header

🄯 Made by devolskii

logo

[নির্বাচনী বুলেটিন] বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬

এপ্রিল ২০২৬


[নির্বাচনী বুলেটিন] বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে পরাস্ত কর, পরাস্ত কর বুর্জোয়া দল কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসকে। সর্বত্র বাম প্রার্থীদের জয়ী কর।

আগমী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দু'দফায় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে। এক অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে হচ্ছে এবারের এই নির্বাচন। SIR-এর নাম করে NRC করবার যে প্রয়াস কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিয়েছে তার প্রক্রিয়া এখনো পশ্চিমবঙ্গে চলেছে। ইতিমধ্যে ৯১ লক্ষ লোকের নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ পড়েছে। আরো প্রায় ২৭ লক্ষ লোকের নাম ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটির বেশি লোকের নাম যে নতুন ভোটার লিস্টে থাকবে না তা প্রায় চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়। যদিও বলা হচ্ছে মৃত বা অন্যান্য অযোগ্য ভোটারদের নাম লিস্ট থেকে বাদ গেছে তা পুরোপুরি ঠিক না। প্রচুর যোগ্য প্রার্থীর নাম এই ভোটার লিস্টে যে নেই তা বিভিন্নভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আর লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে যা চলছে তা তো অভূতপূর্ব ঘটনা। যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেবার জন্য নির্বাচন কমিশনের এ এক দুর্দান্ত কারচুপির পরিকল্পনা তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আর ভোটারদের নাম কাটবার কোপটা কাদের উপর মূলতঃ পড়ছে? সংখ্যালঘু মুসলিম, মহিলা, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা, আদিবাসী এবং সমস্ত ধরনের গরীব মানুষের। অর্থাৎ যাদের বিজেপিকে ভোট দেবার সম্ভাবনা একেবারেই কম, তাদেরই নাম নির্বাচন কমিশন কেটে দেবার জন্য এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির বাহানা হাজির করেছে। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির যেহেতু জিতবার কোন সম্ভাবনাই নেই তাই তাকে জোর করে জেতাতে নির্বাচন কমিশন এই পরিকল্পনা করে মাঠে নেমেছে। সুতরাং এক অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে যে পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচন হতে চলেছে তা পরিষ্কার। আর এই কারণেই এই নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে পরাস্ত করতেই হবে। ভোটে জেতবার জন্য যারা ভোটারদের নাম কেটে দিয়ে ভোটে জিততে চায় তাদেরকে কোনভাবেই ভোটে জিততে দেওয়া চলতে পারে না। আর শুধু তো ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে দেওয়াই নয়, যে সংখ্যায় আধা সামরিক বাহিনীকে এবার পশ্চিমবঙ্গে ভোটে নামানো হয়েছে তাও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। যেন পশ্চিমবঙ্গ একটা যুদ্ধক্ষেত্র। এর পিছনে যে বিজেপি সরকারের কোন অশুভ উদ্দেশ্য কাজ করছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তৃতীয়তঃ যেভাবে বিভিন্ন সরকারী আধিকারিকদের নির্বিচারে বদলি করা হচ্ছে তাও আজ পর্যন্ত কোনদিন হয়নি। এসবের পিছনে যে ফ্যাসিবাদীদের কোন গোপন পরিকল্পনা কাজ করছে তাতে সন্দেহ কি !

আসন্ন নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে পরাস্ত কর

আসন্ন নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে পরাস্ত করতেই হবে। আগেই আমরা বলেছি বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে নির্বাচন জিততে চাইছে, যেহেতু গতবারের নির্বাচনে তাদের সাথে তৃণমূলের ভোটের ব্যবধান ছিল ৬০লক্ষ, তাই যেন তেন প্রকারে ওই সংখ্যার সম্ভাব্য তৃণমূল ভোটারের নাম কেটে তারা এই ভোটে জিততে চাইছে। সুতরাং এটাকে বিরোধিতা করতেই হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাপারটা এখানেই শেষ হবে না। এরপর এই সমস্ত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব নিয়ে টানাটানি শুরু হবে। যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার। সুতরাং এই ভোটার জালিয়াতি নিয়ে আমাদের সোচ্চার হওয়া দরকার। আমরা জানি আসামে তারা কি করেছে। সেখানে ১৯ লক্ষ লোককে NRC-র নাম করে বেনাগরিক করে দেওয়া হয়েছে। সেটা যে এখানেও হবে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তাই সাধু সাবধান! এখন থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।

বিজেপিকে এই নির্বাচনে পরাস্ত করতে হবে কারণ এই দল একাট ফ্যাসিবাদী দল যারা দেশজুড়ে ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস কায়েম করেছে। যারাই তাদের বিরোধী তাদেরকেই ‘শহুরে নকশাল’ বলে চিহ্নিত করে মিথ্যা মামলায় UAPA-এত মত দানবীয় আইনে জেলে পুরে দিচ্ছে এবং বছরের পর বছর বিনা বিচারে হাজতবাস করাচ্ছে। এর ফলে তো অনেকে অকাল মৃতু বরণ করতে বাধ্য হয়েছে । আর এ ব্যাপারে বুদ্ধিজীবী বা ছাত্র কাউকেই তারা রেয়াত করছে না। আর প্রতিবাদী যুবক বা শ্রমিকের জন্য তো তাদের পুলিসের বুলেট নির্বিচারে চলছেই।

সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হচ্ছে তারা ৩১ মার্চের মধ্যে ভারতকে মাওবাদী মুক্ত করবে বলে ঘোষণা করেছিল। কিভাবে তা করা হচ্ছে? আমরা দেখতে পেয়েছি মাওবাদী নেতাদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। ভারতবর্ষে এখনো একটা বিচার বিভাগ আছে। তার কোন তোয়াক্কা না করে যেভাবে তারা এসব করে যাচ্ছে তা তাদের কোন অশুভ উদ্দেশ্যের দিকে ইঙ্গিত করছে। কি সেই উদ্দেশ্য?

আসলে সমস্ত ধরনের প্রতিবাদগুলোকে তারা যে নির্বিচারে দমন করছে তার কারণ হচ্ছে তারা ভারতে বড় পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলি এবং সাম্রাজ্যবাদী বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে দেশের সমস্ত সম্পদ তুলে দিতে চাইছে। ইতিমধ্যেই অবশ্য তাদের সেই কাজের বেশিরভাগই সারা হয়ে গেছে। আদানি-আম্বানিসহ বিভিন্ন পুঁজিপতি গোষ্ঠীকে যেমন তারা ভারতের সমস্ত সম্পদই প্রায় তুলে দিয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার সাথে যে বাণিজ্য চুক্তি তারা করেছে তাতে আগামী দুবছরের মধ্যে আমেরিকার শিল্প ও কৃষি পণ্য ভারতবর্ষের বাজার দখল করে নেবে, ফলে এদেশের শিল্পগুলি যেমন বন্ধ হয়ে যাবে অন্যদিকে কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। কর্মচ্যুত শ্রমিক এবং সর্বস্বান্ত কৃষকেরা যাতে এর প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ফেটে পড়তে না পারে তার জন্যই সমস্ত ধরনের প্রতিবাদী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলির উপর আগেভাগেই তারা আক্রমণ নামিয়ে নিয়ে আসছে যাতে ভবিষ্যতে শ্রমিক কৃষকের লড়াইয়ের পাশে কেউ দাঁড়াতে না পারে।

