৮০-র দশকে যেখানে ছিল বছরে ৩.৭ শতাংশ, ১৯৯০-১ থেকে ১৯৯৬-৯৭ বছরগুলিতে বৃদ্ধির সেই হার কমে হয়েছে বছরে ২.৮ শতাংশ। মাথা পিছু খাদ্যশস্য উৎপাদনের বার্ষিক বৃদ্ধির হার ১৯৯০-৯১ থেকে ১৯৯৬-৯৭ বছরগুলিতে ছিল ১.৭ শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় তা অনেক কম। এর দায়ী কৃষিক্ষেত্রে সরকারী নীতি এবং রপ্তানীমুখী অর্থনীতি। যার ফলে দেশে খাদ্যশস্যের অভাব থাকলেও তা বাইরে পাচার হচ্ছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ পেঁয়াজের অভাব এবং তীব্র মূল্যবৃদ্ধি এসব ঘটনা আগামী দিনে দেশজোড়া দুর্ভিক্ষের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ ঠিক এই সময়েই বড় জমির মালিক এবং সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কৃষি ফার্মগুলির স্বার্থে জমির উর্দ্ধসীমা আইনকে শিথিল করা হচ্ছে। শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনের গতি মন্দীভূত হবার ফলে ১৯৯৬-৯৭ সালে মন্দা অৱস্থা 'দেখা দেয়। ১৯৯৭-৯৮ সালে শিল্পজাত উৎপাদন বৃদ্ধির হার আরও কমেছে। ভারী শিল্পের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হারও নেতিবাচক। শিল্পে এই মন্দার জন্য অংশত দায়ী ভারতীয় বাজারে বিদেশী পণ্যের ভিড়।

গত দু বছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ১৯৯৭-৯৮ সালে ঘাটতি দাড়িয়েছে ৬৮০ কোটি ডলার। এই সময়কালে শিল্পে মন্দার কারণে আমদানির চাহিদা কম হওয়া সত্ত্বেও এটা ঘটেছে। বাণিজ্যে মৌলিক ঘাটতিকে 'কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের' অজুহাত করা হয়েছিল অথচ সেই কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস সত্ত্বেও তা চা কমেনি, বর বরং ঘাটতি আরো বেড়ে গেছে। কংগ্রেস, যুক্তফ্রন্ট এবং বিজেপি ইত্যাদি বুর্জোয়া সরকারগুলো যখন একের পর এক কর বা, মূল্যবৃদ্ধির বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে, তখন ধনীদের ব ক্ষেত্রে কিন্তু বিভিন্ন রকম ছাড়ের ঘোষণা করা হচ্ছে। ১৯৯৭-৯৮ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে চিদাম্বরম ধনীদের ১০ হাজার কোটি টাকার ছাড় দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে অবশ্য পঃবঙ্গের স্ট্যালিনবাদী 'বাম' সরকারও বাদ যায় না। শিল্পায়নের অজুহাতে বিভিন্ন রকম কর ছাড়, বিদ্যুতের দাম কমানো তো আছেই মাত্র কয়েকদিন আগে দুটি শিল্প সংস্থাকে তারা ১০ বছরের জন্য বিক্রয়কর ছাড়ের কথা ঘোষণা করেছে।

সংকট যখন সর্বব্যাপী সেই মুহূর্তে ডলারের তুলনায় টাকার দামও ক্রমশঃই নিম্নমুখী। টাকার দাম কমতে কমতে তা এখন দাড়িয়েছে ডলার পিছু ৪৩ টাকা, আর এক ইউরো পিছু টাকার দাম হয়েছে ৫০ টাকা, টাকার বিনিময়মূল্য এইভাবে হ্রাস পাবার কারণে ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে ১৯৯৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত আট মাস সময়ে ভারতের বৈদেশিক ঋণের বোঝা প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। ভারতীয় অর্থনীতির এই বেহাল অবস্থার ফলে শহর ও গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মান দারুণ খারাপ হয়েছে। শহরে বন্ধ কলকারখানা শ্রমিকদের অনাহারে মৃত্যু ঘটছে, তাদের পরিবারের লোকেরা ভিখারীতে পরিণত হয়েছে। আত্মহত্যার মাধ্যমে কেউ কেউ বা সমস্যা থেকে মুক্তির রাস্তা খুঁজে নিচ্ছে। এই যখন অবস্থা তখন ই সি এলের ৭২ হাজার শ্রমিক, হিন্দ মোটরের ১১ হাজার শ্রমিক এবং আরো ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার শ্রমিক ছাঁটাই –এর খড়গ মাথায় নিয়ে বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন। তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির শিল্পায়নের ফাঁকা আওয়াজে এখন আর কেউই বিশ্বাস করে না। বরঞ্চ শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়াটাই এখন নির্মম ও নিষ্ঠুর সত্য। ১৯৯১ সাল থেকে কে পাঁচ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে চাকরি কমেছে ১ লাখ। রেজিস্ট্রিকৃত বেকারের সংখ্যা দাড়িয়েছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ।

গ্রামাঞ্চলের অবস্থা তো আরো ভয়াবহ, এর কারণ গ্রামাঞ্চলে সরকারী বিনিয়োগ ও ব্যায় - ছাঁটাই, খাদ্যশস্য চাষের তুলনায় রপ্তানীমুখী কৃষিতে কর্মসংস্থানের স্বল্পতর সুযোগ। সাধারথভাবে মূল্যবৃদ্ধির ফলে গরীব মানুষের খাদ্যবাবদ ব্যয়ও প্রচুর বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যশস্য নয় এমন ফসলের দরের ওঠানামার ফলে দরিদ্র কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রপ্তানীমুখী কৃষির জন্য কৃষকরা পড়েছেন নতুন ফাঁদে। অন্ধ্রপ্রদেশের তুলো চাষীদের অনেকে এর জন্য আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন এবং কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রেও একই ধরণের ঘটনা ঘটছে। কীটনাশক, বীজ, সার ইত্যাদি কেনার জন্য চড়া সুদে ঋণ করার পর ফসল ভাল না হলে অথবা ফসলের দাম পড়ে গেলে কৃষকরা জড়িয়ে পড়ছেন ঋণের ফাঁদে।

গ্রামাঞ্চলে ১৬ শতাংশ মানুষের দৈনিক আয় মাত্র ৩ টাকা। খেতমজুরদের প্রকৃত আয় ১৯৯১-৯৫ বছরগুলিতে হ্রাস পেয়েছে। দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের হার ১৯৮৯-৯০ সালের ৩৪.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯৯৪-৯৫ সালে ৩৯.৬ হয়েছে। স্বাধীনতার - পঞ্চাশ বছর পরেও দেশের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের অবস্থা খুবই করুণ। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৫ শতাংশ প্রাথমিক স্কুলেরই কোন বিল্ডিং নেই, প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাথমিক স্কুলই মাত্র ১টি ঘর নিয়ে চলছে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হবার আগেই শিশুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্কুল ছেড়ে চলে যায়। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ নিরক্ষর। শিক্ষার মত স্বাস্থ্যর অবস্থাও তথৈবচ। ভিটামিন এ-র অভাবে ভারতে প্রত্যেক বছর প্রায় এক লক্ষ শিশু অন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যেক বছর ৫ লক্ষ লোকের ক্যানসার ধরা পড়ে। অথচ তাদের সকলের তো দূরের কথা অধিকাংশেরই চিকিৎসার কোন ব্যবস্থাই নেই। সরকারী অপদার্থতার ফলে ম্যালেরিয়া, প্লেগ, কালাজ্বরের মত রোগগুলি আবার তার পূর্বেকার ভয়াবহতা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করছে। উদারনীতির অন্যতম ফল হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ জনকল্যাণের সমস্ত খাতেই যেভাবে সরকার ব্যয় কমাচ্ছে, তাতে এইসব রোগগুলি যে কোন সময়ে গোটা দেশ জুড়ে মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্যের এই যখন অবস্থা, সমস্ত পরিকাঠামোই যখন ভেঙ্গে পড়বার মুখে, তখন সরকার তার উন্নতিকল্পে কোন ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, বরঞ্চ তারা সব কিছু বেসরকারী হাতে তুলে দেবার চক্রান্ত চালাচ্ছে। সরকারী হাসপাতালগুলি বেচে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারী মালিকের কাছে। স্বভাবতঃই মুনাফালোভী এইসব প্রতিষ্ঠানে গরীব মানুষ তো দূরের কথা এমনকি মধ্যবিত্ত মানুষও চিকিৎসার স্বপ্ন দেখতে সাহস পাবেন না। এইভাবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বিনা চিকিৎসায় হত্যার এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে দেশের সরকারগুলি। শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারী মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে শিক্ষার খরচ এমন যে তাতে গরীব মানুষ পা দেবারই সাহস পাবেন না ৷ সরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার খরচ এমন হারে বাড়ছে যে তাও ক্রমশঃ গরীব মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বিশেষতঃ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অবস্থা তো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা গরীব তো বটেই এমনকি মধ্যবিত্তেরও নাগালের বাইরে চলে গেছে। দেশ জুড়ে শিশুশ্রমিকদের নিয়ে সম্প্রতিকালে নতুনভাবে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশে এই মুহূর্তে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। ভারতে গড়ে প্রত্যেক তিনটি বাড়ির মধ্যে একটিতে শিশুশ্রমিক আছে। দেশে মোট জাতীয় উৎপাদনের ২০ শতাংশ শিশু শ্রমিকদেরই অবদান। যে শিশুদের শৈশবাবস্থায় লেখাপড়া, খেলাধূলা করে সময় কাটানোর কথা তারা আজ পুঁজিবাদের জোয়াল ঠেলছে। কি জঘন্য এক শৈশব তাদের উপহার দিয়েছে ভারতীয় খঞ্জ পুঁজিবাদ। শিশুশ্রম অবলুপ্তির অনেকেই আজ কথা বলছে; কিন্তু পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ না করে শিশুশ্রম প্রথা উচ্ছেদ করা যাবে কি করে? যে সব NGO-রা হঠাৎ আজ শিশুদরদী হয়ে উঠেছে তারা কি আসলে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে কাজ করছে না ? সাম্রাজ্যবাদ আসলে শিশুশ্রম ব্যবহারকারী ভারতীয় পুঁজিবাদীদের সস্তা পণ্যকে মোকাবিলা করতে পারছে না বলেই কি “ এই আওয়াজ NGO-দের মাধ্যমে তোল।চ্ছে না? তারা যদি এতই শিশুশ্রম বিরোধী তাহলে তারা এই সত্য চেপে যাচ্ছে কেন যে খোদ আমেরিকাতে প্রচুর শিশুশ্রমিক আছে, তাদের ব্যাপারে মার্কিন সরকার কি পদক্ষেপ নিয়েছে • এই প্রশ্ন কি আমরা করতে পারি না? আমরা শিশু শ্রমিকপ্রথা উচ্ছেদের পক্ষে, কিন্তু তা সর্বত্রই – ভারতে, আমেরিকাতেও। কিন্তু সকলের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা না করে শিশুশ্রমিক প্ৰথা উচ্ছেদ করা যাবে কি করে? আর পুঁজিবাদ যতদিন এই দেশে এবং বিশ্বে বজায় থাকবে ততদিন সকলের জন্য খাদ্য কি আকাশকুসুম কল্পনা নয় ? কাজেই পুঁজিবাদের উচ্ছেদের প্রশ্নে নিশ্চুপ NGO-গুলোর শিশুশ্রম বিরোধিতা আসলে সাম্রাজ্যবাদের দালালি বই কিছু নয়।

গণআন্দোলনের, বর্তমান অবস্থা

সাধারণভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং নির্দিষ্টভাবে গত এক দশকের উদারনীতিকরণের ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে দেশজুড়েই শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষ লড়ছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি বিশেষতঃ ব্যাঙ্ক, বীমা, টেলিকম ইত্যাদি শিল্পগুলির বেসরকারীকরণের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে এইসব শিল্পের শ্রমিকরা দেশ জোড়া ধর্মঘটে বারবার সামিল হয়েছেন। এইসব শিল্পের ট্রেড ইউনিয়নগুলির নেতৃত্বের বেইমানীর ফলে আন্দোলন তার কাঙ্খিত সাফল্য না পেলেও ধর্মঘটগুলিতে শ্রমিক কর্মচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে উদার অর্থনীতির বিরুদ্ধে তারা জোরদার লড়াই গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। বেসরকারী মালিকদের লাগামছাড়া জুলুম এবং শোষণের বিরুদ্ধেও বেসরকারী মালিকদের অধীন শিল্পগুলির শ্রমিকরা লড়ছে। এক ভয়ঙ্কর প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে তাদের এই লড়াই চালাতে হচ্ছে। বিশ্বজোড়া পুঁজিবাদী অর্থনীতির সংকটের মধ্যে যখন একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তখন তাদের উপর কি ভয়ঙ্কর চাপ রয়েছে তা বোঝাই যায়। লে-অফ, লক-আউট, ক্লোজার ইত্যাদি অস্ত্র ব্যবহার করে বুর্জোয়ারা শ্রমিক শ্রেণীকে আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে। বিজেপি সরকার সম্প্রতিকালে ১২ ঘণ্টা শ্রমদিবস চালু করবার এক মারাত্মক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। তথ্য প্রযুক্তি শিল্পে কাজের নির্দিষ্ট কোন সময় সীমা রাখা যাবে না বলে বুর্জোয়া সংবাদপত্রগুলো যে প্রচার শুরু করেছে তা মারাত্মক এক ভবিষ্যতের ঈঙ্গিত দিচ্ছে। শ্রমিক সংগঠনগুলিকে সর্বশক্তি দিয়ে এই আক্রমণকে রুখতে হবে। যদিও দেশে দেশে এবং ভারতে তথা পঃবঙ্গে শ্রমিক আন্দোলন নতুন করে আবার শুরু হবার একটা লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি কিন্তু চেতনাগতভাবে তা আগের থেকে অনেক পেছনে চলে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিবিপ্লবী ভাঙ্গনের ফলে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে চেতনার যে অধোগতি আমরা দেখছি, ভারতেও তা লক্ষিত হচ্ছে। স্ট্যালিনবাদীরা যেভাবে দ্রুত বুর্জোয়া চিন্তা-চেতনায় নিজেদের জারিত করছে তাতে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে দীর্ঘ এক মতাদর্শগত লড়াই ছাড়া তাদেরকে বিপ্লবী মার্কসবাদে উদ্বুদ্ধ করা যাবে না। এই দীর্ঘস্থায়ী কষ্টকর কাজের জন্য আমাদের তৈরী হতে হবে।