বিজেপি যে আর এস এস সংগঠনের রাজনৈতিক শাখা তারা ভারতের স্বাধীনতার আগে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভাঙবার জন্য দ্বিজাতিতত্ত্ব তৈরি করে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা লাগিয়ে কাজ হাসিলের চেষ্টা করত। বর্তমানেও ভারতের পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলি এবং সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থরক্ষার্থে তারা এক কাজই করে যাচ্ছে। যেরকম ন্যক্কারজনকভাবে তারা আমেরিকা ও ইজরায়েলের দালালি করে যাচ্ছে তার ফল এখন ভুগতে হচ্ছে সমস্ত ভারতবাসীকে। এপস্টিন ফাইলে মোদি, হরদীপ সিং পুরী এবং জয়শঙ্করের নাম থাকা বুঝিয়ে দিচ্ছে কীভাবে তারা মার্কিন সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। অথচ মার্কিনীরা ভারতীয়দের সাথে কি ব্যবহার করছে? ভারতীয়দের হাতে হাতকরা পরিয়ে পায়ে শিকল বেধে আমেরিকা থেকে বার করে দেওয়া হয়েছে, অথচ এ নিয়ে ভারত সরকার নিশ্চুপ। শুধু তো তাই নয়, ভারতীয় ছাত্র বা কর্মপ্রার্থীদের ভিসা দেওয়াও আমেরিকা একরকম বন্ধ করে দিয়েছে। ইতিমধ্যেই আমেরিকায় ৪০ শতাংশ ভারতীয় ছাত্রের সংখ্যা কমে গেছে। আর এ সমস্ত কিছুই বিজেপি সরকার নির্বিবাদে হজম করে যাচ্ছে। শুধু তো এসবই নয় আমেরিকার হুমকিতে ইরান-রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনাও বন্ধ। আমেরিকা বা অন্য দেশ থেকে বেশি দাম দিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে অথচ মোদি সরকারের আমেরিকা প্রেমে ঘাটতি নেই। আর এর ফল এখন কি হয়েছে? আমেরিকা ইরানের যুদ্ধের ফলে এখন মধ্যপ্রাচ্যের তেল বা গ্যাস ভারত পাচ্ছে না কারণ হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধের ফলে আমেরিকা-ইজরায়েলের সাথে সখ্যতার কারণে ভারতের তেল-গ্যাসবাহী জাহাজগুলি এখন সেখানে আটকে আছে। শুরু হয়েছে ভারতের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম তো বেড়েইছে, এমনকি তাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দোকান ও রেস্তোরাঁগুলি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে গৃহস্থদের গ্যাস জোগাড় করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। বেড়ে গেছে অটোর ভাড়া, ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। আর এসবের জন্য দায়ী হচ্ছে আমেরিকার দালালি করা বিজেপি সরকার। সুতরাং এদেরকে কোনভাবেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভোট দেওয়া চলবে না।

আর শুধু এসবই নয়, ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসবার সাথে সাথেই শুরু হয়েছে জনগণের সাথে তার প্রতারণা ও জনগণের উপর অত্যাচার। ক্ষমতায় আসবার আগে মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সমস্ত কলো টাকা উদ্ধারের, বিদেশে পাচার হওয়া বেআইনি টাকা ফিরিয়ে আনার। আর এর ফলে প্রত্যেক ভারতীয়ের অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ করে টাকা যোগ করবার প্রতিশ্রুতির। সেই প্রতিশ্রুতির কি হয়েছে? সমস্তটাই মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিশ্রুতি ছিল বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি। কি হয়েছে? বছরে ২ লক্ষ করেও কি চাকরি হয়েছে বেকারদের ? ২০১৬ সালে চালু হয়েছিল ‘স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া' কর্মসূচী। কেউ ব্যবসা করতে চাইলে (অর্থাৎ চাকরি তারা পাবে না এটা ধরে নেওয়া হয়েছিল) সরকার তাদের পুঁজির বন্দোবস্ত করবে। ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বন্দোবস্ত করা হয়। দশ বছরে এই প্রকল্পে নথিভুক্ত স্টার্ট আপের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লক্ষের কিছু বেশি, আর এই সময় ৯ হাজার স্টার্ট আপ সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এখন তো আর এর কথা শোনাই যায় না। ২০১৪ সালে মোদি সরকারের দ্বিতীয় জুমলা ছিল ইন্টার্নশিপ প্রথা। বলা হয়, পাঁচ বছরে দেশের ৫০০টি কোম্পানি ১ কোটি বেকারকে ইন্টার্নশিপ দেবে। গড়ে বছরে ২০ লক্ষ। এক বছরে ইন্টার্নশিপ বা প্রশিক্ষণ শেষে সেই কোম্পানিতে মিলবে স্থায়ী চাকরি। কেন্দ্রীয় কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক জানিয়েছে, প্রথম দফায় ৮২ হাজার ইন্টার্নশিপের বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত এক বছরের প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ করেন মাত্র ৮ হাজার ৭০০ জন। তাদের মধ্যে ১৭টি কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন মাত্র ৯৫ জন। দ্বিতীয় দফায় প্রশিক্ষণ নেন হাজার পাঁচেক বেকার। কতজন চাকরি পেয়েছেন স্পষ্ট নয়। অর্থাৎ, এই গল্পও শেষ।

বিজেপি বলেছিল দেশের বাইরে পাচার হওয়া কালো টাকা ফিরিয়ে আনবে, তা তো হয়ইনি, বরঞ্চ ভারতের ব্যাঙ্কগুলি থেকে টাকা মেরে ( যা কিনা জনগণের সঞ্চিত টাকা) কোটি কোটি টাকা নিয়ে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন এবং তোফা দিন কাটাচ্ছেন। নীরব মোদি, মেহুল চোকসী, বিজয় মাল্য, ললিত মোদিদের মতো ব্যক্তিরা সরকারি হিসেব অনুযায়ীই ৫৮ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। এদেরকে এখনো পর্যন্ত সরকার গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত আনতে পারেনি বা ফেরত আনার কোন ইচ্ছাও তাদের আছে বলে মনে হয় না। শুধু এই নয়, ব্যাঙ্কে জনগণের সঞ্চিত টাকা নিয়ে কীভাবে বড় বড় শিল্পপতি পুঁজিপতিরা মোচ্ছব চালাচ্ছে এবং সরকার তাদের ঋণ মকুব করে দিয়ে তাদের এই জালিয়াতিতে সাহায্য করছে তা দেখলে অবাক হতে হয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৪-১৫ সাল থেকে ২০২২-২৩ এর মধ্যে ১০ থেকে ১১ লক্ষ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ মকুব করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জনগণের টাকা পুঁজিপতিদের পকেটে চিরদিনের জন্য ঢুকে গেল। যদিও সরকার দাবী করছে যে ভবিষ্যতে নাকি তা উদ্ধারের চেষ্টা চলবে, , কিন্তু এখনো পর্যন্ত উদ্ধারের যে চেষ্টা দেখা গেছে, তাতে ভবিষ্যতে কি রকম যে চেষ্টা চলবে তা বোঝাই যাচ্ছে।

এখানেই অবশ্য শেষ নয়। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কর্পোরেটদের কর ছাড় কত দেওয়া হয়েছে জানেন কি? ৪-৫ লক্ষ কোটি টাকা এই সময়ের মধ্যে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে তাদেরকে। যুক্তি কি? না, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি করা, চাকরি সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নাকি এই কর ছাড়। অথচ বিদেশী পুঁজি ভারত ছাড়ায় বেকারী বাড়ছে, কমছে শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।