শ্রমিক সংগ্রামে পাশাপাশি দেশে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন চরিত্রের কৃষক জনগণের সংগ্রাম বিকশিত হচ্ছে। ভারতবর্ষের গত ৫০ বছরের পুঁজিবাদী বিকাশের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক বিশাল ক্ষেতমজুর শ্রেণী, যারা আসলে গ্রামীণ প্রলেতারিয়েত। এরা গ্রামীণ কৃষিকর্মরত জনগণের পঞ্চাশ শতাংশের মত। বিহার, অন্ধ্র, কর্ণাটক সহ বিভিন্ন রাজ্যে এরা উল্লেখযোগ্য সংগ্রাম চালাচ্ছেন। ক্ষেতমজুররা ছাড়া গরীব কৃষকরাও তাদের দাবী দাওয়া নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। লড়াই চালাচ্ছেন মৎস্যজীবীরাও। তাদের পেশাকে বিপন্ন করে যখন বিশাল বিশাল সংস্থাসমুহ মাছের উপর একচেটিয়া দখল কায়েম করতে চাইছে তখন তাদের জীবন-জীবিকার স্বার্থেই তারা লড়াই চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়াও ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগণকে যখন তাদের জমি থেকে উৎখাত করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার হচ্ছেন এবং বিভিন্নভাবে লড়াই-আন্দোলন চালাচ্ছেন । এছাড়া নিপীড়িত জাতিসত্ত্বাগুলি, দলিত ও নিম্নবর্গের মানুষেরা, সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলি, মহিলারা এবং ছাত্র-যুবরা যে বিশেষ বিশেষ অত্যাচারের সম্মুখীন হন সে সবের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই অব্যাহত আছে।

নিপীড়িত সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় সমূহ

ভারতবর্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই বসবাস করছেন। সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়, তারপর আছে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়। এছাড়াও আছে শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি সম্প্রদায়গুলি। ১৯৪৭ সালে যখন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালরা ভারতবর্ষকে বিভক্ত করেছিল তখন এই উপমহাদেশ প্রত্যক্ষ করেছিল এই শতাব্দীর সবচেয়ে কুৎসিততম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এরপর পুঁজিবাদের আপাত বিকাশ এবং বামপন্থী আন্দোলনের ক্রমবিকাশের ফলে সাম্প্রদায়িকতা অনেকটাই পিছু হটেছিল। কিন্তু মূলতঃ আশির দশকের শেষ দিক থেকে ফ্যাসিবাদের উত্থানের পর থেকে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা এক বিশেষ মাত্রা অর্জন করেছে। বাবরি মসজিদ ফ্যাসিবাদীরা ভেঙ্গে দেবার পর দেশজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে ভয়াবহ দাঙ্গা সঙ্ঘটিত হয় তা ৪৬-এর দাঙ্গার কথাই খেয়াল করিয়ে দেয়। পার্থক্য একটাই এবারে মুসলিমরা একতরফা নিহত হয়েছেন। ফ্যাসিবাদীরা অভিযোগ তোলে মুসলিমরা নাকি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত। অথচ ভারতে যে সব ধর্মীয় সম্প্রদায় আছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত এই মুসলিমরাই। শিক্ষা, চাকরি, অর্থনৈতিক অবস্থা সমস্ত দিক থেকেই তারা সকলের পিছনে। ফ্যাসিবাদীদের মুসলিমদের উপরে একতরফা সন্ত্রাসের ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া হয়েছে মারাত্মক। তারা গোটা দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করেছেন। এর ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীলরা শক্তিশালী হয়েছে। এটা শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যের পক্ষে এক বিপজ্জনক ঘটনা। একে সঠিকভাবে মোকাবিলা না করলে তা শ্রমিক আন্দোলনকে দুর্বল করে দেবে।

মুসলিমদের আপাতত রেহাই দিয়ে ফ্যাসিবাদীরা এখন হামলা শুরু করেছে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর। খ্রীষ্টানেরা ব্যাপকহারে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করছে এই মিথ্যা গুজব রটিয়ে দিয়ে তারা তাদের উপর হামলা চালাচ্ছে। চার্চ পুড়িয়ে দেওয়া, বাইবেল পোড়ানো, যাজকদের হত্যা করা, যাজিকাদের ধর্ষণ করা ইত্যাদি হচ্ছে ফ্যাসিবাদীদের খ্রীষ্টানদের বিরুদ্ধে ‘ধর্মযুদ্ধের' নমুনা । মাত্র ২–৩ শতাংশ খ্ৰীষ্টান সমস্ত হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করে তাদের সংখ্যালঘু করে দেবে এই পাগলের প্রলাপই হচ্ছে ফ্যাসিবাদীদের লড়াইয়ের রণকৌশল। এই গুজব রটিয়ে দিয়ে আসলে তারা নিজেরাই খ্রীষ্টানদের ধর্মান্তরিত করছে।

মুসলিম, খ্রীষ্টানদের পাশাপাশি বৌদ্ধদের উপর হামলা চালানোর ক্ষেত্রও তৈরী রেখেছে ফ্যাসিবাদীরা। বিহারের বোধগয়ার বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দুদের বলে দাবী করে একাধিক বার তারা সেখানে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। যে কোন মুহূর্তে বাবরি মসজিদের ধাঁচে সেখানেও শুরু করা হতে পারে 'মুক্তি' আন্দোলন ।

দেশের সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির উপর ফ্যাসিবাদীদের এইসব হামলার বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে এবং গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ। ফ্যাসিবাদীরা যদি নির্বিবাদে এইসব হামলা চালিয়ে যেতে পারে তবে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্টি হবে পারস্পরিক অবিশ্বাস। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। সুতরাং ফ্যাসিবাদীদের এইসব হামলাকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করবার জন্য শ্রমিকশ্রেণীকে এগিয়ে আসতে হবে। নিপীড়িত ও অত্যাচারিত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাঁধে কাঁধ রেখে তাকে ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করতে হবে। অত্যাচারিত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুখপাত্র হিসেবে তাদের নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তবেই রক্ষা পাবে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য ।

নিপীড়িত জাতিসত্ত্বার আন্দোলন

জার আমলের রাশিয়ার মত ভারতবর্ষকেও জাতিসমূহের কারাগার হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। ১৯৪৭ এর পর থেকেই বিভিন্ন জাতির উপর ভারত সরকারের দমন পীড়ন চলছে। ভারত রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই উত্তর- পূর্বাঞ্চলের জাতিগুলি স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের গণতান্ত্রিক দাবীগুলিকে কোনরকম মর্যাদা দেওয়া তো দূরের কথা ভারত সরকার সামরিক শক্তির জোরে তাদের দাবিয়ে রাখবার চেষ্টা করছে। গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলই বাস্তবতঃ ভারত সরকারের উপনিবেশ বই কিছু নয় । আমরা নাগা, মিজোসহ সব জাতিগুলির বিচ্ছিন্ন হওয়া সহ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করি। আমরা পরিষ্কার ভাবে মনে করি, কোন জাতি সত্ত্বা ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে থাকতে না চাইলে তাকে ভারতের মধ্যে জোর করে ধরে রাখার কোন অধিকারই ভারত সরকারের নেই।

একই কারণে আমরা সমর্থন করি কাশ্মিরী জাতির স্বাধীনতার লড়াইকে। তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে আমরা ছিলাম, আছি, থাকবো। ভারত ও পাকিস্তানের নাগপাশ ছিন্ন করে একটি স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক কাশ্মীরী রাষ্ট্র জন্ম নিক এবং উপমহাদেশের সমাজতান্ত্রিক ফেডারেশনের অংশ হিসাবে তারা আত্মপ্রকাশ করুক আমাদের কামনা এটাই। তবে এ ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত এবং সেটা মেনে নেওয়াটাই প্রকৃত গণতন্ত্র বলে আমরা মনে করি। ৷ ১৯৪৭ সালের পর গোটা দেশ জুড়ে ভাষা ভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবীতে যে সব আন্দোলন গড়ে উঠেছিল এবং ভারত সরকারের দমনপীড়নকে উপেক্ষা করে যেভাবে তা বহুলাংশে সফল হয়েছিল তা একটি ইতিবাচক ঘটনা বলেই আমরা মনে করি। ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে বলে স্ট্যালিনবাদীরা যে ঘোষণা করেছে তাকে সমর্থন করি না। গোর্খাল্যাণ্ড, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, উত্তরাখণ্ড ইত্যাদি রাজ্য গঠনের দাবী ন্যায্য বলেই আমাদের মনে হয়। ঐসব অঞ্চলে বসবাসকারী জাতিসত্ত্বাগুলির সর্বাঙ্গীন জাতিগত বিকাশের স্বার্থে আলাদা রাজ্যগঠনের যৌক্তিকতা আছে বলেই আমরা মনে করি। সুতরাং এই আন্দোলনগুলিকে আমরা সমর্থন করি।

তবে এইসব আন্দোলনগুলির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও আমরা সচেতন। এইসব আন্দোলনগুলিকে সমর্থনের অর্থ এটা নয় যে তাদের বুর্জোয়া বা পেটি বুর্জোয়া নেতৃত্বকে আমরা সমর্থন করি। ঐ সব জাতিসত্তার শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী মানুষের মধ্য থেকে ঐসব প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করা প্রকৃত কমিউনিষ্টদের কতব্য। নয়তো আমার ঐসব জাতিসত্ত্বার বুর্জোয়া বা বুর্জোয়া নেতৃত্বের দালালে পরিণত হবেন। এই বিপদ সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। যেভাবে কিছু নকশাল গোষ্ঠী ঐসব জাতিসত্ত্বার আন্দোলনগুলিকে সমর্থনের নামে তাদের বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া নেতৃত্বের দালালে পরিণত হয়েছে তাকে বিরোধিতা করতে হবে। আসলে স্ট্যালিনবাদী যুক্তফ্রন্টের তত্ত্বই তাদের ঐ ধরণের অধঃপতনের মূল ঐসব জাতিসত্ত্বার আন্দোলনগুলির সীমাবদ্ধ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে সম্প্রতিকালে ঐ সব আন্দোলনের নেতৃত্বদায়ী সংগঠনগুলি জাতিদাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছে। বোরো বনাম সাঁওতাল, বোরো বনাম বাঙ্গালী, নাগা বনাম মিজো বা বিভিন্ন বহিরাগত জাতিগুলির মানুষদের সঙ্গে যেভাবে তারা দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছেন তাতেই প্রমাণিত হচ্ছে এই সব আন্দোলনগুলির নেতাদের চরিত্র কতটা প্রতিক্রিয়াশীল। সুতরাং তাদের চরিত্রকে সম্পূর্ণভাবে জনগণের মধ্যে উন্মোচিত করতে না পারলে তাদের এইসব নোংরা কার্যকলাপ শ্রমিক ঐক্যকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। সুতরাং দেশজোড়া শ্রমিক ঐক্যের স্বার্থেই আমরা যেমন ঐসব জাতিসত্ত্বাগুলির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করবো, একই সাথে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বকেও আমরা বিরোধিতা করে যাবো। শ্রমিক স্বার্থের থেকে বড় কোন স্বার্থকে আমরা মানি না। সেই শ্রমিক স্বার্থের অধীনেই সমস্ত আন্দোলনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গী আমাদের অর্জন করতে হবে।

দলিত আন্দোলন

ভারতবর্ষে এমন একটি সমস্যার সম্মুখীন কমিউনিস্ট আন্দোলনকে হতে হয় যা সারা পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। ভারতবর্ষের সমাজ (মূলতঃ হিন্দু সমাজ) জাত-পাতের দ্বারা বিভক্ত একটি সমাজ। যুগ যুগ ধরে উচ্চবর্ণের মানুষরা নিম্নবর্ণের মানুষ এবং বর্ণব্যবস্থার বাইরে অবস্থিত দলিতদের উপরে চালিয়ে আসছে সীমাহীন অত্যাচার। শুধু মাত্র অস্পৃশ্য বলে ঘোষণাই নয়, দলিতদের উপর শারীরিক নির্যাতন, অত্যাচার চালানো, সকলের জন্য যে পানীয় জল তা তাদের ব্যবহার করতে না দেওয়া, দলিত মহিলাদের ধর্ষণ, তাদের মন্দিরে প্রবেশ করতে না দেওয়া ইত্যাদি বিভিন্নভাবে তাদের উপর অত্যাচার চলছে। শুধুমাত্র দলিতদের উপরেই নয়, বর্ণব্যবস্থার মধ্যে যারা আছে সেই নিম্নবর্ণের মানুষদের উপরও চলছে অত্যাচার।

কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও জাগছে। দলিত নিম্নবর্ণের মানুষদের মধ্যেও গণতান্ত্রিক চেতনার বৃদ্ধি ঘটছে। তারা আর পড়ে পড়ে মার খেতে রাজি নন ৷ যদিও দলিতদের মধ্যে এই জাগরণ আজ এক দেশজোড়া চেহারা নিয়েছে কিন্তু তা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার আগেই। ফলে, আম্বেদকর; পেরিয়ার-এর নেতৃত্বে যে দলিত জাগরণ ৪৭-র আগে শুরু হয়েছিল তা ছিল মূলতঃ বুজোয়া দলিত আন্দোলন, বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন দলিত আন্দোলন। যদিও দলিতরা মুলতঃ হচ্ছেন শ্রমজীবি মানুষ কিন্তু তাদের আন্দোলন বরাবরই ছিল বুর্জোয়া বা পেটি বুর্জোয়া নেতৃত্বের অধীন। বর্তমানেও তা তাই আছে। বহু গরম গরম বোলচাল ঝাড়লেও বহুজন সমাজ পার্টি, রিপাবলিকান পার্টি আসলে বুর্জোয়া দলিত পার্টি। নবজাগ্রত দলিত আন্দোলনকে পার্লামেন্টারী ব্যবস্থার সাথে বেঁধে ফেলাই তাদের উদ্দেশ্য। দলিত আন্দোলন যা পরিচালিত হয় উচ্চবর্ণের অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে, তাকে সমর্থন জানালেও দলিত আন্দোলনের বদ নেতাদের বিরুদ্ধে তাদের আমরা সতর্ক করবো। যে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের মত দলিত বিরোধী পার্টির সাথে ভোটে সমঝোতা করে যে বহুজন সমাজ পার্টি ঘোষিত মনুবাদী পার্টি বিজেপি-র সাথে সরকার চালায় তারা যে দলিত আন্দোলনের সাথে বেইমানী করতে বাধ্য তা সব দলিতকে বুঝতে হবে। দলিত

ও নিম্নবর্ণের মানুষদের এটা বুঝতে হবে যে বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে কারও মুক্তি নেই। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই তাদের মুক্তির রাস্তা দেখাতে পারে। যদি সোভিয়েত গড়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা শ্রমিক শ্রেণী ও মেহনতী মানুষ (যাদের মধ্যেই মুলতঃ দলিতরা আছেন) নিজের হাতে না নেয় তবে দলিতদের মধ্যেকার সুবিধাভোগী অংশ পুঁজিপতি-জমিদারদের সাথে সমঝোতা করে নিজেদের জন্য সুবিধা বাগিয়ে নেবে এবং কোটি কোটি মেহনতী দলিত মানুষ যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই রয়ে যাবেন। সুতরাং বুর্জোয়া দলিতবাদী পার্টিগুলিকে ছুঁড়ে ফেলে দলিতদের শ্রমিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হতে হবে। এছাড়া অন্য পথ নেই ।