অর্থাৎ গোটা দেশ জুড়ে ব্যাপক এক মন্দার আবহাওয়া বিরাজ করছে। আর এটা পুঁজিবাদের স্বাভাবিক নিয়মে যেমন হচ্ছে, তেমনই তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোদী সরকারের ভ্রান্ত সব নীতি। যেমন-নোটবন্দী, কোনরকম ভাবনাচিন্তা প্রস্তুতি ছাড়াই GST চালু করা, কোভিড-এর কারণে লকডাউন, মোদীর এসব কাণ্ড কারখানায় সাধারণ মানুষের কোন লাভ তো হয়ই নি, বরঞ্চ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রচুর মানুষ কাজ হারিয়েছেন এবং নোটবন্দির লাইনে দাঁড়িয়ে প্রচুর মানুষ প্রাণ হরিয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন বা দুর্ভোগ সইতে হয়েছে অপরিকল্পিত লকডাউনের সময়ও। লক্ষ লক্ষ মানুষকে এর ফল ভুগতে হয়েছে। আর কোভিড মহামারী তো ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আসল চেহারাটাকে নগ্ন করে দিয়েছে। উন্নত ভারতের শ্লোগানের আড়ালে বিনিা চিকিৎসায় কতশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার হিসাব নেই। মৃত মানুষের দেহ সে সময় গঙ্গায় বা অন্য নদীতে ভাসতে দেখা গেছে। আর যত মোদি সরকারের ব্যর্থতা প্রকট হয়েছে ততই হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজন বৃদ্ধির মাধ্যমে তাকে ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে।

একদিকে সাধারণ মানুষ অতল দারিদ্র্যের কবলে পড়েছেন, আর অন্যদিকে কোভিড মহামারীর সময় ভারতীয় বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ বেড়েছে ১২১%। ঐ সময়ে বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ প্রতিদিন বেড়েছে ৩,৬০৮ কোটি টাকা বছরে। এই হচ্ছে মোদী সরকারের উন্নয়ন।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসবার আগে মোদী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি দেবেন। চাকরি দেওয়া তো দূরের কথা বরঞ্চ চাকরি চলে যাচ্ছে কর্মরতদের। বেসরকারী সংস্থাগুলিতে কিভাবে ছাঁটাই চলছে তা তো সকলেই কমবেশি জানেন। কিছুদিন আগে ওরাকল ১২,০০০ কর্মী ছাঁটাই করেছে ভারতে। এসব তো রোজদিনকার ব্যাপার হয়ে গেছে। সরকারী সংস্থাগুলির কি অবস্থা? রাষ্ট্রায়ত ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে কর্মী সংখ্যা ছিল ১৭.৩ লক্ষ। ২০২২ সালে তা কমে হয়েছে ১৪.৬৬ লক্ষ । ২০১৪-১৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও দপ্তরে মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ছিল ৪০ লক্ষের কিছু বেশি। এখন শূন্যপদের সংখ্যা ১০ লক্ষ । প্রতি চারটি পদে একটি পদ খালি। ক্ষুদ্র-ছোট-মাঝারি শিল্প, সংক্ষেপে এম এস এমই-র পরিসংখ্যানে বলছে গত ৬ বছরে দেশে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার এম এস এমই বন্ধ হয়ে গেছে। সংস্থাগুলি বন্ধ হওয়াতে কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৮ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী। অন্যদিকে প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার সংস্থা ব্যবসার জন্য নাম নথিভুক্ত করেও কাজ শুরু করেনি। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা হচ্ছে ৩ লক্ষ ৩০ হাজারের কাছাকাছি। আর শিল্প বন্ধের অর্ধেক হয়েছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে।

আর বেকারী?

বেকারীত্ব ভারতে এখন মারাত্মক আকার নিয়েছে-৬.৫ শতাংশ। আর যুবদের (১৫-২৯ বৎসর) মধ্যে তার হার হচ্ছে ভারত সরকারের সংস্থা PLFS -এর মতেই ১০ শতাংশ (২০২৫)। আর ২০২৫-২৬ এর কিছু কোয়ার্টারে তা হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশে। শহরে তা প্রায় ১৯ শতাংশ আর গ্রামে প্রায় ১৪শতাংশ। গ্রাজুয়েটদের মধ্যে বেকারীত্ব প্রায় ১১-১২শতাংশ।

আর এসবের ফলে ভারতে অসাম্য বেড়েছে ভয়ানক ভাবে। অক্সফ্যামের মতো সংস্থার মতে তা স্বাধীনতার আগের থেকেও বেশি। বর্তমানে ভারতে উঁচুতলার ১ শতাংশ মানুষের হাতে আছে দেশের মোট সম্পদের ৪০-৫০ শতাংশ। আর উঁচুতলার ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ৭২-৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে নীচুতলার ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশ। আয়ের দিক থেকে যদি আমরা দেখি তবে বুঝবো কি ভয়ানক বৈষম্য চলছে দেশে এবং সাধারণ মানুষ কি দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট (২০২১) অনুযায়ী ভারতের উপর তলার ১০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট আয়ের ৫৭% দখল করে আছেন। আর অন্যদিকে ৫০% র দখলে আছে মাত্র ১৩ শতাংশ আয়। ২০২১ সালের বার্ষিক গড় আয় ছিল এরকম। (ক) তলাকার ৫০ শতাংশের বর্ষিক আয় ৫৩,৬১০ টাকা (খ) উপরকার ১০ শতাংশের বার্ষিক আয় ১১,৬৬,৫২০ টাকা (২০ গুণ বেশি)।

এই সমস্ত তথ্য থেকে পরিষ্কার যে ভয়ানক বৈষম্য আজ ভারতে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোর্বস ইন্ডিয়া (২০২৪-২৫)-এর তথ্য অনুযায়ী আম্বানির সম্পত্তির পরিমাণ ১০৫-১১৯ বিলিয়ন ডলার (রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ) আর আদানি গোষ্ঠীর সম্পদের পরিমাণ ৮৪-৯২ বিলিয়ন ডলার। মোদির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার এই বৈষম্যকে পাকাপোক্ত করা এবং তাকে অরো বাড়িয়ে তোলার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আর এর বিপক্ষে যাতে জনমত না তৈরি হতে পারে তার জন্য একদিকে চরম ফ্যাসিবাদী দমন পীড়ন নামিয়ে এনেছে আর অন্যদিকে এর পক্ষে জনমত তৈরির জন্য চালাচ্ছে সাম্প্রদায়িক ও উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচার। মোদি সরকারের ৩৭০ ধারা রদ করে কাশ্মিরী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার হরণ করা, কাশ্মীরকে দু-টুকরো করে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা তার এই পরিকল্পনার অংশ। বর্তমানে লাদাখের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর সে নামিয়ে এনেছে আক্রমণ আর মণিপুর তো মোদি শাসনের এক কলঙ্কজনক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এস এসের প্ররোচনায় মেইতি ও কুকিদের মধ্যে দাঙ্গার তো কোন শেষ দেখা যাচ্ছে না। দুবছরের বেশি চলছে এই দাঙ্গা অথচ তা প্রশমনের কোন প্রচেষ্টা তো দূরের কথা বরঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকার নীরবে দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আসলে এটাই হচ্ছে আর এস এসের রাজনীতি-জনসমাজকে ধর্মের ভিত্তিতে বা জাতির ভিত্তিতে লড়িয়ে দিয়ে আদানি-আম্বানি শাসনকে চিরস্থায়ী করা। তাই আর এস এসের ধর্মবিদ্বেষী বা জাতিবিদ্বেষী বা ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চবর্ণের আধিপত্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে সচেতন থাকা দরকার।

আরএসএস-এর মুসলিম বিদ্বেষী রাজনীতি গোটা দেশ জুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক আতঙ্কজনক অবস্থা তৈরি করেছে। কখনো গোরক্ষার নামে কখনো বা লাভ জেহাদ কখনো বা অনুপ্রবেশ নানারকম অজুহাতের মাধ্যমে তারা মুসলিমদের জীবনকে নরক বানিয়ে দিয়েছে। মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা, তাদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া, দাঙ্গা লাগিয়ে তাদের খুন করা, এস আই আর বা এন আর সি-র নামে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের বেনাগরিক করে দেওয়া এবং তারপর ডিটেনশান ক্যাম্পে তাদের ভরে দেওয়া অথবা জবরদস্তি তাদের পুশব্যাক করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া এসব এখন দৈনন্দিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর শুধু তো তাই নয়, খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও এখন হিন্দুত্ববাদী বহিনীর হামলার শিকার হচ্ছে দৈনন্দিন। তাদের চার্চে হামলা করা এবং ধর্মান্তরণের মিথ্যা অজুহাতে তাদের মারধর করাটাও এখন একটা দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর এস এস বা বিজেপি এসব কিন্তু করছে একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে। যুদ্ধ বা ভুয়া জঙ্গী হামলার নামে উগ্রজাতীয়তাবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে তারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সমর্থকে পরিণত করতে চাইছে। যাতে পুঁজিপতিরা তাদের শোষণ-নিপীড়ন নির্বিবাদে চালিয়ে যেতে পারে।