মহিলা আন্দোলন

ভারতবর্ষের সমাজ একটা জঘন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। মহিলাদের উপর অত্যাচারের কোন সীমা-পরিসীমা নেই এখানে। পণপ্রথা, বধূহত্যা, সতীদাহ- র মত জঘন্য মধ্যযুগীয় অত্যাচার যেমন আছে তেমনই আছে কর্মক্ষেত্রে যৌন লাঞ্ছনা, ধর্ষণ-এর মত নিপীড়ন। মহিলাদের এখনো পুরুষরা পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি না। তাদের স্বাধীনতাকে তারা ঈর্ষার চোখে দেখেন এবং মহিলাদের শত্রু হিসেবেই গণ্য করেন। এসবের বিরুদ্ধে মহিলারা ক্রমশঃই সরব হচ্ছেন। আন্দোলনের ময়দানে তারা তাই বেশি বেশি করে সামিল হচ্ছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন যোগ্য নেতৃত্ব তাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। যাও বা আছে তা আগাপাশতলা বুর্জোয়া নেতৃত্ব। তারা বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যেই মহিলাদের আটকে রাখতে চান। পরিবারে মহিলা আর পুরুষরা যদি পরস্পরের কাজ ভাগ করে নেন, তাহলেই তারা খুশি। এর থেকে বেশি তারা ভাবতে রাজী নন। অর্থাৎ একটা পরিবারের গণ্ডীর মধ্যেই তারা সকলকে বন্দী করে ফেলতে চান। কিন্তু পরিবারের কাজগুলিকে কেন সমাজীকৃত করা যাবে না? কেন পরিবারের সঙ্কীর্ণ পরিসরে মানুষ আবদ্ধ হয়ে থাকবে? এসব প্রশ্ন বুর্জোয়া নারীবাদীদের মাথাতেই নেই। বুর্জোয়া পরিবারকেই তারা জীবনের শ্রেষ্ঠ জিনিস বলে মেনে নিয়েছে, যাকে কিনা মার্কস-এঙ্গেলস মহিলাদের পক্ষে অবমাননাকর বলে মনে করতেন। কিন্তু বিপ্লবোত্তর রাশিয়া ও চীনের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। সামাজিকীকরণের বিকল্প অন্য কিছু হতে পারে না। মুক্তির জন্য যে মহিলা আন্দোলন আছে তাদের বুঝতে পুরুষদের পরিবারের গণ্ডীতে আবদ্ধ করলে নারী মুক্তি হয় না, নারী ও পুরুষ উভয়ে যখন পরিবারের গণ্ডী ছেড়ে বেরোয় তখনই হয় প্রকৃত নারীমুক্তি। নির্বোধ বুর্জোয়া নারীবাদীরা এটা না বুঝলেও ব্যাপক নারী সমাজকে একথা বুঝতে হবে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যে অত্যাচার চলছে নারীদের উপর, সম্প্রতিকালে তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে ভারতে ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের উদ্ভবের পর। এমনিতেই উদার অর্থনীতির রমরমার ফলে ছাঁটাই-এর খড়গ সবচেয়ে বেশি নেমেছে মহিলাদের উপর, তারা বেশি করে জীবিকাচ্যুত হচ্ছেন। ফলে পরিবারের গণ্ডীতে তারা বেশি করে আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন। আর ফ্যাসীবাদীরা ঠিক এটাই চাইছে। তারা মহিলাদের গৃহে আবদ্ধ করার পক্ষে। নারীর স্থান গৃহে মনুবাদের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে এটাই তারা ঘোষণা করেছে। এছাড়াও বিজেপি-শিবসেনা দেশ জুড়ে যেসব দাঙ্গা সংঘটিত করেছে তাতেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন মহিলারাই। দুপক্ষেরই সমাজবিরোধীরা মহিলাদের উপর নির্বিবাদে অত্যাচার চালিয়ে গেছে। সুতরাং সাধারণভাবে যেমন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে মহিলা আন্দোলনকে সোচ্চার হতে হবে, তাদের বিশেষভাবে সোচ্চার হতে হবে ফ্যাসীবাদীদের বিরুদ্ধে।

বুর্জোয়া নারীবাদীরা এবং সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট NGOগুলি মহিলাদের আন্দোলনকে শ্রমিক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য হাজারো প্রচেষ্টা চালায়। তারা তথাকথিত 'স্বাধীন' নারীবাদী আন্দোলনের কথা বলে। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের পরাধীন দালাল এইসব নারীবাদীদের 'স্বাধীন' আন্দোলন ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এদের সম্পর্কে মহিলাদের সতর্ক থাকতে হবে। শ্রমজীবী মানুষদের সম্পর্কে এদের যা ঘৃণা সেই ঘৃণা এদের নিজেদের শ্রেণীর পুরুষদের সম্পর্কে নেই। থাকাটা সম্ভবও নয়। সুতরাং এদের চাতুর্যে না ভুলে মুক্তির জন্য মহিলা আন্দোলনকে শ্রমিকশ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত করতে হবে। তবেই অর্জন করা যাবে মহিলাদের মুক্তি।

পরিবেশ

আজ থেকে দুই-তিন দশক আগে ইউরোপে-আমেরিকায় শুরু হয়েছিল পরিবেশবাদী আন্দোলন। পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ তাদের অতি মুনাফার কারণে পৃথিবী জুড়ে পরিবেশের যে ধ্বংস সাধন করেছে তারই প্রতিক্রিয়ায় এই পরিবেশবাদী আন্দোলন। নির্বিচার অরণ্যনিধন, দায়দায়িত্বহীন ও দূষণরোধী ব্যবস্থাবলী না রেখে শিল্পের নির্বিচার বিকাশের ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তরের ক্ষয় ঘটেছে, তা ভরে গেছে বিষাক্ত সব রাসায়নিক গ্যাসে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এর ফলে ঘটছে অ্যাসিডবৃষ্টি। পরিবেশের ভারসাম্য বদলে গেছে ভীষণভাবে। পুঁজিবাদ ভাবে কেবলমাত্র মুনাফার কথা, মানবজাতির ভবিষ্যত নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা নেই। উদাহরণতঃ জিন সংস্থাপনের দ্বারা যে ট্রান্সজেনিক কৃষি পদ্ধতি আমদানী করা হয়েছে তা অনেক গাছ বা শস্যকে বন্ধ্যা করে দিয়ে খাদ্যব্যবস্থা বা উদ্ভিদজগতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যদি মুনাফার কথা না ভেবে মানবজাতির কথা ভাবা হত তাহলে যা মানবজাতির বিরাট উপকারে লাগতে পারে, তা হয়তো পুঁজিবাদের সঙ্কীর্ণ মুনাফালোভের কারণে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। পৃথিবী তথা মানবজাতিকে পুঁজিবাদ তার সীমাহীন মুনাফার লোভে ধ্বংসের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে পরিবেশ রক্ষার যে আন্দোলন তার গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত বুর্জোয়া ও পেটি বুর্জোয়া নেতৃত্বই এই আন্দোলনকে পরিচালনা করছে। তারা শুধুমাত্র পরিবেশ রক্ষার কথাই বলে, কিন্তু পুঁজিবাদ ধ্বংস না করলে যে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয় তা তারা বোঝে না বা বলেও না অথবা সচেতনভাবে তাদের আড়াল করতে চায়। যেমন, মেধা পাটকরের নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন। তারা ভারত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও যে প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণাকে তারা আশ্রয় করে আছে তা পুঁজিবাদকেই রক্ষা করে মাত্র। আর পুঁজিবাদ যদি রক্ষা পায়, তবে পরিবেশ-এর রক্ষা হবে কি করে? সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট বিভিন্ন NGOগুলোও এই আন্দোলনে সক্রিয়। তাদের উদ্দেশ্য পরিবেশ রক্ষা নয়, পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষাই তাদের উদ্দেশ্য। এদেরকে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন থেকে হটাতে না পারলে পরিবেশ রক্ষা কথার কথা মাত্র থেকে যেতে বাধ্য। পরিবেশবাদী NGO রা বা অন্যান্য সংগঠনগুলো যান্ত্রিক সভ্যতাকেই সমস্ত নষ্টের মূল বলে মনে করে। তাদের সাথে আমাদের মূল পার্থক্য এখানেই যে আমরা তা মনে করি না। যদি পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করা যায় তবে যন্ত্রসভ্যতাকে মানবস্বার্থের এবং পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়ে ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলেই আমরা মনে করি। বিজ্ঞানের বিকাশ আমাদের সেই দিকে পৌঁছে দিতে পারে যদি পুঁজিবাদী দস্যুদের কবল থেকে বিজ্ঞানকে মুক্ত করা যায়। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে যদি বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা যায় তবে তা মানব সমাজকে ও প্রকৃতিকে ধ্বংস নয়, তাকে বিকশিত করতে ও বজায় রাখতেই সাহায্য করবে। সুতরাং, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত করতে না পারলে তার পারলে তার ইপ্সিত লক্ষ্যে সে কোন দিনই পৌঁছবে না ।

NGO প্রসঙ্গে

অতি সম্প্রতিকালে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদের আর্থিক মদতপুষ্ট NGO-দের কার্যকলাপ প্রচণ্ডভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয় ৷ এই NGOগুলো সমাজসেবার নাম করে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে জনগণকে সমাবেশিত করে, তাদের হয়ে চরবৃত্তি করে এবং দেশের সমস্ত সামাজিক-'. অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক তথ্যাবলী তাদের হাতে তুলে দেয়। যার ভিত্তিতে সাম্রাজ্যবাদ গণআন্দোলনগুলিকে মোকাবিলার রণকৌশল ঠিক করে। শুধু এসবই নয়, গণআন্দোলনগুলিকে বিপথগামী করবার জন্য তারা তার মধ্যেও অনুপ্রবেশ করে, আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে তারা মার্কসবাদের বিরুদ্ধে প্রচার করে এবং তাদের তথাকথিত ‘উদার আদর্শাবলীগুলোকে তুলে ধরে। সাম্রাজ্যবাদের এজেণ্ট এইসব NGO গুলোকে আমরা কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিরুদ্ধে নিয়োজিত বিরাট শত্রু বলেই মনে করি। এদের বিরুদ্ধে তীব্র আদর্শগত লড়াই আমাদের চালাতে হবে। এবং জনগণকে ভিখারী বানাবার ও তাদের বিভ্রান্ত করবার যে রণকৌশল NGO-রা নিয়েছে তাকে আমাদের দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। NGO-দের সাথে কোনরক যৌথ কার্যকলাপের আমরা বিরোধী এবং যে সব মাথামোটা বামপন্থীরা তাদের সাথে দহরম মহরম চালায় তাদেরকে আমরা সমালোচনা চালিয়ে যাবো।

বামপন্থী আন্দোলন সম্পর্কে

ভারতবর্ষে বামপন্থী আন্দোলনের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। ১৯২১ সাল থেকেই ১৯২১- এখানে কমিউনিস্ট সংগঠনগুলো কাজকর্ম চালাচ্ছে। বর্তমানে ভারতবর্ষে বামপন্থী দলগুলিকে তিনভাগে বিভক্ত করা যায়। একদিকে আছে স্ট্যালিনবাদী CPI, CPM, CPIML -এর বিভিন্ন গ্রুপ SUCI। তাছাড়াও অসংখ্য

ছোটখাটো স্ট্যালিনবাদী গ্রুপ আছে। স্ট্যালিনবাদের জাতধর্ম অনুযায়ী এরা প্রত্যেকেই পার্লামেন্টারী রাজনীতিকেই তাদের কার্যকলাপের মূল কেন্দ্ৰবিন্দু করেছে। দু-একটি মাওবাদী গোষ্ঠী অবশ্য সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন PWG-CPIML, MCC -ইত্যাদি, তবে তারাও খুব দ্রুত পার্লামেন্টারী পথের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের মধ্যেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত খুব পরিষ্কার স্ট্যালিনবাদী CPI, CPM, SUCI যদিও এখনো পর্যন্ত শ্রমিকশ্রেণীর এক বড় অংশকে নিজেদের নেতৃত্বের অধীনে রেখেছে তবে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি তাদের বেইমানী এবং বুর্জোয়াদের সঙ্গে তাদের মাখামাখির ফলে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ-বিক্ষোভ তৈরী হচ্ছে। এই স্ট্যালিনবাদীরা স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বুর্জোয়া দল কংগ্রেসকেই জাতির নেতা বলে মেনে নিয়েছিল এবং এখনো তারা বুর্জোয়াদের কোন না । কোন অংশের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে। তাদের এইসব কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের মার্কসবাদ সম্পর্কেই সংশয় তৈরী করছে। বিশেষতঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর প্রতিবিপ্লবী ভাঙ্গনের পর স্ট্যালিনবাদীদের দিশেহারা ভাব আরো প্রকট হয়েছে। একেবারে অনাথের মত তারা আচার-আচরণ শুরু করেছে এবং বুর্জোয়াদেরকেই তাদের নতুন পিতা বলে তারা মেনে নিয়েছে। পঃ.বঙ্গ, কেরল এবং ত্রিপুরায় বুর্জোয়াদের সম্পূর্ণ সেবাদাস হিসেবে তারা কাজ করছে, আর তা বুর্জোয়াদের এতটাই অভিভূত করেছে যে তাদেরকে তারা দরাজ হাতে সার্টিফিকেট দিচ্ছে। স্ট্যালিনবাদীরা বর্তমান প্রতিক্রিয়ার যুগের সাথে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের মানিয়ে নেবার চেষ্টা করছে এবং পুরোদমে বুর্জোয়া পার্টি বনে যেতে তাদের আর খুব বেশি দেরী নেই। স্ট্যালিনবাদী সংগঠনগুলি ছাড়াও ভারতে RSP, RCPI - ইত্যাদি কিছু স্ট্যালিনবাদী দল আছে যারা মুখে স্ট্যালিনের বিরোধিতা করলেও কার্যতঃ স্ট্যালিনবাদকেই অনুসরণ করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই তারা স্ট্যালিনবাদীদের সাথেই জোট গড়ে তুলেছে এবং শ্রমিক-কৃষকের উপর দমন-পীড়ন চালাতে তারা স্ট্যালিনবাদীদের থেকে কোন অংশে কম যায় না। এদের থেকে বেরিয়ে আসা কিছু গ্রুপ নিজেদের 'বিপ্লবী' বলে অভিহিত করতে ভালবাসে। কিন্তু ট্রটস্কীবাদকে গ্রহণ না করে তারা বিপ্লবী মার্কসবাদী হবে কি করে? স্ট্যালিনবাদ আর ট্রটস্কীবাদের মাঝে দোল খেতে খেতে তাদের দম শীগগিরই ফুরিয়ে যাবে। এইসব দলগুলি ছাড়াও সম্প্রতিকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভারতে কিছু মেনশেভিক গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে। যদিও এরা নিজেদের মেনশেভিক বলতে লজ্জা পায় কিন্তু, লেনিন, ট্রটস্কী এবং রুশ বিপ্লবকে বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে তারা প্রকৃত মেনশেভিকদেরকেও হার মানিয়েছে। নিজেদের বিপ্লবী ইমেজ গড়ে তুলবার জন্য এরা রোজা লুক্সেমবুর্গের নামের পেছনে আড়াল নেবার চেষ্টা করে। এদের মুখোশ শ্রমিক শ্রেণীর সামনে টেনে খুলে দেবার দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। এদের সাথে তিক্ত ও তীব্র বিতর্ক চালিয়ে ভারতের বুকে বিপ্লবী মার্কসবাদ তথা ট্রটস্কীবাদকে আমাদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এসব ছাড়াও আছে ভূয়া ট্রটস্কীবাদী দু-একটি গোষ্ঠী। এরা স্ট্যালিনবাদেরই ছায়া মাত্র। কিন্তু বিপ্লবী মার্কসবাদী আন্দোলনে অন্তর্ঘাত চালানোর জন্য এরা নিজেদের ট্রটস্কীবাদী' বলে দাবী করে। এদের মুখোশও খুলে দিতে হবে এদের কর্মী সমর্থকদের কাছে।

আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ভারতবর্ষে ট্রটস্কীবাদী আন্দোলনের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় স্ট্যালিনের নির্দেশে CPI যখন বেইমানী করে এবং বিট্রিশ সাম্রাজ্যবাদের দালালে পরিণত হয়, তখন ট্রটস্কীবাদী BLPI বিপ্লবী মার্কসবাদের ঝাণ্ডাকে উর্দ্ধে তুলে ধরে সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। খঞ্জ গান্ধীকে সম্পূর্ণ ভাবে বিরোধিতা করেই তারা ঐ আন্দোলনে অংশ নেয়। ঐ আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে আমাদের প্রচুর কমরেড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসনের অত্যাচার, নিপীড়নের সম্মুখীন হন, কিন্তু তাতে তারা দমে যান নি।

কিন্তু এর পরেই চতুর্থ আন্তর্জাতিকের নেতৃত্ব বিলোপবাদী লাইন গ্রহণ করার ফলে BLPI অবলুপ্ত হয়। সংকটে পড়ে ভারতের ট্রটস্কীবাদী আন্দোলন। তারপর দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আবার ট্রটস্কীবাদী আন্দোলন সংগঠন গড়ে উঠছে। এদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের লক্ষ্যেই আমরা কাজ চালাচ্ছি।

সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিবিপ্লবী ভাঙ্গনের ফলে বিশ্ব জুড়ে যে প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠেছে তার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে স্ট্যালিনবাদীরা অধঃপতনের চুড়ান্ত বিন্দুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বিরাট রাজনৈতিক শূন্যতা। বামপন্থী আন্দোলনের এই চূড়ান্ত দুর্দশার সময় মার্কসবাদের ঝাণ্ডাকে আজ উর্দ্ধে তুলে ধরতে হবে ট্রটস্কীবাদীদেরই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ট্রটস্কীবাদীরা যেরকম দৃঢ়তার সাথে এই দায়িত্ব পালন করছে আমাদেরও তা করতে হবে। প্রতিক্রিয়ার কাছে আত্মসমর্পণ নয়, তাকে প্রতিরোধ করতে হবে। বুর্জোয়া বা সংশোধনবাদী মতাদর্শকে কোন ছাড় নয়, তাকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়তে হবে। বিচ্ছিন্ন হতে ট্রটস্কীবাদীরা কোনদিন ভয় পায়নি। আজকেও আমরা তা পাই না । মার্কসবাদের বিপ্লবী মর্মবস্তুকে রক্ষা করবার জন্য আমরা না হয় আরো কিছুদিন বিচ্ছিন্ন থাকবো। কিন্তু ভবিষ্যত আমাদেরই। স্ট্যালিনবাদ, মাওবাদ এবং তার বিভিন্ন অপভ্রংশ আজ দিশেহারা, সংকটগ্রস্থ, প্রতিক্রিয়ার কাছে আত্মসমর্পণরত। তাদেরকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। শ্রমিক শ্ৰেণী, মেহনতী মানুষের স্বার্থ ছাড়া আর কারো স্বার্থকে আমরা স্বীকার করি না, তাদের আন্দোলনকে সমাজতন্ত্র গঠনের সংগ্রামের সাথে যুক্ত করে বিশ্ববুর্জোয়ার সাথে আমাদের মুখোমুখি হতে হবে। শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্র গঠনের স্ট্যালিনবাদী মিথ্যাচারকে ছুঁড়ে ফেলে আমাদের প্রস্তুত হতে হবে বিপ্লবী ঝঞ্ঝার জন্য। মনে রাখতে হবে আমরা যদি বিশ্ব জুড়ে সমাজতন্ত্র গড়তে না পারি তবে বর্বরতা ঘিরে ফেলবে মানবসমাজকে। পুঁজিবাদ আজ ধ্বংসের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিয়েছে গোটা মানবজাতিকে। এই পুঁজিবাদকে আজ কোন রেয়াৎ নয়। গোটা মানবজাতিকে রক্ষার জন্য সংগ্রাম আজ সমার্থক হয়ে গেছে সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের সাথে। ভারতবর্ষে সেই সংগ্রামকে জয়যুক্ত করতে আসুন আমরা গড়ে তুলি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি এবং তার নেতৃত্বে গড়ে তুলি দেশ জোড়া বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন। ভারতীয় পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করে বিশ্বসমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে আমরা সচেষ্ট হই।

কমিউনিস্ট লীগ-এর কর্মসূচী

১) বিশ্ব পরিস্থিতি : সাম্যবাদের জন্য সংগ্রাম :

i) বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদী উৎপাদন ক্ষমতার বিকাশ ও বৃদ্ধি ধনতন্ত্রের দুর্বলতা ও ফাটলগুলিকে আড়াল করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। যদিও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত এবং বিশাল আকারের অগ্রগতি হয়েছে (যাকে সাধারণতঃ ‘টেকনোলজিক্যাল রিভলিউশন' হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে), তা সত্ত্বেও সমস্যাগুলির সমাধান হয়নি। উপরন্তু, এটা পরিষ্কার যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার নিজের ভিতরেই একটি দ্বন্দ্ব ( a contradiction in itself) এবং তা দারিদ্র, দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা, বেকারী, ভয়ঙ্কর রোগ, মহামারী, পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্তির কোন উপায় বাতলাতে পারে না। পুঁজিবাদ এবং তার জনগণের সমস্যার সমাধান তো করতে পারেই না, বরং সমস্যাকে আরও গভীরতর করে। সাম্রাজ্যবাদের পচনের যুগ শুরু হয়েছে বহুদিন আগেই, এবং তার সাময়িক সাফল্য এবং বিজয় সত্ত্বেও তা দিন দিন আরও ধ্বংসের দিকে চলেছে পুঁজিবাদ তার নিজের কবর নিজেই খুঁড়ছে।

ii) যদিও দুনিয়াব্যাপী আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী ঐক্যের প্রচেষ্টা চলছে, তথাপি, সাম্রাজ্যবাদের নিজের প্রকৃতির ফলেই, আন্তঃ সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব ও বিরোধ বেড়ে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের যাবতীয় ঘটনাবলীর উপর নিজের খবরদারী আরও জোরদার করার লক্ষ্যে ও নিজের একাধিপত্য বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়েছে (ইউ.এন.ও., আই.এম.এফ. বিশ্বব্যাঙ্ক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রভৃতির মাধ্যমে) এবং সব কিছুকে নিজের আয়ত্বে রাখার উদ্দেশ্যে প্ৰচেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে তা তীব্র আভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, অন্যদিকে জাপানী এবং জার্মান সাম্রাজ্যবাদের গুরুতর চ্যালেঞ্জের সামনে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রধান সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্র হলেও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে জার্মানী ও জাপানের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করা তার পক্ষে ক্রমশঃ দুরূহ হয়ে পড়ছে।

iii) পুঁজিবাদ যে এককভাবে বাঁচতে পারে না, তা বুঝতে পেরে ইউরোপীয় পুঁজিবাদী দেশসমূহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোটে আবদ্ধ হতে চাইছে (এবং ইউরোপব্যাপী সাধারণ মুদ্রা ইউরো চালু হয়েছে। বিভিন্ন সামরিক জোটও গ'ড়ে উঠেছে) কিন্তু তা তাদের দ্বন্দ্ব ও সংকটকে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারছে না। তারা তাদের সংকটের বোঝা বহুল পরিমাণে চাপিয়ে দিচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির উপর। ফলস্বরূপ তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহেও সংকট এক চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে, যার থেকে মুক্তি পাবার কোন উপায় সে সব দেশের শাসকশ্রেণীগুলির সামনে নেই। সে সব দেশের শ্রমিক শ্রেণীই পারে সাম্রাজ্যবাদের জোয়াল থেকে নিপীড়িত মানুষকে মুক্ত করতে।

iv) পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের এই সংকটের ফলে বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ফ্যাসীবাদী প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে (অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মতই)। উগ্র জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদী, এবং অনুরূপ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করতে পেরেছে এবং দুনিয়ার শ্রমিকশ্রেণী এবং নিপীড়িত জনগণের বিরূদ্ধে ক্রমশঃ বিপজ্জনক একটা প্রবণতা হিসাবে হাজির হচ্ছে। ফ্যাসীবাদের পুনরাবির্ভাব যেমন পুঁজিবাদের সংকটকে চিহ্নিত করছে, তেমনি শ্রমিকশ্রেণীর দুর্বলতাকেও তা দেখিয়ে দেয়। একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ লড়াই পারে এই ফ্যাসীবাদী প্রবণতার গতিরোধ করতে।

v) পূর্ব ইউরোপে, বিশেষতঃ সোভিয়েত রাশিয়ায় তথাকথিত সমাজতন্ত্র’ এর পতন বামপন্থী মহলে ডেকে এনেছে চরম বিপর্যয়। এ ঘটনা বিংশ শতাব্দীর অন্তিম লগ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা বামপন্থী জনগণ এবং শ্রমিকশ্রেণীকে ব্যাপকভাবে হতাশ ও নিষ্ক্রিয় করেছে। কারণ, তারা একে সমাজতন্ত্রের পরাজয় হিসাবেই বিবেচনা করেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই বিপর্যয় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপর্যয় নয়, বা ওই মতাদর্শের ভ্রান্তি নয়, বরং যথার্থতাই প্রমাণ করে, প্রমাণ করে যে তথাকথিত ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র' গঠনের স্বপ্ন এক নিছক কল্পনাবিলাস (Utopia)।

vi) পূর্ব ইউরোপে (সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ) যার পতন হয়েছে তা হল স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্রের, যা শ্রমিকশ্রেণী থেকে উদ্ভুত হলেও তার থেকে বিচ্ছিন্ন সামাজিক স্তর, যা শ্রমিকশ্রেণীর উপরই দমন পীড়ন চালাতো। সোভিয়েত ইউনিয়নে, সমাজতন্ত্রের নামে তারা সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা সমূহকে বহুদিন পূর্বেই বাতিল করে দিয়েছিল এবং ডেকে এনেছিল নিজেদের অধঃপতন। সুতরাং ওই রাষ্ট্র ছিল 'আমলাতান্ত্রিকভাবে বিকৃত ও অধঃপতিত শ্রমিকরাষ্ট্র' – যা নিজের মত করে পূর্ব ইউরোপেও অনুরূপ রাষ্ট্রসমূহ গড়ে তোলে, যা প্রথম থেকেই ছিল তার তাঁবেদার এবং অধঃপতিত। এই রাষ্ট্রগুলির গতি ছিল ধারাবাহিক প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র থেকে ফের পুঁজিবাদের দিকে যাওয়া। ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর রাশিয়ায় যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের চেষ্টা হয়েছিল, স্তালিনবাদ তা ব্যর্থ করে দেয়, তা বিপ্লবের ফসলকে আত্মসাৎ করে এবং রাশিয়ায় শ্রমিক গণতন্ত্রকে হত্যা করে, তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিককে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে শেষমেষ তাকে ভেঙ্গে দেয় এবং এইভাবে সমাজতন্ত্রের সর্বনাশ করে। আর্ন্তজাতিকভাবে তা পরোক্ষে পুঁজিবাদের স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতেই সহায়তা করেছে।

vii) স্তালিনবাদের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যান রাশিয়ায় কমরেড ট্রটস্কি এবং ‘বামপন্থী বিরোধী পক্ষ। তারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক সত্যকে সামনে নিয়ে আসেন এবং ফলস্বরূপ নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং কেউ কেউ বিতাড়িত এবং এমন কি নিহতও হন। কমরেড ট্রটস্কি-র নেতৃত্বে গড়ে ওঠে চতুর্থ আন্তর্জাতিক, কিন্তু পরবর্তীকালে উপযুক্ত বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাবে তা দুর্বল ও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। যদিও চতুর্থ আন্তর্জাতিকের রাজনৈতিক দিশা সঠিক ছিল কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতার ফলেই সে তার তাৎপর্য বহুলাংশে হারিয়ে ফেলে। বিশ্ব বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালনায় তা বিশেষ কোন কার্যকরী ভূমিকা আজও রাখতে পারে নি। আমাদের ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক সংগঠন হল পুনর্গঠিত ও পুনঃসংহত চতুর্থ আন্তর্জাতিক। এটাই হল আন্তর্জাতিক প্রলেতারিয়েতের অগ্রগামী বাহিনী।

viii) সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপ, চীন বা অন্যান্য কয়েকটি দেশে সমাজতন্ত্রের ‘ব্যর্থ' প্রয়োগ হয়েছে তার অন্যতম কারণ হল নেতৃত্বের সঠিক মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গী ও সামাজিক দিশার অভাব। কিন্তু ইতিহাসের এটাই শেষ অধ্যায় নয়। বরং এ হল নতুন ইতিহাসের শুরুর অধ্যায়। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সংগ্রাম চলছে এবং তা আরও নিঁখুতভাবে ও সঠিকতর দিশায় নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে যাবে। সমাজতন্ত্রের জন্য এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