ভারতবর্ষে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষকে তারা কি চোখে দেখে তা তো পরিষ্কার হয়ে গেছে তাদের চালু করা কৃষি বিলের বিরুদ্ধে দেশজোড়া কৃষক আন্দোলনের সময় তাদের ভূমিকা থেকে। ঐ আন্দোলন দমনে কোনরকম অত্যাচার করতেই তারা বাকি রাখেনি। শেষ পর্যন্ত কয়েকশো কৃষকের প্রাণের বিনিময়ে আন্দোলন জয়ী হয়। পিছু হটে মোদি সরকার। তবে এখনও বিভিন্ন অজুহাতে তারা আবার সেই বিল ফিরিয়ে আনার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কেননা ভারতের কৃষিপণ্যের বাজার আদানি-আম্বানি এবং মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলির কাছে বিকিয়ে দিতে মোদি সরকার বদ্ধপরিকর। সাম্প্রতিক ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি যে খুব শিগগিরই ভারতের কৃষকদের সর্বনাশ ঘটাবে তা অচিরেই প্রমাণিতহবে। এ তো গেল কৃষকদের কথা। শ্রমিকদের দমন করতে মোদি সরকার চালু করেছে চারটি শ্রম কোড। যা শ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠন এবং ধর্মঘটের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। শ্রমিকরা যাতে সংগঠিত হতে না পারে, না পারে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সেটা দেখাই এইসব আইনের উদ্দেশ্য। মোদি সরকার -এর সমস্ত কাজকর্মই এখন দাঁড়িয়েছে ভারতীয় পুঁজিপতিদের মুনাফাবৃদ্ধির জন্য একের পর এক পরিকল্পনা নেওয়া। অন্য দিকে তাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষ যাতে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে তার জন্য বিভিন্ন কালা কানুন জারি করা, প্রতিবাদীদের জেলে পোরা এবং সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বা জাতগত বিদ্বেষ তৈরি করে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যকে ভেঙে দেওয়া। এহেন ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে যে কোন মূল্যে পরাস্ত করতে হবে। তাদের একটি ভোট দেওয়ার মানে হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের বুকে একটি বুলেট নিক্ষেপ। তাই ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে কোন ভোট নয়।

প্রতিক্রিয়াশীল তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেসকে পরাস্ত কর

গত ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে আসীন রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় বাম সরকারের জবরদস্তি জমি দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে পুঁজি করে তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের সরকারী ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। যদিও ঐসব আন্দোলনে তাদের ভূমিকা সেরকম কিছু ছিল না, কিন্তু নকশালপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী ও এস ইউ সি আই-এর সমর্থনকে পুঁজি করে তারা সরকারি ক্ষমতা দখল করে। জনগণের একটা বড় অংশের সমর্থনও তারা আদায় করে। সে সময়ে বিজেপি, কংগ্রেস থেকে শুরু করে সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি তাদের সমর্থন জানিয়েছিল। তৃণমূল যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্যতম ধারক ও বাহক ছিল এবং তাকেই রক্ষা করতে চেয়েছিল বা এখনো রক্ষা করে চলেছে এ বিষয়ে আমাদের কোন সন্দেহ ছিল না বা নেই। যদিও তৃণমূলের সমর্থক নকশালপন্থী ও এস ইউ সি আই তাদের মধ্যে অনেক কিছু দেখতে পেয়েছিল। যাহোক সেসব স্বতন্ত্র বিষয়।

তৃণমূল সরকারী ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের ভাষায় যথেষ্ট উন্নয়ন’ তারা করেছে। উন্নয়ন বলতে বুর্জোয়া অর্থনীতি যেভাবে বলে সেই অর্থে কিছু উন্নয়ন যে তারা করেছে এবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। যেমন ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার সময় থেকে আজ পর্যন্ত রাজ্যের অর্থনীতি তিন গুণের কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়েছে। (২০১১-১২ তে GSDP ছিল ৫.২ লক্ষ কোটি, ২০২৪-২৫-এ তা হয়েছে ১৮.১ লক্ষ কোটি)। মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। যেমন, ২০১১ সালে মাথা পিছু আয় ছিল ৬০,০০০- ৬৫,০০০ টাকা, ২০২৪ সালে তা হয়েছে ১.৮ লক্ষ টাকা। এমনকি বিভিন্ন (২০টির মতো) সামাজিক প্রকল্প চালু করে ছাত্র-ছাত্রী, মহিলা, বৃদ্ধদের হাতে নগদ টাকা বা সাইকেল বা রেশনে কম দামে চাল-গম দেওয়া হয়েছে। শিল্প খাতে বৃদ্ধিও ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে। আবার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজের সংখাও বেড়েছে। সুতরাং সেই অর্থে ‘উন্নয়ন' যে হয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই ।

কিন্তু এসব ‘উন্নয়ন' হলেও শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের আসল সমস্যার সমাধান কিন্তু হয়নি। গোটা ভারতবর্ষে অসাম্য যে প্রচণ্ডভাবে বেড়েছে (যা কিনা ব্রিটিশ আমলের থেকে বেশি) তা তো পঃ বাংলাতেও হয়েছে। তা থেকে মুক্তি মেলেনি। বেকারত্ব এমনকি ২০২১-২২ এর সময় থেকে বেড়ে এখন হয়েছে ৪ শতাংশের মতো। তা জাতীয় গড়ের থেকে কম হলেও এখানে শ্রমিকদের মজুরিও কিন্তু জাতীয় গড়ের থেকে অনেকটাই কম। সুতরাং মেহনতী মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যাও ফলে এখানে বেশি। যে কারণে পঃবঙ্গ থেকে প্রচুর মানুষ বেশি আয় করবার জন্য বাইরের রাজ্যে চলে যায়। যদিও সম্প্রতিকালে বেকার ভাতা চালু করা হয়েছে, তাতে হয়তো কিছুটা প্রলেপ পড়বে, কিন্তু তাতে তো সমস্যার সমাধান হবে না। আসলে সমাজের সার্বিক শিল্পায়ন ছাড়া বেকার সমস্যার কোন সমাধান নেই। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের যুগে পিছিয়ে পড়া দেশগুলিতে এবং এর ফলে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পঃবঙ্গেও সার্বিক শিল্পায়ন সম্ভব নয়। ফলে সমস্যার মৌলিক সমাধান তৃণমূল সরকার তো নয়ই, কোন সরকারই করতে পারবে না। কাজেই 'উন্নয়ন' এর গল্প গল্পই থেকে যাবে, বাস্তবায়িত হবে না। তৃণমূল সরকার যেসব সামাজিক প্রকল্পগুলো চালু করেছে তা আসলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে রক্ষা করবার জন্যই। সমাজের সার্বিক রূপান্তের যেহেতু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে সম্ভব নয়, তাই স্বাভাবিকভাবেই শ্রমিক-কৃষক- মেহনতী মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে এই ব্যবস্থা বদলের দিকে অগ্রসর হতে পারে, তা যাতে না হয়, তাই কিছু খুদকুড়ো বিলিয়ে তাদেরকে ঠান্ডা রাখবার জন্যই এইসব সামাজিক প্রকল্প চালু করা হয়েছে। যা কিনা ভারতের সমস্ত বুর্জোয়া দলই কম বেশি করে থাকে। সুতরাং এ ব্যাপারে তৃণমূলের আলাদা কোন কৃতিত্ব নেই।