ix) পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের সমস্ত ধরণের আক্রমণের বিরুদ্ধে, সমস্ত ধরণের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমাজতন্ত্র আনতে গেলে শ্রমিকশ্রেণীর কাছে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের কোন বিকল্প নেই। সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সর্বহারা আন্তর্জাতিক বিপ্লব একটি বা কয়েকটি দেশে প্রথমে সংগঠিত হয়ে তারপর তা আরও অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে একটি দেশের পরিসরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জয়কে বেশী দিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। সেখানে সমাজতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটানোও সম্ভব নয়। তাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যদি তার দুর্বলতম গ্রন্থি থেকে (সেই গ্রন্থির অবস্থান তৃতীয় বিশ্বেও হতে পারে। আবার এমনকি দ্বিতীয় বা প্রথম বিশ্বেও হতে পারে) সাম্রাজ্যবাদী প্রাণকেন্দ্র (বা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে) ছড়িয়ে পড়ে তবেই বিপ্লব চূড়ান্তভাবে জয়যুক্ত হতে পারে, সমাজতন্ত্র গঠিত হওয়ার রাস্তা পরিস্কার হতে পারে। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের যুগে, তার ধ্বংসের উপরই নির্ভর করছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়, সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সহাবস্থান করে সমাজতন্ত্র গঠিত হতে পারে না।

x) স্বতঃস্ফুর্তভাবে সাম্যবাদ আসতে পারে না। বুর্জোয়া সমাজে শ্রমিকশ্রেণী এবং অন্য সমস্ত শোষিত ও নিপীড়িত জনগণ ধারাবাহিকভাবে বুর্জোয়ার রাজনৈতিক এবং মতাদর্শগত চাপের সম্মুখীন হয়। শ্রমিকশ্রেণী বহুলাংশেই বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। সমস্ত রকম শোষণ, নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়েই শ্রমিকেরা সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারে। এর জন্য যা আবশ্যিকভাবে দরকার তা হল সমস্ত রকম বুর্জোয়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ও চৌহদ্দির থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়া। এর জন্য শ্রমিকদের শ্রেণী হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, এবং সমস্তরকম জাতিদাম্বিকতা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাতপাতের বিভাজন, নারী পুরুষ বিভাজন, ভাষাগত বিভেদ ইত্যাদির উর্দ্ধে উঠে নিজেদের সংঘবদ্ধ করতে হবে।

xi) শ্রমিকশ্রেণীকে কেবল নিজেদের সংঘবদ্ধ করলেই চলবে না, অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণী, সামাজিক স্তর ইত্যাদিকেও বুর্জোয়া শাসকদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করতে হবে এবং তাদের আন্দোলনে নেতৃত্বে দিতে হবে যাতে সেগুলি সঠিক দিশায় পরিচালিত হতে পারে এবং তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। একাজ সঠিকভাবে না করতে পারলে শ্রমিকশ্রেণী এককভাবে একাজ করতে পারে না।

xii) আর এই কাজ, অর্থাৎ সুষ্ঠুভাবে সশস্ত্র অভ্যুত্থান মারফৎ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজতান্ত্রিক পুর্নগঠনের মাধ্যমে সাম্যবাদী সমাজে পৌঁছানো – তা করতে গেলে শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রণী বাহিনীকে তার নিজস্ব তত্ত্ব মার্কসবাদ- লেনিনবাদকে আয়ত্ত করতে হবে, আয়ত্ত করতে হবে তার মহান নেতা মার্কস, ••• এঙ্গেলস্, লেনিন, ট্রটস্কি লুক্সেমবুর্গ প্রমুখের রচনা। তাকে সংগঠিত হতে হবে কমিউনিস্ট পার্টিতে। তাদেরকে সমস্ত ধরণের সুবিধাবাদ, অর্থনীতিবিদ, সংস্কারবাদ, সংকীর্ণতাবাদ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসী, স্তালিনবাদ, মাওবাদ, কাস্ত্রোবাদ, ইউরো কমিউনিজম ইত্যাদি ক্ষতিকর মতবাদের ব্যর্থতা ও ভ্রান্তিগুলি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কেবলমাত্র এইভাবেই তারা নিজেদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে পারে, সোভিয়েত রাজ তথা সর্বহারা একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এবং শ্রেণীহীন, সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরী হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে সেই লড়াই-এর আমরাও অংশীদার, ভারতের শ্রমিকশ্রেণীকে সেখানে সামিল করা আমাদের লক্ষ্য ।

২) ভারতীয় পরিস্থিতি : সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সংগ্রাম

i) স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ভারতের শ্রমিকশ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে তাকে উৎখাতের লক্ষ্যে অনেকবার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন এবং বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে সামিল হয়েছেন। শোলাপুর ও পেশোয়ারে কমিউন স্থাপন, নৌ-বিদ্রোহ, তেলেঙ্গানার বুকে ঐতিহাসিক কৃষক সংগ্রাম এবং এরকম আরও বহু ঐতিহাসিক লড়াই তার স্বাক্ষর বহন করছে। এই লড়াইগুলির ভিতর বুর্জোয়া নেতৃত্বকে অস্বীকার করা, সমাজতন্ত্র গড়ার জন্য আকাঙ্খা বারংবার অনুভূত হ'য়েছে, কিন্তু দুভার্গ্যবশতঃ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সুবিধাবাদী স্তালিনবাদী নেতৃত্বের বেইমানির জন্য ও নেতৃত্বের দুর্বলতা ও অক্ষমতার দরুণ সে লড়াইগুলি কাঙ্খিত সাফল্য লাভ করতে পারেনি, সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যেও অগ্রসর হ'তে পারেনি। সমস্ত আন্দোলনগুলিই শেষমেষ ব্যর্থ হয়েছে বা বুর্জোয়াদের পায়ে আত্মসমর্পণ করেছে।

ii) ভারতের কমিউনিস্টদের এই ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে ভারতের প্রধান বুর্জোয়া দল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ভারতের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতা রূপে নিজেদের প্রতিপন্ন করতে পেরেছে এবং জনগণকে ধোঁকা দিয়ে নিজেদের সম্মান ও প্রতিষ্ঠা বাড়াতে সক্ষম হ'য়েছে। সেই জন্য ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়ে যাওয়ার সময় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার বিশ্বস্ত তাঁবেদার কংগ্রেসকেই পুঁজিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার পক্ষে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত দল হিসেবে বিবেচনা করে তাদের হাতে শাসনভার হস্তান্তর করে। সেই সময়কার একমাত্র উল্লেখযোগ্য বুর্জোয়া প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগ তার ধর্মীয় চৌহদ্দি পেরোতে ব্যর্থ হয় এবং দ্বিখণ্ডিত ভারতের ক্ষুদ্রতম অংশ, নব প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানকে শাসন করার অধিকার আদায় করে নেয়। স্বাধীনতা উত্তর পর্যায়ে পাকিস্তানে মুসলিম-লীগ তার আগের ক্ষমতা হারিয়েছে। ভারতেও কংগ্রেস দল তার নির্ভরযোগ্যতা বহুলাংশেই হারিয়ে ফেলেছে, জনগণ আজ সাধারণভাবে ওই প্রতিক্রিয়াশীল দলের উপর ক্ষুব্ধ ও হতাশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও, কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতা এনেছে' এই দাবী আজও অধিকাংশ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য রয়ে গেছে। অন্য দিকে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাবার ফলে একদা বৃটিশ অনুগত ও তাদের বংশবদ হিন্দু মহাসভা ও পরবর্তীকালের জনসংঘের পরিবর্তিত রূপ ভারতীয় জনতা পার্টি 'হিন্দুত্ব'-এর ধ্বজা উড়িয়ে সামনের সারিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এরাই আজ ভারতীয় ফ্যাসীবাদের প্রধান পাণ্ডা। কংগ্রেসের বিভিন্ন দলছুট গোষ্ঠী ও পূর্বতন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসীর অবশিষ্ট, যেমন জনতা দল ইত্যাদি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক বুর্জোয়া দলের দুর্বল জোট 'রাষ্ট্রীয় মোর্চা' নামে কংগ্রেস ও বিজেপির তৃতীয় বিকল্প হিসাবে নিজেদের জাহির করছে এবং এদেশের সংশোধনবাদী, সংস্কারবাদী ও স্তালিনবাদী শ্রমিক দলগুলির সাথে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে গাঁটছাড়াও বেঁধেছে।

iii) ১৯৪৭ সালে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে থেকে ভারতের বুর্জোয়াদের হাতে আসে এবং ভারতবর্ষ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করে। ভারতে একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী (পার্লামেন্টারী) ব্যবস্থা চালু হয়। বিভিন্ন কারণে তার জন্মলগ্ন থেকেই ভারতীয় বুর্জোয়ারা অপরাপর তৃতীয় বিশ্বের দেশের বুর্জোয়াদের থেকে অপেক্ষাকৃত বেশী শক্তিশালী ছিল। তারা ভারতে একটি অনুন্নত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের যুগে জাতীয় স্বাধীনতাপ্রাপ্ত কোন দেশই সাম্রাজ্যবাদের আয়ত্তের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটাতে পারে না। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতীয় বুর্জোয়ারা আজও সাম্রাজ্যবাদের উপর অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি নির্ভরশীল এবং তারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ হয়েও তারা তাদের আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করে।

iv) স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে, ভারতের অন্তর্গত সামন্ত রাজাদের রাজ্যগুলির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়েছে, সেগুলি সরকার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে অধিগ্রহণ করেছে। একগুচ্ছ ভূমিসংস্কার কর্মসূচীর মাধ্যমে এবং কৃষিক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটা মোটামুটি শক্তিশালী পুঁজিবাদী কৃষক (কুলাক) শ্রেণী গ'ড়ে উঠেছে। সাম্রাজ্যবাদী ও আধাসামন্তবাদী জমিদারতন্ত্রকে বহুলাংশেই বিলুপ্ত করা হ’য়েছে, যদিও আধাসামন্তবাদী এবং অন্যান্য প্রাক্- পুঁজিবাদী উৎপাদনের সম্পর্কের এবং সেই সঙ্গে আধা সামন্ততান্ত্রিক ধরণের পশ্চাৎপদ আর্থ সামাজিক সম্পর্কের অবশেষ আজও বেশ কিছু মাত্রায় রয়ে গেছে। ভারতের বুর্জোয়াদের সামনে ধনতান্ত্রিক বিকাশের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য ‘প্রাশিয়ান য়ুংকার' (Prussiann Yunkaer) পদ্ধতি নেওয়া ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না। (অর্থাৎ পুঁজিবাদের বিকাশ হ'য়েছে মূলতঃ উপর থেকে চাপানো সংস্কারের মাধ্যমে, জমিদারতন্ত্রকে সমূলে উচ্ছেদ করে নয়, বরং তার সাথে আপোষ করে। অনেকক্ষেত্রে জমিদারই কুলাকে রূপান্তরিত হয়েছে।

v) ভারতের শিল্পোৎপাদন অনেকদিন আগেই কৃষি উৎপাদন ছাড়িয়ে গেছে এই অর্থে যে, ভারতের জাতীয় আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ শিল্পক্ষেত্রগুলি থেকে আসছে। ভারতে পুঁজিবাদের বিকাশের গতি শ্লথ, তবে তা অন্যান্য অনুন্নত বা অর্ধোন্নত দেশের মতই ধীর গতিতে হচ্ছে। ১৯৫০-৫১ সালে যেখানে ৩০০০ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছেছিল, সেখানে ১৯৯০-৯১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭৯০০০ গ্রাম। এই সময়ের মধ্যে কয়লার উৎপাদন বেড়েছে প্রায় সাতগুণ এবং পেট্রোলিয়ামের প্রায় একশ ত্রিশগুণ। কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের সংখ্যা ৫০৭৮ থেকে বেড়ে হ'য়েছে ৪৯৩৮৮। ১৯৭০-৭১ সালে যেখানে কর্মচারী পিছু উৎপাদনশীল পুঁজির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩০০০০ টাকা, ১৯৮৭-৮৮-তে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৬০০০০ টাকা। ভারতে মোট চাষযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ গত ২৫ বছরে কমলেও কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে, কৃষিতে আধুনিকীকরণের ফলে, অর্থাৎ উন্নত বীজ, সার, কৃষি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে এবং জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতি মারফৎ। বহু ছোট-মাঝারি শিল্প রুগ্ন হয়ে পড়লেও এবং বেকার সমস্যা তীব্রতর হলেও, বৃহৎ শিল্পে সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ দেশে পুঁজিবাদী বিকাশ ও তার সংকটের লক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়েছে।

vi) ভারতের গরীব কৃষকরা বহুকাল ধরেই শ্রেণী সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন। আগে যে লড়াই ছিল মূলতঃ জমি দখলের (যেমন নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম) ফসল দখলের, আজ সেখানে মূল দাবী হচ্ছে মজুরীবৃদ্ধি, উন্নত জীবন-যাত্রার মানের জন্য লড়াই। গ্রামে অধিকাংশ স্থানে প্রাক্তন জমিদারতন্ত্রের প্রাধান্য আর নেই, বরং সে জায়গায় ধনীচাষী (কুলাক)দের প্রাধান্যই বেশী। তবে অসম বিকাশের দরুণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম অবস্থা বিরাজ করছে। তাই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে সংগঠনের চেহারা-চরিত্র এবং লড়াই-এর দাবীগুলিও ভিন্ন হবে। আমরা গরীব কৃষকের জমির ও মজুরীবৃদ্ধি সহ অন্যান্য দাবীর লড়াই সমর্থন করি। জমির জাতীয়করণ, (রাষ্ট্রীয়করণ) যৌথ করণের দাবী কোন কোন এলাকায় এখনই তোলা সম্ভব হতে পারে কিন্তু সর্বত্র সাধারণ দাবী হিসেবে সামনে আসতে পারে না। কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টনের পর আরো আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের পরে এর তাদের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের পর এই সমস্যাগুলি সামনে আসবে।

vii) ভারত বহুজাতিক রাষ্ট্র। পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদ জাতিতে জাতিতে বিভেদ কাজে লাগাতে চায়, লে জাতি বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। ভারতের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় একটি আপেক্ষিক ভাবে উন্নত জাতি' পার্শ্ববর্তী অনুন্নত জাতিগুলির উপর তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেমন আসামে অসমীয়া জাতি অন্যান্য জাতি-উপজাতির উপর শোষণ ও দমন চালায় ।

একইভাবে আমরা দেখি পূর্ব ভারতে বাঙালী, পশ্চিম ভারতে মারাঠী বা দক্ষিণ ভারতে তামিল জাতির আধিপত্য কায়েমের প্রচেষ্টা। এছাড়া রয়েছে নিপীড়িত উপজাতি ও জাতিসত্তাগুলির আন্দোলন, যেমন কাশ্মীরি, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড, ছত্তিশগড়, গোর্খা, অসমীয়া, বোরো, নাগা-মিজো-কুকি-মণিপুরী ইত্যাদির আন্দোলন। কেউ কেউ নিজেদের ভারতরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় (যেমন কাশ্মীরীরা), কেউ বা স্বতন্ত্র রাজ্য (যেমন ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড ইত্যাদি) চায়। যদিও এই দাবীগুলি তাদের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যার সুরাহা করতে পারে না। তবু আমরা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার স্বীকার করি এবং তাদের দাবীগুলি সাধারণভাবে সমর্থন করি। ..