তবে যে দুটি ব্যাপারে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বেশ বড় আকার নিয়েছে তা হল তাদের সরকারের দুর্নীতি এবং স্বৈরাচারী কার্যকলাপ।

তৃণমূলের জন্ম কংগ্রেস থেকে। সুতরাং কংগ্রেসীদের দুর্নীতির ঐতিহ্যই তৃণমূল বহন করে চলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সমস্ত ক্ষেত্রেই এই দুর্নীতি লাগামছাড়া হয়ে গেছে। শিক্ষক পদ টাকা দিয়ে বিক্রি হয়েছে। যার ফল ভুগছেন রাজ্যের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকারেরা। এমনকি আদালতের রায়ের ফলে ( যা সঠিক নয় বলে আমরা মনে করি) যেসব শিক্ষক টাকার বিনিময়ে চাকরি পাননি তাদেরও চাকরি চলে গেছে। ফলে এক ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অবস্থাটা কি তা বোঝা যায় যখন ৮ হাজার স্কুল বন্ধের ঘোষণা হয়। অর্থাৎ ছাত্রদের সংখ্যা কমছে, বাড়ছে ড্রপ আউট। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সিট খালি পড়ে থাকছে, ছাত্ররা ভর্তি হচ্ছে না বা হতে পারছে না। আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তো নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধই হয়ে গেছে। চূড়ান্ত স্বৈরাচারী কার্যকলাপ চলছে সেখানে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও চলছে নৈরাজ্য। আরজিকরের ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে বেআইনি বাতিল ওষুধের কারবার অবাধে চলছে। রোগীরা বেডের অভাবে চিকিৎসার সুবিধা পাচ্ছেন না। নামে ফ্রি হলেও প্রচুর টাকা খরচ করে তাদের চিকিৎসা পরিষেবা পেতে হচ্ছে। ঘটা করে ‘মাল্টি স্পেশালিটি' হাসপাতাল চালু হলেও তাতে চিকিৎসার সুযোগ প্রায় কিছু নেই বললেই চলে। সুতরাং স্বাস্থ্য পরিষেবা একরকম ধুঁকছে বলাই চলে। এক্ষেত্রে ‘স্বাস্থ্যসাথী' প্রকল্প সমস্যার কোন সুরাহা করতে পারছে না। কেননা সম্পূর্ণ চিকিৎসা বিনা পয়সায় না দিলে বিমা প্রকল্প চালু করে গরিব মানুষের বিরাট কিছু লাভ হবে না।

তবে দুর্নীতি চলছে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পগুলিকে কেন্দ্র করে, যেমন আবাস যোজনা। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা এখান থেকে কাটমানি আদায় করছেন তা সকলেই জানে। আবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বালি, কয়লা ইত্যাদি পাচারের অভিযোগ। ঐসব করেও তৃণমূলের নেতারা প্রচুর টাকা কামাচ্ছেন বলে শোনা যায়। তারপর সিন্ডিকেট রাজ তো রয়েইছে। যাও টাকা কামানোর অন্যতম উৎস।

তবে দুর্নীতির পাশাপাশি তৃণমূলের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ হচ্ছে তাদের স্বৈরাচারী কার্যকলাপের। সরকারি ক্ষমতায় আসবার পর থেকেই তারা সমস্ত বিরোধী দলের উপরই হামলা-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। বামপন্থী দলগুলির প্রচুর নেতা-কর্মীকে তারা খুন পর্যন্ত করেছে। কোন জায়গাতেই কোনরকম আন্দোলনকেই তারা সহ্য করতে রাজি নয়। মিথ্যা অজুহাতে আন্দোলনকারীদের জেলে ঢোকানোটা তাদের কাছে জলভাত। পঞ্চায়েত নির্বাচন ও পৌরসভা নির্বাচনগুলি যেগুলি তাদের আমলে সংঘটিত হয়েছে সেগুলিকে তারা একরকম প্রহসনে পরিণত করেছিল। বিরোধীদের নমিনেশন পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় জমা দিতে তারা বাধা দিয়েছে। তবে আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা সরকারিভাবে ছাত্রসংসদের নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে কায়েম হয়েছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের গুণ্ডারাজ। বামপন্থী সংগঠনগুলো তাদের অতীতের জনবিরোধী কার্যকলাপের ফলে যখন পঃবঙ্গের মানুষের থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তখন এখানে উত্থান ঘটেছে ফ্যাসিবাদী বিজেপির। ফ্যাসিবাদীরা যখন থেকে তাদের হিন্দুত্ববাদী কার্যকলাপের বৃদ্ধি ঘটিয়েছে, তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে তৃণমূলও একই কাজ করে চলেছে। সরকারি টাকায় জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে উত্তর বাংলায় মহাকাল মন্দিরের প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সবই আসলে হিন্দুত্ববাদের পালেই হাওয়া লাগাচ্ছে। রামনবমীর পালন তৃণমূল নেতারা যেভাবে করে চলেছেন তাতে বোঝা মুশকিল তাদের সাথে বিজেপির ফারাক কোথায়! আসলে জনগণের পশ্চাদপদ চেতনাকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলও এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রক্ষকের কাজই করছে। বিজেপির মৌখিক বিরোধিতা করার কারণে অনেকেই ভাবছেন তৃণমূল বোধহয় বিজেপির বিরুদ্ধে বিরাট কোন লড়াই করবে, আসলে আদপেই তা হবে না। যেমন এসআইআরের বিরোধিতা তৃণমূল করছে বটে, কিন্তু আদালতের বাইরে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নিতে তাকে দেখা যাচ্ছে না। আসলে এটাই স্বাভাবিক। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কোন বুর্জোয়া দলই কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নিতে পারবে না, নেওয়া সম্ভবও নয়। কারণ তাদের সকলেরই টিকি বাধা রয়েছে ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণীর কাছে। তাদের সকলেরই শ্রেণীস্বার্থ এক। তাই আসন্ন নির্বাচনে শ্রমিক শ্রেণীর স্বাধীন স্বতন্ত্র অবস্থানের স্বার্থে ফ্যাসিবাদী বিজেপির পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসকেও পরাস্ত করতে হবে।

কংগ্রেস সম্পর্কেও আমাদের মতামত আলাদা কিছু নয়। ভারতবর্ষের বুর্জোয়াদের অন্যতম প্রাচীন দল এই কংগ্রেস। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে থাকাকালীন পরাধীন ভারতবর্ষে কংগ্রেস স্বাধীনতা আন্দোলনে ছিল বটে, কিন্তু তার ভূমিকা ছিল আপোষকামী। আপোষের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে যে স্বাধীনতা তা ভারতীয় পুঁজিপতিদের রাজ কায়েম করেছে। আর কংগ্রেস ছিল তাদেরই প্রতিনিধি। সুতরাং সে ভারতীয় পুঁজিপতিদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দল। ভারতীয় পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষাই সে বরাবর করে এসেছে। ভারতবর্ষের যে সংবিধান কংগ্রেস চালু করেছে তা ব্যক্তিমালিকানাকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছে, যা পুঁজিবাদেরই মতাদর্শ এবং জীবনও বটে। যে শ্রেণী বিভক্ত, শোষণমূলক ব্যবস্থা কংগ্রেসের নেতৃত্বে পুঁজিপতিরা ভারতে চালু করেছে তা উত্তরাধিকার সূত্রে বিজেপি, তৃণমূল, বামফ্রন্ট বা সমস্ত দলই বহন করে চলেছে। আজ বিজেপির বিরোধিতা কংগ্রেস করছে বটে কিন্তু তা মৌলিক কোন বিরোধ নয়। বিজেপির ফ্যাসিবাদকে কংগ্রেস বরাবরই রক্ষা ও মদত করে এসেছে, শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে তাকে কাজে লাগানোর জন্য। যার উপযোগিতা এখন ভারতের পুঁজিপতিরা বুঝতে পারছে। আম্বানি আদানির বিরুদ্ধে রাহুল গান্ধী বলছেন, আম্বানির উত্থান তো হয়েছিল কংগ্রেসের মদতে। তাকে বেআইনি ও অন্যায় মদত করেছিল তো কংগ্রেস সরকারই। সুতরাং রাহুলের এই বিরোধিতা নাটক ছাড়া কিছু নয়। বিজেপির দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কংগ্রেস কোন ব্যবস্থা নিয়েছে কি? বাবরি মসজিদের তালা কে খুলে দিয়েছিল? রাজীব গান্ধী নন কি? বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার কেন নীরব হয়ে বসেছিল। কংগ্রেস কি তার জন্ম থেকে বরাবরই হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাকে মদত করেনি? মদনমোহন মালব্য, লালা লাজপত রাই-এর মতো সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিরা তো কংগ্রেসেরই নেতা ছিল? ১৯৮৪ সালে হরিদ্বারে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সম্মেলনের উদ্বোধন তো করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী—যেখান থেকে বাবরি মসজিদ ভাঙবার আহ্বান দেওয়া হয়েছিল? তাহলে কংগ্রেস কি ফ্যাসীবাদের মদতদাতা নয় ? তাছাড়া নির্বাচনের সময় রাহুল গান্ধী থেকে কংগ্রেসের নেতারা মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ান। অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের পাশে তারা এভাবেই হাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন।

আর কংগ্রেসের অর্থনৈতিক নীতি? স্বাধীনতার সময় থেকেই কংগ্রেস পুঁজিপতি ও জমিদারদের হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তার তথাকথিত ভূমি সংস্কার আসলে ছিল সামন্তবাদী জমিদারদের পুঁজিবাদী জমিদারে রূপান্তরিত করার কর্মসূচী। জমিদারদের জমি ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে অধিগ্রহণের মানেই ছিল তাদের হাতে পুঁজি তুলে দেওয়া, যা দিয়ে তারা পুঁজিবাদী বড় চাষী হয়ে উঠতে পারে। আর রাষ্ট্রীয় শিল্প গড়ে তুলেছিল তারা কি উদ্দেশ্যে? যেহেতু ভারতের পুঁজিপতিরা ছিল দুর্বল, তাই শিল্পের জন্য পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারাটা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সরকার পরিকাঠামোগত মৌলিক শিল্পগুলি গড়ে তুলে ঐসব ব্যক্তিমালিকানাধীন পুঁজিবাদকেই উৎসাহ দিয়েছিল। আবার যখন নব্বই দশকে তারা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল তখন আবার সেগুলো বেসরকারিকরণ করে ঐসব পুঁজিপতিদের হাতে সেগুলো তুলে দিতে শুরু করে। এটারই গালভরা নাম তারা দিয়েছিল উদার অর্থনীতি। কংগ্রেসীদের সেইসব কাজই আজ বিজেপি আরো জোরদারভাবে করে চলেছে।

আর গণতন্ত্র! পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রকে পুঁজিবাদের দালালরা ‘গণতন্ত্র' বলে চালায় । আসলে এটা পুঁজিপতিদের একনায়কত্ব। যেখানে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের কোন গণতন্ত্র নেই। তাদের জীবন-জীবিকার স্বার্থে যখনই তারা দাবিদাওয়া তুলে লড়তে গেছে তখনই তাদের উপরে নেমে এসেছে আক্রমণ। কংগ্রেসীদের শাসনকালে এমন কোন সময় যায়নি যখন বিনা বিচারে আটক আইন ছিল না। যেমন- পিডি অ্যাক্ট, মিসা, নাসা, পোটা এবং সর্বশেষ চালু হয় ইউএপিএ। যাকে এখন বিজেপি খুব দক্ষভাবে ব্যবহার করছে। আমরা তো জরুরি অবস্থার কথা ভুলে যাইনি। তখন যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ভারতবর্ষের মানুষ ভোগ করত তা সব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন নিপীড়িত জাতিসত্ত্বাগুলোর উপর কংগ্রেসীদের অত্যাচার আমরা বিস্মৃত হইনি। কাশ্মীর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুরের রক্তাক্ত ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করছে। সেই রাজ্যগুলিতে আফস্পা আইন কংগ্রেসীরাই চালু করেছিল, যাতে বিদ্রোহী জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা করলে সেনবাহিনীকে জবাবদিহি করতে হয় না। এই কংগ্রেসের মুখে গণতন্ত্রের বুলি হাস্যকর শোনায়। আমরা কি সত্তরের দশকে পঃবঙ্গে বামপন্থীদের উপর কংগ্রেস সরকারের নারকীয় অত্যাচার এবং হত্যাকাণ্ডের কথা ভুলে যেতে পারি। হাজার হাজার নকশালপন্থী ও সিপিএম কর্মীকে সেই সময় হত্যা করা হয়েছিল। এই কংগ্রেসকে কোন ভোট নয় ।

তবে বিকল্প কে? বামপন্থীরা ?

বামফ্রন্ট সম্পর্কে বা তার ৩৪ বছরের শাসন সম্পর্কে পঃবঙ্গের মানুষের স্মৃতি এখনও টাটকা আছে, তা বাসি হয়ে যায়নি। ১৯৭৭ সালে একটা বিকল্প শাসন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল। কি তারা করেছে? একটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে সরকারে যেই আসুক তাকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দাসত্বই করতে হয়, এটা আমরা জানি। বামফ্রন্ট তার ৩৪ বছরের শাসনে পঃবঙ্গের মানুষের কাছে সেটাই প্রমাণ করেছে, আর সেই কারণেই ২০১১ সালে সে ক্ষমতাচ্যুত হয়।

বামফ্রন্ট বিশেষত সিপিএম তার ৩৪ বছরের শাসন নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু গর্ব করার মতো কি তারা করেছে? তাদের দাবী ভূমিসংস্কার, অপারেশন বর্গা ইত্যাদি। এটা অস্বীকার করা যায় না যে ক্ষমতায় আসবার পরই তারা ভূমিসংস্কার কিছুটা হলেও করেছিল, কিছু ভূমিহীন চাষী কিছুটা করে জমি পেয়েছিল, কিন্তু শুধু জমি দিয়ে কি চাষ হয়? সার, সেচ, বীজ, বিদ্যুৎ এসব তো পয়সা দিয়ে কিনতে হয়। এগুলোর ব্যবস্থা কে করবে? এজন্যই ২০০৭ সালে জানা যায় তারা যত মানুষকে জমি দিয়েছিল তাদের মধ্যে ১৩ শতাংশের মতো মানুষ জমিচ্যুত হয়ে গেছে। আর তাছাড়া এর ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কি কোন ক্ষতি হয়েছিল? একদমই নয়, বরঞ্চ তা লাভবানই হয়েছিল। সুতরাং এটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে একটা সংস্কারবাদী কর্মসূচি ছাড়া কিছু নয়। যা তাদের মতো সংস্কারবাদীদেরই মানায়। আর অপারেশন বর্গা? এটা ছিল বর্গাদারদের নাম রেজিস্ট্রেশনের একটা কর্মসূচী, যা কিনা জমির মালিকদের কোর্ট কেসের ফলে শেষে বানচাল হয়ে যায় এবং এই কর্মসূচী পরিত্যক্ত হয়। এরপর বামফ্রন্ট-এর কার্যাবলী কি ছিল? আর পাঁচটা পুঁজিবাদী সরকার যা করেছে তারাও তাই করে গেছেন। ভুলে গেলে চলবে না স্বাধীন ভারতে ১০০ শতাংশ ভূমি সংস্কার কর্মসূচী সম্পন্ন হয়েছিল জম্মু ও কাশ্মীরে। তাতে কি সেখানকার সমাজ বদলে গেছে? নাকি পুঁজিবাদের কোন ক্ষতি হয়েছে? সুতরাং সিপিএমের ভূমি সংস্কার ও অপারেশন বর্গা নিয়ে বাগাড়ম্বর- এর কোন অর্থ আছে বলে আমরা মনে করি না।