viii) ভারত যেহেতু বহুভাষার দেশ, তাই এখানে ভাষাগত বিভেদও বিদ্যমান। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দিভাষী (অবশ্যই নিরঙ্কুশ নয়, মাত্র ৩৭ শতাংশ) তাই রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে হিন্দীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি অপরাপর ভাষাগুলিকেও সমান মর্যাদা দান করা এবং বিকাশ ঘটানো উচিত । এক্ষেত্রে আমরা ভারতীয় বুর্জোয়াদের জোর করে হিন্দী চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করি। অন্যদিকে যোগাযোগ রক্ষাকারী ইংরাজী ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার বিরোধী, আমরা মাতৃভাষাকে মূল মাধ্যম করার পক্ষপাতী।

ix) ভারতের একটি বিশেষ এবং জটিল সমস্যা হল জাতপাতের সমস্যা। ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে বর্ণবিদ্বেষের ফলে বহু ধরণের জাতিভেদের সৃষ্টি হয়েছে যা শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশকে ব্যাহত করে। বিশেষত ব্রাহ্মণ্যবাদ সমাজের তথাকথিত নীচু জাতি, দলিত ও অবহেলিতের উপর নির্মম অত্যাচার চালায়। অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে হলেও মুসলিম, খ্রীষ্টান ইত্যাদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই ধরনের জাতিভেদ দেখা যায়। আমরা জাতিভেদ প্রথার উচ্ছেদ চাই এবং সেই জন্যেই দলিত ও অন্যান্য নিপীড়িত তথাকথিত নীচু জাতির সামাজিক সংরক্ষণের জন্য ও অধিকার অর্জনের জন্য লড়াইকে, ব্রাহ্মণ্যবাদ নির্মূল করার লড়াইকে সাধারণভাবে সমর্থন করি।

x) ভারতে নানা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। ভারতকে 'ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা হলেও, কার্যত ভারতে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা চরম অবহেলা ও নিপীড়নের শিকার। চাকুরি, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই বৈষম্য প্রকট। ভারতবর্ষ কার্যত হিন্দুত্ববাদীদের, উগ্র ধর্মান্ধকারীদের মদৎকারী। ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পর দিল্লীসহ সারা দেশ জুড়ে শিখদের উপর জঘন্য অত্যাচার বা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সুরাট-বোম্বে সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর বর্বর নৃশংশ এবং মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটে খ্রীষ্টানদের উপর আক্রমণ ও নির্যাতন দেখিয়ে দেয় এদেশে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ কত অসহায়। তাদের নিরাপত্তা ও সুব্যবস্থার কোন বন্দোবস্ত নেই। আমরা এইসব সম্প্রদায়ের মানুষের উপর দমন পীড়ন বন্ধের এবং তাদের সমানাধিকারের দাবী সমর্থন করি।

xi) ভারতীয় সমাজে যুগ যুগ ধরে নারীরা নির্যাতিত। হিন্দু, মুসলিম, খ্ৰীষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ ইত্যাদি সমস্ত ধর্মীয় সম্প্রদায় ও সমস্ত জাতির মহিলারাই কমবেশি সামাজিক ও পারিবারিক নিপীড়নের শিকার এবং সেই জন্য তারা অবহেলিত এবং তাদের বিকাশও পূর্ণমাত্রায় হয়নি। আমরা নারীর স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের দাবীকে সমর্থন করি এবং সেই জন্যই নারীদের জন্য সংরক্ষণ ও বিশেষ সুযোগ- সুবিধার দাবীসমুহকে সমর্থন করি। আমরা এও মনে করি, বুর্জোয়া সমাজে চূড়ান্ত নারীমুক্তি অসম্ভব তাই বুর্জোয়া নারীবাদী আন্দোলন বা NGOদের তথাকথিত নারীবাদী আন্দোলনকে আমরা সমর্থন করি না ।

xii) ভারতীয় ছাত্র সমাজও নানাভাবে আজ নিপীড়নের শিকার। তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হ’য়েছে এক অন্যায় শিক্ষাব্যবস্থা, যার বোঝা দিন দিন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। শিক্ষাগ্রহণের জন্য ব্যয় বাড়ছে, সাধারণ মানুষ উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হ’চ্ছে। শ্রমিক ও গরীব কৃষক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যুব সমাজে বেকারী দিন দিন বেড়ে চলেছে। বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র- যুব সমাজের লড়াইকে আমরা সমর্থন করি

xiii) ভারতের বিচার ব্যবস্থা বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করে চলে। ভারতের সংবিধান হল বুর্জোয়া রাষ্ট্রীয় " রাষ্ট্রীয় শাসনের রক্ষাকবচ। 'আইনের চোখে সবাই সমান'- এই বক্তব্যের আড়ালে প্রকৃত ঘটনা হল যাবতীয় আইন ধনীদের স্বার্থরক্ষা করে চলে। আমরা বুর্জোয়া সংবিধানের পরিবর্তে শ্রমিকশ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণের স্বার্থে সংবিধান প্রনয়ন করার ও তাদের স্বার্থে আইন বিচার ব্যবস্থা ঢেলে সাজাবার পক্ষপাতী।

xiv) পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতই ভারতেও বুর্জোয়ারা দিন দিন পরিবেশকে আরও দূষিত ও কলুষিত করে চলেছে। ভারতের অরণ্য সম্পদ আজ তাদের নিষ্ঠুর লোভের শিকার। বিজ্ঞানকে আজ ভারতীয় শাসকেরা মারণাস্ত্র ব্যবহার করার কাজে ব্যবহার করছে, কিন্তু জনকল্যাণে, পরিবেশের রক্ষায় তার ব্যবহার খুবই সীমিত। পরিবেশকে ধ্বংস করার পুঁজিবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াইকে আমরা সমর্থন আমরা সমর্থন করি। এক্ষেত্রে কোথাও কোথাও বুর্জোয়া ও তাদের দালাল NGO রা এই আন্দোলনে অংশ নিয়ে বিপদগামী করতে চায়। আমরা তার বিরোধী।

xv) ভারতের শ্রমিকশ্রেণী স্বাধীনতার পর বহু ঐতিহাসিক সংগ্রামে সামিল হয়েছেন। সারা ভারতে লাগাতার ধর্মঘট হয়েছে। সরকারী দমননীতির বিরুদ্ধে বহুবার শিল্প ধর্মঘট ও সাধারণ ধর্মঘটে সামিল হয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক । যদিও বহু শ্রমিক আজও অসংগঠিত, কিন্তু বড় বড় শিল্পক্ষেত্রে সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রায়শঃই বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল, সংশোধনবাদী বা দুর্বল নেতৃত্বের জন্য তাদের সেইসব লড়াই আকাঙ্খিত সাফল্য লাভ করতে পারে নি। আমরা শ্রমিকশ্রেণীকে আরও সংগঠিত একটি লড়াকু শ্রেণী হিসাবে গড়ে তুলতে চাই, তাদের সঠিক দিশায় পরিচালিত করতে চাই।

xvi) শিল্পক্ষেত্রে ভারতীয় বুর্জোয়ারা আজ তাদের স্বাধীতা-পূর্ব বোম্বাই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করছে। ৬০এর দশকে শুরু হয়েছিল শিল্পের কেন্দ্রভবন ও রাষ্ট্রায়ত্তকরণ। কারণ মুনাফা বৃদ্ধির জন্য সেটাই ছিল বুর্জোয়াদের কাছে বিশেষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। আর আজ '৯০-এর দশকে এসে বেসরকারীকরণ- এর পলিসি নেওয়া হচ্ছে এবং বিকেন্দ্রীকরণকে পুরোমাত্রায় চালু করার চেষ্টা চলছে। এটা শুধু ভারতীয় বুর্জোয়াদের নয়, এমন কি সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়াদেরও স্বার্থসিদ্ধি করবে। কিন্তু বুর্জোয়াদের স্বার্থসিদ্ধি হলেও তা শ্রমিক, গরীব কৃষক ও মধ্যবিত্তদের অধিকাংশের দুরবস্থাকে আরও প্রকট করবে, তাদের আরও দুর্দশাগ্রস্ত করে তুলবে। গ্যাট চুক্তিতে স্বাক্ষর এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ভারতের অন্তভূক্তি ভারতকে সাম্রাজ্যবাদীদের উপর আরও নির্ভরশীল করে তুলছে, এবং এতে ভারতের সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব হওয়ার পরিবর্তে বৃদ্ধি পাবে।

xvii) স্বাধীনতা – উত্তর কাল থেকে এখন পর্যন্ত ভারতীয় বুর্জোয়াদের শাসন খুব মসৃণভাবে চলেনি। বিভিন্ন সমস্যার মোকাবিলায় ভারতীয় শাসকরা বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসবাদী পথের আশ্রয় নিয়েছে। কখনও তাদের ‘জরুরী অবস্থা' জারী করতে হয়েছে, বিভিন্ন অজুহাতে পি.ডি.অ্যাক্ট, এসমা, নাসা, টাডা ইত্যাদি কালাকানুন লাগু করতে হয়েছে গণবিক্ষোভকে প্রশমিত করার লক্ষ্যে। নাগা, মিজো, কাশ্মীরি জনগণের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে শাসকশ্রেণী দমনপীড়নের সাহায্যে অবদমিত করতে চেয়েছে। শ্রমিক সংগ্রাম ও ট্রেড ইউনিয়ন লড়াই, কৃষক সংগ্রাম, ছাত্র-যুব সংগ্রাম, জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম প্রভৃতির উপরে নেমে এসেছে বর্বর আক্রমণ। কোথাও বা প্রলোভনের সাহায্যে আন্দোলনকে বশ করার চেষ্টা হয়েছে। নিজেদের শ্রেণী শাসন ও একাধিপত্যকে বজায় রাখতে বুর্জোয়ারা ভিন্ন ভিন্ন পন্থা ও পদ্ধতির সাহায্য নিয়েছে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যারা স্বাধীনভাবে লড়াই করেছে ও করছে, সেই সমস্ত উদ্যোগকেই আমরা সমর্থন করি। কিন্তু যেখানে তা সাম্রাজ্যবাদী বা পুঁজিপতিদেরই সহায়তায় মেকী লড়াই - এ পর্যবসিত হয় ও দিকভ্রান্ত হয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তখন আমরা তার বিরোধিতা করি।

xviii) বুর্জোয়াদের বড় বড় দাবী সত্ত্বেও ভারতীয় গণতন্ত্রের দুর্বলতা প্রকট হয়ে পড়েছে। এই দুর্বলতার সুযোগে আর.এস.এস, শিবসেনা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বি.জে.পি প্রভৃতি ফ্যাসীবাদী দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা ভারতের পার্লামেন্টারী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে এক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা কায়েম করতে উদ্যত হয়েছে। এই শক্তি ভারতের শ্রমিকশ্রেণী ও নিপীড়িত মানুষের কাছে ভয়ঙ্কর এক বিপদ যা তীব্র শ্রমিক বিদ্বেষ (তথা কমিউনিস্ট বিদ্বেষ) ও মুসলিম বিদ্বেষকে সম্বল করে বেড়ে উঠেছে। বর্তমানে তা খ্রীষ্টান বিদ্বেষকে আকড়ে ধরেছে। এই ঘটনা দেখায় যে ভারত শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন নয়। বরং রাজনৈতিক ও কাঠামোগত গুরুতর সংকটের সম্মুখীন। তাই অদূর ভবিষ্যতে ভারতে একটি ফ্যাসিবাদী রাজ কায়েমের সম্ভাবনা প্রবল। এটা মনে রাখা আবশ্যক যে আমরা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে এই কারণেই পছন্দ করি (বা তা আমাদের কাছে অধিকতর কাম্য) যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের শাসনে আমরা, আমাদের মতামত প্রচার করার, জনগণকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সংগঠিত করার বেশী সুযোগ পাই। কিন্তু ফ্যাসিবাদ (বা স্বৈরতন্ত্রের কোন রূপ) কায়েম হলেও আমাদের লক্ষ্য ও শ্লোগান বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা থাকে না, বরং আমাদের তখনও উদ্দেশ্য ও শ্লোগান থাকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। ফ্যাসীবাদ থাকা বা না থাকায় বুর্জোয়া শ্রেণী শাসনের কোন পরিবর্তন হয় না ।

xix) সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসী ও স্তালিনবাদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে, ভারতে একটি প্রকৃত বিপ্লবী শক্তি অনুপস্থিত; শ্ৰেণী সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে শ্রেণী ঐক্যও গড়ে ওঠেনি। শ্রমিকশ্রেণী আজও অপ্রস্তুত ও বিভক্ত। বিভিন্ন নিপীড়িত শ্রেণীর লড়াইগুলি দিশাহীন হয়ে পড়ছে। এই লড়াইগুলিকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে, বুর্জোয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত করতে একটি কমিউনিস্ট সংগঠন আবশ্যক। ভারতের তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলি (সি.পি.আই. সি.পি.আই.এম. প্রভৃতি) এ দায়িত্ব বহুদিন আগেই বর্জন করেছে। তারা জনগণকে বিপথগামী করছে এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সম্বন্ধে মোহগ্রস্ত করে তুলছে। মাওবাদী নকশালপন্থী শক্তিগুলিও হয় দক্ষিণপন্থী নয়তো বা অতিবাম বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং তাদের তাৎপর্য হারিয়েছে। শ্রমিকশ্রেণী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা মাথাচাড়া দিচ্ছে। এর ফলে একদিক যেমন ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে প্রকৃত কমিউনিস্ট শক্তিগুলির সমাজতন্ত্রের ধ্যানধারণা প্রচারের এই হল আদর্শ সময়। এই হল সময় যখন শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণকে সঠিক দিশায় অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ করা যায় এবং তাদেরকে সঠিক লক্ষ্যে পরিচালিত করা যায় ৷ একমাত্র প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বে সমস্ত নিপীড়িত শ্রেণী ও স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, ট্রেড ইউনিয়ন ও গণসংগঠনগুলিকে নতুন রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ করে, পার্লামেন্টারী ও পার্লামেন্ট বর্হিভূত সংগ্রামের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে, গণসংগঠন ও গণআন্দোলনের বিকাশ ঘটিয়ে এবং সোভিয়েত গড়ে তুলে, ও সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করেই ভারতবর্ষকে সাম্রাজ্যবাদ ও তার বশংবদ পুঁজিপতিদের করল থেকে মুক্ত করে সেখানে সর্বহারা একনায়কত্ব কায়েম করা সম্ভব। এবং এ কাজে অবশ্যই আন্তজার্তিক শ্রমিকশ্রেণীর সাহায্য ও সহযোগিতা একান্ত জরুরী।

xx) এর জন্য আমাদের সমস্তরকম সংস্কারবাদ, সুবিধাবাদ ও সংকীর্ণতাবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে। যে কোন লাইন যা পার্লামেন্টবাদ; ট্রেড ইউনিয়নবাদ, অর্থনীতিবাদ, যে কোন যুক্তিতে বুর্জোয়াদের সাথে ঐক্যের পক্ষে বাংবুর্জোয়া সরকারে যোগদানের পক্ষপাতী, অথবা, সর্বহারা একনায়কত্বের ধারণার বিরোধী এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্রের পক্ষে ওকালতি করেন। সে সব লাইনকেই নির্দ্বিধায় পরিত্যাগ করতে হবে। আমাদের (মার্কস-এঙ্গেলস প্রণীত), মার্কসবাদ দের প্রথ হল কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো' লেনিনবাদ, তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম চারটি কংগ্রেসের কর্মসূচী, উত্তরণশীল কর্মসূচী (ট্রটস্কি প্রণীত এবং চতুর্থ কমিউনিস্ট আন্তর্জার্তিক কর্তৃক গৃহীত) এবং তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা লাইনের উপর দাঁড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালানো এবং এর মাধ্যমে আমাদের আশু লক্ষ্য অর্জন করা এবং তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা লাইনের উপর দাঁড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালানো এবং এর মাধ্যমে আমাদের আশু লক্ষ্য অর্জন করা এবং চুড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়া, শ্রমিকশ্রেণীর পিছনে গরীব কৃষক ও বিপ্লবী পেটি বুর্জোয়াদের সংগঠিত করে। বিপ্লবী সোভিয়েত গঠনের মাধ্যমেই কেবল শ্রমিকশ্রেণী তার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এবং ভারতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অসমাপ্ত কাজ প্রলেতারিয়েত কর্তৃক ক্ষমতা দখলের পরই তার সহযোগীদের সাহায্যে সম্পন্ন হতে পারে। এটাই হল নিরন্তর বিপ্লবের পথ যেখানে ভারতের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক দুই পৃথক বিপ্লবের পৃথক অস্তীত্বের সম্ভাবনা নাকছ হয়।