ভারত বিভাজনের সময় পঃবঙ্গে আগত উদ্বাস্তুদের স্বার্থে অবিভক্ত সিপিআই একসময় জোরদার আন্দোলন করেছিল। যে কারণে উদ্বাস্তু অঞ্চলগুলিতে বামপন্থীদের বরাবরই প্রভাব ছিল। তারা সেই সময় বহির্বঙ্গে অর্থাৎ আন্দামান বা দণ্ডকারণ্যে বাঙালি উদ্বাস্তুদের পাঠানোর বিরোধিতাও করেছিল। সেই কারণে ১৯৭৭ সালে পঃবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার কায়েম হবার পর দলে দলে উদ্বাস্তু সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে এসে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের উপর ১৯৭৯ সালে বাম সরকার যে নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল তা এখনও অনেকের স্মৃতিতে টাটকা আছে। এরপর আমরা দেখেছি শান্তিপুরে কৃষক হত্যা, হাওড়ায় শ্রমিকদের উপর গুলি ইত্যাদি একের পর এক মেহনতী মানুষের উপর হামলা। ভিক্টোরিয়া জুট মিলে ভিখারী পাসোয়ানের হত্যা আমরা ভুলিনি। অবিভক্ত সিপিআই এক সময় স্বাধীন গোর্খাল্যান্ড এর দাবি নিয়ে আন্দোলন চালিয়েছিল। অথচ ১৯৮৬-৮৭ সালে যখন দার্জিলিং পাহাড়ে গোর্খাল্যান্ড এর দাবী নিয়ে আন্দোলন শুরু হল তখন তার বিরুদ্ধে বিনা বিচারে আটক আইন পোটা প্রয়োগ করা হল এবং কালিম্পং-এ গণহত্যা করা হল। ১১ জন পুলিশি গুলিতে মারা যান। অথচ ভারতের সংবিধানে আলাদা রাজ্য গঠনের অধিকার স্বীকৃত আছে। একই আচরণ আমরা দেখেছি ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। সেখানেও তারা দমনপীড়ন চালিয়ে আন্দোলন ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। শুধু এসবই নয়, বিরোধী বিভিন্ন বামপন্থী দলের উপরেও তারা হামলা চালিয়েছে। খুন করেছে নকশালপন্থী এবং এসইউসিআই কর্মীদের। এটা তাদের আসল চেহারাকে চিনিয়ে দেয়।

গণতান্ত্রিক অধিকারের উপরেও তারা ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে গেছে। শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন যেমন আক্রান্ত হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে ছাত্র আন্দোলনও। সেই সময়ে ছাত্র সংসদগুলিকে গায়ের জোরে বা জালিয়াতি করে তারা দখলে রাখবার জন্য মরিয়া হয়ে গিয়েছিল।

সিপিএম বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক দল বলে গাল দেয়, এমনকি তাকে নয়া ফ্যাসিবাদী বলে দাবী করে তাকে পরাস্ত করতে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসের মতো আরো অন্যান্য বুর্জোয়া দল এবং ফ্যাসিবাদী দল শিবসেনার সাথে ইন্ডিয়া জোট গড়ে তুলেছে। অথচ আমরা দেখেছি বাজপেয়ী সরকারের আমলে যখন পঃবঙ্গে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই ফেরি করে বেড়াতেন। তিনি দাবী করেছিলেন 'মাদ্রাসাগুলিতে জঙ্গী তৈরি হয়।' এবং শুধু তাই নয়, ব্যাপকহারে মুসলিম যুবকদের জঙ্গী অভিহিত করে গ্রেপ্তার করা হয়। যাদের পরে প্রমাণের অভাবে সকলকেই ছেড়ে দিতে বাম সরকার বাধ্য হয়েছিল। এইভাবেই তারা হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বা ফ্যাসীবাদের দালালি করেছিল। শুধু এটাই নয়, ফ্যাসীবাদের দালালি করার আরো অতীত ইতিহাস তাদের আছে। ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরাচার (তাদের ভাষায় 'আধা ফ্যাসিবাদ')-কে বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা হাত মিলিয়েছিলেন আর এসএসের সাথে। জয়প্রকাশ নারায়ণের সাথে মিলে তারা এই কাজ করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে যে জনতা পার্টির সরকার তৈরি হয়েছিল, সেই পার্টির অন্যতম শরিক ছিল জনসংঘ (বিজেপির পূর্ববর্তী নাম) আর সেই সরকারের অন্যতম দুই মন্ত্রী ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদবানি। সেই সরকারকে সিপিএম সমর্থন দিয়েছিল তাদের পতনের সময় পর্যন্ত। অর্থাৎ ফ্যাসীবাদের দোসর হিসেবে তারা সেই সময়ে কাজ করেছিল। আজকে আবার নয়া 'ফ্যাসিবাদ'-এর বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা হাত মেলাচ্ছে কংগ্রেসের সাথে যারা কিনা তাদের ভাষায় 'আধা ফ্যাসিবাদ । সিপিএমের এইসব দ্বিচারিতা আর কতদিন চলবে?

তবে সিপিএমের সবচেয়ে বড় অপরাধ ‘শিল্পায়নের' নাম করে যেভাবে তারা সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে কৃষকদের উচ্ছেদ করে সেইসব জমি পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলির হাতে তুলে দিয়েছিল এবং দেবার চেষ্টা করেছিল। সিপিএম লেনিনবাদ-এর কথা বলে, অথচ লেনিনই সাম্রাজ্যবাদ-এর যুগে পিছিয়ে পড়া পুঁজিবাদী দেশগুলিতে পুঁজিবাদের সার্বিক বিকাশের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছেন। অথচ নিজেকে লেনিনবাদী বলে দাবী করা সিপিএম পঃবঙ্গের ‘শিল্পায়ন' করবে বলে দাবী করে। অর্থাৎ টাটা বা অন্যান্য পুঁজিপতিদের দালালি করতে গিয়ে তারা কৃষক স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। অথচ এক সময় কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তারা পঃবঙ্গে জনভিত্তি তৈরি করেছিল। তাদের এই পুঁজিপতি বান্ধব কার্যকলাপের ফলেই শেষ পর্যন্ত তারা ২০১১ সালের নির্বাচনে পরাস্ত হয়। সিঙ্গুরে কৃষকদের উপর নির্যাতন, নন্দীগ্রামে কৃষক হত্যা পঃবঙ্গের মানুষ মেনে নিতে পারেনি।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে সিপিএম এখনও এসব বুঝে উঠতে পারেনি (কোনদিন পারবেও না)। তারা এখনও ‘শিল্পায়নের' ঢক্কা নিনাদ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা তাদের সম্পর্কে মানুষকে সন্দিহান করে তুলছে। মোদি, মমতা থেকে কেউই শিল্পায়ন, উন্নয়ন-এর কথা বলতে ছাড়ছে না। অথচ কেউই এটা করতে পারছে না। কেন? কারণটা আজ থেকে ১১০ বছর আগে লেনিন ব্যাখ্যা করে গেছেন। সিপিএম নিজেকে লেনিনবাদী বলে দাবী করে, অথচ সাম্রাজ্যবাদের যুগে ভারতের মতো দেশে শিল্পায়নের মিথ্যা কথা বলে ভোট চায়। শুধু তাই নয়, তারা প্রত্যেক পরিবারের একজনকে চাকরি দেবেন বলে দাবি করছেন। কোত্থেকে দেবেন? এসব মিথ্যা কথা তারা প্রচারে বলে বেড়াচ্ছেন। আরো অনেক মিথ্যা তারা বলছেন, সেসব আলোচনা আর নাই বা করলাম। কিন্তু জবাব দেবেন কি- তৃণমূল সরকার অস্থায়ী কর্মী দিয়ে সরকারি দপ্তর, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ভরিয়ে দিচ্ছে বলে আপনারা তাকে বিরোধিতা করছেন। খুবই ভালো কথা, আমরাও তাই করি। কিন্তু উত্তর দিন তো— এসব শুরু করেছিল কারা? আপনারাই তো এসব শুরু করেছিলেন। শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, বেসরকারিকরণ, যৌথ উদ্যোগ এসব তো আপনারাই শুরু করেছিলেন, এখনও তো তাই করবেন বলছেন, তাহলে তৃণমূলকে গাল পাড়ছেন কোন মুখে? আর আরজিকরে ছাত্রী হত্যা, দুর্নীতি? আপনাদের আমলে আরজিকরে ছাত্রী হত্যা, দুর্নীতি এসব ছিল না, না হয়নি? গোটা পঃবঙ্গে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি ছিল না? আপনারা এদের থেকে কোথায় আলাদা? না কোথাও আলাদা নয়। আপনাদের সরকারটা একটা পুঁজিবাদী সরকারই ছিল। ভবিষ্যতে যদি আপনারা সরকার গঠন করতে পারেন, সেটাও তাই হবে। তাই আপনাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা কিছু নেই।