৩) বিপ্লবের কর্মসূচী :

i) যে কোন কমিউনিস্ট সংগঠনের রণনীতিগত কার্যক্রম ধনতন্ত্রের সংস্কার নয়, বরং তার উচ্ছেদ। তাদের লক্ষ্য থাকা উচিত বুর্জোয়া একনায়কত্ব ধ্বংস করে শ্রমিক একনায়কত্ব প্রচলন করা। কিন্তু এই রণনীতিগত কার্যক্রম সফল করে তুলতে চাই সঠিক রণকৌশল প্রয়োগ করা। এমনকি প্রতিটি খুঁটিনাটি এবং আংশিক বিষয়েও সঠিক কৌশল গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। সমাজতন্ত্রের জন্য তার কর্মসূচী হওয়া উচিত মূলতঃ কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম চারটি কংগ্রেস এবং উত্তরণশীল কর্মসূচীর দিশায় ।

ii) ভারতবর্ষ একটি অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশ, যা সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত দুনিয়ার এক অংশ বিশেষ। এর বিকাশের এক দ্বৈত চরিত্র রয়েছে। সর্বাপেক্ষা আদিম অর্থনৈতিক পন্থাগুলি পুঁজিবাদী সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে আছে। তাই এখানে খুব ক্ষুদ্র একটা সাফল্যের জন্য লড়াই বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। গণতান্ত্রিক দাবীসমূহ, উত্তরণশীল দাবীসমূহ এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সমস্যা এখানে আলাদা আলাদা ঐতিহাসিক পর্যায়ে বিভক্ত নয়। বরং তারা একে অপরের সঙ্গে সংমিশ্রিত, পরস্পরের সাথে যুক্ত।

iii) বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের পতাকাতলে গণজমায়েতের একটা বিশেষ নির্দিষ্ট পর্যায়ে সোভিয়েতগুলি গড়ে উঠবে। তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা নির্ভর করবে সেই পর্যায়ে প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক সচেতনতার মাত্রার উপর, তাদের সাথে গরীব কৃষকের ঐক্যের মাত্রার উপর এবং প্রলেতারীয় পার্টির পলিসির চরিত্রের উপর। এই সোভিয়েতগুলিই বুর্জোয়াদের রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেবে, এবং একমাত্র তারাই পারে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অধীনে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পূর্ণ করতে।

iv) আমাদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে আশু কর্তব্য এবং উত্তরণশীল কর্মসূচীর মূল দাবীসমূহ ও কার্যক্রম হল নিম্নরূপ :

১) বিনা ক্ষতিপূরণে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অধিগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয়করণ ও সেখানে শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

২) সমস্ত বৈদেশিক ঋণ (সাম্রাজ্যবাদী ঋণ) নাকচ করা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের রাষ্ট্র কর্তৃক একচেটিয়াকরণ।

সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান শিল্প, ব্যাঙ্ক ইত্যাদি এবং বন্ধ-কলকারখানার জাতীয়করণ ও সেখানে শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ চালু করা এবং বিনা ক্ষতিপূরণে জাতীয় বুর্জোয়াদের শিল্পসম্পদের জাতীয়করণ।

৪) মৌলিক পণ্যের বিশেষত ভোগ্যপণ্যের ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণে ব্যবসা বন্ধ করা, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যমান সুনির্দিষ্টকরণ ও মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা। ৫) প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের সংস্থাসমূহের স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে ও পরিচালন ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের অপসারণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকীকরণ এবং সেখানেও শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

৬) শ্রমিকশ্রেণীর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে একটি পরিকল্পিত অর্থনীতি চালু করা ও মুদ্রাস্ফীতি দূর করা।

৭) শ্রম সময় হ্রাস করা মারফৎ এবং গণতান্ত্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ মারফৎ সকলের জন্য চাকুরীর গ্যারান্টি সৃষ্টি করা ও বেকারী দূর করা এবং তা না হওয়া পর্যন্ত বেকার ভাতা চালু করা।

৮) কারখানা ভিত্তিতে এক কারখানায় একটি গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠিত ইউনিয়ন গঠন, শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে আন্দোলন করার, ধর্মঘট করার অধিকারের স্বীকৃতি ও সেইসঙ্গে কারখানায় লক-আউট, ক্লোজার, ছাটাই বে-আইনী ঘোষণা করা । ৯) মজুরীর পুনর্গঠন এবং একটি সুষম নীতি গ্রহণ করা, প্রচলিত বেতন কাঠামো ও কর কাঠামোরর ব্যাপক পুনর্বিন্যাস করা যাতে শ্রমিকশ্রেণী, গরীব কৃষক ও নিম্ন মধ্যবিত্তের স্বার্থ রক্ষিত হয়।

১০) কৃষি বিপ্লব সম্পন্ন করা, করা, বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদার ও ধনীকৃষকদের জমি অধিগ্রহণ ও বাজেয়াপ্তকরণ, জমির চাষীর মধ্যে সুষম বন্টন। রাষ্ট্রীয় সহায়তার জরির যৌথকরণ ও গ্রামিন প্রলেতারিয়েত ও গরীব চাষির দ্বারা তার নিয়ন্ত্রণ চালু করা অথবা গরীব চাষীদের মধ্যে পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী বন্টন ১১) গরীব কৃষকের উপর বর্তমান বকেয়া কৃষি ঋণ মকুব করা এবং শ্রমের বিনিময়ে তাদের আগাম প্রয়োজনীয় কৃষি সরঞ্জাম, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা ও জলসেচ ও বিদ্যুৎ ইত্যাদির সুলভ ও সুবন্দোবস্ত করা।

১২) বুর্জোয়া সংবিধান বাতিল করা, শ্রমিক শ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণের সাথে নতুন আইন প্রণয়ন ও বিচার ব্যবসার সংস্কার করা এবং তৎসহ সকলের জন্য সমান আইন (uniform civil code) চালু করা (জাতিভেদ, ধর্মভেদ, বর্ণভেদ, লিঙ্গভেদ ব্যাতিরেকে)।

১৩) জনগণের মৌলিক অধিকার যথা বেঁচে থাকার, শিক্ষা পাওয়ার, চিকিৎসা পাওয়ার, কাজ করার, মত প্রকাশের অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা ও সরকারী কর্মচারীসহ প্রত্যেকের রাজনীতি করার অধিকারের স্বীকৃতি।

১৪) জনগণের ‘ও গণ আন্দোলনের উপর অত্যাচারকারী সমস্ত পুলিশ, মিলিটারি ইত্যাদির বিচার ও শাস্তিপ্রদান এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, সরকারী আমলা ও কর্মচারীদের বিচার ও শাস্তিপ্রদান করা। অত্যাচারকারী বুর্জোয়া, জমিদার, ধনী কৃষক ইত্যাদিকে শাস্তি দান।

১৫) সকলের জন্য সুষ্ঠ ও সুলভ আবাসনের বন্দোবস্ত করা, পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার ও সেক্ষেত্রেও সুলভ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রণয়ন, কারা ব্যবস্থার সংস্কার করা।

১৬) চিকিৎসা ব্যবস্থার, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির সংস্কার সাধন, নতুন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্মাণ এবং জনগণের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত করা।

১৭) জনস্ফীতি রোধে দমনমূলক পদ্ধতির অবসান। এক্ষেত্রে প্রচার ও শিক্ষা দান আবশ্যিক ।

১৮) প্রতিটি নিপীড়িত জাতি ও জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (বিচ্ছিন্নতার অধিকার সহ) - এর স্বীকৃতি।

১৯) সমস্ত স্থানীয় ভাষার বিকাশ ঘটানো, হিন্দিসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষার রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি, কিন্তু জোর করে কোন ভাষা চালানোর বিরোধিতা করা। পাশাপাশি প্রয়োজন মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান ও সমস্ত বিদ্যালয়ের সরকারীকরণ।

২০) জাতিভেদ, বর্ণভেদ প্রথার বিলোপ সাধন এবং বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত নিম্ন বর্ণের মানুষদের ও দলিতদের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সামাজিক সংরক্ষণের অধিকার (সার্বজনীনতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত) স্বীকার করা। ২১) ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারকে সুনিশ্চিত করা এবং তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সমান সুযোগ দেওয়া। দেশে একটি ধর্ম-নিরপেক্ষ পরিবেশ সৃষ্টি, প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম, চর্চার অধিকারের স্বীকৃতি, কিন্তু সার্বজনীন ধর্মাচরণের (On public Spheres) বিরোধিতা করা।

২২) নারী, পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সর্বক্ষেত্রে এই বৈষম্য দূর করা এবং স্বাধীনতা ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত নারীদের জন্য সংরক্ষণের স্বীকৃতি তি (সার্বজনীনতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত এবং এই সংরক্ষণ, সংরক্ষণের আওতাভুক্ত জাতিগুলির মধ্যেও সমহারে প্রযোজ্য)।

২৩) নারীদের মাতৃত্বের ও অন্যান্য বিশেষ অধিকারের স্বীকৃতি। তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ পাওয়ার এবং চাকুরী না পাওয়া পর্যন্ত বিচ্ছেদ হওয়া মহিলাদের ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার এবং তাদের দেহের উপর সম্পূর্ণ অধিকারের সুরক্ষা।

২৪) বাল্যশ্রমের উচ্ছেদ, শিশুদের ও বালক-বালিকাদের জন্য ক্রেশে স্থাপন, বৃদ্ধাশ্রম চালু করা, বৃদ্ধদের জন্য পেনসন প্রকল্প চালু করা পঙ্গু ও মানসিক রোগগ্রস্থদের জন্য সুস্থ পরিবেশে জীবনযাপনের বন্দোবস্ত করা।

২৫) বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবলুপ্তি, সেগুলির সরকারীকরণ এবং শিক্ষাব্যবস্থার ও পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, একটি গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। বিনা মূল্যে সকলের একটি নির্দিষ্ট মান পর্যন্ত শিক্ষা পাওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি।

২৬) পরিবেশ দূষণ রোধ করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বনসৃজন, বনসংরক্ষণ ও বন্য পশু সংরক্ষণ করা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে জনস্বার্থে ব্যবহার করা ।

২৭) গ্রামোন্নয়ন করা। গ্রামীণ বৈদ্যুতিকীকরণ সম্পূর্ণ করা, গ্রামীণ পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ। শহরের সম্প্রসারণ করা ও পৌর সমস্যার সমাধান করা।

২৮) স্থায়ী সৈন্য বাহিনীর বিলোপ সাধন। গণ-মিলিশিয়া সৃষ্টি।

২৯) শ্রমিকশ্রেণী, গরীব কৃষক, দলিত ও অবহেলিত, নির্যাতিতদের একটি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচীতে সংঘবদ্ধ করে একটি সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ পুঁজিবাদী শাসনের অবসান, বুর্জোয়া একনায়কত্বের অবসান, 'সোভিয়েত রাজ প্রতিষ্ঠা, সর্বহারা একনায়কত্বের প্রতিষ্ঠা।

৩০) আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিকশ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণের সাথে মজবুত সংহতি গড়ে তোলা। সারা দুনিয়া ব্যাপী সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াই গড়ে তোলা।

কমিউনিস্ট লীগের সংবিধান

১ নং ধারা : নাম : সংগঠনের নাম কমিউনিস্ট লীগ। সংক্ষেপে সি.এল

২ নং ধারা : পতাকা এবং সীল : পতাকার রং হবে লাল । পতাকায় মুদ্রিত থাকবে কাস্তে-হাতুড়ি চিহ্ন। এবং তাদের উপর থাকবে ইংরেজী (4) অক্ষরটি। পতাকায় যেরকম প্রতীক চিহ্ন থাকবে সীলেও তাই থাকবে এবং তাতে তৎসহ থাকবে সংগঠনের নামের আদ্যাক্ষর (সংক্ষিপ্তরূপে)।

৩ নং ধারা : লক্ষ্য : সংগঠন হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রণী অংশের সংগঠন, যা শহুরে এবং গ্রামীণ প্রলেতারিয়েতের উপর বিশেষ জোর দেবে, সংগঠনের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে ভারতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত করা এবং তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বব্যাপী সাম্যবাদী সমাজ অর্জন করা।

৪ নং ধারা : পথনির্দেশক নীতিসমূহ : (i) সংগঠন মার্কস-এঙ্গেলস, লেনিন, ট্রটস্কী এবং লুক্সেমবুর্গের দৃষ্টিভঙ্গীতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের চিরায়ত আন্তর্জাতিকের প্রথম চারটি কংগ্রেসের দলিল, উত্তরণকালীন কর্মসূচী (Transitional Programme) ( ট্রটস্কী কর্তৃক লিখিত এবং চতুর্থ কমিউনিস্ট আন্তজার্তিকের প্রতিষ্ঠা কংগ্রেসে গৃহীত) এবং এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় যে সব তাত্ত্বিক অবদান ও উন্নয়ন ঘটেছে তার দ্বারা পরিচালিত হবে। (ii) চতুর্থ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক যে রাজনীতি প্রচার করেছিল তা সংগঠন মেনে চলবে এবং বিশ্বব্যাপী চতুর্থ আন্তর্জাতিককে গড়ে তুলতে চলমান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে।

৫ নং ধারা : কর্মবিধি (code of conduct) (i) বিভিন্ন অবশ্যপালনীয় অনুবিধির মাধ্যমে সংগঠনের যে কার্যবিধি আছে তাকে অবশ্যই মান্য করতে হবে। এই বিধির কোন লঙ্ঘন হলে কার্য্যকরী কমিটি তার বিচার করে রায় দেবে এবং সিদ্ধান্তগুলিকে কার্যে পরিণত করবে। (ii) চূড়ান্ত শৃঙ্খলাভঙ্গের ক্ষেত্রে বা মৌলিক আদর্শগত বিচ্যুতির ক্ষেত্রে একজন সদস্যকে চার্জশীট দেওয়া হতে পারে অথবা শো কজ করা হতে পারে। যদি কোন উত্তর না পাওয়া যায়, অথবা উত্তর যদি সন্তোষজনক না হয় তবে তাকে তার কমিটি (যার অধীনে সে কাজ করে) সাসপেণ্ড করতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই নেবে কার্য্যকরী কমিটি বা কেন্দ্রীয় সম্মেলন। (iii) মৌলিক ও গুরুতর আদর্শগত বিচ্যুতির ঘটনায় অথবা রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার ক্ষেত্রে কিংবা ঐ ধরনের কোন লজ্জাজনক কাজের ক্ষেত্রে কোন সদস্যকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। একমাত্র কার্য্যকরী কমিটি বা কেন্দ্রীয় সম্মেলনই তা করতে পারে। যদি কার্য্যকরী কমিটি এই ধরণের কোন সিদ্ধান্ত নেয় তবে সেই সদস্য সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরবর্তী কেন্দ্রীয় সম্মেলনে আপিল করতে পারে।

৬ নং ধারা : সাংগঠনিক নীতিসমূহ : (i) সংগঠনের মৌলিক রাজনৈতিক নীতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা। এর মানে হচ্ছে এর সদস্যদের অভিজ্ঞতা ও বোঝাপড়ার সর্ব্বোচ্চ কেন্দ্রিকতা যাতে ব্যক্তিগত চেতনার যোগফল থেকেও সংগঠনের চেতনা অনেক বেশি হয়। এর জন্য প্রয়োজন সর্ব্বোচ্চ পরিমাণ আভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক গণতন্ত্র যা সংগঠনের শৃঙ্খলার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। যে কোন বাস্তব কাজে অংশগ্রহণের জন্য আমাদের চাই ঐক্যবদ্ধ, দৃঢ়সংবদ্ধ সংগঠন যা শৃঙ্খলা ছাড়া সম্ভব নয়। (ii) ব্যাপক আলাপ-আলোচনার পর সৰ্ব্বসম্মতিতে অথবা যদি প্রয়োজন হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের সাথে দ্বিমত থাকবে তারা তার বিরোধিতা করতে পারে (এমনকি প্রকাশ্যে) কিন্তু একই সময়ে সংগঠনের সিদ্ধান্ত রূপায়ণ করতে তারা বাধ্য থাকবে। (iii) সংখ্যালঘিষ্ঠের অধিকারের পরিপূর্ণ রক্ষাকবচ ছাড়া কোন অর্থবহ গণতন্ত্র থাকতে পারে না। সেগুলো হবে এরকম

ক) সংখ্যালঘুদের, সংগঠনের যে কোন সদস্যকে তাদের মতামত জানাবার অবশ্যই অধিকার থাকবে। তার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী কোন ব্যক্তি বা কমিটির কোন প্রাক্ অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সংখ্যালঘুরা এমনকি সংগঠনের বাইরেও তাদের রাজনৈতিক মতামত জানাতে পারবে। তারা তাদের রাজনৈতিক মতামতকে প্রচার করতে পারে।

খ) সংখ্যালঘুরা তাদের মতামতের ভিত্তিতে সাময়িক চরিত্রের গোষ্ঠী বা ধারা গঠন করতে পারে। সংগঠনের শৃঙ্খলা মেনে সংগঠনের অভ্যন্তরে গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করার স্বাধীনতা তাদের থাকবে।

গ) ধারা এবং গোষ্ঠীসমূহের কার্য্যকরী কমিটিকে তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সর্বদা অবহিত করানোর দায়িত্ব থাকছে। বিপরীতে কার্যকরী কমিটিও সাধারণ সদস্যদের তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত করবে।

ঘ) ধারা এবং গোষ্ঠীসমূহ স্বাভাবিক নিয়মেই সংগঠনের নেতৃত্বদায়ী কমিটিগুলিতে তাদের সাংগঠনিক সংখ্যাগত শক্তির ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব পাবে (যতটা নিঁখুতভাবে সম্ভব)।

৭ নং ধারা : সাংগঠনিক কাঠামো ব্যাপক সন্ত্রাস, বুর্জোয়া মিলিটারী শাসন অথবা ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে যখন গুপ্তভাবে কাজকর্ম প্রয়োজন অথবা একই ধরণের পরিস্থিতিতে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে গেছে যখন রাজনৈতিকভাবে এবং প্রয়োগগতভাবে যেভাবে এখানে নীচে বর্ণনা করা হয়েছে সেভাবে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে তখনকার পরিস্থিতি বাদ দিয়ে নিম্নলিখিতভাবে সংগঠনের কাঠামো গড়ে উঠবে : (i) একেবারে তলাকার নিম্নতম সাংগঠনিক ইউনিট হবে লোকাল কমিটি। এই কমিটি তৈরী হবে পূর্ণ এবং প্রার্থী সদস্যদের নিয়ে। ভৌগোলিকভাবে নির্দিষ্ট অঞ্চলে লোকাল কমিটি কাজ করবে। লোকাল কমিটি তার দায়িত্বকে ভাগ করে দিতে পারে এবং সাব কমিটি তৈরী করতে পারে। অ্যাকটিভিস্ট গ্রুপগুলির' নবাগতদের নিয়ে প্রয়োজনে এই কমিটি হতে পারে। (ii) লোকাল কমিটি, শহর কমিটি বা জেলা কমিটির শাখা হবে, এগুলো সবই হচ্ছে ভৌগোলিক ইউনিট। সংগঠনের যে পিরামিড সদৃশ কাঠামো, যা কিনা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং তা কার্যে পরিণত করে;তাকে যদি কেন্দ্রীভূত করতে হয় তবে লোকাল কমিটিগুলি থেকে প্রতিনিধি সদৃশ কাঠামো, যা কিনা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং তা কার্যে পরিণত করে; তাকে যদি কেন্দ্রীভূত করতে হয় তবে লোকাল কমিটিগুলি থেকে প্রতিনিধি নিয়ে তার উচ্চতম কমিটিগুলিকে তৈরী করতে হবে (যদি প্রয়োজন অনুভূত হয় তবে জেলা কমিটি বা রাজ্য কমিটির অধীনে ফ্যাক্টরিতে পার্টি সেল গড়তে হবে ) (iii) শহর কমিটি বা জেলা কমিটির উপরে থাকবে জোনাল কমিটি বা রাজ্য কমিটি। জোনাল কমিটি তখনই কাজ করবে (ক) যদি কোন একটি রাজ্যের সদস্যসংখ্যা এত কম হয় যে আলাদা প্রতিনিধিত্ব অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে খ) যখন কিছু প্রতিবেশী রাজ্য তাদের কাজকর্মের সুবিধার্থে কাজের সমন্বয় করতে রাজ্যোত্তর জোনাল কমিটি গড়ে তোলাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে। (iv) রাজ্য কমিটি পর্যন্ত উচ্চতর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও সমন্বয়কারী সমস্ত কমিটির সমস্ত প্রতিনিধিকে . একেবারে নীচুতলার লোকাল কমিটিগুলি থেকে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। যে কোন প্রতিনিধিকে প্রত্যাহার করে নিতে চাইলে যথাযোগ্য কমিটি আহ্বান করার মাধ্যমে তা করা যেতে পারে। (v) সম্মেলনের ”মধ্য দিয়ে কার্য্যকরী কমিটি গঠিত হবে। কার্য্যকরী কমিটি নতুন সদস্যদের পরিবর্ত (alternate) সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু তাকে তা পরবর্তী সম্মেলনে অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। দুটো কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্যে কার্য্যকরী কমিটিই হবে সর্ব্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। (vi) কেন্দ্রীয় সম্মেলন এবং অন্যান্য সম্মেলন (যেমন রাজ্য, জেলা এবং স্থানীয় সম্মেলনগুলি) দুবছরে একবার করে অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে। স্বাভাবিক অবস্থার ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। বিশেষ প্রয়োজন অনুভূত হলে কার্য্যকরী কমিটি দুটো সম্মেলনের মাঝে বিশেষ সম্মেলন ডাকতে পারে অথবা সদস্যদের এক তৃতীয়াংশের বেশি যদি তা ডাকতে চায় তাহলেও তা ডাকা যেতে পারে। কার্য্যকরী কমিটি যখন প্রয়োজন মনে করবে বর্দ্ধিত প্লেনামও ডাকতে পারে। (vii) কেন্দ্রীয় সম্মেলনই হচ্ছে সর্ব্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। একটা সমরূপ এবং গৃহীত আনুপাতিক হারে সদস্যদের মধ্যে থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত করে রাজ্য সম্মেলন কেন্দ্রীয় সম্মেলনে তাদের পাঠাবে। একই পদ্ধতিতে স্থানীয় সম্মেলনগুলি জেলা সম্মেলনে এবং জেলা সম্মেলন রাজ্য সম্মেলনে তাদের প্রতিনিধি পাঠাবে। (viii) যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যে কোন কমিটি মিটিং-এ ৫০ শতাংশ সদস্য উপস্থিত না থাকলে কোরাম হবে না এবং তা বৈধ বলে স্বীকৃত হবে না। (ix) সংগঠনের কেন্দ্রীয় মুখপত্রসমূহ কার্য্যকরী কমিটির পরিচালনায় প্রকাশিত হবে। সম্পাদকীয় বোর্ডগুলো কেন্দ্রীয় সম্মেলনে নির্বাচিত করা যেতে পারে, অথবা বিশেষ ক্ষেত্রে কার্য্যকরী কমিটি কর্তৃক মনোনীত বা গ্রহণ করা যেতে পারে। স্থানীয় কমিটিগুলো বিভিন্ন স্থানীয় ভাষায় মুখপত্র প্রকাশ করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে এবং তাদেরও সম্পাদকীয় বোর্ডগুলো একই পদ্ধতিতে গঠিত হতে পারে। অর্থাৎ, স্থানীয় সম্মেলনে তারা নির্বাচিত হতে পারে বা স্থানীয় কমিটি কর্তৃক তাদের মনোনীত বা গ্রহণ করা হতে পারে। (x) কার্য্যকরী কমিটি তার সম্পাদক, হিসাবরক্ষক এবং আহ্বায়ককে নির্বাচন বা মনোনয়ন করতে পারে, যদি প্রয়োজন বোধ করে তবে কার্য্যকরী কমিটি একটি কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েট নির্বাচিত বা মনোনীত করতে পারে। এদেরকে কেন্দ্রীয় সম্মেলনেও নির্বাচিত করা যেতে পারে। অন্যান্য ইউনিটগুলো একইভাবে কাজে চালাতে পারে। (xi) সংগঠনের সম্পাদক হিসেবে যাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে, অফিস সম্পাদক হিসেবে এবং সংগঠনের মুখপত্র হিসেবে কাজ করা ছাড়া তার অতিরিক্ত কোন ক্ষমতা থাকবে না। (xii) যদি সংগঠনের কোন সদস্য বা সদস্যসমূহের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোন তদন্ত সংগঠনের ভিতরে চালাতে হয় তবে কার্য্যকরী কমিটি তার কর্তৃত্বের জায়গা থেকে একটি সাময়িক চরিত্রের তদনত টীম বা কমিশন তৈরী করতে পারে। এই কমিশনের তদস্ত চালানোর অধিকার বা ক্ষমতা থাকবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে তারা তাদের রিপোর্ট কার্যকরী কমিটিকে জমা দেবে।

৮ নং ধারা : সদস্য পদ : (i) সদস্যপদের যোগ্যতা হচ্ছে ক) সংগঠনের মৌলিক কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে খ) সংগঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে যোগ দিতে হবে গ) মাসিক চাঁদা দিতে হবে। ঘ) সমস্ত সদস্যকে কোন না কোন কমিটিতে যুক্ত থাকতে হবে।

(ii) দু ধরণের সদস্যপদ সংগঠনে থাকবে পূর্ণ সদস্য এবং প্রার্থী সদস্য। প্রার্থী সদস্যরা ছয় মাসের একটা পর্যায়ের পর পূর্ণ সদস্য হবে। বিশেষ আরো ছমাস পর্যায়ের জন্য প্রার্থী সদস্যপদ বাড়ানো যেতে পারে। (iii) সমস্ত নতুন সদস্যরা শুরুতে প্রার্থী সদস্য থাকবে। কার্য্যকরী কমিটি কেবল মাত্র বিশেষ ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে ছাড় দিতে পারে। একজন ইচ্ছুক প্রার্থীকে তার নিজ কমিটি, কার্য্যকরী কমিটির আগাম অনুমোদন ছাড়া সদস্যপদ দিতে পারে। (v) একজন পূর্ণ সদস্যের যা অধিকার আচে, প্রার্থী সদস্যেরও তা থাকবে। কেবলমাত্র তার ভোটাধিকার এবং উচ্চতর কমিটিতে নির্বাচিত হবার অধিকার থাকবে না।

৯ নং ধারা : অর্থ সংক্রান্ত বিষয় : (i) প্রত্যেক সদস্যের মাসিক চাঁদা হবে ন্যূনতম ২ টাকা। (ii) কোন নির্দিষ্ট প্রয়োজনে কার্য্যকরী কমিটি সদস্যদের কাছ থেকে কখনো কখনো অতিরিক্ত লেভি আদায় করতে পারবে। তার সেই অধিকার থাকবে। (iii) সমস্ত স্থানীয় কমিটিগুলি তাদের আদায়ীকৃত অর্থের ২৫ শতাংশ তাদের উচ্চতর কমিটিকে দিতে বাধ্য থাকবে।

সূচি

  • ট্রটস্কীবাদী আন্দোলনের পতাকাকে উর্দ্ধে তুলে ধরুন
  • বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও তার দিশা
  • জাতীয় পরিস্থিতি
  • কমিউনিস্ট লীগ-এর কর্মসূচী
  • কমিউনিস্ট লীগের সংবিধান