তাহলে ভোট দেব কাকে?

বিজেপি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস- এর সঙ্গে বামফ্রন্টেরও সরকারী স্তরে মৌলিক কোন ফারাক নেই। সব সরকারই পুঁজিবাদের দালাল বা চাকর সরকার।

কিন্তু ফ্যাসিবাদী বিজেপি বা বুর্জোয়া দল কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেস-এর থেকে বাম দলগুলির একটা ফারাক আছে। এগুলো সংস্কারবাদী শ্রমিক দল। এরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চায়, কিন্তু এদের শ্রেণী ভিত্তি বা গণভিত্তি শ্রমিকদের মধ্যে এবং মেহনতী মানুষদের মধ্যে। এদের ভিত্তি থেকে দলগুলিকে বিচ্ছিন্ন করতে হলে এদের সম্পর্কে শ্রমিক শ্রেণী ও মেহনতী মানুষের আরো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন আছে। আমরা চাই এরা সরকারে আসুক এবং শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী মানুষের সামনে নিজেদের মুখোশ নিজেরাই খুলুক। তবেই এইসব শ্রমিক ও মেহনতী ভাইদের আমরা বিপ্লবী মার্কসবাদের পতাকার তলে টানতে পারব। কিছু অগ্রণী মার্কসবাদী বা শ্রমিক এদের প্রকৃত চরিত্র কি তা জানে, কিন্তু ব্যাপক শ্রমিক বা মেহনতী মানুষ তা জানে না বা বোঝে না। আমরা চাই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা তা শিখুন এবং বিপ্লবী মার্কসবাদের সঠিকতা সম্পর্কে তারা নিঃসন্দেহ হোন।

তাই এই তথাকথিত বামদের চরিত্র উন্মোচনের কাজ চালিয়ে যাবার সাথে সাথে আমরা বলব এদের ভোট দিন এবং একটা ফাঁসির দড়ি যেভাবে ফাঁসির আসামীকে সাহায্য করে, এদেরকেও এদের রাজনৈতিক মৃত্যুর জন্য একটা ভোট দিয়ে সেভাবে সাহায্য করুন। আমাদের শ্লোগান হচ্ছে-- শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রেণী। ফ্যাসিবাদী ও বুর্জোয়া দলগুলিকে আসন্ন নির্বাচনে পরাস্ত করুন এবং বাম দলগুলিকে জয়ী করুন। তবে দক্ষিণপন্থী আইএসএফ বা সোস্যালিস্ট পার্টিকে কোন ভোট নয়।

আমাদের কথা

আমরা মনে করি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। একমাত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়েই একে উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সেটাই আমাদের মূল কাজ। কিন্তু সেই মূল কাজের সহযোগী হিসেবে পার্লামেন্টকে ব্যবহার করা যেতে পারে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচনের জন্য। আমাদের সংগঠন ক্ষুদ্র বলে আমরা নির্বাচনে প্রার্থী দিচ্ছি না। কিন্তু বাম দলগুলিকে সমালোচনামূলক সমর্থনের মধ্য দিয়ে আমরা একরকম ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। কিন্তু সেটা শুধুমাত্র বাম দলগুলিকেই ভোট দিয়ে আমরা করব। আইএসএফ বা সোস্যালিস্ট পার্টির মতো দক্ষিণপন্থী দলগুলিকে ভোট নয়। সেইসব কেন্দ্রে আপনারা এসইউসিআই বা অন্য বাম দল থাকলে তাকে ভোট দিন। তাও না থাকলে ভোটদানে বিরত থাকুন। যদিও এসইউসিআইও একটা আদ্যোপান্ত স্ট্যালিনবাদী দল এবং ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের শরিক হিসেবে নকশালবাড়ির কৃষক জনতা ও টেক্সম্যাকোর শ্রমিক হত্যার রক্তে তাদের হাতও রক্তাক্ত। সুতরাং এইসব বেইমানদের উপর কোন আস্থা নয়। একটা সত্যিকারের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলতে আসুন আমরা সচেষ্ট হই। আর কেবলমাত্র লিয় ট্রটস্কি কর্তৃক গঠিত চতুর্থ আন্তর্জাতিকের কর্মসূচির ভিত্তিতেই সেই পার্টি তৈরি হতে পারে। আসুন ভারতবর্ষে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে যে নেতৃত্ব আজ অবশ্য প্রয়োজনীয় সেই কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলতে আমরা আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করি।

“কমিউনিস্ট পার্টি কাকে ‘রক্ষা করবে? উইমার সংবিধান? না, আমরা এই কর্তব্য ব্র্যান্ডলারকে (জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সুবিধাবাদী নেতা–লেখক) ছেড়ে দেব। জার্মান রাষ্ট্রের মধ্যে শ্রমিক শ্রেণী যেসব বস্তুগত ও নৈতিক অবস্থানগুলি জয় করতে সক্ষম হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি সেগুলোকে রক্ষা করবার জন্যই অবশ্য আহ্বান জানাবে। তা সবচেয়ে প্রত্যক্ষভাবে চিন্তা করে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগঠনগুলির, ট্রেড ইউনিয়নগুলির, পত্রিকাগুলির, ছাপাখানাগুলির, ক্লাবগুলির, গ্রন্থাগারগুলি ইত্যাদির ভাগ্য নিয়ে। কমিউনিস্ট শ্রমিকরা তাদের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক প্রতিপক্ষদের অবশ্যই বলবে: ‘আমাদের পার্টিগুলির নীতিসমূহ অনতিক্রমনীয়ভাবে পরস্পরের বিরোধী; কিন্তু ফ্যাসিস্টরা যদি আজ রাতে তোমাদের সংগঠনগুলির হল ভাঙতে আসে তবে আমরা অস্ত্র হাতে তোমাদের সাহায্য করতে দৌড়ে আসব, তোমরা কি আমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ যে আমাদের সংগঠন যদি আক্রান্ত হয় তবে আমাদের সাহায্যে তোমরাও এগিয়ে আসবে ?” বর্তমান পর্যায়ে এটাই হচ্ছে আমাদের নীতির মূল বিষয়, সমস্ত আলোড়ন এই প্রশ্নকে ঘিরেই আবর্তিত হওয়া উচিত।” (লিয় ট্রটস্কী-দি টার্ন ইন দি কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড দি সিচুয়েশন ইন জার্মানি— সেপ্টেম্বর ১৯৩০)

সূচি

  • আসন্ন নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে পরাস্ত কর
  • প্রতিক্রিয়াশীল তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেসকে পরাস্ত কর
  • তবে বিকল্প কে? বামপন্থীরা ?
  • তাহলে ভোট দেব কাকে?
  • আমাদের কথা